পশ্চিমী আধিপত্যের জোয়াল ভেঙে ডলার সাম্রাজ্যের বাইরে আসার বিপজ্জনক পথ (শেষ পর্ব)

জাস্টিন পোদুর
২০০৪ সালের সুনামিতে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। সেই সময় আইএমএফের লুঠেরা ঋণের গ্রাহক হয় এই দেশ। যদিও শ্রীলঙ্কার মোট বৈদেশিক ঋণে চীনের দেওয়া ঋণ মাত্র ১০ শতাংশ, তবুও পশ্চিমী দুনিয়ায় বলা হয় শ্রীলঙ্কা নাকি ‌‘‌চীনের ঋণ ফাঁদে’‌ আটকা পড়েছে। বস্তুত, শ্রীলঙ্কায় চীনের ঋণের পরিমাণ এতই কম যে, তাতে স্পষ্ট হয়ে গেছে শ্রীলঙ্কা একেবারে সোজাসুজি পশ্চিমী ঋণফাঁদে গিয়ে পড়েছে যেখানে থেকে এই দেশটার বেরিয়ে আসা কঠিন।

অন্যান্য উদাহরণ

আর্জেন্টিনা এবং পাকিস্তানের মধ্যে ডলার নিয়ন্ত্রিত দুনিয়া এবং ডলার–পরবর্তী দুনিয়ার একাধিক উভয় সঙ্কট বিধৃত অবস্থায় রয়েছে। তবে যদি আমরা এক ঝলকে আরও কয়েকটি দেশের কথা ধরি, তাহলে আরও কিছু নিয়ম আমাদের কাছে আরও কিছু বিষয় স্পষ্ট হবে। আইএমএফ চায় ইজিপ্ট (‌এই দেশটিকেও তাদের সংস্থায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে ব্রিকস)‌ তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ণ করুক। ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট, এক দশক আগে অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে যিনি ক্ষমতায় এসেছেন, তিনি আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা যতটা পারেন দীর্ঘায়ত করার চেষ্টা করছেন। ইজরায়েলকে নিরাপত্তা দেওয়ার স্বার্থে আমেরিকা চায় ইজিপ্টকে যে কোনও রকম বিপ্লবী পরিস্থিতির বাইরে রাখতে। সুতরাং আশা করা যায়, আইএমএফ অবমূল্যায়নের জন্য চাপ দিলেও ইজিপ্ট এই পরিস্থিতির সুযোগে আলোচনা আরও দীর্ঘায়ত করার সুযোগ পাবে। লেবাননে আইএমএফ–এর কৌশল ভিন্ন — আমেরিকা /ইজরায়েলের রণনীতির আরেকটা অংশ হল লেবাননকে সব সময় ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা সম্বলিত অর্থনীতির সামনে ফেলে রাখা, ঠিক যেমন আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও তাদের লক্ষ্য হল অন্তহীন আর্থিক সঙ্কট টিকিয়ে রাখা। এখনও পর্যন্ত,তাদের মিশন সফল। সেই উনবিংশ শতাব্দী থেকে নয়া উদারবাদী ঋণ ব্যবস্থার মধ্যে ফেলে রেখে টিউনিশিয়াকে লুঠ করা হচ্ছে। এবং বিষয়টা চলছে একেবারে ধারাবাহিকভাবে। ২০০৪ সালের সুনামিতে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। সেই সময় আইএমএফের লুঠেরা ঋণের গ্রাহক হয় এই দেশ। যদিও শ্রীলঙ্কার মোট বৈদেশিক ঋণে চীনের দেওয়া ঋণ মাত্র ১০ শতাংশ, তবুও পশ্চিমী দুনিয়ায় বলা হয় শ্রীলঙ্কা নাকি ‌‘‌চীনের ঋণ ফাঁদে’‌ আটকা পড়েছে। বস্তুত, শ্রীলঙ্কায় চীনের ঋণের পরিমাণ এতই কম যে, তাতে স্পষ্ট হয়ে গেছে শ্রীলঙ্কা একেবারে সোজাসুজি পশ্চিমী ঋণফাঁদে গিয়ে পড়েছে যেখানে থেকে এই দেশটার বেরিয়ে আসা কঠিন।

শেষ করার আগে আরও কয়েকটি উদাহরণ:

কেনিয়ার ওপর আইএমএফ খুব কঠোরভাবে চাপ দিচ্ছে, তারা আরও কর বসিয়ে এবং সরকারি খরচ কমিয়ে কেনিয়াবাসীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে, — এটাই হল সেই চিরাচরিত ব্যয়সংক্ষেপের ব্যবস্থা। এবছরের গোড়ায় কেনিয়ার কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল তারা কোনওভাবেই ঋণশোধের সময়সূচি বদলাবে না বা ঋণের পুনর্বিন্যাসও করবে না। কেনিয়া একইসঙ্গে চীন–আফ্রিকা ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের অন্যতম স্থান। প্রকল্পটি হল মোম্বাসা–নাইরোবি স্ট্যান্ডার্ড গেজ রেলওয়ে (‌এসজিআর)‌। এছাড়া রয়েছে আরও পরিকাঠামো প্রকল্প। অন্যদিকে ইউএস আফ্রিকা কমান্ড (‌অ্যাফ্রিকম)–এর সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে মোম্বাসায়। জাম্বিয়া এব্যাপারে ভাগ্যবান। কারণ তাদের মোট ঋণ ৬.৩ বিলিয়ন ডলার এবং তার মধ্যে চীনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণই ৪.১ বিলিয়ন ডলার। চীন মাঠে থাকায় জুন মাসেই জাম্বিয়ার বাকি ঋণেরও পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই, আইএমএফ দাবি করেছে এটা তাদের নিজস্ব নমনীয়তা ও দূরায়ত দৃষ্টিভঙ্গীর জয়। একইসঙ্গে তাদের দাবি, তাদের এই চুক্তি জাম্বিয়াকে ‘‌সাহায্য করছে টেকসই অর্থনৈতিক বিকাশের পথে এগিয়ে যেতে ও দারিদ্র দূরীকরণের কাজে’‌। এই ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’এর ‌জন্য কৃতিত্ব দাবি করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ। তাঁর টুইট, ‘আমরা ‌এই লক্ষ্যে [সংহত] রয়েছি.... এটা নিশ্চিত করতে যে, অন্য যে সব দেশ ঋণফাঁদে পড়েছে তারা যাতে বহপাক্ষিক তৎপরতার দরুন উপকৃত হয়।’

এই সমস্ত ক্ষেত্রগুলিতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আইএমএফ সতর্ক থেকে একমাত্র তখনই চাপ দিচ্ছে যখন সব তাস তাদের হাতে রয়েছে। যখন ঋণের একটা বড় অংশ চীনের হাতে থাকে কিংবা চীন কোনও কার্যকর বিকল্প দিতে পারে, তখন আইএমএফও একটা পথ খুঁজে নেয় যা তাদের খাতকদের কাছে কম উদ্ধত মনে হয়। আইএমএফএর এখন দরকার লঘু ও সতর্ক পদক্ষেপে, কার্যত পা টিপে টিপে চলা। কারণ এখন শহরে তারাই আর একমাত্র খেলোয়াড় নয়। বিকল্প সূত্র থাকা সত্ত্বেও যদি তারা আলোচনায় খুব বেশি কড়া শর্ত দেয় তাহলে সেই দেশ ঋণ শোধে ব্যর্থ হবে— যেটা আইএমএফ একেবারেই চায় না।

সংক্ষেপে: ডলার সাম্রাজ্যের বাইরে আসার পথের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বেশির ভাগ দেশই বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি নয় (চীন)। কিংবা বেশিরভাগ দেশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমকক্ষ নয় (রাশিয়া)। খুব কম দেশই পড়বে ইরান, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, আফগানিস্তান এবং ডিপিআরকে দেশগুলির গোষ্ঠীতে। এই দেশগুলিকে বহু দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর বাস্তবত সম্ভব সবরকম অত্যাচার চাপিয়ে দিয়েছে এবং সেগুলির মোকাবিলা করে তাদেরও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।

বেশির ভাগ দেশের হাল আর্জেন্টিনা ও পাকিস্তানের মতো। অর্থনৈতিক দুর্ভোগ, নানা ধরনের বিপদ এবং কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা — এসবের মাঝখানেই তাদের থাকতে হচ্ছে। পশ্চিমী শক্তির নাগপাশ থেকে তাদের মুক্ত করে আনাটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক হবে, তবে এখন এই মুক্তি আর অসম্ভব মনে হয় না।

 

জাস্টিন পোদুর টরোন্টোর লেখক এবং তাঁর লেখা প্রকাশিত হয় গ্লোবট্রটারে। তাঁর ওয়েবসাইট হল podur.org এবং টুইটার অ্যাকাউন্ট হল Twitter @justinpodur. ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অফ এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড আরবান চেঞ্জেস বিভাগে তিনি অধ্যাপনা করেন।

সূত্র: পিপলস ডেসপ্যাচ, ১ অক্টোবর, ২০২৩
ভাষান্তরঃ সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ২২-অক্টোবর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org