সংহতি কিউবার জনগণের অনন্য গুণাবলীর একটি। কিউবার সকল মানুষেরই সংহতিবিষয়ক নিজস্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। কারও শিক্ষক হিসেবে, কারও ডাক্তার হিসেবে। আর অন্যান্যদের রয়েছে প্রশিক্ষক হিসেবে। যেমন, আন্তর্জাতিক মিশনগুলি নিয়ে আমাদের সবারই কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা রয়েছে। আর যদি নিজে কেউ কোনও মিশনে শামিল না-ও হয়ে থাকেন, তার কোনও না কোনও পরিবার-পরিজন নিশ্চিত কোনও মিশনে শামিল হয়েছেন কখনও না কখনও।
বিপ্লবের অন্যতম সুন্দর শিক্ষা এই যে, কিউবার মানুষ পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের যে কোনও মানুষের সঙ্গেই একাত্ম অনুভব করেন। যখন আমি দেখি আমার কোনও এক পুরনো সহপাঠী অন্য এক দেশে ইবোলা-র বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েছেন, তখন যে আশ্চর্য সুখানুভূতি হয়, তা অন্যের পক্ষে অনুধাবন করা খানিক কঠিনই বটে। আমি একজন শিশুরোগ-বিশেষজ্ঞ। কোনও একটি হাসপাতালে একবার একজন অধ্যাপক আমায় বললেন, ‘আপনি দেখবেন ওরা ইবোলা-র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য নিতে আসবে কিউবার কাছে।’ আমি সঙ্গে সঙ্গে বলি, ‘কিন্তু আমরা তো ইবোলা নিয়ে কিছুই জানিনা!’ ‘ওটা ব্যাপারই না,’ উনি বললেন, ‘ওরা আসবেই, আপনি দেখে নেবেন।’
আর ঠিক তাই ঘটলঃ কিছুদিন বাদেই হু (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) কিউবার কাছে ইবোলা-র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য চাইতে এল। ওরা এসেছিল কারণ ওরা জানে কিউবার মানুষ সাহায্য করতে পিছপা হবে না। আমরা শুধু রাজি-ই হইনি, আমরা আমাদের সেরা পেশাদার মানুষদেরই পাঠাই ওদেশে; স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স, ডাক্তার, প্রযুক্তিবিদ সকলেই ইবোলা-র বিরুদ্ধে লড়তে যান। আর তারা সফলও হন।
সংহতির অভিজ্ঞতা, মানুষ হিসেবে আমাদের এক অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার বোধ তৈরি করে। আমরা বলতে পারি, ‘আমরা দুনিয়ার যে কোনও প্রান্তে যেতে পারি যেখানে আমাদের সাহায্য প্রয়োজন আর সত্যিই অন্য মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পারি।’ তাদের গায়ের রং, তাদের ধর্ম কোনও বাধা হয় না। অন্য মানুষের সাহায্যে লাগতে পারলেই যথেষ্ট।
সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এইটাও অন্যতম সুন্দর বৈশিষ্ট্য, মানবোন্নয়ন এমন একটা বিষয়, যা প্রত্যহ অর্জন করা সম্ভব। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, একজন ডাক্তার, অ্যালার্জিস্ট ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি প্রথম নিকারাগুয়ায় একটি মিশনে গিয়ে প্রথম এ জাতীয় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। ডাক্তার হিসেবে আমার যাত্রার সেই সবে শুরু। আমার তখন মাত্র তেইশ বছর বয়স, আর সেটা ছিল মেডিকেল স্কুলের শেষ বছর। কিউবায় তখন এখনকার মত এত ডাক্তার ছিল না। তাই, চিফ কম্যান্ডার ফিদেল কাস্ত্রো নিজে অন্তিম বর্ষের মেডিকেল স্কুল ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করেন। জিজ্ঞাসা করেন কে স্বেচ্ছায় একটি আন্তর্জাতিক ইন্টার্নশিপে যুক্ত হতে রাজি। কিউবায় মেডিকেল স্কুলের শেষ বছরকে আমরা ‘ইন্টার্নশিপ’ই বলে থাকি।
আমাদের ক্লাস থেকে চারশো আশি জনই এগিয়ে এসেছিল। আর আমি তাদের সঙ্গেই নিকারাগুয়াতে গিয়েছিলাম। এটা আমার কাছে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। কারণ আমি কিউবায় বিপ্লবের পরে জন্মেছিলাম। আমি জন্মেছি আর বড় হয়েছি— শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সম্মান— সমস্ত কিছুর অধিকার সুরক্ষিত এমন একটা দেশে— আর অন্য কেমন এক দেশে যাচ্ছি ও তার সংস্পর্শে আসছি, আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। জানা সম্ভব ছিল না অন্য জগৎটা ঠিক কীরকম। নিকারাগুয়ার অভিজ্ঞতা খুবই রূঢ়। একদম প্রারম্ভিক বিপ্লবী প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে, দেশটা শক্তিশালী ক্যাথলিক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয় যা নিকারাগুয়ার সমাজকে কার্যত দু’ভাগে বিভক্ত করে দেয়।
কিউবাতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম এক সর্বজনীন বিনামূল্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থায়, যা সব মানুষের সেবার জন্য বর্তমান। হঠাৎ করেই আমি সেইসব ডাক্তারদের সংস্পর্শে এলাম যারা সরকারি হাসপাতালে আংশিক সময় কাজ করেই কোনও প্রাইভেট ক্লিনিকে কাজ করতে ছুটে যায়। অনভিজ্ঞদের হাতে, তখনকার আমাদের হাতে, রোগীকে ছেড়ে দিতে দু’বার ভাবতেন পর্যন্ত না, ভাবেনওনি। তখন আমাদের যথেষ্ট সৃজনশীল হতে হয়েছে। আর মানুষ হিসেবে অনেকটা বড় হতে হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে কঠিন ছিল। একইসাথে এ ছিল এক দুর্দম শিক্ষাও। আমার মনে পড়ে, নিকারাগুয়ায় পৌঁছেই আমায় দুটো শিশু প্রসবের ব্যাপারে সহায়তা করতে হয়েছিল। আমি আমার ছোট্ট ডাক্তারি গাউন চাপিয়ে হাসপাতালের দরজায় দাঁড়িয়ে যেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডাক্তারবাবু, বলুন, আমি কী করতে পারি?’ সঙ্গে সঙ্গে একজন চেঁচিয়ে উঠে ডাকল, ‘ডাক্তার! জলদি আসুন, একজন মহিলা এখানে শিশুর জন্ম দিচ্ছেন!’
পরবর্তীতে দেখা গেল, আমি একাই কমবেশি ১০০টা শিশুজন্মের সহায়তা করেছি। শিশুজন্মের সহায়করূপে আমি সুনিপুণ দক্ষতাও অর্জন করে ফেলি। নিকারাগুয়া আমাদেরকে তৈরি করেছে, এত কিছু শিখিয়েছে আর যথার্থ পেশাদার হিসেবে আমাদের আরও শক্তিশালী আর যোগ্য করে তুলেছে।
পরে, আমায় কিউবায় ফিরে আসতে বলা হয়েছিল মিশনের অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে নিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিকারাগুয়াকে অভ্যুত্থানের ধমকি দিচ্ছিল, আর চিফ কম্যান্ডার (ফিদেল কাস্ত্রো) সবসময় কিউবার মহিলাদের সুরক্ষার জন্য চিন্তিত থাকতেন। তথাপি, আমরা কয়েকজন রাজি হইনি। ফিদেলকে আমি ‘কাকু’ ডাকতাম। আমি বললাম, ‘দেখো কাকু, সমস্যাটা তুমি জানো, কতিপয় যুবক কেবল রয়ে যাবে কারণ আমাদের মিশনের অধিকাংশই যুবতী।’
তথাপি, আমি লা হাবানায় ফিরে আসি আর আমার হাসপাতাল পেড্রো বোরাসে কাজ শুরু করি যতক্ষণ না আমি খবর পাই যে আরেকটা মিশন সংগঠিত করা হচ্ছে, এইবারে যেটাকে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে পাঠানো হবে। এই সময়কালে, আমি ছিলাম একমাত্র যে যেতে পারত— আমার প্রেমিক, স্বামী, সন্তান বা পিছুটান ছিল না কোনও। তাই আমি বললাম, ‘আমি যাব।’
আমি অ্যাঙ্গোলাতে গিয়েছিলাম। এবং আমার জীবনের সম্ভবত সবথেকে দুর্বিষহ দুটো বছর কাটিয়েছিলাম ওখানে। একজন শিশুরোগ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার স্মরণকালের সম্ভবত কঠিনতম সময় ছিল এটা। দু’বার কলেরা মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, আর তা ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বাবা-মায়েরা মৃত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে আসছিল, আর আমরা ওদের বাঁচাতে কিচ্ছুটি করে উঠতে পারছিলাম না।
কিন্তু অ্যাঙ্গোলাতে মানুষ সম্পর্কে বেশ কিছু বুনিয়াদি ধারণা গড়ে ওঠে আমার। আমি শিখলাম যে বর্ণবৈষম্য ও উপনিবেশবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধেই আমাদের সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের নিজের ইতিহাসকে মনে রাখবার ও নিজের জীবনকে নিজের ইচ্ছেমত বাঁচবার অধিকার থাকা দরকার। আফ্রিকা মহাদেশকে যথেচ্ছে লুঠ ও শোষণ করা হয়েছিল। এখানকার মানুষকে জন্তুজানোয়ারের মত অন্য মহাদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মানবেতিহাসের অংশ এই বীভৎস অংশগুলোকে মুছে ফেলা দরকার। আর আমরা সেটাই করি মানুষের মধ্যে রোজকার জীবনে সংহতি গড়ে তুলে। আমরা নিজেদের সংস্কৃতি অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে কোনওমতে তা পারব না; আমরা কেবল এব্যাপারে সাহায্য করতে পারি তাদের থেকে কিছু শিখতে পেরে।
দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, উত্তর ইকুয়েডরের কিচওয়া দাইমায়েরা আমাকে সেই সমস্ত কিছু শিখিয়েছে যা কোনও বইয়ে লেখা নেই। যদি তুমি সংহতি জানাতে শেখো, তার মানে তুমি শুনবার কানও তৈরি করছ, যা তোমাকে শুধু মানুষ হিসেবে নিজেকে উপযোগী ভাবাতেই সাহায্য করে না, বরং তোমাকে বেড়ে উঠতেও সাহায্য করে, জ্ঞানের নানা শাখায় ভর করে—দরকারে প্রাচীন জ্ঞানের সাহায্যেও।
আমাদের সংহতি যাত্রাগুলোর দৌলতে এতগুলো বছর ধরে আমরা যে বিপুল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম তার তুলনা হয় না। একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী ডাক্তার হবার সুবাদে আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্বের কাছে আমাদের ব্যাপক ঋণের সামান্যই শোধ করতে পেরেছি মাত্র।
পরবর্তীতে আমি ব্রাজিলে মুভিমেন্তো সেম তেরা (ভূমিহীন মজুরদের আন্দোলন, এমএসটি.)র মধ্যে কাজ চালিয়ে যাই। আমি আর্জেন্টিনার ‘আন মুন্ডো মেজর এস পসিবল’ (এক আরও ভালো পৃথিবীও সম্ভব) নামে একটি ফাউন্ডেশনের কাজেও যুক্ত ছিলাম। এই ফাউন্ডেশনের সূত্রেই আমি জানতে পারি রোজারিও নামে সেই মফস্বলের কথা, আমার জন্মসূত্রে আর্জেন্তিনীয় বাবা যেখানের বাসিন্দা ছিলেন।
আমি ওই শহর থেকে সত্যিই বহু কিছু শিখেছি। আমি মাপুচে ও গুয়ারানি মানুষদের সঙ্গে বহু সময় কাটিয়েছি। আমি ওই খানের মেডিকেল ছাত্রদের সঙ্গে ছিলাম যারা ‘লাম’ (এসক্যুইলা লাতিনো আমেরিকানা দে মেদিসিনা, কিউবা) থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ইদানিংকালে বিপ্লবের অন্যতম এক সুফল হল বিশ্বের যে কোনও প্রান্তের ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এক লাতিন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে হবার সম্ভাবনার বাস্তবায়ন।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও, বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রশিক্ষণের মানেই হল কিউবার মানুষদের বেশ কিছু অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যত্যাগ, তা সত্ত্বেও এটি এক সত্যিকারের মনোহর ব্যাপার, আর এটা একজন কিউবার মানুষকে অত্যন্ত গর্বিত করে।
আমরা গর্ব অনুভব করি সবসময় সংহতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে দিতে পৃথিবীর এত প্রান্তে কাজ করতে পেরে, এবং একইসঙ্গে পারস্পরিক ভালোবাসা, বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধার গুরুত্ব সম্পর্কে শিখতে পেরে।
যদি এই জিনিসগুলো না বদলায়, আমরা দুনিয়াকে বদলাতে পারব না। এবং আমাদের এই দুনিয়াকে বদলাতে হবেই, কারণ এইভাবে কোনওমতে জীবন কাটিয়ে দেওয়া চলতে পারেনা।
ঋণ: জ্যাকোবিন, ২৬শে মে ২০২২ ভাষান্তর: দেবরাজ দেবনাথ
প্রকাশের তারিখ: ১৭-জানুয়ারি-২০২৩ |