আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা অর্জন করবে এই সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণটি অনুমান করা কিছু কঠিন কাজ নয়। এ-রাজ্যের ভোটদাতাদের ৩০ শতাংশ মুসলিম ধর্মাবলম্বী, অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই যাঁরা বিজেপিকে ভোট দেবেন না। বাকি যা, ভোটদাতা পরিচয়ের দিক থেকে যাদের হিন্দু বলা হয়ে থাকে, তাঁরা সবাই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি পছন্দ করেন না। এই ভোটদাতাদের ৬০ শতাংশ ভোট যদি বিজেপি করায়ত্ত করতে পারে, তাহলে তাদের ভোট শতাংশ দাঁড়ায় ৪২। ভোট যদি এই শতাংশ অর্জন করতে না-পারে তাহলে বিজেপি নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পেতে পারে না। পরিস্থিতি যা অনুমান করা যাচ্ছে, তাতে বিজেপি ৬০ শতাংশ হিন্দুদের ভোট এক জায়গায় নিয়ে আসতে পারবে, এমনটা অসম্ভব। শুধু সাংগঠনিক দুর্বলতাই এর কারণ নয়। এ-রাজ্যে বহু হিন্দু আছেন যাঁরা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি পছন্দ করেন না। বিজেপির গায়ে অবাঙালি তকমা লেগে আছে। সচেতন প্রয়াসে সেটা সরিয়ে দেওয়ার কোনও প্রচেষ্টাই নেই বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্বের দিক থেকে। এই সব কারণে ৬০ শতাংশ হিন্দু ভোটকে পদ্ম ফুলে নিয়ে আসার শাহী প্রকল্প ব্যর্থ হবে।
এ-রাজ্যের শাসক দলটি এই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই তাদের নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজি সাজিয়েছেন। বালিচোর, কয়লাচোর, চাকরিচোর— সব চোরেরাই অকুতোভয়ে তাদের নির্বাচনী এলাকাগুলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা জানেন, ৩০ শতাংশ মুসলিম ধর্মাবলম্বী ভোট আর কমবেশি ২০ শতাংশ হিন্দু ভোট তাদের দখলে থাকবেই। কাজেই এই রাজ্যে তাদের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনাই নেই। আমাদের মতে, তৃণমূলের এই অনুমানটিতে গুরুতর ভ্রান্তি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে লড়তে হবে এক কঠিন লড়াই।
শ্রেণি রাজনীতি থেকে পশ্চিমবঙ্গকে সরিয়ে আনাই ছিল এই রাজ্যের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির আদি প্রকল্প। রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসে এই আদি প্রকল্পটিকে অনুসরণ করেই, যদিও প্রবল বাম মতাদর্শের চাপে থাকা এই দলটি ক্ষমতা দখলের স্বার্থে বেশ কিছু বাম শ্লোগান আত্মস্যাৎ করেই তার যাত্রা শুরু করে। ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এই দলটি শ্রেণি রাজনীতিকে দুরমুশ করা শুরু করে। এবং ক্ষমতার রাজনীতিকে অতি দ্রুত আত্মপরিচিতির রাজনীতিতে রূপান্তরিত করে। আত্মপরিচিতির রাজনীতির মতাদর্শগত ভিত্তি দুর্বল থাকে, কারণ আত্মপরিচিতির রাজনীতির বস্তুগত ভিত্তি দুর্বল। সেটা পূরণ করার জন্য দলটি আনে জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতি যার স্থূল রূপটি হল ‘উন্নয়ন’ অর্থাৎ পাইয়ে দেওয়া।
পাইয়ে দেওয়াটাও অচিরেই বৃত্তি বা প্রফেশনে রূপান্তরিত হল। এবং যাঁরা পাইয়ে দেন তাঁরা এই বৃত্তির মধ্যেই এক ভালো জীবিকার সন্ধান পেলেন। এই জীবিকা যত প্রসারিত হতে লাগল ততই এটিকে ঘিরে উপার্জনের অমিত সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হল। উচ্চপদে আসীন আমলা থেকে স্থানীয় বিডিও, সাংসদ থেকে স্থানীয় কাউন্সিলরের সর্বশেষ তল্পিবাহক, সবাই হয়ে উঠলেন এই জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির বেনিফিশিয়ারি। যাঁকে পাইয়ে দেওয়ার নামে এই বিপুল লুঠের আয়োজন, তিনি অর্থাৎ সাধারণ ভোটদাতা, একেবারে বঞ্চিত হলেন না। তবে তিনি হয়ে উঠলেন গ্রহীতা, দানের গ্রহীতা। হকের আদায়ে কুণ্ঠা থাকে না। কুণ্ঠা থাকে দান গ্রহণে। সুতরাং, লুঠপাটের এই আনন্দযজ্ঞে কুণ্ঠা ও তা থেকে জন্ম নেওয়া হীনমন্যতা বোধ হয়ে উঠল অন্তেবাসী মানুষের অঙ্গভূষণ। এই মানুষ হলেন তৃণমূলের ভোটার, যাঁদের হীনমন্যতা দূর করার জন্য থাকে আত্মপরিচিতির রাজনীতির আরোপিত শ্লাঘা।
এই রাজনীতিই এখন তীব্র সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে। রাজ্যে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে তৃণমূলের শাসনকালে। রাজ্যের মাথাপিছু নিট আয় এখন বার্ষিক ১ লক্ষ ৫৪ হাজার ১১৯ টাকা, অঙ্কটি ওড়িশার চেয়ে কম (ওড়িশার মাথাপিছু বার্ষিক নিট আয় ১,৬৩, ১০১ টাকা)। এই রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে মাথাপিছু মাসিক ভোগব্যয়ের ক্ষমতা ৩৬২০ টাকা, শহরে তুলনীয় অঙ্কটি ৫৭৭৫ টাকা। দুটি ক্ষেত্রেই, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান সর্বভারতীয় গড়ের নিচে। এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে, সর্বভারতীয় অর্থনৈতিক মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ক্রমশ নিচে নামছে। তথ্য বলছে, বামফ্রন্টের শাসনের অবসানের পর থেকে গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গের আয়বৃদ্ধির হার ক্রমশ কমে এসেছে। গত ১৫ বছরে কর্ণাটকের অর্থনীতি বেড়েছে ৮৩৪.৮১ শতাংশ, ওড়িশায় ৩১২.৫৩ শতাংশ। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি প্রসারিত হয়েছে মাত্র ২২৬.২৩ শতাংশ। এর জন্য অবশ্যই দায়ী তৃণমূলী কুশাসন। রাজ্যটি বিনিয়োগ-বিমুখ। তোলাবাজি ছাড়া আর কোনও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে খোলা নেই রাজ্যটিতে।

এই অবস্থায় পাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কমার কথা। সেটা ঘটলে আবার এই জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির প্রসার ঘটানো যায় না। দক্ষিণপন্থার হাতে তখন থাকে শুধু আত্মপরিচিতির রাজনীতি। মতাদর্শগত দুর্বলতার কারণে যার টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সুতরাং, যেভাবেই হোক, কন্যাশ্রী থেকে যুবসাথী বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার চালিয়ে যেতেই হবে। এই ‘যেভাবে’র মধ্যে পড়ে স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রাখা, গ্রামীণ হাসপাতালে তালা ঝোলানো, লাইব্রেরি তুলে দেওয়া, ডিএ বন্ধ রাখা, রাস্তাঘাটে তাপ্পি মারা। আরও উপায় খোঁজার জন্য ভার বেতন দিয়ে ধূর্ত আমলা পোষা হয়, যারা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পের টাকায় কীভাবে দিদির খাদ্যসাথী চালাতে হবে কিংবা খরচের হিসাব চাইলেই কীভাবে আমলাতান্ত্রিক বাধা সৃষ্টি করতে হবে— আর এক খাতের রিজার্ভের টাকা কীভাবে অন্য খাতে চালান করে দিতে হবে, তার ছক কষে।
সেকারণেই, আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূলকে লড়তে হবে এক কঠিন লড়াই। হাড্ডিসার অর্থনীতিতে জনপ্রিয়তাবাদের মাসুল দিতে দিতে তৃণমূল কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত তার দানের গ্রহীতাকেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। নিয়োগ নেই, ভাতা আছে— এটা আনন্দের কথা নয়, এটা এখন যন্ত্রণার কথা। তৃণমূলের যাঁরা ভোটদাতা, তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই যে এই উপলব্ধিতে পৌঁছে যাচ্ছেন, যুবসাথীর লাইনে অপ্রসন্ন মুখে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ-তরুণীর কাতারে তার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। তৃণমূল নেত্রী এই লক্ষণ উপলব্ধি করেছেন। এই অবস্থায় সমস্ত দক্ষিণপন্থী রাজনীতির যা শেষ আশ্রয়, তৃণমূল কংগ্রেস সেটিকেই আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে। আত্মপরিচিতি, স্থূলভাবে যা ধর্মীয় আত্মপরিচিত, তৃণমূলকে আশ্রয় করতে হচ্ছে সেটিকেই। সেখানে সমস্যা ৩০ শতাংশ মুসলিম ধর্মাবলম্বী আত্মপরিচিতির একটা রাজনীতি, যেটা মমতা ব্যানার্জির দুধেল গাইয়ের রাজনীতি, তার সঙ্গে আবার মেলাতে হবে বাকি ৭০ শতাংশের আত্মপরিচিতির রাজনীতি, যেটার জন্য প্রয়োজন হয় শিলিগুড়ির মহাকাল মন্দির, দীঘার জগন্নাথ মন্দির আর নিউ টাউনের দুর্গামণ্ডপ। এই মিশেলটা মমতা উদ্ভাবিত সেকুলার রাজনীতি। তার ধাক্কায় বহু বিধানসভা নির্বাচন ক্ষেত্রেই তৃণমূল সমস্যায় পড়েছে। রাজনৈতিক মহলের খবর, অন্তত ৮০টি নির্বাচন ক্ষেত্রে তৃণমূলকে তাদের এই ধাপ্পাবাজির সেকুলার রাজনীতির দাম মিটিয়ে দিতে হবে আসন খুইয়ে। অন্য যে-সমস্যা তার চরিত্র আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপির আছে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, এ-রাজ্যের সংখ্যাগুরু ভোটদাতা যে-রাজনীতির বিরোধিতা করেন। এই ভোটদাতারা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেছেন, সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তৃণমূল ও বিজেপি পরিপূরক ভূমিকা পালন করে। সারদা, নারদ থেকে শুরু করে চালচুরি, কয়লাচুরি, বালিচুরি, চাকরিচুরি— সব দুর্নীতিতে তৃণমূলকে বাঁচিয়ে দিয়েছে মোদির ইডি, মোদির সিবিআই। এক পয়সা উপার্জন না-করেই ভাইপো যে তার বাসস্থানে এসকালেটর বসানোর হিম্মত রাখে, ব্যানার্জি পরিবার ভবানীপুরে ৩৫টি প্লট হস্তগত করে রাজসুখে দিনযাপন করার সুযোগ পায়— এ সবই মোদির দয়ায়। অন্যদিকে, মোদির শ্রম আইন তৃণমূল সদস্যরা রাজ্যসভায় পাশ করিয়ে দেয়, ইন্ডিয়া জোটে ঘোঁট পাকিয়ে মোদির রাজত্বের বনিয়াদ শক্ত করে তৃণমূল কংগ্রেস।
সমস্যা হল মোদি-মমতার এই বোঝাপড়া ইদানীং বড়ো বেশি স্পষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে। আত্মপরিচিতির রাজনীতিকে যারা শ্রেণি পরিচয়ের রাজনীতির বিপরীতে দাঁড় করাতে চান, সেই দক্ষিণপন্থীদের পক্ষে এটি আদৌ সুখকর নয়। বোঝাপড়া করে রাজনীতির যে-ছক দাঁড় করানো হয়েছে এই রাজ্যে, তা ক্ষতি করেছে বিজেপি ও তৃণমূল উভয়পক্ষের। যে মোদির শাসনে চিদাম্বরম থেকে হেমন্ত সোরেন, সবাইকে জেল যাত্রা করতে হয়, সেই শাসন ‘কালীঘাটের কাকু’র গলার স্বর ধরতে পারে না কেন, কেনই বা অনুব্রত মণ্ডলের চার্জশিটের ইংরেজি অনুবাদ করার মতো অনুবাদক জোটাতে পারে না এই মোদি-শাসন, তার সদুত্তর নেই। মোদি আদৌ মমতার বিকল্প চায়, নাকি এসবই ছায়াযুদ্ধ— বিজেপি সমর্থকদের মধ্যেই এ-প্রশ্ন উঠেছে। দিদি কি মোদির ওয়াকফ আত্মস্যাৎ সত্যিই রুখতে চান? এ-প্রশ্নও এড়াবার উপায় নেই। দিদির রাজত্বে আরএসএসের এত বাড়বাড়ন্ত কেন, এ-প্রশ্নও উঠেছে সর্বত্র। এসআইআর নিয়ে দিদির নাটক দিদি সমর্থকদেরই সন্দিহান করে তুলেছে।
এই অবস্থায় শ্রেণি রাজনীতি যারা করতে চান, তাদের রাজনৈতিক পরিসর প্রসারিত হওয়ার কথা। সেটাই ঘটছে পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র। এবং সেটাই মোদি ও মমতা উভয়পক্ষকেই বিব্রত করে তুলেছে। বলা হচ্ছে, এই রাজনীতি যারা করছেন, তারা ভোটকাটুয়া। সেটাই বলার কথা। দ্বিমুখী রাজনীতির যে অ্যাজেন্ডা তৈরি করে রেখেছে দক্ষিণপন্থা, এটা তার বাইরের কথা— জীবন ও জীবিকার কথা— যে-কথা শুনতে আদৌ রাজি নয় আজকের দক্ষিণপন্থা। সমস্যা হল, দক্ষিণপন্থার তৈরি করা অ্যাজেন্ডা ধরে মানুষ ভোট দেবেন, এই সম্ভাবনা দ্রুত কমে আসছে।
বিজেপির ভয়ে ভীত এক সংখ্যালঘু সমাজ এবং ভাতা-নির্ভর দরিদ্র হিন্দু-মুসলমান, তৃণমূল নেত্রী ভরসা করে আছেন এঁদের ওপর। এর আগে অন্তত দুটি নির্বাচন (২০২১ ও ২০২৪) তিনি পার করে এসেছেন এই দুই যষ্ঠি অবলম্বন করে। আত্মপরিচিতি এবং জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির এ-ছিল এক সুচারু মিশ্রণ। ২০২৬-এ তাঁর সমস্যা আত্মপরিচিতির মুসলমান রাজনীতি মমতা ব্যানার্জির ওপর আস্থা হারিয়েছে তাঁর ওয়াকফ ডিগবাজি, ওবিসি নীতি এবং স্পষ্ট হয়ে ওঠা বিজেপি ও আরএসএসের সঙ্গে আঁতাতের কারণে। সম্প্রদায় হিসাবে মুসলমানদের ভয় দেখানো ছাড়া উনি আর কিছু করবেন না। ভয়ে এঁরা তাঁকে ভোট দেবেন এবং অন্তত ১৩০টি আসনে এই কারণে তিনি জিতে আসবেন, এই হল তাঁর সহজ ফর্মুলা। এই ফর্মুলায় যে আর কাজ হবে না আইএসএফের সভায় জনপ্লাবন তা প্রমাণ করছে।
ভাতাজীবীদের ভরসায় কি ভোট করা যাবে? এক আধটা ভোট হয়তো এই ফর্মুলায় জেতা যায়, কিন্তু এটা ভোটে জেতার স্থায়ী কৌশল হতে পারে না। বিশেষত এই রাজ্যে যেখানে কর্মসংস্থান নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করা হয়েছে। এখন পরিষ্কার যে, কর্মসংস্থান এই মহিলার অ্যাজেন্ডাতেই আসেনি কখনও। সে-কারণে ডবল ডবল চাকরির সঙ্গে ঘুগনি বেচা থেকে কাশের বালিশ তৈরি— সবকিছুই শোনা গেছে। আর বাস্তবে পাওয়া গেছে ১৫০০ টাকার ঘুষ। আমাদের অনুমান, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে যুবসাথীর বেকার ভাতা, এগুলো যে স্থায়ী কাজ করে উপার্জনের বিকল্প হতে পারে, এটা কোনও দিনই প্রকল্পগুলির সুবিধাভোগীরা কল্পনা করেননি। তাঁর এগুলিকে উপরি পাওনা হিসাবে দেখেছেন। এবং অপেক্ষা করেছেন দিদি এসবের পাশাপাশি কাজের ব্যবস্থাও করবে, যাতে তাঁরা সমৃদ্ধির সন্ধান পেতে পারেন। কাজের বিকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কাজের বিকল্প যুবসাথী, এসব তাঁদের কল্পনাতেও ছিল না। ২০২৬-এর বাস্তবতা হল— ১৫০০ বা ১৮০০ টাকা অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়াই হল স্থায়ী কাজের বিকল্প, তৃণমূলী বিকল্প। সিঙ্গুর হবে না, সরকারি চাকরি হবে না, ঘুষের টাকায় ভাইপো এসকালেটর চাপবে, আর সিবিআই এবং ইডি এই ধরলাম, এই ধরলাম করে আসর জমাবে— আর্থিকভাবে দুর্বল পশ্চিমবঙ্গবাসী এই সার্কাস দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।
১৫ বছর এই সার্কাস দেখার পর পশ্চিমবঙ্গের বঞ্চিত মানুষ বুঝেছেন তৃণমূল তাদের প্রতারণা করেছে। মুসলিম দুধেল গাইকে ভয় দেখিয়ে দমানো যাচ্ছে না, আর্থিকভাবে দুর্বল হিন্দু-মুসলমান আর উন্নয়নের সার্কাস দেখতে রাজি হচ্ছেন না। উল্টোদিকে বিজেপি রচিত আখ্যান সম্পর্কেও মানুষের আস্থা কমছে। ত্রিপুরায় এক ফোনে চাকরির ধাপ্পা জনমানসে এখনও ধূসর হয়ে যায়নি। এটাও বোঝা যাচ্ছে যে, বিজেপিকে ভোট দিয়ে কোনও হিসেবে তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না।
রঙ্গমঞ্চ অপেক্ষা করছে তৃণমূল ও বিজেপির কুনাট্যের অবসানের অপেক্ষায়। যবনিকা কম্পমান। প্রকৃত কুশীলবদের উজ্জ্বল উপস্থিতির জন্য উন্মুখ হয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চ।
প্রকাশের তারিখ: ২০-এপ্রিল-২০২৬ |