নারী-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল হকিকত 

সুবর্ণ গোস্বামী
রাষ্ট্রের ভূমিকা এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় নির্ণায়ক। যদি জনস্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে না দেখে বিমা-কেন্দ্রিক বাজার সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবে বিচ্ছিন্নতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। স্বাস্থ্যসাথীর মত প্রকল্প পরিবারের নারী সদস্যের নামে ইস্যূ করা হলেও, কাগজেকলমে বিমাকৃত নারী বাস্তবে অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, অপুষ্টি ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে বেঁচে থাকেন। সামাজিক সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য খাতে জিডিপির বরাদ্দ, স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা উপেক্ষিত থেকে যায়; দৃশ্যমান হয়ে ওঠে অস্ত্রোপচার-প্যাকেজ ও প্রকল্পভিত্তিক ভাতা। ওয়েলফেয়ারিজমে নারী বেনেফিশিয়ারি হিসেবে চিহ্নিত হন, পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে নয়।

বিশ্বপরিসরে শ্রমজীবী নারীর স্বাস্থ্য আজ যে গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে আবর্তিত, তাকে কেবল চিকিৎসাবিদ্যার অন্তর্গত একটি সেক্টরাল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যথেষ্ট নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতি, রাষ্ট্রের কাঠামোগত চরিত্র এবং পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতাবিন্যাসের আন্তঃসম্পর্কের ফল। আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস আমাদেরকে নারীশরীরকে নিছক এক জৈব সত্তা হিসেবে নয়, বরং সামাজিক পুনরুৎপাদন, শ্রমবিন্যাস এবং ক্ষমতার সম্পর্কসমূহের এক ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত সংঘর্ষক্ষেত্র হিসেবে অনুধাবন করতে আহ্বান জানায়। উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন, রাষ্ট্র ও বাজার, পিতৃতন্ত্র ও পুঁজি - এই সমস্ত শক্তির সমাবেশ নারীশরীরের উপরই নিবদ্ধ হয়; কখনও প্রত্যক্ষ হিংসার মাধ্যমে, কখনও বা নীতিগত নিরপেক্ষতার আড়ালে।

মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি শ্রমশক্তির পণ্যায়নকে পুঁজিবাদের কেন্দ্রীয় শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু একজন নারীর ক্ষেত্রে এই পণ্যায়ন দ্বিস্তরীয়। একদিকে তিনি মজুরিকৃত শ্রমবাজারে শ্রমশক্তি বিক্রি করেন; অন্যদিকে অবৈতনিক যত্নশ্রম ও সামাজিক পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তির জন্ম, লালন ও পুনর্গঠন করেন। পরিবার, মাতৃত্ব, গৃহস্থালির অবকাঠামো - এসব কেবল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র নয়, এগুলি অর্থনীতির মৌলিক উপাদান। তবু জাতীয় আয় বা উৎপাদন-পরিসংখ্যানে এই শ্রম অদৃশ্য, হিসেব-খাতার বাইরে। ফলে নারীশরীর এক অদৃশ্য কারখানা, যেখানে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন একসঙ্গে সংঘটিত হলেও স্বীকৃতি, সম্পদ ও সিদ্ধান্ত-ক্ষমতার বণ্টনে তা প্রান্তিক থেকে যায়। দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি, রক্তাল্পতা, মানসিক অবসাদ, প্রজনন-সংক্রান্ত জটিলতা - এসব কেবল স্বাস্থ্য-পরিসংখ্যানের চর্চা নয়, বরং এক কাঠামোগত সংকট।

এই কাঠামোগত সংকটকে তাত্ত্বিক গভীরতায় বুঝতে গেলে মার্কসের বিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব বিশেষ তাৎপর্যের সঙ্গে চর্চা করা জরুরী। সম্প্রতি Health Promotion International-এ প্রকাশিত ‘Marxist concepts of alienation in relation to health: a narrative review of the evidence’ প্রবন্ধটি দেখিয়েছে - বিচ্ছিন্নতা কেবল এক বিমূর্ত দর্শনগত ধারণা নয়; এটি সমকালীন স্বাস্থ্যবৈষম্য বিশ্লেষণের একটি কার্যকর কাঠামোও বটে। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থায় শ্রমিক তার শ্রমফল, শ্রমপ্রক্রিয়া, সহমানুষ এবং নিজের সৃজনশীল মানবসত্তা - ‘species-being’ - থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শ্রম আর আত্মপ্রকাশের মাধ্যম থাকে না; বরং বাধ্যতামূলক ক্রিয়া হয়ে ওঠে। প্রবন্ধটি যে ৩৪টি গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করেছে, সেগুলি প্রমাণ করে - কাজের উপর নিয়ন্ত্রণহীনতা, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও সিদ্ধান্তগ্রহণে অক্ষমতা মানসিক চাপ, অবসাদ, উদ্বেগ এবং শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতা মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি মাত্র নয়; এটি রাজনৈতিক অর্থনীতির জৈব-সামাজিক ফল।

শ্রমজীবী নারীর ক্ষেত্রে এই বিচ্ছিন্নতা দ্বিগুণ তীব্র। কর্মক্ষেত্রে তিনি নিয়ন্ত্রণহীন শ্রমিক; গৃহে অবৈতনিক যত্নশ্রমের ভারবাহী। নিজের সময়, বিশ্রাম, পুষ্টি ও দেহের উপর তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত। ফলে রক্তাল্পতা, দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি, প্রজননস্বাস্থ্যের জটিলতা ও মানসিক অবসাদকে বিচ্ছিন্নতার শারীরিক রূপ হিসেবে পড়া যায়। যখন নারী নিজের শ্রমফল থেকে বিচ্ছিন্ন, নিজের শরীরের উপর সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্ছিন্ন, তখন সে আপন সত্তা থেকেও দূরে চলে যায়।

প্রজনন-রাজনীতি এই বিচ্ছিন্নতার কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র। নারীর প্রজননক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আধুনিক ও প্রাক-আধুনিক উভয় সমাজেই পিতৃতন্ত্রের ক্ষমতার মৌলিক উপাদান। অ-চিকিৎসাগত জননাঙ্গ বিকৃতির শিকার বিশ্বে অন্তত ২০০ মিলিয়ন নারী ও কিশোরী। এটি নারীযৌনতার নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলনের হিংসাত্মক কৌশল। এর স্বাস্থ্যগত পরিণতিগুলি - রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ, প্রসবজটিলতা - ব্যক্তিগত বিপর্যয় হলেও, তা আসলে সমষ্টিগত ক্ষমতাবিন্যাসের বহিঃপ্রকাশ। এটি কেবল একটি সংস্কার নয়; পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের প্রণালী, যেখানে নারী শরীরকে তথাকথিত শুদ্ধতা ও নিয়ন্ত্রণের নামে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। পুঁজিবাদ এই প্রথা সৃষ্টি করেনি ঠিকই, কিন্তু বিশ্বায়িত বাজার এই সমাজগুলিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শিক্ষার অভাবকে চিরস্থায়ী করে রেখে এমন প্রথার অবসানকে বিলম্বিত করেছে। নারী শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ এখানে শ্রমবাজারে তার অধীনস্থ অবস্থানকে স্থায়ী করে।

রাষ্ট্রের ভূমিকা এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় নির্ণায়ক। যদি জনস্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে না দেখে বিমা-কেন্দ্রিক বাজার সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবে বিচ্ছিন্নতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। স্বাস্থ্যসাথীর মত প্রকল্প পরিবারের নারী সদস্যের নামে ইস্যূ করা হলেও, কাগজেকলমে বিমাকৃত নারী বাস্তবে অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, অপুষ্টি ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে বেঁচে থাকেন। সামাজিক সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য খাতে জিডিপির বরাদ্দ, স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা উপেক্ষিত থেকে যায়; দৃশ্যমান হয়ে ওঠে অস্ত্রোপচার-প্যাকেজ ও প্রকল্পভিত্তিক ভাতা। ওয়েলফেয়ারিজমে নারী বেনেফিশিয়ারি হিসেবে চিহ্নিত হন, পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে নয়। ভাতা তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন আনে না। নারীকে উৎপাদনের সমান অংশীদার না করে তাকে হাজারটা প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসেবে নির্মাণ করলেও স্বাস্থ্য-স্বাধীনতা অর্জিত হয় না।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

আর তা হয় না বলেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হিসাব বলছে ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ লক্ষ ৮৭ হাজার নারী মাতৃমৃত্যুর শিকার হয়েছেন। প্রতিদিন প্রায় ৮০০ জন নারী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান - এই তথ্য জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA)-এর। কিন্তু এই মৃত্যু বিশ্বের মানচিত্রে সমবন্টিত নয়। সাব-সাহারান আফ্রিকায় প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যুর হার ৪০০-এর ওপরে, যেখানে উন্নত বিশ্বে তা এক অঙ্কে নেমে এসেছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি, দারিদ্র্য, যুদ্ধ, বর্ণবৈষম্য - সব মিলিয়েই নারীর শরীর হয়ে উঠছে বৈষম্যের শিকার। রক্তাল্পতা নারীস্বাস্থ্যের এক নীরব মহামারী। বৈশ্বিক স্তরে অনুমান, প্রজননক্ষম নারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রক্তাল্পতায় ভোগেন। এই পরিসংখ্যান পুষ্টির অভাবের পাশাপাশি দারিদ্র্য, অল্পবয়সে বিয়ে, ঘনঘন সন্তানধারণ ও লিঙ্গভিত্তিক খাদ্যবণ্টনের বৈষম্যকে উন্মোচিত করে। ভারতও এই বৈষম্যের বাইরে নয়। পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা জানাচ্ছে, ভারতে ১৫-৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫৭ শতাংশ অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত; পশ্চিমবঙ্গে এই হার ৭০ শতাংশেরও বেশি। এরাজ্যের জঙ্গলমহল বা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে অপুষ্টি ও রক্তাল্পতার হার উদ্বেগজনকভাবে বেশী। সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর অপ্রতুলতা এবং বেসরকারি চিকিৎসার অত্যধিক ব্যয় - সব মিলিয়ে দরিদ্র শ্রমজীবী নারী চিকিৎসা পেতে গিয়ে পাড়ায় পাড়ায় মাইক্রোফিন্যান্স ঋণের খপ্পরে পড়ছেন। তপশিলী জাতি ও উপজাতিভুক্ত নারীদের মধ্যে রক্তাল্পতার উচ্চতর হার শ্রেণী-জাতি-লিঙ্গের আন্তঃসম্পর্কিত শোষণকেই স্পষ্ট করে।

কিশোরীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। অপুষ্টি, কম ওজন, এবং অল্পবয়সে গর্ভধারণ - এই ত্রিমুখী সংকট একে অপরকে পুষ্ট করে। ভারতে এখনও প্রায় ২৩.৩ শতাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়; গ্রামীণ ও দরিদ্র অঞ্চলেই এই প্রবণতা বেশি। পশ্চিমবঙ্গে এই হার সর্বোচ্চ – ৪১.৬ শতাংশ। কৈশোরেই মাতৃত্ব মানে শরীরের পূর্ণ বিকাশের আগেই প্রজননের চাপ শরীরকে পুষ্টিহীনতার চক্রে আবদ্ধ করে। জন্মায় কম ওজনের শিশু, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মও অপুষ্টিতে ভোগে। এই আন্তঃপ্রজন্মীয় অপুষ্টির চক্র পুঁজিবাদী অর্থনীতির জন্য সস্তা শ্রমশক্তি তৈরি করে, কিন্তু নারীর শরীর তার মাশুল গোণে নির্মমভাবে।

গড় আয়ুতে নারী পুরুষের তুলনায় সামান্য এগিয়ে থাকলেও, সুস্থ আয়ু ও অসুস্থতার বোঝা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি, প্রজননজনিত জটিলতা, মানসিক অবসাদ ও অস্থিরতা নারীদের জীবনমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমাদের দেশে মাতৃমৃত্যু কমার হার আশানুরূপ নয়। তার মধ্যে এরাজ্যে মাতৃমৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের চেয়েও ঢের বেশী ও উর্ধ্বমুখী। রাজ্যের মধ্যে আবার জেলাগত বৈষম্য প্রকট - আদিবাসী ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় ঝুঁকি বহুগুণ বেশি। অর্থাৎ, জাতি ও শ্রেণিভেদে বৈষম্য আরও প্রকট। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তপশিলী জাতি ও উপজাতিভুক্ত মহিলাদের মাতৃমৃত্যু ও অপুষ্টির হার সাধারণ শ্রেণিভুক্ত নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। দরিদ্রতম পঞ্চমাংশে থাকা নারীদের মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি ধনীতম অংশের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরিষেবার লভ্যতা, পুষ্টির সুযোগ, নিরাপদ প্রসবের সুবিধা - সব ক্ষেত্রেই এই শ্রেণিগত ও জাতিগত বিভাজন স্পষ্ট।

অন্যদিকে, চিকিৎসাব্যবস্থার অতিবাণিজ্যিকীকরণ প্রজননকে নতুনভাবে পণ্যায়িত করেছে। সারোগেসি, ডিম্বাণু বিক্রি, বাণিজ্যিক প্রজনন প্রযুক্তি - সব ক্ষেত্রেই দরিদ্র নারীর শরীর ব্যবহৃত হয় ধনী মানুষের চাহিদা পূরণে। শ্রমজীবী নারী নিজের দারিদ্র্যের চাপে শরীরকে ভাড়া দিতে বাধ্য হন। এটি আধুনিক দাসত্বের এক রূপ।

আরও উদ্বেগের বিষয় - স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্পের আড়ালে বাণিজ্যিক চিকিৎসার বিস্তার। আয়ুষ্মান ভারত, স্বাস্থ্যসাথীর মত প্রকল্পের অধীনে একাধিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিভিন্ন জেলায় জরায়ু অপসারণ (হিস্টেরেক্টমি) সার্জারির হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক জেলায় বীমা ক্লেইমের‌ উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল জরায়ু অপসারণের অপারেশনের সংক্রান্ত ক্লেইম। মহারাষ্ট্রের আখখেতের শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে অস্বাভাবিক উচ্চ হারে হিস্টেরেকটমির ঘটনা এই প্রবণতার এক চরম উদাহরণ। উৎপাদনচাপ, মাসিক ঋতুস্রাবের সময় ছুটি না-পাওয়া, রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য পরিষেবার খামতি - এসবের সমন্বয়ে জরায়ু অপসারণকে কর্মসংস্থান-সহায়ক সমাধান হিসেবে হাজির করা হয়েছে। এখানে শরীরের অঙ্গচ্ছেদ শ্রমবাজারে টিকে থাকার কৌশল, যা আসলে কাঠামোগত হিংসারই ভাষ্য।

পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও লিঙ্গবৈষম্য প্রকট। পুরুষ নির্বীজকরনের হার অত্যন্ত কম; নারীর টিউবেক্টমি বা অন্যান্য হরমোনাল পদ্ধতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। প্রজনন-স্বাস্থ্যের বোঝা একতরফাভাবে নারীর কাঁধে চাপানো হয়। কখনও লক্ষ্যপূরণের তাগিদে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়; কখনও পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং ছাড়াই অপারেশন বা জরায়ুতে গর্ভরোধী মেডিক্যাল ডিভাইস স্থাপন।

বেসরকারি কর্পোরেট হাসপাতালগুলিতে অতিরিক্ত সিজারিয়ান সেকশন - বিশেষত কর্পোরেট ও বেসরকারি বীমা-নির্ভর পরিকাঠামোয় - মুনাফা-চালিত চিকিৎসার এক নগ্ন উদাহরণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিজারিয়ান সেকশনের হার ১০–১৫ শতাংশের মধ্যে থাকাই চিকিৎসাবিজ্ঞানগতভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের বহু দেশে, বিশেষত বেসরকারি ক্ষেত্রে, এই হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ভারতে পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (২০১৯–২১) অনুসারে সামগ্রিক সিজারিয়ান হার ২১.৫ শতাংশ; বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তা প্রায় ৪৭ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে এই হার ২৪ শতাংশ (২০১৪-'১৫) থেকে বাড়তে বাড়তে ৩৩ শতাংশ (২০১৯-'২১) হয়েছে এবং বেসরকারী ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে ৮৩ শতাংশে (২০১৯-'২১) পৌঁছেছে। প্রসঙ্গতঃ, ২০১৬ সালে এরাজ্যে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু হয়েছে। প্রসব, যা একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, তাকে প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যতে পরিণত করে ছেড়েছে ধান্দার ধনতন্ত্র। স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দ্রুত ও ব্যয়বহুল প্রসব করানো হয়, যার ফলে মায়ের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা দেখা দিতে পারে। এখানে মাতৃত্বও বাজারের নিয়ন্ত্রণাধীন। অন্যদিকে দরিদ্র শ্রমজীবী নারী নিরাপদ প্রসবের ন্যূনতম সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। এই দ্বিমুখী বাস্তবতা - অতিরিক্ত চিকিৎসাকরণ ও সম্পূর্ণ অবহেলা - উদার অর্থনীতির স্বাস্থ্যব্যবস্থার চরিত্র স্পষ্ট করে।

নয়া উদার অর্থনীতির যুগে বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিও নিরপেক্ষ নয়। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মের সময়কার লিঙ্গ-অনুপাতের বিকৃতি নিয়ে সতর্ক করেছে। আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, যা রোগনির্ণয়ে সহায়ক, পুত্রপ্রীতির উপকরণে পরিণত হলে কন্যাভ্রূণ হত্যার পথ প্রশস্ত হয়, জন্মের আগেই নারীর অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়।

প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও জরায়ুমুখ ক্যান্সার নিম্ন ও মধ্যআয়ের দেশগুলিতে নারীমৃত্যুর অন্যতম কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর প্রায় ৬ লক্ষ নতুন সংক্রমণ ও ৩ লক্ষাধিক মৃত্যু ঘটে। টিকাকরণ, স্ক্রিনিং ও প্রাথমিক চিকিৎসা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে মৃত্যুহার যথেষ্ট কমানো সম্ভব। কিন্তু প্রান্তিক জাতি, উপজাতি ও সংখ্যালঘু নারীদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যপরিষেবার প্রাপ্তি সীমিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রোগ ও মৃত্যু শ্রেণী ও জাতির ভেদরেখা অনুসরণ করে।

যৌন ও গার্হস্থ্য হিংসা নারীস্বাস্থ্যের আরেক মৌলিক সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর একজন জীবদ্দশায় সঙ্গীর হিংসার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ভারতে পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা বলছে, প্রায় ২৯ শতাংশ বিবাহিত নারী গার্হস্থ্য হিংসার শিকার। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা দেখিয়েছে, অনিশ্চিত শ্রমবাজার ও অভিবাসন-নির্ভর কাজ নারীদের শোষণ ও হিংসার ঝুঁকি বাড়ায়। এই হিংসা মানসিক ট্রমা ছাড়াও অনিচ্ছাজনিত গর্ভধারণ, যৌনরোগ, দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ শরীর ও সত্তা উভয় ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্নতার গভীরতর স্তর। মার্কসীয় বিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব আমাদের শেখায় যেখানে শ্রম, শরীর ও সত্তা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন, সেখানে স্বাস্থ্যও বিচ্ছিন্ন ও ভঙ্গুর।

নব্য উদার অর্থনীতির সাংস্কৃতিক পরিসরে কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রি নারীশরীরকে আরেকভাবে পণ্যায়িত করেছে। চিকিৎসার নামে ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট, ত্বক-ফর্সাকরণ, উন্নত স্তন গঠন ও শরীরের নানা অংশের পুনর্গঠন - এইসব ইন্ডাস্ট্রি আত্মপরিচয়কে বাজারের যুক্তিতে পুনর্গঠিত করে। লিবারেল ফেমিনিস্টদের প্রিয় শব্দবন্ধ 'পছন্দের স্বাধীনতা' এখানে কাঠামোগত চাপে গঠিত; সামাজিক ও বাজারগত মানদণ্ড নারীশরীরকে অপর্যাপ্ত ও অসম্পূর্ণ প্রমাণ করে তাকে অস্ত্রোপচারের উপযুক্ত বস্তুতে রূপান্তরিত করে। নারী নিজের শরীরকে বাজারের দৃষ্টির মানদণ্ডে বিচার করতে শিখে সে নিজের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কসমেটিক সার্জারি ইন্ডাস্ট্রি শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্যও সৃষ্টি করে। ধনী নারীরা খরচ করে বাজারের চোখে আদর্শ সৌন্দর্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, দরিদ্র নারীরা তা পারেন না। ফলে তথাকথিত সৌন্দর্য ও সৌষ্ঠব নিজেই এক শ্রেণিচিহ্নে পরিণত হয়। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে চিকিৎসকদের একটা অংশ অধিক মুনাফার আশায় জনস্বাস্থ্য পরিষেবা ছেড়ে কসমেটিক সার্জারিতে ঝুঁকছেন। এতে জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে - যার ফল ভোগ করছেন প্রান্তিক শ্রমজীবী নারীরা।

এর সঙ্গে জুড়তে হয় সামাজিক মানসিকতার প্রশ্ন। মনুবাদী ও পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও নারীকে মূলত গৃহস্থালির দায়ে আবদ্ধ সত্তা হিসেবে কল্পনা করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার স্বাধীনতা সীমিত; প্রজনন, গর্ভপাত, বা চিকিৎসা - সব ক্ষেত্রে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ সক্রিয়। গার্হস্থ্য হিংসা, যৌন নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি - NCRB-র তথ্য বলছে, অভিযোগের সংখ্যা বছরে লক্ষাধিক। এই হিংসার হার সবচেয়ে বেশী দলিত, আদিবাসী, প্রান্তিক ও প্রতিবন্ধী শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে। এই হিংসা কেবল আইনি সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের গভীর সংকট।

এই সংকট ও বৈষম্য আকস্মিক নয়। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদনের খরচ কমিয়ে রাখতে চায়, দায় হস্তান্তর করে দেয় পরিবারে। আর পিতৃতান্ত্রিক পরিবার সেই দায় চাপিয়ে দেয় নারীর উপরে। নারীর অদৃশ্য গৃহশ্রম, যত্নশ্রম এবং প্রজনন - সবই সেই ব্যবস্থার ভিত্তি, অথচ মূল্যহীন। তার উপর যখন রাষ্ট্র জনস্বাস্থ্যকে বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়, তখন মুনাফাই হয়ে ওঠে চিকিৎসার চালিকাশক্তি। শ্রেণি, জাতি ও লিঙ্গ - এই ত্রিস্তরীয় কাঠামো নারীর শরীরকে দ্বিগুণ নয়, বহুগুণ শোষণের কেন্দ্রে পরিণত করে।

অতএব শ্রমজীবী নারীর স্বাস্থ্যকে বিচ্ছিন্ন চিকিৎসাগত সমস্যা হিসেবে দেখা যায় না। এটি রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। রক্তাল্পতা, জরায়ু অপসারণ, অতিরিক্ত সিজারিয়ান সেকশন, কন্যাভ্রূণ হত্যা, সারোগেসি, গার্হস্থ্য হিংসা বা কসমেটিক সার্জারি - প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা দেখি পুঁজির মুনাফা-যুক্তি, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের সমাবেশ। অর্থাৎ সমস্যা ব্যক্তি নারীর শরীরের ভিতরে বা মনের অন্দরে নয়, সমাজ ও অর্থনীতির কাঠামোর গভীরে প্রোথিত।

সমাধানও তাই আবশ্যিকভাবেই কাঠামোগত। সর্বজনীন ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পুষ্টিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ শ্রমপরিবেশ, সমান মজুরি, যত্নশ্রমের সামাজিক স্বীকৃতি, প্রজনন অধিকারের নিশ্চয়তা এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল শিক্ষা - এই সমন্বিত কর্মসূচি ছাড়া নারীশরীরের ওপর আরোপিত ঐতিহাসিক শোষণচক্র ভাঙা সম্ভব নয়। মুক্তি কেবল চিকিৎসার উন্নতিতে নয়; মুক্তি মানে বিচ্ছিন্নতার অবসান - শ্রম, শরীর ও সত্তার পুনর্মিলন। নারীকে পণ্য বা অনুদানপ্রাপক নয়, পূর্ণাঙ্গ নাগরিক ও উৎপাদন-সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াই সেই পুনর্মিলনের সূচনা। তাই বিকল্পের দাবীতে সংগ্রামকে তীব্রতর করতেই হবে। 

কী সেই বিকল্প? প্রথমত, স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সর্বজনীন, বিনামূল্যের, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মাতৃত্বকালীন ছুটি, পুষ্টি কর্মসূচি, গণবন্টন ব্যবস্থা, প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবা - সবই সর্বজনীন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নারীর অবৈতনিক গৃহশ্রমকে সামাজিক স্বীকৃতি ও পরিকাঠামোগত সমর্থন দিতে হবে - সমবায়ভিত্তিক শিশুসেবা কেন্দ্র, কমিউনিটি কিচেন, বৃদ্ধসেবা, বৃদ্ধাবাস নির্মাণ ও পরিচালনার মাধ্যমে। তৃতীয়ত, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, টিকা ও চিকিৎসা-সরঞ্জামের মূল্যনিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। চতুর্থত, শিক্ষার মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জোরদার করতে হবে - কন্যা ভ্রূণ হত্যা ও যৌনাঙ্গ বিকৃতির বিরুদ্ধে, বিজ্ঞানচেতনার পক্ষে, ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শ্রমজীবী নারীকে সংগঠিত করতে হবে। ট্রেড ইউনিয়ন, নারী সংগঠন ও গণআন্দোলনের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা, সমমজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা আদায় করতে হবে, অভয়াদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে সীমিত সংস্কার কিছু উন্নতি আনতে পারে, কিন্তু নারীর স্বাস্থ্যকে সত্যিকার অর্থে সুরক্ষিত করতে হলে উৎপাদন সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আজকের দিনে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের তাৎপর্য সেখানেই।


প্রকাশের তারিখ: ০৮-মার্চ-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org