|
আফ্রিকায় লুঠ হয়ে যাচ্ছে ‘বিছন’- এর অধিকারসুচিক্কণ দাস |
|
গল্পটা আলু চাষ নিয়ে। তবে সাধারণ আলু নয়। গল্পটা ঔপনিবেশিক আলু চাষের। শুধু চাষের বললে ভুল হবে। এ হল চাষের নামে বীজ, সার, ঋণ ও বাজারের চক্রে কীভাবে উপনিবেশের কৃষকদের জড়িয়ে দেয় ঔপনিবেশিক শাসকেরা, সেই গল্প। কীভাবে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে বিছনের অধিকার সেই কাহিনি। যদি গত শতাব্দীতে নাইজিরিয়ার মালভূমিতে আলু চাষ শুরুর পর্ব থেকে এখনকার পরিস্থিতি বিচার করা যায়, তাহলে দেখা যাবে ফসলের বীজ, কৃষি ঋণ, কৃষি আইন — এসব নিয়ে পুরনো ও নতুন শাসকদের সঙ্গে নাইজিরিয়ার চাষিদের ঘোরতর বিবাদ বেধে রয়েছে। এবং একথাও স্পষ্ট হবে যে, আফ্রিকার চাষিরা কী চাষ করবেন সেটা কারা ঠিক করে দেয়। কোনও ফসলের বিছন তো নিছক বীজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু প্রজন্মের স্মৃতি, শ্রম, স্বাদ, আস্বাদ, আইন, ক্ষমতা ও ঋণ। নাইজিরিয়ার ঔপনিবেশিক পোট্যাটো পরিকল্পনা দেখিয়ে দেয় আমদানি করা বীজের ওপর নির্ভরতা এতটাই বেড়ে উঠতে পারে যে তা পরে আইন হয়ে চাষির গলায় চেপে বসে। সেকারণে আজ আফ্রিকার জুড়ে উঠেছে বীজ সার্বভৌমত্বের দাবি। তার সঙ্গে জড়িয়ে পেটেন্টের অধিকার, মূল চারা যাদের কাছ থেকে চাষি কেনেন সেই ব্রিডারদের অধিকার। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বীজ সংক্রান্ত আইন এবং কৃষি ব্যবসা। দেখে নেওয়া যাক ব্যবস্থাটা কীভাবে কাজ করে। ঔপনিবেশিক শাসক ও নাইজিরিয়ার আলু চাষি ১৯৩০ ও ১৯৪০এর দশকে ব্রিটিশ অফিসারেরা নাইজিরিয়ার জোস ও ম্যামবিলা মালভূমিতে আলু চাষ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করে। গোড়ায় জমির আয়তন ছিল স্বল্প। চাষের ঝামেলাও ছিল বিস্তর। সেই আলু খেতো নাইজিরিয়ায় কাজ করতে আসা ইউরোপীয় খনি শ্রমিকেরা, খ্রিস্টান মিশনারিরা এবং ঔপনিবেশিক অফিসারেরা। সবকিছু বদলে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। জলপথ বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় সরবরাহে ভাটা পড়ল। ব্রিটিশ সেনাদের খাবারে টান পড়ল। তখন নাইজিরিয়ার হাইল্যান্ডের চাষিদের বাধ্য করা হল ব্যাপকভাবে আলু চাষ করতে। কারণ, আলু খাবে ব্রিটিশ সেনারা। তখন ব্রিটেনের যুদ্ধের অঙ্গ হয়ে উঠল চাষবাস নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা। আজকের দিনে সারা আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে প্রায়ই নানান সঙ্কটের সময় নিতে হয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি। তখন খাবারের দাম বাড়ে, জলবায়ু এলোমেলো হয়ে যায়, সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এমন পরিস্থিতি হয়েছিল কোভিড অতিমারির সময়। এখন হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে। প্রতিটি সঙ্কটের সময় বলা হয়, উন্নত বীজ আনা হবে, সার আনা হবে, ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হবে। খাদ্য সরবরাহে স্থিতিশীলতা আনা হবে। আজকের দিনে অ্যালায়েন্স ফর আ গ্রিন রেভোলিউশন ইন আফ্রিকা চাষিদের দেয় উন্নত বীজ যাতে উৎপাদন বাড়ে। বাড়ে বাণিজ্যিক চাষ। নাইজিরিয়ার অ্যাঙ্কর বরোয়ার্স প্রোগ্রাম চাষিদের যুক্ত করে বীজ, সার, ঋণ, ক্রেতা ও ফসল ওঠার পর ঋণ মেটানোর ব্যবস্থার সঙ্গে। ঘানার প্ল্যান্টিং ফর ফুড অ্যান্ড জবস কৌশল বদলে চলে গেছে কৃষি উপকরণের ঋণের ব্যবসায়। সেই ঋণ শোধ করতে হবে ফসল বিক্রি করে। মালাউইয়িতেও রয়েছে একই ধরনের ব্যবস্থা। কর্মসূচিগুলির নাম ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু কাজে তারা এক। সবকটি কর্মসূচিতে ঝুঁকি একই— আগে উপকরণ দেওয়া হবে ঋণে, পরে শোধ করতে হবে ফসল বেচে। বাজারের ব্যবস্থাও করা হবে ওপর থেকে। এতে চাষিরা শুধু বীজ কেনেন না। আসলে তাদের একটা চক্রে জড়িয়ে ফেলা হয়। সেটা হল বীজ, ঋণ, সার, ডিজিটাল নথিভুক্তি এবং ক্রেতাদের চক্র। এখানে শব্দগুলো সব আধুনিক, কিন্তু মূল বিষয়টি সেই অতি পরিচিত— বীজ-ঋণের সেই পুরনো ফাঁদ। নির্ভরতাই যখন আইন জরুরি ভিত্তিতে চালু করা স্কিমগুলি দ্রুত চাষের ধরন বদলে দিতে পারে। এই বদলগুলিকে স্থায়ী চেহারা দিতে পারে আইন। সে কারণেই জেনেটিক রিসোর্সেস অ্যাকশন ইন্টারন্যাশনাল এবং আফ্রিকান সিড সোভারেনটি আন্দোলন এত গুরুত্বপূর্ণ। গত দু দশকের বেশি সময় ধরে এই দুই সংস্থা আফ্রিকার নিজস্ব বীজ আইনগুলির খোঁজ রেখেছে এবং সেগুলি যাতে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য প্রোটেকশন অফ নিউ ভ্যারাইটিজ অফ প্ল্যান্টস (উপোভ ১৯৯১)-এর চালু করা আইনগুলির সঙ্গে মিশে যেতে না পারে, তার বিরোধিতা করেছে। কারণ, দুটো আইন মিশে গেলে যারা বীজ উৎপাদন করে তাদের অধিকার জায়গা পেয়ে যাবে চাষিদের অধিকারের ওপর। উন্নত দেশের বীজ উৎপাদক আধিপত্য করবে আফ্রিকার কৃষকদের ওপর। তখন চাষি কোন বীজ বিছন হিসাবে কাজে লাগাবেন সেই অধিকার খর্বিত হবে। সোজা কথায়, উপোভ ১৯৯১ বীজকে পরিণত করেছে একটি সংরক্ষিত মেধা স্বত্ত্বে এবং এখন সেই স্বত্ত্বের অধিকারী উন্নত দেশের বীজ উৎপাদকেরা। সংরক্ষিত বীজ কোথায় কতটা চাষ হবে, কে কোন দামে কিনবে, কীভাবে সেগুলির বিপণন হবে তা ঠিক করে দেবে চাষিরা নয়, বীজ উৎপাদকেরা। চাষ টিকিয়ে রাখতে গেলে বিছন বাঁচাতে হয়, পরে সেই বিছন মাটিতে পঁুততে হয় ভাবী ফসলের আশায়, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিছনের বিনিময় করতে হয়, স্থানীয় মাটির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া শিখতে হয়, এলাকার বাজারে বিক্রি করতে হয়— এগুলো সবই চাষির জন্মগত অধিকার। কিন্তু বিছন যদি আমদানি করা হয়, তার সঙ্গে যদি বীজ উৎপাদকের নানান শর্ত জুড়ে থাকে, তাহলে চাষের ওপর চাষির অধিকার খর্বিত হয়। কারণ তাতে থাকে নানা শর্ত — ঋণের শর্ত, বিক্রির দামের শর্ত, এমনকী শর্ত ভাঙলে থাকে নজরদারির ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রেই বীজ মেধাস্বত্ত্ব হওয়ায় সেই অধিকার হারিয়েছেন আফ্রিকার চাষিরা। প্ল্যান্টার্স ব্রিডার্স বিলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লড়াই করছেন ঘানার কৃষকেরা। বিলটা চালু করা হয়েছিল আধুনিকীকরণের নামে। বলা হয়েছিল, নতুন বীজ উদ্ভাবনে পুরস্কার দেওয়া হবে, এর ফলে নতুন নতুন বিনিয়োগ আসবে, কৃষির উন্নতি হবে। তবে কৃষকেরা ও নাগরিক সংগঠনগুলি এই মর্মে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই বিলের আসল উদ্দেশ্য হল বীজের ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি করা। এই বিল পাশ হলে নতুন ধরনের বীজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে, ঠিক করে দেওয়া হবে কারা সেই বীজ চাষ করতে পারবেন, কাদের কাছে সেই সব বীজ দেওয়া হবে, কী দামে চাষিকে সেই ফসল বিক্রি করতে হবে। সূত্র: মান্থলি রিভিউ অনলাইন ডেলি আপডেট, ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশের তারিখ: ০৫-অক্টোবর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |