|
সাধারণের জমায়েতের পরিসর দখল এবং প্রতিবাদের অধিকারএম এ বেবি |
|
২ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে বিরোধী দল ও গণসংগঠনগুলির কর্মী ও নেতারা যাঁরা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছিলেন, তাঁদের আটক করা হয়। এমনকী রাজধানী দিল্লিতে প্রতিবাদের যে জায়গা তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন সেই যন্তর মন্তরেও তাঁদের জড়ো হতে দেওয়া হয়নি। দিল্লি পুলিসের পারমিশন রাজের অজুহাত কাজে লাগিয়ে তাঁদের আটক করা হয়েছিল।
তবে আগে বিষয়টা এমন ছিল না। আমার এখনও মনে আছে ১৯৮১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দিল্লির প্রাণকেন্দ্র বোট ক্লাবে যুবছাত্রদের একটা বিশাল জমায়েত হয়েছিল। জমায়েতের সামনেই ছিল দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি — সংসদ, সাউথ ব্লক, নর্থ ব্লক এবং রাষ্ট্রপতি ভবন। সেই দশকে বোট ক্লাবে শ্রমিক, কৃষক,ছাত্র ও যুবদের বিশাল বিশাল সমাবেশ হয়েছিল। তবে নব্বইয়ের দশকের গোড়া থেকে বোট ক্লাবে সব গণ জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়। বোট ক্লাবে জমায়েতের সুযোগ প্রত্যাহারের পর, দিল্লির আরও অনেক জায়গা যেমন পার্লামেন্ট স্ট্রিট ও যন্তর মন্তর জমায়েতের জন্য ছেড়ে দেওয়া হযেছিল। ১৯৯৩ সালে যন্তর মন্তরই হয়ে ওঠে জমায়েত ও প্রতিবাদ-বিক্ষোভের নির্ধারিত জায়গা। সাধারণত যন্তর মন্তরের কর্মসূচি শুরু করার অনুমতি দেওয়া হত মান্ডি হাউস কিংবা কাছাকাছি কোনও জায়গা থেকে মিছিল শুরুর মধ্যে দিয়ে। এর ফলে সংগঠকেরা মিছিল নিয়ে যেতে পারতেন লাটিয়েন্সের দিল্লির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকার মধ্যে দিয়ে এবং সেখানে তাঁদের দাবিগুলি উচ্চৈঃস্বরে তাঁরা তুলে ধরতেন। কোভিড অতিমারির সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবে লকডাউন চাপিয়ে দেওয়ার পর থেকে রাজধানীর গণতান্ত্রিক পরিসরগুলি ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসছে। অতিমারির সময়কার অস্থায়ী বিধিনিষেধগুলি একেবারে স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত করা হল যাতে সাধারণ মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলি ব্যক্ত করার কোনও পরিসর পেতে না পারেন। এই সময়ে মান্ডি হাউস থেকে যন্তর মন্তর পর্যন্ত মিছিল করার পরিচিত পথও সাধারণ মানুষ ব্যবহার করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন এবং তা করা হল পারমিশন রাজ জারি করে। গত এক দশকে এই সরকার বিক্ষোভ বন্ধ করার জন্য সেই পারমিশন রাজকে আরও শক্তিশালী করেছে। এমনকী যে অসংখ্য প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা গোটা দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, যার জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী মোদি সরকারের ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ও অকর্মণ্যতা, তার জেরে ছাত্রছাত্রী, তাদের বাবা-মা এবং দেশের উদ্বিগ্ন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্রোধ ও হতাশা জন্ম নিয়েছে। তিন দানবিক সি — সেন্ট্রালাইজেসন, কর্মাশিয়ালাইজেসন অ্যান্ড কমিউনালাইজেসন (কেন্দ্রীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণ), এগুলোই হল আসল অপরাধী যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, কেন্দ্রীকরণ মানে দাঁড়িয়েছে রাজ্যস্তরে যে সব পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে সেগুলোর দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে নবগঠিত এনটিএর হাতে। তারা আবার নিজেদের কাজগুলি বাণিজ্যিক-বেসরকারি সংস্থাকে আউটসোর্স করে। এ ঘটনা হৃদয়বিদারক যে, যেভাবে অপরাধীসুলভ হেলাফেলার সঙ্গে নিট পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে তার জেরে ২০ জনের বেশি পড়ুয়াকে আত্মহত্যা করতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এই সব নীতির বিরুদ্ধে বিপুল প্রতিবাদ হওয়ার দরকার ছিল এবং সেটাই পরিণতি লাভ করে যন্তর মন্তরে ২০ জুলাইয়ের বিশাল জমায়েতের মধ্যে। জুলাই মাসে যন্তর মন্তরে যে সফল লড়াই হয়েছিল, প্রতিবাদ স্থলে সেটাই যাতে শেষ সফল সংগ্রাম হয়ে থাকে সেজন্য কোনও চেষ্টাই বাকি রাখছে না মোদি সরকার। ২ অক্টোবর প্রতিবাদ জানানোর জন্য যন্তর মন্তরের অনুমতি চেয়েছিল বিরোধী দলগুলি। আইন-শৃঙখলা পরিস্থিতির অজুহাতে সেই অনুমতি আটকে দেওয়া হয়েছে। ১২০০র বেশি পড়ুয়াকে আটক করা হয়েছে এবং ১১টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। যন্তর মন্তরে যে প্রতিবাদী সমাবেশ হয়েছিল তখন কোথাও কখনই কোনও অশান্তির ঘটনা ঘটেনি। অতএব জমায়েত নিষিদ্ধ করার আসল কারণ আইনশৃঙ্খলা ছিল না। আসল কারণটা ছিল রাজনৈতিক। সাধারণের জন্য নির্দিষ্ট যে জায়গা তা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অসাম্য স্পষ্ট। সেটা শুধু প্রতিবাদ দমন করার মধ্যেই স্পষ্ট নয়। বরং যারা ক্ষমতাসীন তাদের জন্য দিল্লি শহরকে কীভাবে সাফ রাখা হচ্ছে তার মধ্যেও স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অন্য বিজেপি নেতারা যে পথে যাবেন কিংবা কেনাকাটা করবেন সেই সম্ভাব্য প্রতিটি রাস্তা দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রাখা হয়। এতে ক্ষতি হয় রাস্তার ধারের শত শত দোকানের, হকারদের, এমনকী এমসিডি বা এনডিএমসি স্বীকৃত যে সব দোকান যারা অনেক বেশি ভাড়া দেয় তাদেরও এতে ক্ষতি হয়। বিশেষত এই সব দোকানগুলি রয়েছে সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, উদ্যোগ ভবন এবং প্যাটেল চকের আশপাশে। নেতা-মন্ত্রীদের এই যাতায়াত চলে প্রায় নিত্যদিন, চলে বিকেল সন্ধেয় যখন রাস্তায় লোকজনের যাতায়াত সবচেয়ে বেশি কারণ তখন অফিসের কাজ শেষ করে লোকে বাড়ি ফেরে। কনভয় আসা ও যাওয়ার দীর্ঘ সময় আগেপরে ফুটপাথ ব্যবহার করতে পারেন না পথচারীরা। দিল্লির বেশ কয়েকটি সরকারি রাস্তা, যেমন রেস কোর্স রোড, কৃষ্ণমেনন মার্গ এবং এ ধরনের বহু রাস্তা সাধারণ মানুষের জন্য স্থায়ীভাবে বন্ধ করা থাকে। যদিও এসব রাস্তার প্রকৃত মালিক সাধারণ মানুষই। কারা ভিআইপি তার কোনও তালিকা দিল্লি পুলিশ দেয় না। ভিআইপিদের যাতায়াতের সময় কী ভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হবে তার কোনও লিখিত নির্দেশিকাও দিল্লি পুলিশের নেই।
আসলে নাগরিক এখন দুই শ্রেণির। একদল নিরাপত্তার আড়ালে থাকে। তাদের জন্য রাস্তা সাফ থাকে। তাদের জন্য গোটা শহরটাই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। আর এসবের দাম দিতে হয় আরেক দলকে। এতে অন্যদলকে চলাফেরার বিধিনিষেধ ও জীবনজীবিকার ক্ষতির বোঝা বইতে হয়। সাধারণের জন্য যে জায়গা সেটা চলে যায় ক্ষমতাবানদের হাতে এবং জনগণের কাছে সেই সব রাস্তার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কনভয়ের জন্য রাস্তা সাফ করার কাজে নামে যে দিল্লি পুলিস তারা সেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে থাকা একই বাহিনী যারা যন্তর মন্তরে প্রতিবাদী জমায়েত আটকে দেয়। যে যুক্তিতে শ্রমিকদের যন্তর মন্তরে জমায়েত হওয়া আটকানো হয়, সেই একই যুক্তিতে রাস্তার ধারের দোকানের শাটারগুলি বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়। এখনও পর্যন্ত আমাদের ছিল একটা যন্তর মন্তর। গায়ের জোরে সেই জায়গা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এবার জন্ম নেবে একটা, দুটো, তিনটে, চারটে, অসংখ্য যন্তর মন্তর, জন্ম নেবে শুধু শহরেই নয়, মাথাচাড়া দেবে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতেও। ব্যারিকেড তৈরি করে কিংবা ১৬৩ ধারা জারি করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিকে আটকানো যাবে না। দিন গোনা শুরু হয়ে গেছে শুধুমাত্র দুর্নীতিগ্রস্ত জ্ঞানেশ কুমারের জন্যই নয়, শুরু হয়ে গেছে তাদের সেই সব অপরাধী প্রভুদের জন্যও, গণতন্ত্রের সেই সব কশাইদের জন্যও। সেই কশাইরা হল মোদি শাহ ও ভাগবত — এই ত্রয়ী। প্রকাশের তারিখ: ১৩-অক্টোবর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |