ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র তরফে পার্টির অভ্যন্তরীণ আলোচনার দলিল প্রকাশিত হতেই সামাজিক গণমাধ্যম অভিযোগে ভরে উঠেছে। প্রধানতম আপত্তিটি হচ্ছে, সিপিআই(এম) ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেনি (যদিও প্রথমবারের মতো নয়া ফ্যাসিবাদ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে)। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-ও এই আলোচনায় চলে এসেছে। এই অভিযোগে একটি কথা অবশ্য স্পষ্ট– এতে শুধু একটি কথাই বলা হচ্ছে– সিপিআই(এম) ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেনি। কিন্তু কেউই একথা বলেনি যে দশ লক্ষাধিক সদস্যের দল সিপিআই(এম) ভারতে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামনে সারিতে নেই। কিংবা যারা এই নয়া ফ্যাসিবাদের আক্রমনের শিকার হয়েছে তাদের পাশে সিপিআই(এম) দাঁড়ায়নি। একটিই কথা, ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি নেই। এটা কেউই বলছে না যে সিপিআই(এম) সংখ্যাগুরুবাদের উত্থান বা সংখ্যালঘুদের আইনী সুরক্ষা প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে লড়াইকে উপেক্ষা করেছে। এই মুহূর্তে ভারতে যখন বামপন্থীরা নিঃসন্দেহে দুর্বল, তখন এই অভিযোগটি প্রধানত সিপিআই(এম)-এর একটি ধারণার বিরুদ্ধে, তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নয়।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্যে প্রয়োজন পরিস্থিতির সঠিক পর্যালোচনা। একটি যুগ সন্ধিক্ষণে যদি তার মর্মবস্তু যথার্থভাবে উপলব্ধিতে না আসে, তবে সঠিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করায় ব্যর্থ হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা থেকে যায়। সে জন্যেই কোনও একটি যুগ সন্ধিক্ষণের বিশ্লেষণ করতে হয় যথেষ্ট ধৈর্যের সঙ্গে। হিন্দুত্ব জোটের কার্যকলাপে আমাদের মধ্যে যে ক্রোধ জাগ্রত হয় শুধুমাত্র তার ভিত্তিতে নয়। (সঙ্ঘ পরিবার অভিধাটি আমাদেরকে হিন্দুত্বের বিচিত্র ধারার রাজনীতিকে বুঝতে সহায়ক হবে)
সঙ্ঘ পরিবার
বহু বছর ধরেই সঙ্ঘ পরিবার বলতে সঙ্ঘ পরিবারের নেতা আরএসএস এবং বজরং দলের মতো অংশটিকে পুরোপুরি ফ্যাসিবাদী মনে করা হচ্ছে। এই সংগঠনগুলির আচরণ যে অনেকটাই নাৎসীদের ব্রাউনহেমডেন বা ইতালীয় ফ্যাসিবাদীদের ক্যামিসিয়ে নেরের মতোই ফ্যাসিবাদী চরিত্রের, এ নিয়ে কোনও বিতর্ক ছিল না। সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলিতে কয়েকদশকের কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে এই গোষ্ঠীগুলি যথেষ্ট গভীরে তাদের শিকড় ছড়িয়েছে।
২০২২ সালে সিপিআই(এম)-এর ২৩-তম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার ‘আরএসএস-এর হিন্দুত্বের ফ্যাসিবাদী কর্মসূচিকে আক্রমণাত্মক কায়দায় রূপায়িত করছে’। ২০০০ সালে বিশেষ সম্মেলনে সময়োপযোগী করে গৃহীত সিপিআই(এম)-এর কর্মসূচিতে বলা হয়েছে, ‘সাম্প্রদায়িক এবং ফ্যাসিবাদী আরএসএস-এর নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক কাঠামোর সামনে এক ভয়াবহ বিপদ উপস্থিত হয়েছে।’ আরএসএস-এর নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলি এবং বিজেপি সরকারের এই মূল্যায়নই সুনিশ্চিত করেছে সিপিআই(এম) এবং তাদের গণসংগঠনগুলিকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯-এর বিরুদ্ধে তৎপর ভুমিকা গ্রহণ এবং সংখ্যালঘুদের উপর ফাসিবাদী আক্রমনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে (২০২২ সালে দিল্লিতে সংঘটিত ব্যাপক আকারের হিংসা বা তুলনায় ছোট আকারের আক্রমনের ঘটনাবলী, সব ক্ষেত্রেই সিপিআই(এম) সুরক্ষা ও ত্রাণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করেছে)।
তবে সঙ্ঘ পরিবারের অভ্যন্তরে নানা ধরনের সামাজিক উৎসের ভিত্তিতে তৈরি নানা রাজনৈতিক চেহারার সংগঠন রয়েছে, যেমন শ্রমিক ও কৃষক ফ্রন্টগুলি (ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ বা বিএমএস এবং ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘ বা বিকেএস)। তারা আরএসএস-এর নেতৃত্ব বা পরিচালনাতেই কাজ করে এবং এমনকী যখন তারা রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে বাধ্য হয়, তখনও তারা কোনও না কোনওভাবে আরএসএস-এর ফ্যাসিবাদী কর্মধারার সাথে সম্পৃক্ত হয়েই থাকে। বিএমএস নিজেদেরকে শ্রমিকদের কল্যাণকামী ‘অ-রাজনৈতিক ইউনিয়ন’ বলে দাবি করে এবং এই যুক্তি দেখিয়ে ২০১৫ সালের সাধারণ ধর্মঘটের বিরোধিতা করেছে। আবার ইউনিয়নের ফেডারেশনগুলি বিজেপি সরকারের ট্রেড ইউনিয়ন আইন সংস্কারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। বিকেএস কৃষক আন্দোলনের দাবিগুলিকে সমর্থন করে, অথচ তাদের প্রতিবাদের ধরনকে ‘হিংসাত্মক’ বলে মিথ্যা অভিযোগ এনে বিরোধিতা করে। ভারতের সর্ববৃহৎ শ্রমিক ও কৃষক এই সংগঠনগুলি ফ্যাসিবাদী আরএসএস-এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও, তারা সরাসরি ফ্যাসিবাদী সংগঠন নয়। তার অর্থ বিজেপির অভ্যন্তরীণ জোটে এমন কিছু অংশ রয়েছে, যারা তাদের সদস্যদের জীবনের শ্রেণি-বাস্তবতার প্রশ্ন সামনে এসে হাজির হলে রাজনীতির ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয়।
এক বিশেষ ধরনের উগ্র দক্ষিণপন্থা
একটি বিষয় স্পষ্ট যে শুধু নির্বাচনের মধ্য দিয়েই নয়, সংস্কৃতি, সমাজ, মতাদর্শ এবং অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে আধিপত্য কায়েম করে এক নতুন ধরনের দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটেছে। এরা সবসময় উদারনৈতিক গণতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটাতেও আগ্রহী নয়। আইজাজ আহমেদের লেখাকে অনুসরণ করে ট্রাইকন্টিনেন্টাল ইনস্টিট্যুট ফর সোস্যাল রিসার্চ-এর নামকরণ করেছে ‘উদারবাদ ও উগ্র দক্ষিণপন্থার ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গন’ হিসেবে। এই ‘ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গন’-এর ধারণাটি আমাদের এই কথাটিই বোঝাতে চায় যে উদারবাদ ও উগ্র দক্ষিণপন্থার মধ্যে বিরোধটি সবসময় অবধারিত নয়। সত্যিকার অর্থে উদারবাদ উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে কোনও ঢাল নয়। এবং অবশ্যই নয় এর কোনও প্রতিষেধকও। চারটি বিষয় এই ‘ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গন’ এবং এই বিশেষ ধরনের উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থানকে বুঝতে সহায়তা করবে:
১। নয়া-উদারবাদী ব্যয়সংকোচনের নীতি অনুসরণকারী উদারনৈতিক গণতন্ত্রের দেশগুলি, উদারনৈতিক সংবেদনশীলতার প্রতীক যে সামাজিক কল্যাণের কর্মসূচিগুলি, তাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। দরিদ্র অংশের দায়িত্ব নিতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এখন পর্যবসিত হয়েছে তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতায়।
২। সামাজিক কল্যাণ ও পুনর্বন্টন কর্মসূচির প্রতি আন্তরিকভাবে দায়বদ্ধ না হওয়ায় উদারনৈতিকতা স্বযাচিত হয়েই দক্ষিণপন্থী রাজনীতির দিকে চলে গেছে। এছাড়াও দেশের অভ্যন্তরের শ্রমিক মহল্লাগুলিতে আরো বেশি দমনমূলক পুলিসী ব্যবস্থা তৈরিতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রয়োজনের সামগ্রীর বিতরণে ক্রমবর্ধমান সংকোচন এবং এই সহায়তা বিতরণে মানবাধিকার সংকোচনকে মেনে নেওয়ার শর্ত হিসেবে আরোপ করেছে তারা।
৩। উগ্র দক্ষিণপন্থার দিকে উদারনৈতিক রাজনীতির প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলি ঝুঁকে পড়ার ফলে রাজনীতির পরিসরে এই বিশেষ ধরনের দক্ষিণপন্থা ক্রমেই বেশি বেশি করে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। অন্যভাবে বললে, নীতির ক্ষেত্রে উগ্র দক্ষিণপন্থাকে স্বাগত জানানোই উগ্র দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলিকে মূলধারায় আসার পথ সুগম করেছে।
৪। পরিশেষে দেখা গেল, সর্বত্র বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বামপন্থীদের প্রভাব নিঃশেষ করে দিতে উদারনৈতিক ধারার রাজনৈতিক দলগুলি উগ্র দক্ষিণপন্থীদের সাথে জোট বেঁধে নেমে পড়েছে। আসলে অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্নে শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষকদের বিষয়ে উগ্র দক্ষিণপন্থা ও তাদের উদারনৈতিক সহযোগীদের মধ্যে কোনও ফারাক নেই।
১৯৬৪ সালে পোলিশ মার্কসবাদী মাইকেল কালেস্কি ‘আমাদের সময়ের ফ্যাসিবাদ’ নামে একটি সাড়া জাগানো প্রবন্ধ লেখেন। সেই প্রবন্ধে কালেস্কি বলেন, নতুন যে ধরনটির ফ্যাসিবাদের আত্মপ্রকাশ ঘটছে তারা সাড়া পাচ্ছে ‘বৃহত্তর জনগনের মধ্যে থাকা সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল অংশ থেকে’ এবং তাদের ‘অর্থায়ন হচ্ছে বৃহৎ ব্যবসায়ী চক্রের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল অংশটির দ্বারা’। তবে কালেস্কি লিখেছেন, ‘শাসকশ্রেণি সাধারণভাবে চায় না এরা ক্ষমতায় চলে আসুক। আবার এদেরকে প্রতিহত করতে কোনও উদ্যোগও নেয় না। শুধুমাত্র এদের অত্যুৎসাহের বাড়াবাড়িকে ভর্ৎসনা করে তারা’। এই মনোভাব আজও বজায় রয়েছে: শাসকশ্রেণি সামগ্রিকভাবে ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীগুলির উত্থানে আতঙ্কিত নয়, শুধুমাত্র ‘বাড়াবাড়ি’কে ভয় পায়। বৃহৎ পুঁজিপতিদের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল অংশগুলিই এদের অর্থসাহায্য করে (২০১৪ সালে গুজরাটের লগ্নি সম্মেলনে রতন টাটার মুখে মোদীর প্রশংসা উদারনৈতিক বুর্জোয়া ও ফ্যাসিবাদী অংশের পার্থক্যহীনতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ)। বুর্জোয়ারা এই নতুন ধরনের উগ্র দক্ষিণপন্থার বৃহত্তর মঞ্চকে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃত্তের অন্দরে স্বাগত জানায়, কারণ তারা মনে করে পুঁজিবাদের পক্ষে সমাধানের অতীত সমস্যাগুলি (সামাজিক বৈষম্য, পরিবেশগত বিপর্যয় ইত্যাদি) থেকে সৃষ্টি হওয়া অশান্তির এটাই প্রতিষেধক।
এই বিশেষ ধরনের উগ্র দক্ষিণপন্থা মানে শুধু নয়া ফ্যাসিবাদীরা নয় (যেমন ব্রাজিলের বোলসোনারিওপন্থীরা), এদের যারা সামনে এগিয়ে দিচ্ছে তারাও (যেমন জার্মানির খ্রিস্টান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন, যারা সানন্দে নয়া ফ্যাসিবাদী জোটের সাথে হাত মিলিয়ে অভিবাসন বিরোধী ভোট দিয়েছে)। বিশেষ ধরনের উগ্র দক্ষিণপন্থার এই ধারণা দক্ষিণপন্থার সেই দিকটিরই ব্যাখ্যা করে যেখানে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পতন অগ্রাধিকার দেয় দক্ষিণপন্থার রাজনীতিকে এবং একইসঙ্গে দক্ষিণপন্থীদের সেই ধরনের জোটকে, যেখানে পুরোনো দক্ষিণপন্থা ও উগ্র দক্ষিণপন্থা মিলে একটি কিম্ভূত কোরাসের জন্ম হয় (প্রায়শই এ ধরনের জোটে জুটে যায় সোশ্যাল ডেমোক্রেসি-র পুরোনো শক্তিগুলি, যারা এতটাই অধঃপতিত যে পুরোনো দিনের রক্ষণশীল আর এদের মধ্যে কোনও তফাৎ করা যায় না, যেমন ইংল্যান্ডের লেবার পার্টি)।
সোশ্যাল ডেমোক্রেসি-র পতন
জরুরি অবস্থার সময়পর্বে (১৯৭৫-৭৭), এটা বোঝা যাচ্ছিল যে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রথম প্রজন্মের মৃত্যু এবং সময়ের নিরিখে ১৯২০ থেকে ১৯৪০-র সংগ্রামী পর্ব দূরত্বে চলে যাওয়ায়, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের চেতনা দুর্বল হয়ে গেছে। উদারনৈতিকতার ভারতীয় ধারার যে বিষয়গুলি অভিজাত সমাজে চর্চিত হতো, তার ভাঙন ঘটে গিয়ে এমন এক বিমূর্ত বিশ্বজনীনতা এলো, যা ভারতীয় শ্রমিক ও কৃষকদের সামাজিক জগতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, সমাজতন্ত্রের ভারতীয় ধারণা (সমাজবাদ) এবং ভারতীয় উদারনৈতিকতার এই অবক্ষয় ঘটলো কংগ্রেসের একাধিপত্যের যুগের অবসানের সমান্তরালে এবং এটা এর অন্যতম কারণও। ভারতের প্রথম অ-কংগ্রেসী সরকার (১৯৭৭-১৯৮০) গঠিত হল উগ্র দক্ষিণপন্থী ভারতীয় জনসঙ্ঘ থেকে শুরু করে ভারতের সোস্যালিস্ট পার্টি অবধি বিচিত্র রাজনৈতিক শক্তিসমূহের সংযুক্তিতে তৈরি জনতা পার্টির আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে, যা খুব দ্রুতই টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
সংসদের ভিতরে (১৯৫২ থেকে ১৯৬৭ অবধি লোকসভার বৃহত্তম অংশ) এবং বাইরে, কলে-কারখানায় রাজপথে ময়দানে, কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় ভূমিকার সুবাদেই ভারতীয় সাধারণতন্ত্রে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি-র কিছু বৈশিষ্ট্য বিকশিত হল। কমিউনিস্টরা আরো অন্যদের সঙ্গে নিয়ে (এতে ছিল সমাজবাদের ভারতীয় ধারাগুলি, যারা পরে ১৯৫২-১৯৭২ পর্বের রামমনোহর লোহিয়ার প্রজা সোস্যালিস্ট পার্টি থেকে বেরিয়ে এসেছিল) ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের যে দাবিগুলি কংগ্রেসের করাচি অধিবেশনের (১৯৩১) সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছিল তাকে আরো বিকশিত করেছিল। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৪ অবধি সক্রিয় স্বতন্ত্র পার্টির মত ভারতীয় পুঁজিপতিদের দলগুলির কথা না বললেও ভুল হবে, যারা ফ্যাসিবাদী আরএসএস-এর বিপক্ষে এক ধরনের উচ্চবর্গীয় বিশ্বজনীনতাকে ভারতীয় সমাজের সমক্ষে নিয়ে এসেছিল (পুঁজিবাদী দলের মধ্যেও সমাজ গণতন্ত্রের ধারণার সর্বব্যাপী প্রভাবের বিষয়টি স্বতন্ত্র পার্টির মধ্যে লক্ষ্য করা গিয়েছিল কারণ তাদের নেতৃত্বে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এন জি রঙ্গ, আকালি নেতা দর্শন সিং ফেরুমন ও উধম সিং নাগোকের মত স্বাধীনতা আন্দোলনের কৃষক সংগ্রামের নেতারা এবং প্রাক্তন কমিউনিস্ট মিনু মাসানী; তবে তাদের মধ্যে থাকা ফ্যাসিস্টদের প্রতি আগাগোড়া সহানুভূতিশীল নেতা কে এম মুনশী ১৯৬৪ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রতিষ্ঠা করেন)।
১৯৭০ সাল নাগাদ সোশ্যাল ডেমোক্রেসি-র এই ধারাগুলি, যাদের মধ্যে কোনও কোনওটি উঠে এসেছিল নিচুতলা থেকেই, কংগ্রেস ও সমাজবাদের ভারতীয় পরম্পরার আঞ্চলিক দলগুলি নয়া উদারবাদের পথ গ্রহণ করার ফলে দুর্বল হয়ে যায়। ভারতে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি-র ভেঙে পড়া, বিশেষ করে উত্তর ভারতে, বামপন্থী আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। রাজনীতির ক্ষেত্রে ভারতীয় বুর্জোয়াদের সর্বমান্য পথ বেঁকে যায় আরো দক্ষিণদিকে। এবং কংগ্রেস হয়ে ওঠে নয়া উদারবাদের মূল প্রবক্তা। উচ্চবর্গীয় ভারতীয় সমাজে নয়া উদারবাদকে ঘিরে সর্বসম্মতি থেকেই আসে স্বাধীন বিদেশনীতির বিসর্জন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহদের দলে ভারতের প্রবেশ। সামাজিক কল্যাণমুখী প্রকল্প, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের ধারাবাহিক সংকোচনের ফলে শ্রমিক এবং কৃষক সমাজ ক্রমেই সংগঠিত শক্তি হারিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হল। ১৯৮০-র দশকে উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থানের অংশত কারণ, মূলত কংগ্রেস এবং তার সঙ্গে ভারতীয় সমাজবাদের পুরোনো ধারা-জাত সোশ্যাল ডেমোক্রেসি-র মৃত্যু (উদাহরণস্বরূপ সমাজবাদী দল হয়ে উঠল নয়া উদারবাদের আঞ্চলিক প্রতিভূ ও আঞ্চলিক পুঁজিবাদের দল)। বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের আত্মপ্রকাশ নিজের জোরে ঘটেনি, বা শুধুমাত্র তাদের পূর্বজ জনসঙ্ঘ বা আরএসএস-এর ধারাবাহিকতায় হয়নি। স্বাধীনতা আন্দোলন ও সমাজবাদের ভারতীয় ধারার মধ্য দিয়ে বিকশিত জাতীয়তাবাদের ভারতীয় ধরনটির বিলুপ্তি থেকে সৃষ্টি হওয়া শূন্যতা পূরণ করতে সক্ষম হয় বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার। কংগ্রেস ও লোহিয়াবাদী ধারা নিজেদের দক্ষিণমুখী মোড়বদলের আত্মঘাতী দুর্বলতায় দিশেহারা হয়ে পরস্পরের দিকে হাত বাড়িয়ে অ-বিজেপি জোট গঠনে প্রয়াসী হল। যথাক্রমে এলো জাতীয় মোর্চা (১৯৮৯-৯১) এবং যুক্তমোর্চা (১৯৯৬-৯৮)। দ্বিতীয়টিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংঘাত থাকা সত্ত্বেও সিপিআই(এম)-এর ঐক্য বজায় রেখে মোর্চাকে টিকিয়ে রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ২০০৪ সালে চতুর্দশ লোকসভা নির্বাচনের পর যখন কোনও দলই সরকার গঠনে সমর্থ হল না, তখন সিপিআই(এম) ইউপিএ গঠনে উদ্যোগী হয়ে অ-বিজেপি সরকারের পথ খুলে দেয় যা একদশক স্থায়ী হয় (যদিও সিপিআই(এম)-এর সাথে হওয়া বোঝাপড়াকে কংগ্রেস লঙ্ঘন করে, যার ফলে ২০০৮ সালে সিপিআই(এম) সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়)। ইউপিএ-তে বামফ্রন্টের অনুপস্থিতি কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে দক্ষিণমুখী পথে চালিত করে দুর্নীতির আগল খুলে দেয়। ফলে ভারতে নয়া উদারবাদ-উত্তর বিকল্প পথ তৈরির সম্ভাবনা বিনষ্ট হয়ে যায়। এভাবেই ২০১৪ সালে বিজেপির বিজয়ের দুয়ারটি উন্মুক্ত হল। বিজেপির দীর্ঘ শাসনকালে (২০১৪ থেকে বর্তমান সময় অবধি) সিপিআই(এম) ধর্মনিরপেক্ষ জোট তৈরির জন্যে সক্রিয় থেকেছে। এমনকী ভূমিকা নিয়েছে ইন্ডিয়া-মঞ্চের মত সংগঠন গড়ে তোলায়ও, যেখানে রয়েছে তৃণমূলের মত সিপিআই(এম)-এর বিরুদ্ধশক্তি এবং ফরোয়ার্ড ব্লক, সিপিআই ও সিপিআই (এম এল)-লিবারেশনের মত সহযোগীরাও। এর পূর্বদৃষ্টান্ত ছিল ২০১৯ সালে উত্তর ভারতে পুরোনো লোহিয়াপন্থীদের বিভিন্ন অংশকে এক ছাতার তলায় নিয়ে এসে মহাগাটবন্ধন। কিন্তু সেটা প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়। অভিজ্ঞতাই দেখাচ্ছে যে বিজেপিকে দুর্বল ও পরাভূত করার লক্ষ্যে কৌশলগত জোটগঠনে সিপিআই(এম) কখনোই বিমুখ নয়। কিন্তু ইন্ডিয়া মঞ্চের দুর্বলতাটি হচ্ছে যে এর শরিকদের কোনও অভিন্ন কর্মসূচি নেই, যা দিয়ে বিজেপির অপশাসনের বিরুদ্ধে একটি সত্যিকারের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক বিকল্প তুলে ধরা বা ভবিষ্যৎ ভারতের একটি আদর্শ প্রতিকল্প হাজির করা যায়। বিজেপি বিরোধিতাই তাদের রাজনীতির একমাত্র বক্তব্য, যা দিয়ে হয়ত একটি জোট তৈরি হতে পারে, কিন্তু যখনই ভারতের জনগনের স্বার্থে সত্যিকার অর্থে বিকল্প পথ তৈরির প্রশ্ন আসে, তখনই আর জোট অটুট থাকে না। ফলে ভোটদাতাদের মধ্যেও এই ভরসা জাগে না যে বিজেপি বিরোধিতার প্রশ্নে তৈরি এই জোটের সরকার চালানোর কোনও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি আছে।
ফ্যাসিবাদ, নয়া ফ্যাসিবাদ
ব্রাজিল থেকে ফিলিপাইনস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে রোয়ান্ডা– একই ঘটনা ঘটে চলেছে। মানুষকে খণ্ডবিখণ্ড করা এবং সমাজকে হতদরিদ্র করে দেওয়ার পুঁজিবাদের শক্তি সারা বিশ্বজুড়ে এক নৈতিক অধঃপতনের ঢেউ এনেছে। মানুষ নিঃসঙ্গ ও ভীত। জীবিকার সংস্থান বা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কোনওটিই সহজসাধ্য নয়। আশার দেখা নেই। থাকলেও সেটা পরজনমের আশা, যা তাঁরা হয়ত ভাবে এই জন্মের মতো নিষ্ঠুর হবে না। এই নিঃসঙ্গতা জন্ম নেয় দুর্বিষহ কাজের পরিবেশ এবং দীর্ঘ কর্মপ্রহর থেকে, যা একটি প্রাণবন্ত গোষ্ঠীবদ্ধতা ও সমাজ গঠনের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে দেয়। উন্নত পুঁজিবাদী সমাজের পরতে পরতে যে নিঃসঙ্গতার বুনন আছে, তার একটা উপশম দেয় নয়া ফ্যাসিবাদ। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাথে পরজীবীর মত সম্পর্কটুকু ছাড়া নয়া ফ্যাসিবাদ কোনও প্রকৃত গোষ্ঠীবদ্ধতা তৈরি করে না। বিপরীতে, নয়া ফ্যাসিবাদ গোষ্ঠীবদ্ধতার ধারণাটি তৈরি করে আন্তঃজাল বা ব্যক্তিসমূহের গণজমায়েত, বা অভিন্ন প্রতীক বা অঙ্গভঙ্গি ব্যবহারের মাধ্যমে। গোষ্ঠীবদ্ধতা গঠনের যে সুতীব্র খিদে তার অনেকটাই আপাতদৃষ্টিতে সমাধান করে দেয় নয়া ফ্যাসিবাদ, যদিও নিঃসঙ্গতার নির্যাসটুকু ভালোবাসায় না মিশে আক্রোশে জ্বলে ওঠে।
বিশেষ ধরনের উগ্র দক্ষিণপন্থা নয়া ফ্যাসিবাদকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে বাস্তব সমস্যার একটি মেকি সমাধান দেয়। কিন্তু কোনও না কোনও ভাবে যেহেতু একটি সমাধান দৃশ্যমান হয়, ফলে প্রচুর অনুগামী আকর্ষিতও করে ফেলে। এই ক্ষেত্রেই বামপন্থীদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় হস্তক্ষেপটুকু করতে হবে। বামপন্থীদের কর্তব্যটি পরস্পর সম্পর্কিত। এক, নিজেদের সাংগঠনিক দৃষ্টি থেকে স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি যখন তাদের শক্তির ভাণ্ডারগুলি দুর্বল হয়ে পড়েছে (যেমন ট্রেড ইউনিয়ন)। এবং দুই, গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের পুনরুদ্ধার (জনসম্প্রদায় ভিত্তিক সংগঠন, সমবায় সমিতি, গণগ্রন্থাগার, রেডবুক দিবস ইত্যাদির মাধ্যমে)। বিশেষ ধরনের উগ্র দক্ষিণপন্থার গণভিত্তি রয়েছে এবং সর্বত্র এদের সাংস্কৃতিক শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে আছে। সোশ্যাল ডেমোক্রেসি-র বিলুপ্তির অর্থ হল, শুধুমাত্র বামপন্থীদের নিজেদের শক্তি-ভাণ্ডার বা গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন গড়ে তোলায় কেন্দ্রীভূত না হয়ে (যদিও অতিমানবের মত শক্তিধর হয়েই বামপন্থীরা শ্রমিক ও কৃষক সংগঠন গড়ে তোলা, ছাত্র আন্দোলন, গ্রন্থাগার আন্দোলন ও আরো নানা কিছুতে বামপন্থীরা নিজেদের নিয়োজিত রেখেইছে) সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের পরিত্যক্ত কর্তব্য সম্পন্নে এগিয়ে আসা (মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ নিযুক্তি নিশ্চয়তা যোজনার মত জীবনদায়ী প্রকল্প যার জন্যে সমাজ গণতন্ত্রীদের লড়ার কথা ছিল, সেই সংস্কার প্রকল্পগুলির জন্যে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া)।
ফ্যাসিবাদ নিয়ে তর্কাতর্কির সমস্যাটা হল এই যে, এর ফলে একটি জরুরি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক একটি নৈতিক বিতর্কের চেহারা নিয়ে ফেলেছে। নৈতিক দিক থেকে ফ্যাসিবাদের ভর্ৎসনার অর্থটা কী? এর দ্বারা কি স্বযাচিত ফ্যাসিবাদী লোকজনের ভর্ৎসনা হয়? নাকি যারা সাধারণভাবে উত্তরহীন প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে বেরায় তাদের দানবীকরণ করে? এই মুহূর্তের রাজনীতি প্রত্যাশা করে এই উপলব্ধির: কীভাবে ফ্যাসিবাদী শক্তির আধিপত্য ভেঙে দেওয়া যায়, কী করে নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তি ও উগ্র দক্ষিণপন্থার খপ্পর থেকে যারা তাদেরকে গণভিত্তি জোগায় তাদেরকে বের করে আনা যায়। ওই গণভিত্তিকে কালিমালিপ্ত করে লাভ হবে না। তাতে হয়ত ভর্ৎসনাকারীর একটু উচ্চমন্যতা প্রাপ্তি হবে, কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু সাধিত হবে না। নিন্দাবাদ, নৈতিক অবস্থান থেকে ক্রোধপ্রকাশ– এগুলো বু্র্জোয়াদের কর্মপদ্ধতি। বামপন্থীদের নয়। বামপন্থীদের বিকল্প তৈরি করতে হবে। সেই মানুষগুলির কাছে পৌঁছে গোষ্ঠীবদ্ধতা তৈরি করতে হবে, যারা ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছে এবং শহরে-গ্রামে সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে হবে। ফ্যাসিবাদ বিরোধিতার অবশ্যই একটি নৈতিক চরিত্র থাকবে। কিন্তু তাকে নৈতিক ভাষণবাজী দিয়ে সংজ্ঞায়িত করলে হবে না। এর জন্যে প্রয়োজন রাজনৈতিক বিচারবোধ। নৈতিক অনলবর্ষণ একটি ভাবালুতা মাত্র, বামপন্থী আচরণ হতে পারে না।
রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াই
ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা কি ফ্যাসিবাদী? সিপিআই(এম) এটা সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছে, বিজেপি ও তাদের জোটের মধ্যে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার শক্তির উপস্থিতি থাকলেও বিজেপি সরকার একটি ফ্যাসিবাদী সরকার নয়। ভারতীয় রাষ্ট্রও ফ্যাসিবাদী হয়ে যায়নি। অন্যভাবে বললে, এখনও রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিসর রয়েছে। এবং সেটা শুধু নির্বাচন বা আদালত নয়। বরং রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্নভাবে লড়াইয়ের মাধ্যমে। নির্বাচন ও বিচারবিভাগে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। যেমন নির্বাচনে পুঁজিপতিদের বিপুল টাকার ভূমিকা এবং বিচারবিভাগে ঔপনিবেশিক আইনী কাঠামোর অব্যাহত থাকা।
‘নয়া ফ্যাসিবাদ’ অভিধাটি ব্যবহার করা হয় উপরে বর্ণিত পরিবর্তনগুলির বৈশ্বিক চরিত্র উপলব্ধি করার জন্যে। যেমন ব্রাজিলের নতুন ধরনের উগ্র দক্ষিণপন্থা (বোলসোনারিওপন্থা) এবং স্পেনের উগ্র দক্ষিণপন্থা ভক্সের (এক্সট্রিমা ডেরেচা) মধ্যেকার যোগসূত্রের ধরন। নিশ্চিতভাবেই, উদারনৈতিকতা ও সোশ্যাল ডেমোক্রেসি-র নয়া উদারবাদী ব্যয়সংকোচনের নীতিতে অধঃপতিত হওয়াটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রের দেশগুলিতে রাজনৈতিক পরিসরকে বিবস্ত্র করে দিয়েছে। নয়া উদারবাদের ফলাফলে সমাজে যে বিপুল ভাঙন দেখা দিয়েছে তার বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির প্রতিরোধ গড়ে তোলা সীমিত শক্তির বামপন্থীদের দ্বারা সম্ভব নয়। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের ফসল তুলেছে বিশেষ ধরনের উগ্র দক্ষিণপন্থা। অর্থনীতির প্রশ্নে আস্থা অক্ষুন্ন রেখেও শুধুমাত্র নয়া উদারবাদের বাহ্যিক ঐক্যমত্যের কিছু কিছু দিকের বিরোধিতা করে। ঠিক এই জায়গাতেই মোদীর সাথে বোলসোনারো এবং ট্রাম্পের যোগসূত্র গাঁথা হয়ে যায়। আর এই কারণেই এই অভিধাটি সামনে এসেছে।
বামপন্থীদের সামনে দু’টি বিষয় গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই। এক, পুঁজির গণতন্ত্রের পরিবর্তে জনগণতন্ত্র তৈরির লড়াইয়ের জন্যে শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষক সমাজের মধ্যে স্বাধীন শক্তি গড়ে তোলা। দুই, তারই সঙ্গে সমাজের এই ভাঙনে ক্ষুব্ধ যে শক্তিগুলি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে দায়বদ্ধ তাদের সঙ্গে নীতি-ভিত্তিক ঐক্য গড়ে তোলা।
বিজয় প্রসাদ, ট্রাইকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিট্যুট ফর সোস্যাল রিসার্চের অধিকর্তা ভাষান্তর: শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার
প্রকাশের তারিখ: ১৬-মার্চ-২০২৫ |