|
নগরদুর্গে বিজয়োল্লাসপ্রভাত পট্টনায়েক |
লিজ ট্রাসের বদলে ঋষি সুনককে কেন বেছে নিল সিটি বা ফিনান্সের গড় নির্দেশিত প্রক্রিয়া? ঋষি সমাজের কোন অংশ থেকে উঠে এসেছেন, তিনি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার কিনা, হেজ ফান্ড ম্যানেজার কিনা বা লক্ষকোটিপিত কিনা, দুর্গের পাহারাদারদের পছন্দের জন্য এগুলোই যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ঋষির অ্যাজেন্ডাগুলি কী কী। |
লিভারপুল স্ট্রিট স্টেশনের লাগোয়া এক বর্গকিলোমিটার এলাকাই হল ব্রিটিশ ফিনান্সের দুর্গ বা গড়। সেটাই আদত সিটি অফ লন্ডন। সেই সিটি অফ লন্ডনের সাফল্য এখন পরিপূর্ণ। ব্রিটেনের যে প্রধানমন্ত্রীকে এই দুর্গের অধিপতিরা অবিশ্বাস করতেন, সেই মহিলার হাত থেকে মাত্র ৪৪ দিনের মধ্যে তাঁরা নিষ্কৃতি পেয়েছেন। শুধু তাই নয়। এমনকি ব্রিটিশ ফিনান্সের নগরদুর্গে তাঁদের পছন্দের একজন প্রধানমন্ত্রীকে তৎক্ষণাৎ ক্ষমতার গদিতে বসিয়েও ফেলেছেন। ঋষি সুনককে এখন নানা নামে ডাকা হচ্ছে: প্রথম ব্রিটিশ এশীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রথম হিন্দু প্রধানমন্ত্রী এবং এই ধরনের আরও নানা নাম দেওয়া হচ্ছে তাঁর। ঋষি সম্পর্কে এধরনের তথ্যগুলো নেহাৎই অকিঞ্চিৎকর। ভারতে তাঁর নিয়োগ নিয়ে যতই হইচই করা হোক না কেন, ঋষির বিষয়ে এখানে আলোচিত তথ্যগুলি একেবারেই তুচ্ছ। তাঁর সম্পর্কে আসল কথাটা হল, তিনি সিটি অফ লন্ডনের পছন্দের, মানে তিনি ব্রিটিশ ফিনান্সের দুর্গের অধিপতিদের পছন্দের লোক। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর প্রাক্তন কর্মী, প্রাক্তন হেজ ফান্ড ম্যানেজার ঋষি, আসলে ফিনান্সের জগতেরই লোক। সিটি অফ লন্ডন বা ফিনান্সের দুর্গাধিপতিদের কাছে সংশয়াতীত ভাবেই তিনি ‘আমাদেরই একজন’।
কনজারভেটিভ দলের কার্যপ্রণালী বেশ রহস্যজনক। এই রহস্যে ঢাকা ব্যাপার–স্যাপারগুলোই হল সিটি বা দুর্গের নিখুঁত হাতিয়ার। যার সাহায্যে ব্রিটিশ রাজনীতি কোন্ পথে চলবে তার নির্দেশ দেওয়া হয়। মার্গারেট থ্যাচারকে তাঁর নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েই প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছিল এই সিটি কিংবা ফিনান্সের দুর্গের অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে। তখন তিনি যে আক্ষেপ করেছিলেন সেটাই তাঁকে বিখ্যাত করে তুলেছিল। থ্যাচার বলেছিলেন, “আমি কখনও সাধারণ নির্বাচনে হারিনি। হাউজ অফ কমন্সে কখনও আস্থা ভোটে হারিনি। কনজারভেটিভ দলে কখনও সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন হারাইনি। এবং তবুও আমাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়তে হল।” একই মনোভাব ব্যক্ত করতে পারেন লিজ ট্রাস। বস্তুত তিনি একদিন বলেই ফেলেছিলেন, “আমি লড়াকু, পালিয়ে যাওয়ার লোক নই।” এবং একথা বলার ঠিক পরদিনই কোনও এক রহস্যময় ক্রিয়াকলাপের কল্যাণে তাঁকে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়। কনজারভেটিভ দলে একটা আবছা, ঠিক যেন মাটির নীচের সুড়ঙ্গে গোপন একটা কমিটি আছে। তার নাম The 1922 Committee। কাকে প্রধানমন্ত্রী বাছা হবে এবং সেই পদে কে কতদিন টিকে থাকবেন সে বিষয়ে এই কমিটির বেশ একটা নির্ধারক মতামত রয়েছে। সিটি বা ফিনান্সের দুর্গের সঙ্গে যোগাযোগ আছে শুধুমাত্র এমন সব মন্ত্রী বা তাঁদের কর্মচারীদের মাধ্যমেই নয় কিংবা অবসরের পর যাঁদের দুর্গের লোভনীয় চাকরিগুলোতে বহাল হওয়ার উচ্চাকাঙ্খা রয়েছে, তাঁদের মাধ্যমেও শুধু নয়, দুর্গের অধিপতিরা কলকাঠি নাড়ে সেই সব পিছনের বেঞ্চের লোকজনদের মাধ্যমেও, যারা The 1922 Committee–র মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয়। সিটি বা দুর্গের ফিনান্সিয়াল অভিজাততন্ত্র মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং জনমত কোনদিকে ঘোরাতে হবে সেকাজে মিডিয়ার ওপর যথেষ্টই ভরসা করা যায়। আসলে কার্যকর অস্তিত্ব রয়েছে সিটি বা দুর্গ নির্দেশিত একটা অদৃশ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার। যে আনুষ্ঠানিক জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আমরা প্রকাশ্যে দেখতে পাই, অদৃশ্য প্রক্রিয়াটি চলে ঠিক তার সমান্তরাল গতিতে এবং অদৃশ্যই প্রকাশ্যের ওপর আধিপত্য করে। সেই অদৃশ্য প্রক্রিয়াটি প্রকাশ্য প্রক্রিয়াটিকে তার নিজের ছাঁচে বদলে ফেলতে ফেলতে এগোয়। লিজ ট্রাসের বদলে ঋষি সুনককে কেন বেছে নিল সিটি বা ফিনান্সের গড় নির্দেশিত প্রক্রিয়া? ঋষি সমাজের কোন অংশ থেকে উঠে এসেছেন, তিনি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার কিনা, হেজ ফান্ড ম্যানেজার কিনা বা লক্ষকোটিপতি কিনা— দুর্গের পাহারাদারদের পছন্দের জন্য এগুলোই যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ঋষির অ্যাজেন্ডাগুলি কী কী। লিজ ট্রাস পুঁজিপতিদের কর–ছাড়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই কর ছাড়ের ফলে রাজস্ব আদায় যেটুকু কমত ট্রাস বলেছিলেন তা তিনি রাজকোষ ঘাটতি বাড়িয়ে পুষিয়ে দেবেন। সুনকও কর–ছাড়ের তোফা দেবেন (কিংবা এই জাতীয় অন্য কোনও ছাড়), কিন্তু এর পিঠোপিঠি কোথাও কোথাও আবার সরকারি ব্যয়বরাদ্দও ছাঁটাই করবেন (কিংবা শ্রমিকদের ওপর কর চাপাবেন, যদিও এই মুহূর্তে সেটা কোনও সম্ভাব্য বা কার্যকর বিকল্প নয়।) এবং এভাবে রাজকোষ ঘাটতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। কিন্তু যে কেউ এই প্রশ্নটা করতেই পারেন যে, কেন রাজকোষ ঘাটতি বৃদ্ধি–সহ কর-ছাড়ের বদলে সিটির কর্তারা রাজকোষ ঘাটতি বৃদ্ধি ব্যতিরেকেই কর-ছাড় বেশি পছন্দ করেন? এই প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তরটা হবে যে, ফিনান্স পুঁজি সর্বদাই রাজকোষ ঘাটতির বিরোধিতা করে এসেছে। এবং তা মোটেই ভুল উত্তর নয়। যে কারণে আর্থিক বিশ্বায়নের (ফিনান্সিয়াল গ্লোবালাইজেসন) যুগে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (জিডিপি-তে) রাজকোষ ঘাটতির শতাংশ কতটা হবে, আইন করে তার সীমা বেঁধে দিয়েছে। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এবিষয়ে তাদের সুবিধাজনক অবস্থানটা একেবারেই অনন্য। রাজকোষ ঘাটতির সীমা ছাড়ানো চলবে না, এমন চাপ বিশেষভাবে জোরদার হয় মুদ্রাস্ফীতির পরিস্থিতিতে এবং ব্রিটেনের এখনকার পরিস্থিতি ঠিক সেরকমই। অন্যভাবে বললে, মুদ্রাস্ফীতির পর্বে যদি রাজকোষ ঘাটতি বৃদ্ধি পায় তাহলে মোট চাহিদা (এগ্রিগেট ডিমান্ড) বেড়ে যায় এবং তার জেরে কর্মসংস্থানও বাড়ে। কর্মসংস্থান বাড়লে মজুরির প্রশ্ন ঘিরে শ্রমিকদের প্রতিরোধও শক্তিশালী হয়। এবং মজুরি বাড়লে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মুদ্রাস্ফীতির একেবারে সসেমিরা দশা তৈরি হয়। সেকারণেই ফিনান্স পুঁজি আর্থিক সম্পদের প্রকৃত মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কায়, মুদ্রাস্ফীতির পর্বে বিশেষভাবে রাজকোষ ঘাটতির তীব্র বিরোধী। কিন্তু রাজকোষ ঘাটতি বৃদ্ধি করাই তো কর–পরবর্তী মুনাফা আরও বাড়ানোর সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়। তাহলে রাজকোষ ঘাটতির বৃদ্ধির যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় কেন? এই যুক্তি কি রাজকোষ ঘাটতি না বাড়ানোর পাল্টা যুক্তিকে খারিজ করে দেয় না? আমরা আগেই দেখেছি (পিপলস ডেমোক্রেসির ২৪–৩০ অক্টোবর সংখ্যায়), এখানে বিষয়টাকে সহজ করে বোঝার জন্য বিদেশি লেনদেন এবং শ্রমিকদের সঞ্চয় বাদ দেওয়া হচ্ছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে কর–পরবর্তী মুনাফার পরিমাণ, অবশ্যই পুঁজিপতিদের ভোগ, তাদের বিনিয়োগ এবং রাজকোষ ঘাটতির যোগফলের সমান হতে হবে। যেহেতু বিনিয়োগ ও পুঁজিপতিদের ভোগের আশু প্রভাব চলতি মুনাফায় (current profit) পড়ে না (এবং সেকারণে যে কোনও নির্দিষ্ট পর্বে পুঁজিপতির বিনিয়োগ ও ভোগকে আগাম স্থিরীকৃত পরিমাণে ধরে নেওয়া যায়।), সেহেতু মুদ্রাস্ফীতির পর্বে কর–পরবর্তী মুনাফা কখনই বাড়বে না, তা সে যতই বেশি কর-ছাড় পুঁজিপতিকে দেওয়া হোক না কেন। এক্ষেত্রের কর–পরবর্তী মুনাফা বৃদ্ধির একমাত্র পথ হল এই কর-ছাড়ের পরিমাণকে পুষিয়ে দিতে হবে আরও বৃহত্তর রাজকোষ ঘাটতির মাধ্যমে। অন্যভাবে বললে, পুঁজিপতিদের ব্যাপকহারে কর-ছাড় দেওয়া হলেও, যদি একইভাবে এই ছাড়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ভাবে সরকারি ব্যয় বরাদ্দ ছাঁটাই করা না হয়, তাহলে কর–পরবর্তী মুনাফা আদৌ বাড়বে না। তবে এই প্রতিপাদ্যটি মোট মুনাফার ক্ষেত্রে সত্যি। কর–পরবর্তী মুনাফা পুঁজিপতিদের মধ্যে কীভাবে বণ্টন করা হবে তার ছাঁদ বদলে যেতে পারে। এটা নির্ভর করবে কাদের এইসব করছাড় দেওয়া হচ্ছে এবং সরকারি ব্যয় বরাদ্দ ছাঁটাইয়ের কারণে কাদের কর–পূর্ববর্তী মুনাফা কমে যাচ্ছে তার ওপর। সাধারণত বড় পুঁজিপতিদেরই কর-ছাড় দেওয়াটাই রীতি। (যারা সর্বোচ্চ বন্ধনীর মধ্যে থাকা পুঁজিপতি, তাদেরই করের হার কমানো হয়।) ওদিকে সরকারি ব্যয়বরাদ্দে ছাঁটাই, কাজকর্ম কমিয়ে আনে এবং তার ফলে কমবেশি ছোটবড় সব পুঁজিপতির মুনাফাই কমে। এর সঙ্গে যদি রাজকোষ ঘাটতির পরিমাণ অপরিবর্তিত রাখা হয়, তাহলে এই দুই পদক্ষেপের নীট ফল হবে-- মোট মুনাফার যে কোনও নির্দিষ্ট পরিমাণের ভাগ–বাঁটোয়ারা, ছোট পুঁজিপতিদের দিক থেকে চলে যাবে বৃহৎ পুঁজিপতিদের অনুকূলে। সংক্ষেপে এর মানে হল, কর ছাড় দিলে তাতে অনিবার্যভাবেই বড় পুঁজিপতিদের মুনাফার আয়তন বাড়বে, তা সে সরকারি ব্যয়বরাদ্দ ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে পুষিয়ে দেওয়াই হোক কিংবা রাজকোষ ঘাটতির মারফতেই হোক। (দ্বিতীয় ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই রাজকোষ ঘাটতি আরও বাড়াতে হবে।) তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র রাজকোষ ঘাটতির মাধ্যমে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার বদলে ফিনান্স পুঁজি, যুগপৎ পুঁজিপতিদের জন্য কর ছাড়ের কর্মসূচি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয়বরাদ্দ ছাঁটাইয়ের পন্থাই বেশি পছন্দ করে। এই পছন্দের কারণ তিনটি। প্রথমত, দ্বিতীয় পন্থার ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবেই বেকারত্ব বাড়ে। প্রথম পন্থা অবলম্বন করলে বেকারত্ব কমে। এটা হয়, কারণ সরকারি ব্যয়বরাদ্দ ১০০ টাকা ছাঁটাই করলে সঙ্গে সঙ্গে মোট চাহিদা ১০০ টাকা কমে যায়। অন্যদিকে যদি পুঁজিপতিদের শুধু কর-ছাড় দেওয়া হয় তাহলে মোট চাহিদা অনেক কম পরিমাণে হলেও বেড়ে যেতে পারে, কারণ এই ধরনের সুবিধা দিলে সঞ্চয় বাড়ে। (বস্তুত, মুদ্রাস্ফীতির পর্বে যদি পুঁজিপতিদের ভোগ ও বিনিয়োগ দুটোই ধরা হয়, তাহলে এধরনের কর-ছাড়ের কারণে মোট চাহিদার বৃদ্ধি হবে শূন্য।) সুতরাং, মোট চাহিদায় নীট সংকোচন হবে এবং তার ফলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানও কমবে। এবং একমাত্র আরও বেকারত্ব সৃষ্টি করেই, পুঁজিবাদী অর্থনীতি অনিবার্যভাবে মুদ্রাস্ফীতির মোকাবিলা করে। তাই কর-ছাড়ের চেয়ে ফিনান্স পুঁজির পছন্দ হল সরকারি ব্যয় বরাদ্দ ছাঁটাই। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতির পর্বে এটাই তাদের পছন্দ। দ্বিতীয়ত, সরকারি বরাদ্দে কাটছাঁট করে যখন পুঁজিপতিদের কর-ছাড়ের খরচ জোটানোর ব্যবস্থা করা হয় এবং সেকারণে যখন এমনকী মোট কর–পরবর্তী মুনাফা অপরিবর্তিত থাকে, আমরা দেখেছি তখনও বৃহৎ পুঁজিপতি কিংবা ফিনান্স অভিজাততন্ত্রের কর–পরবর্তী মুনাফা বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, এই দুটি বিষয়কে বিবেচনার ভিত্তিতে, অর্থাৎ বৃহত্তর পরিমাণে বেকারত্ব এবং ফিনান্স অভিজাততন্ত্রের বৃহত্তর কর–পরবর্তী মুনাফা, বিশ্বের অন্য প্রান্তের ফিনান্সকে আকর্ষণ করে টেনে আনে এবং এর জেরে সব মিলিয়ে ওই দেশের মধ্যে ফিনান্সের মোট ব্যবসা বেড়েই চলে। ঋষি সুনক এখনও তাঁর মোট পলিসি প্যাকেজ ঘোষণা করেননি। ফিসক্যাল বিষয়ে যথার্থ আচরণে তিনি নিশ্চিতভাবেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি কতদূর কর-ছাড় দিতে চলেছেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। যদিও পুঁজিপতিদের কিছু ছাড় দিতে তিনি বাধ্য। কারণ এই ব্যবস্থার পুরাণে বলে, এই ধরনের ছাড় পুঁজিপতিদের দিলে তবেই অর্থনীতির বৃদ্ধি হবে। এর মানে সুনকের কর্মসূচি থেকে সম্ভবত লাভ হবে ফিনান্স অভিজাততন্ত্রের এবং এর পাশাপাশি বেকারত্ব বাড়বে। এই দুটো পদক্ষেপেই সিটি অফ লন্ডন বা ব্রিটেনের অর্থব্যবস্থার দুর্গের অধিপতিদের পছন্দ। ব্রিটেনের শ্রমিকশ্রেণির পক্ষে লিজ ট্রাসের চেয়েও জঘন্য প্রধানমন্ত্রী হবেন সুনক। যে কারণে তিনি সিটি অফ লন্ডন কিংবা ব্রিটিশ ফিনান্স পুঁজির দুর্গের কাছে আকর্ষণীয় এবং সেই একই কারণে তিনি শ্রমিকশ্রেণির কাছে হবেন জঘন্যতর। কেউ ধরে নিতেই পারেন যে, সুনকের অ্যাজেন্ডা হল মুদ্রাস্ফীতি বিরোধী। এবং যেহেতু মুদ্রাস্ফীতি ব্রিটেনের শ্রমিকশ্রেণিকে ক্ষতবিক্ষত করছে, তাই বুঝি সুনকের মুদ্রাস্ফীতি বিরোধী অ্যাজেন্ডা শ্রমিকশ্রেণির বিরোধী নয়। কিন্তু এখানে যে বিষয়টা নজর এড়িয়ে যাচ্ছে তা হল, তিনি মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান শ্রমিক শ্রেণিকে বলি দিয়ে। পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় মজুরি কমিয়ে। এর ফলে দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হন শ্রমিক। কিন্তু ফিনান্সের দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে এভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সুবিধা রয়েছে। এতে ফিনান্সিয়াল বা আর্থিক সম্পদের প্রকৃত মূল্য হ্রাসকে আটকানো সম্ভব। সরকারি ব্যয়বরাদ্দ ছাঁটাই করা হলে, আমরা জোর দিয়েই দেখিয়েছি যে, তাতে বেকারত্ব বাড়বে। শুধু তাই নয়, এতে ব্রিটেনের সরকারি পরিষেবার দফারফা হবে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেসব জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল সেগুলি বহু পরিমাণে তুলে দেওয়া হবে। যথেষ্ট অর্থ না থাকায় ব্রিটেনের সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ইতিমধ্যেই টলোমলো দশা। এর ওপর বরাদ্দ যদি আরও কমানো হয় তাহলে এই সব পরিষেবা মৃত্যুমুখে পড়বে। প্রশ্ন হল, সুনক সরকারকে এমন একটা অ্যাজেন্ডা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি কি দেবে ব্রিটেনের শ্রমিকশ্রেণি? পিপলস ডেমোক্রেসি, ৩১ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর, ২০২২
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস প্রকাশের তারিখ: ১৫-নভেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |