|
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিক-পরিবর্তনকারী মুহূর্তমাও সে তুং |
অন্যদিকে হিটলারের দফারফা হয়ে যাচ্ছে দেখে ইতালী, রুমানিয়া ও হাঙ্গেরী হতাশ হয়ে পড়বে এবং তার থেকে বেশি বেশি করে দূরে সরে যাবে। এক কথায়, ৯ই অক্টোবরের পর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার একমাত্র একটি পথই হিটলারের সামনে খোলা থাকছে। এই আটচল্লিশটি দিন ধরে স্তালিনগ্রাদে লালফৌজের প্রতিরোধের সঙ্গে গত বছরের মস্কোর প্রতিরোধের কিছু মিল রয়েছে। অর্থাৎ বলা যায়, হিটলারের এই বছরের পরিকল্পনা ঠিক গত বছরের তার পরিকল্পনার মতোই একেবারে ভণ্ডুল হয়ে গেছে। |
স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধকে ব্রিটিশ ও আমেরিকান সংবাদপত্র ভের্দু-র যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছে এবং 'লাল ভের্দু' এখন বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত। এই তুলনাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ভের্দুর যুদ্ধের চেয়ে প্রকৃতির দিক থেকে ভিন্ন রকমের। কিন্তু এই দুটির মধ্যে মিল হচ্ছে এই যে এখন যেমন, তখনো, তেমনই, জার্মান আক্রমণ অভিযান দেখে বহু মানুষ এই ভুল ধারণা করেছিলেন যে জার্মানির পক্ষে তখনো যুদ্ধে চূড়ান্ত জয়লাভ করা সম্ভব। ১৯১৬ সালে জার্মান সেনাবাহিনী ভের্দু'র ফরাসী দূর্গের ওপর বেশ কয়েকটি আক্রমণ অভিযান চালায়, ১৯১৮ সালের শীতকালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার দুবছর আগের ঘটনা এটি। ভের্দুতে প্রধান সেনাপতি ছিলেন জার্মান যুবরাজ স্বয়ং এবং এই যুদ্ধে জার্মান সেনাবাহিনীর বাছাই করা সেরা সৈন্যদের নিয়োগ করা হয়েছিল। যুদ্ধটি ছিল নির্ধারক গুরুত্বসম্পন্ন। জার্মানদের হিংস্র আক্রমণগুলি ব্যার্থ হবার পর, সমগ্র জার্মান-অস্ট্রিয়ান-তুর্কী-বুলগেরীয় জোটের আর কোন ভবিষ্যৎ ছিল না এবং তার পর থেকে তার অসুবিধাগুলি বেড়ে যেতে শুরু করে, অনুগামীরা তাদের পরিত্যাগ করতে শুরু করে, তার ভাঙন শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের চরম পরাজয় ঘটে। কিন্তু ঐ সময়ে ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসী জোট এই পরিস্থিতির তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেনি, তারা এই বিশ্বাসই করছিল যে জার্মান বাহিনী তখনো খুবই শক্তিশালী এবং তারা তাদের আসন্ন বিজয় সম্পর্কে সচেতন ছিল না। ঐতিহাসিকভাবে বলতে গেলে, বিলুপ্তির উপান্তে এসে সকল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলিই অপরিহার্যভাবে বিপ্লবী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে মরীয়া হয়ে শেষ চরম সংগ্রাম শুরু করে দেয় এবং কিছু কিছু বিপ্লবীও কিছু সময়ের জন্য এই বাহ্যিক শক্তির প্রকাশ দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন এবং শত্রুর অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কথা বুঝতে না পেরে এই মূল সত্যটিই তাঁরা ধরতে পারেন না যে শত্রু নিশ্চিহ্ন হওয়ার সন্নিকটবর্তী হচ্ছে এবং তাঁরাই বিজয়ের দিকে এগিয়ে চলেছেন। ফ্যাসিবাদের শক্তিগুলির উত্থান এবং বেশ ক'বছর ধরে যে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ তারা চালাচ্ছে তা ঠিক এই মরীয়া হয়ে পরিচালিত শেষ সংগ্রামেরই প্রকাশ। বর্তমান এই যুদ্ধে স্তালিনগ্রাদের ওপর আক্রমণই ছিল ফ্যাসিবাদের শেষ মরীয়া আক্রমণের প্রকাশ। ইতিহাসের দিক-পরিবর্তনসূচক এই মুহূর্তেও দুনিয়ার ফ্যাসি বিরোধী ফ্রন্টের বহু লোক ফ্যাসিবাদের হিংস্র চেহারা দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন এবং তার মূল সত্যটিই ধরতে পারেননি, ব্যর্থ হয়েছেন। আটচল্লিশটি দিন ধরে ওখানে চলে আসছে অভূতপূর্ব তীব্র তিক্ত এক সংগ্রাম, মানুষের ইতিহাসে যার কোন তুলনা মেলে না-২৩শে আগস্ট যখন গোটা জার্মান সৈন্য বাহিনী ডন নদীর বাঁকটি অতিক্রম করে স্তালিনগ্রাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু করে সেইদিন থেকে ১৫ই সেপ্টেম্বর যখন কিছু কিছু জার্মান বাহিনী নগরটির উত্তর-পশ্চিম শিল্পাঞ্চলের জেলাটির মধ্যে ঢুকে পড়ল তখন এবং ৯ই অক্টোবর যখন সোভিয়েত তথ্য দপ্তর ঘোষণা করল যে লালফৌজ ঐ জেলাতে জার্মান অবরোধ্যগহকে ভেদ করে ফেলেছে ঐ দিনটি পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলেছে। শেষ পর্যন্ত, সোভিয়েত বাহিনীই এই যুদ্ধে জয়লাভ করে। এই আটচল্লিশ দিন ধরে ঐ নগরী থেকে প্রতিটি পশ্চাদপসরণ অথবা বিজয়ের সংবাদ অসংখ্য কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে তোলপাড় করেছে, কখনো হয়তো আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন করে তুলেছে আবার কখনো আনন্দে উদ্বেল করে তুলেছে। এই যুদ্ধ শুধু সোভিয়েত-জার্মান যুদ্ধের বা শুধু ফ্যাসি-বিরোধী বিশ্বযুদ্ধের দিক পরিবর্তনসূচক মূহূর্তই নয়, তা সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসেরই দিক-পরিবর্তনকারী মুহূর্ত। এই আটচল্লিশটি দিন ধরে, বিশ্বের জনগণ গত অক্টোবরে মস্কোর দিকে যে উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি উদ্বেগ নিয়ে স্তালিনগ্রাদের দিকে তাঁরা তাকিয়েছিলেন। পশ্চিমী ফ্রন্টে জয়লাভের পূর্ব পর্যন্ত হিটলার অনেকটা সাবধান ছিল। যখন সে পোল্যান্ড আক্রমণ করে, যখন নরওয়ে আক্রমণ করে, হল্যান্ড, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স আক্রমণ করে, যখন বলকান আক্রমণ করে তখন সে এক সময়ে একই লক্ষ্যে নিজের শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে রাখে, তার মনোযোগকে বিক্ষিপ্ত করতে সাহস করেনি; পশ্চিম রণাঙ্গনে জয়লাভের পর সাফল্যে তার মাথা ঘুরে গেল এবং তিন মাসের মধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করে ফেলার সে চেষ্টা করে। এই বিশাল ও শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক দেশের বিরুদ্ধে উত্তরে মুরমান্স্ক থেকে দক্ষিণে ক্রিমিয়া পর্যন্ত সমগ্র রণাঙ্গন জুড়ে আক্রমণ শুরু করে এবং এভাবে তার বাহিনীকে বিক্ষিপ্ত করে ফেলে। গত অক্টোবরে তার মস্কো অভিযানের ব্যর্থতা সোভিয়েত-জার্মান যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটায় এবং হিটলারের প্রথম যুদ্ধ-পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। লালফৌজ গত বছর জার্মান আক্রমণকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এবং শীতকালে সকল রণাঙ্গনেই তা পাল্টা আক্রমণ শুরু করল; তা হচ্ছে সোভিয়েত-জার্মান যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়; হিটলারের পশ্চাদপসরণের এবং রক্ষণাত্মক যুদ্ধের পর্যায়ের শুরু হল। এই সময়ে তার প্রধান সেনাপতি ব্রাউচিৎশকে বরখাস্ত করে দিয়ে ও নিজে সর্বময় সেনাপতিত্ব গ্রহণ করে হিটলার সিদ্ধান্ত নিল যে সর্বাত্মক আক্রমণ অভিযানের পরিকল্পনা সে পরিত্যাগ করবে এবং ইউরোপের সকল বাহিনীকে ঝেড়েমুছে এনে জড়ো করল চূড়ান্ত অভিযানের জন্য। শুধু দক্ষিণ রণাঙ্গনেই তাকে কেন্দ্রীভূত করে সে ভাবল এতে করে সোভিয়েত ইউনিয়নের একেবারে মূলে আঘাত হানা যাবে। যেহেতু প্রকৃতির দিক থেকে তা ছিল চূড়ান্ত অভিযান, তার ওপর ফ্যাসিজমের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছিল। হিটলার তার সম্ভাব্য সকল শক্তিকে এনে কেন্দ্রীভূত করল, এমনকি উত্তর আফ্রিকার রণাঙ্গন থেকেও তার বিমান ও ট্যাঙ্কবহরের একটা অংশকে এনে এখানে জড়ো করল। এই বছরের মে মাসে কের্চ ও সেবাস্তপোলের ওপর জার্মান আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের তৃতীয় পর্যায় শুরু হল। পনের লক্ষ সৈন্যের এই বিশাল বাহিনী এবং তার বিমান ও ট্যাঙ্ক বহরের সাহায্যপুষ্ট হয়ে অভূতপূর্ব প্রচণ্ড বিক্রমে হিটলার স্তালিনগ্রাদ ও ককেশাসের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করল। প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে সে এই দুটি লক্ষ্য হাসিল করার প্রচেষ্টা করেছিল ভল্গা জলপথকে বিছিন্ন করে দেওয়া ও বাকু দখল করার জন্য। তারপর উত্তরে অভিযান চালিয়ে মস্কোর বিরুদ্ধে এগিয়ে যাওয়া এবং দক্ষিণে পারস্য উপসাগর ভেদ করে যাওয়া; আর একই সঙ্গে সে জাপানি ফ্যাসিষ্টদের নির্দেশ দিল স্তালিনগ্রাদের পতনের পর সাইবেরিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে তাদের সৈন্যবাহিনীকে মাঞ্চুরিয়াতে সমবেত করার জন্য। হিটলার এই নির্বোধ প্রত্যাশা করেছিল যে সে সোভিয়েত ইউনিয়নকে এমন দুর্বল করে ফেলতে পারবে যে তার পক্ষে সোভিয়েত রণক্ষেত্র থেকে মূল জার্মান বাহিনীকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে পশ্চিম রণাঙ্গনে ইঙ্গ-মার্কিন আক্রমণের মোকাবিলা করার জন্য এবং নিকট প্রাচ্যের সম্পদ কব্জা করে নেওয়ার ও জাপানীদের সঙ্গে মিলন সাধনের জন্য। একই সঙ্গে এর ফলে জাপানী সৈন্যরা উত্তরাঞ্চল থেকে মুক্ত হয়ে, পেছনের দিক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে পশ্চিমে যাবে চীনের বিরুদ্ধে এবং দক্ষিণে ব্রিটেন ও আমেরিকার বিরুদ্ধে। ঠিক এইভাবেই হিটলার ফ্যাসিষ্ট শিবিরের বিজয়ের হিসেব-নিকেশ করেছিল। কিন্তু এই পর্যায়ে অবস্থাটি কী রকম দাঁড়াল? হিটলার সোভিয়েতের এমন রণকৌশলের মুখে পড়ল যে তার ভবিষ্যতের দফারফা হয়ে গেল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এমন নীতি গ্রহণ করল যাতে করে শত্রুকে লোভ দেখিয়ে অনেকখানি গভীর পর্যন্ত এগিয়ে আসতে দিল এবং তারপর দৃঢ় প্রতিরোধ শুরু করল। পাঁচ মাসের যুদ্ধে জার্মান সৈন্যবাহিনী ককেশাসের তৈলক্ষেত্রে ঢুকতে বা স্তালিনগ্রাদ দখল করতে ব্যর্থ হয়েছে; যার ফলে হিটলারকে তার সৈন্যদলকে উচ্চ পর্বতের পাদদেশে এবং দুর্ভেদ্য একটি নগরীর বাইরে থামিয়ে রাখতে হল, এগোতে পারছে না, পেছোতেও পারছে না এরকম একটা অবস্থায় পড়ে অপরিমেয় ক্ষতি তাকে স্বীকার করতে হল এবং রীতিমত একটি গাড্ডায় সে পড়ে গেল। এর মাঝে অক্টোবর এসে গেছে, শীত আসছে; শীঘ্রই যুদ্ধের তৃতীয় পর্যায় শেষ হবে এবং শুরু হবে চতুর্থ পর্যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সামরিক পরিকল্পনার একটিও সফল হয়নি। গত বছরের গ্রীষ্মকালের তার ব্যর্থতার কথা মনে রাখলে দেখা যায় ঐ সময়ে তার শক্তিগুলি বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তাই হিটলার এবার দক্ষিণ রণাঙ্গনে তার শক্তি কেন্দ্রীভূত করেছিল। কিন্তু এবারও পূর্বদিকে ভল্গা জলপথ বিছিন্ন করা ও দক্ষিণে ককেশাস এক ঝটকায় দখল করার দ্বিবিধ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য – নিজের বাহিনীকে সে বিভক্ত করে ফেলল। এটা সে বুঝে উঠতে পারেনি যে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পুরণের মতো শক্তি তার নেই এবং তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার- ‘বহনের দণ্ডটির দুই প্রান্তই মজবুত না হলে বোঝাগুলি পিছলে পড়ে যাবে।’ সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যত সে যুদ্ধ করছে ততই তার শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্তালিনের প্রতিভাদীপ্ত সমরাভিযান পরিচালনার ফলে উদ্যোগ পুরোপুরি এসে গেছে তাঁদের হাতে এবং সর্বত্র হিটলারকে ধ্বংসের দিকে তা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। এই শীতের থেকে শুরু করে যুদ্ধের যে চতুর্থ পর্যায় শুরু হয়েছে তা হিটলারের আমন্ন পতনেরই সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। যুদ্ধের প্রথম ও তৃতীয় পর্যায়ে হিটলারের অবস্থার তুলনা করলে আমরা দেখতে পাব যে সে তার চূড়ান্ত পরাজয়ের দোরগোড়ায় এসে উপনীত হয়েছে। লালফৌজ স্তালিনগ্রাদ ও ককেশাস এই উভয় জায়গাতেই জার্মান আক্রমণ কার্যত স্তব্ধ করে দিয়েছে; স্তালিনগ্রাদ ও ককেশাসে তার আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর হিটলার এখন অবসন্ন হওয়ার সন্নিকটে এসে দাঁড়িয়েছে। এই বছরের ডিসেম্বর থেকে মে এই পুরো শীতকাল জুড়ে সে যে বাহিনী জড়ো করেছিল তা সবই নিঃশেষে কাজে লাগানো হয়ে গেছে। এক মাসের কম সময়ের মধ্যে সোভিয়েত-জার্মান রণাঙ্গনে শীত পড়ে যাবে এবং হিটলারকে দ্রুত রক্ষণাত্মক অবস্থায় পিছিয়ে যেতে হবে। ডন নদীর সমগ্র পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চল তার পক্ষে সবচেয়ে দুর্বল এলাকা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং লালফৌজ ওখানে প্রতিআক্রমণ শুরু করে দেবে। আসন্ন পরাজয়ের ভয়ে চালিত হয়ে হিটলার এই শীতে তার সৈন্যবাহিনীকে আরেকবার পুনর্গঠিত করবে। পূর্ব ও পশ্চিম এই উভয় রনাঙ্গনের বিপদের মোকাবিলা করার জন্য সে হয়তো তার বাহিনীর অবশেষটুকু জড়ো করে অস্ত্র সজ্জিত করবে এবং কয়েকটি নতুন ডিভিশন তৈরী করবে এবং তাছাড়া ইতালী, রুমানিয়া ও হাঙ্গেরীর মতো তার ফ্যাসিষ্ট অংশীদারদের কাছেও সাহায্য চাইবে ও তাদের কাছ থেকে আরও কিছু কামানের খাদ্য সংগ্রহের জন্য তৎপর হবে। কিন্তু পূর্ব রণাঙ্গনে শীতকালীন অভিযানের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি তাকে পোয়াতে হবে ও পশ্চিম রণাঙ্গনে দ্বিতীয় ফ্রন্ট-এর মোকাবিলা করার জন্য তাকে প্রস্তুত থাকতে হবে; অন্যদিকে হিটলারের দফারফা হয়ে যাচ্ছে দেখে ইতালী, রুমানিয়া ও হাঙ্গেরী হতাশ হয়ে পড়বে এবং তার থেকে বেশি বেশি করে দূরে সরে যাবে। এক কথায়, ৯ই অক্টোবরের পর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার একমাত্র একটি পথই হিটলারের সামনে খোলা থাকছে। এই আটচল্লিশটি দিন ধরে স্তালিনগ্রাদে লালফৌজের প্রতিরোধের সঙ্গে গত বছরের মস্কোর প্রতিরোধের কিছু মিল রয়েছে। অর্থাৎ বলা যায়, হিটলারের এই বছরের পরিকল্পনা ঠিক গত বছরের তার পরিকল্পনার মতোই একেবারে ভণ্ডুল হয়ে গেছে। কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে এই দিক থেকে যে সোভিয়েত জনগণ মস্কোর প্রতিরক্ষার ধারা অনুসরণ করে চালিয়েছিলেন শীতকালীন একটি আক্রমণ অভিযান, কিন্তু তাঁদের জার্মান বাহিনীর এই বছরের গ্রীষ্মকালীন আক্রমণের মোকাবিলা করার জন্য অপেক্ষা বাকী ছিল, অংশতঃ তার কারণ হচ্ছে এই যে জার্মানি ও তার ইউরোপীয় সাঙ্গপাঙ্গদের তখনো পর্যন্ত কিছু শক্তি রয়ে গিয়েছিল এবং ব্রিটেন ও আমেরিকার দিক থেকে দ্বিতীয় রণাঙ্গন খুলতে দেরী করাটাও ছিল তার আংশিক কারণ। কিন্তু স্তালিনগ্রাদের প্রতিরক্ষার যুদ্ধের পর গত বছরের অবস্থার চেয়ে এখন অবস্থা দাঁড়াবে সম্পূর্ণ পৃথক। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যাপক আকারে শীতকালীন দ্বিতীয় প্রতিআক্রমণ শুরু করবে, ব্রিটেন ও আমেরিকার পক্ষে দ্বিতীয় রণাঙ্গন খোলার ব্যাপারে আর দেরী করা সম্ভব হবে না (যদিও সঠিক দিনক্ষণ আগে থেকেই বলে দেওয়া যাচ্ছে না), এবং ইউরোপের জনগণও প্রতিরোধের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে জার্মানি ও তার অপকর্মের সঙ্গীদের আর সেই শক্তি নেই যে তারা ব্যাপক আকারে বড় রকমের আক্রমণ চালাবে এবং তার সমগ্র সমরনতির ধারাকেই রক্ষণাত্মক ধাঁচে দাঁড় করানো ছাড়া হিটলারের আর অন্য গতি থাকবে না। আর হিটলার যখনই একবার এই রক্ষণাত্মক সমরনীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হবে তখনই ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ প্রায় নির্ধারিত হয়ে যাবে। জন্মের সময় থেকেই হিটলারের রাষ্ট্রের মতো একটি ফ্যাসিষ্ট রাষ্ট্র তার সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনকে আক্রমণমুখী করে দাঁড় করিয়ে রাখে এবং একবার এই আক্রমণমুখীনতা স্তব্ধ হয়ে পড়লে তার প্রাণপ্রবাহই স্তব্ধ হয়ে যাবে। স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ ফ্যাসিবাদের আক্রমণমুখীনতাকেই স্তব্ধ করে দেবে এবং তাই তা চূড়ান্ত নির্ধারক একটি যুদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। সমগ্র বিশ্বযুদ্ধের পক্ষেই তা চূড়ান্ত নির্ধারক হয়ে দাঁড়াবে। তিনটি শক্তিমান শত্রু হিটলারের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তারা হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন ও আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্র, এবং জার্মান কবলিত অঞ্চলসমূহের জনগণ। পূর্ব রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে আছে লালফৌজ প্রস্তর কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এবং সমগ্র দ্বিতীয় শীতকাল জুড়ে আর তার পরেও অব্যাহত গতিতে চলবে তার প্রতিআক্রমণের অভিযান। এই বাহিনীই সমগ্র যুদ্ধের পরিণাম নিরূপণ করে দেবে, নির্ধারণ করবে মানবজাতির ভবিষ্যৎকে। যদিও ব্রিটেন ও আমেরিকা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখার ও বিলম্ব করার তাদের নীতিই চালিয়ে যাচ্ছে তবু মৃত ব্যাঘ্রকে হেনস্তা করার সময়টি যখন আসবে তখন পশ্চিম রণাঙ্গনে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় রণাঙ্গন অবশ্যই খোলা হবে। তারপর রয়েছে হিটলার-বিরোধী আভ্যন্তরীণ যুদ্ধক্ষেত্রটি – জার্মান, ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য অংশে জনগণের ব্যাপক অভ্যুত্থান মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে; সোভিয়েত ইউনিয়ন যে মুহূর্তে সর্বাত্মক প্রতিআক্রমণ শুরু করবে এবং দ্বিতীয় ফ্রন্টের কামানগুলির গর্জন শুরু হবে তখন তারা এই তৃতীয় ফ্রন্টের রণভেরী বাজিয়ে দেবে। এভাবে হিটলারের বিরুদ্ধে তিনটি ফ্রন্টের আক্রমণের ধারা একযোগে এসে মিলিত হবে – স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের সূত্র ধরে এই বিরাট ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটিই শুরু হয়েছে। নেপোলিয়নের রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটেছিল ওয়াটারলুর রণক্ষেত্রে, কিন্তু তার পরাজয়ের নির্ধারক দিক-পরিবর্তনের মুহূর্তটি রচিত হয়েছিল মস্কোতে তার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। হিটলার আজ নেপোলিয়নের সেই একই পথের যাত্রী এবং স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধই সেই চরম পরিণতিটি রচনা করে দিয়েছে। এই ঘটনাগুলি দূর প্রাচ্যের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করবে। আগামী বছরটি জাপানী ফ্যাসিবাদের জন্যও কোন সুসংবাদ বহন করে আনছে না। সময় যত যাবে ততই তার শিরঃপীড়াও বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং এভাবেই ঘনিয়ে আসবে কবরে যাওয়ার তার অন্তিম মুহূর্তটি। বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে যাঁরা হতাশাবাদী মনোভাব পোষণ করেন, তাঁদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করাই উচিত। ১২ই অক্টোবর, ১৯৪২ কমরেড মাও সে-তুঙ ইয়েনান-এর লিবারেশন ডেইলি পত্রিকার জন্য এই সম্পাদকীয়টি লিখেছিলেন। প্রকাশের তারিখ: ০২-ফেব্রুয়ারি-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |