|
ইউক্রেন যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদসুচিক্কণ দাস |
ইউক্রেনকে কত সেনা ট্যাঙ্ক দেবে ন্যাটো জোট? যতদূর খবর পাওয়া গেছে, সব মিলিয়ে দেওয়া হবে মোট ৩০০টি ট্যাঙ্ক। এবং আপাতত এগুলি তিন দেশের ট্যাঙ্ক। মার্কিন ট্যাঙ্ক আসবে আরও পরে। এখানে যে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, প্রতিটি দেশের ট্যাঙ্ক ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তিতে তৈরি। মূল কামান ও সহযোগী মেশিনগানগুলির পাল্লা, ট্যাঙ্কের গতি, লক্ষ্য নির্ধারণের কৌশল— এসবই আলাদা। এত ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তিচালিত এ তহরেক কিসিমের বিদেশি ট্যাঙ্ক ব্যবহার করার সক্ষমতা কি ইউক্রেন বাহিনীর আছে? যে কোনও সমর বিশেষজ্ঞই বলবেন, এত ধরনের বিদেশি ট্যাঙ্ক উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া ব্যবহার করা অসম্ভব। প্রশিক্ষণের আবার দুটো দিক— প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের মহড়ায় প্রশিক্ষণ। একাজে দরকার বহু সংখ্যক দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার। যেহেতু শীত শেষে বসন্ত প্রায় সমাগত, তাই এত প্রশিক্ষণের সময় নেই। তাই ধরেই নেওয়া যায়, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলির দক্ষ সেনারা ইউক্রেন সেনার পোশাক পরে ঢুকবে ইউক্রেনে এবং তারাই এইসব ট্যাঙ্ক যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করবে। ঠিক এমনটাই ঘটেছিল অবরুদ্ধ কিয়েভের কাছে আজভস্তাল স্টিল প্ল্যান্টে। সেখানে আটকে পড়েছিল ন্যাটোর অ-ইউক্রেনিয় ভাড়াটে সৈন্যরা, যাদের জড়ো করা হয়েছিল ন্যাটোভুক্ত দেশগুলি থেকে। |
ন্যাটোর আরও অস্ত্রসজ্জা আসন্ন বসন্তে যদি রুশ বাহিনীর কিয়েভ বা খারকভ-মুখী অভিযান ঠেকাতে হয়, তাহলে দরকার আরও বেশি অস্ত্রসজ্জা। এখনও পর্যন্ত যে সব ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেন ব্যবহার করছে, হয় সেগুলি সোভিয়েত আমলের, যা ইউক্রেনের ভাণ্ডারে রয়েছে, নয় তা আমেরিকা বা ন্যাটোর দেওয়া। এগুলোর পাল্লা কম। ফলে খুব দূরে আঘাত হানা যাচ্ছে না। যে ট্যাঙ্ক এতদিন ইউক্রেন ব্যবহার করে এসেছে সেগুলিও তত আধুনিক নয়। রুশ সূত্রে খবর, পাল্টা হামলার জন্য বিপুল দামে ইউক্রেনকে যে এম ১৪২ হিমার্স মাল্টিপল রকেট লঞ্চার দিয়েছিল, তা সরবরাহের আগে পেন্টাগনের নির্দেশে লঞ্চারগুলো এডিট করে দেওয়া হয় যাতে ক্ষেপণাস্ত্র মূল রুশ ভূমিতে আঘাত হানতে না পারে। এ থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট - রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না আমেরিকা। বরং তারা এই যুদ্ধ জিইয়ে রাখতে চায় ইউক্রেনকে কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র বেচে। এবং রুশ জুজু দেখিয়ে এই অস্ত্রের দাম বাবদ অনেকটা টাকাই ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানির কাছ থেকে আদায় করছে আমেরিকা। ইউক্রেন যুদ্ধ আসলে মার্কিন অস্ত্র ব্যবসার ফলাও কারবার। মেইন ব্যাটল ট্যাঙ্ক ও সেনা অভিযান কিন্তু এখন ইউক্রেন চাপে। মানে ন্যাটোও চাপে। এখন রাশিয়ার আরও সামরিক সাফল্য ঠেকাতে হলে দরকার দূরপাল্লার অস্ত্র। সেটাই হল ট্যাঙ্ক। মনে রাখা দরকার, এখন যুদ্ধের অনেকটা পর্ব নিয়ন্ত্রণ করে আকাশযুদ্ধ। সেজন্য জোরালো কোনও সামরিক বিমান পায়নি ইউক্রেন। তাছাড়া তাদের বায়ুসেনার বিমানঘাঁটিও গুঁড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়া। ফলে রুশবাহিনীকে রুখতে এখন ভরসা আরও আধুনিক ট্যাঙ্ক। ট্যাঙ্কের কাজ তিনটি। শত্রু এলাকায় ঢুকে পড়া। বাইরের আবরণ যদি বেশ মজবুত হয় এবং ট্যাঙ্ক যদি হাল্কা হয়, তাহলে দ্রুতগতিতে শত্রু এলাকায় ঢুকে পড়া যায়। দ্বিতীয়ত, ট্যাঙ্কের গোলার পাল্লা কতদূর সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে অনেক দূর থেকে শত্রু এলাকার টার্গেটে হামলা করা যায়। এছাড়া ট্যাঙ্ক হল পদাতিকবাহিনীর কভার। ট্যাঙ্কের পিছু পিছু চলে পদাতিকেরা। হিটলারের জার্মান ব্লিৎসক্রিগ দাঁড়িয়েই ছিল ট্যাঙ্কের গতির ওপর নির্ভর করে। তবে লাল ফৌজ স্তালিনগ্রাডে মোবাইল ওয়ারফেয়ারেরর হাতিয়ার ট্যাঙ্ককে ব্যবহার করেছিল পজিশনাল ওয়ারফেয়ারের হাতিয়ার হিসাবে। গর্ত খুঁড়ে ট্যাঙ্ক মাটিতে বসিয়ে ওপরে ক্যামোফ্লেজ করে রাখা হত। জার্মান ট্যাঙ্ক এগোচ্ছে, চরেরা এসে খবর দিলেই তলায় আগুন জ্বালিয়ে শীতে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া তরল জ্বালানি উত্তপ্ত করে তোলা হত। এবার জার্মান ট্যাঙ্ক কাছাকাছি এলেই ক্যামোফ্লেজের কভার সরিয়ে একেবারে নিখুঁত নিশানায় হিট। এভাবে স্তালিনগ্রাডে একেবারে ভিন্ন কৌশলে বহু জার্মান ট্যাঙ্ক ধ্বংস করেছিল লাল ফৌজ। সেজন্য সেনার বিভিন্ন শাখার মধ্যে আগাম সমন্বয়ের ম্যানুয়্যাল তৈরি করা হয়েছিল। মোবাইল ওয়ারফেয়ারের মূল হাতিয়ারকে পজিশনাল ওয়ারফেয়ারের হাতিয়ারে পরিণত করাটা লাল ফৌজের নিজের উদ্ভাবন করা কৌশল। ন্যাটো জোটের ট্যাঙ্ক-চাঁদা সোলেডার ও বাখমুটের পর রুশবাহিনীকে ঠেকাতে তাই ইউক্রেনের সেনাকে সরবরাহ করা হচ্ছে ট্যাঙ্ক। ইতিমধ্যেই আমেরিকা জানিয়েছে তারা ইউক্রেনকে দেবে সবচেয়ে শক্তিশালী ৩১টি অ্যাব্রাম ট্যাঙ্ক। সঙ্গে দেবে দরকারি সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ যাতে যুদ্ধক্ষেত্রেই সেগুলি সারিয়ে নেওয়া যায়। তবে আসল কথাটি হল, এই ট্যাঙ্কগুলি ২০২৩-এর শেষ দিকের আগে তৈরিই হবে না। ফলে আপাতত সেগুলি সরবরাহ করার কোনও সম্ভাবনা নেই। অতএব চাপ গিয়ে পড়ল জার্মানির ওপর যাদের সঙ্গে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক সবচেয়ে ভাল, এত যুদ্ধের পরও। যেহেতু জার্মানি রাশিয়ার গ্যাস কেন এবং জার্মান গাড়ি ও মেশিন রাশিয়ায় বিপুল পরিমাণে বিক্রি হয়, তাই রাশিয়াকে চটাতে চায় না জার্মানি। তাই আমেরিকা চাপ দিলেও জার্মানি গোড়ায় তাদের অত্যাধুনিক লেপার্ড ২ ট্যাঙ্ক দিতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত জার্মানির ওপর চাপ দিতে ফ্রান্স আগাম জানিয়ে দেয়, তারা ইউক্রেনকে এএমএক্স ১০ আরসি লাইট ট্যাঙ্ক দেবে। ফ্রান্স ইতিমধ্যে পাঠিয়েছে আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার, অ্যান্টি ট্যাঙ্ক ও অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল। এরপর ব্রিটেনও জানাল তারা দেবে ১২টি চ্যালেঞ্জার ২ ট্যাঙ্ক। এবার সবাই মিলে চাপ দিল জার্মানিকে, তোমরাও ট্যাঙ্ক-চাঁদা দাও। অনিচ্ছুক জার্মান প্রেসিডেন্ট শেষ পর্যন্ত ১৪টি লেপার্ড ২ ট্যাঙ্ক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে ন্যাটো সদস্যদের কাছে থাকা স্টক থেকে আরও ১২৭টি লেপার্ড ২ ট্যাঙ্ক যাবে ইউক্রেনে। আসলে জার্মানি রাশিয়াকে দিতে চাইল এই বার্তা— আমি চাই না, তবে কী করব, জোটের স্বার্থে। এখানেই রাশিয়ার বড় কূটনৈতিক জয়। আমেরিকার নির্দেশে রাশিয়াকে বাদ দিয়ে চলবে ইউরোপ, এটা অন্তত জার্মানি আর ফ্রান্স আর মানতে চাইছে না। যে কারণে ফরাসি কোম্পানিগুলি এখনও মস্কোয় ব্যবসা করে যাচ্ছে। অলিম্পিকে রাশিয়াকে চাইছে ফ্রান্স। আর বেশি দামে মার্কিনী জ্বালানি না কিনে সস্তায় রাশিয়ার গ্যাস আর তেল কিনতে চায় জার্মানি। গোটা পরিল্পনায় বাধ সাধছে ঐতিহাসিকভাবে অচল হয়ে যাওয়া ন্যাটো যুদ্ধ-জোট, যারা সোভিয়েতের পতনের পরও রাশিয়াকে সামনে রেখে একটা ভুয়ো ফ্রন্ট খুলে রাখতে চায়। ইউক্রেনে রাশিয়া জিতলে ন্যাটোয় ভাঙন হবে, নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী ঘুঁটি সাজাবে জার্মানি ও ফ্রান্স। সেই ভয়ে দুই আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমেরিকা ও ব্রিটেন রুশ-বিরোধী সামরিক জোট টিঁকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে আপাত ঐক্যের আড়ালে পশ্চিমী জোটের এই ফাটলই ভবিষ্যতে ইউরোপ-কেন্দ্রিক রাজনীতির মোড় ফেরাতে পারে। কত সেনা চলেছে সমরে? ইউক্রেনকে কত সেনা ট্যাঙ্ক দেবে ন্যাটো জোট? যতদূর খবর পাওয়া গেছে, সব মিলিয়ে দেওয়া হবে মোট ৩০০টি ট্যাঙ্ক। এবং আপাতত এগুলি তিন দেশের ট্যাঙ্ক। মার্কিন ট্যাঙ্ক আসবে আরও পরে। এখানে যে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, প্রতিটি দেশের ট্যাঙ্ক ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তিতে তৈরি। মূল কামান ও সহযোগী মেশিনগানগুলির পাল্লা, ট্যাঙ্কের গতি, লক্ষ্য নির্ধারণের কৌশল— এসবই আলাদা। এত ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তিচালিত এ তহরেক কিসিমের বিদেশি ট্যাঙ্ক ব্যবহার করার সক্ষমতা কি ইউক্রেন বাহিনীর আছে? যে কোনও সমর বিশেষজ্ঞই বলবেন, এত ধরনের বিদেশি ট্যাঙ্ক উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া ব্যবহার করা অসম্ভব। প্রশিক্ষণের আবার দুটো দিক— প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের মহড়ায় প্রশিক্ষণ। একাজে দরকার বহু সংখ্যক দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার। যেহেতু শীত শেষে বসন্ত প্রায় সমাগত, তাই এত প্রশিক্ষণের সময় নেই। তাই ধরেই নেওয়া যায়, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলির দক্ষ সেনারা ইউক্রেন সেনার পোশাক পরে ঢুকবে ইউক্রেনে এবং তারাই এইসব ট্যাঙ্ক যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করবে। ঠিক এমনটাই ঘটেছিল অবরুদ্ধ কিয়েভের কাছে আজভস্তাল স্টিল প্ল্যান্টে। সেখানে আটকে পড়েছিল ন্যাটোর অ-ইউক্রেনিয় ভাড়াটে সৈন্যরা, যাদের জড়ো করা হয়েছিল ন্যাটোভুক্ত দেশগুলি থেকে। এদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই পোল্যান্ডের সেনা। ছিল ব্রিটেনের ভাড়াটে সেনাও। এরপরেও কি এই যুদ্ধকে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বলা যাবে? নাকি এ হল আসলে ন্যাটো বনাম রাশিয়ার যুদ্ধ। সাম্রাজ্যবাদের অবসান হয়নি এ থেকেই প্রমাণিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কমিউনিজমের ভূত পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদীদের এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তাই সোভিয়েতের পতনের পরও তারা রাশিয়াকে একেবার নির্মূল করার ছক থেকে সরে আসেনি। আসলে সোভিয়েত না থাকলেও এই রাশিয়া জারের রাশিয়া নয়। কমিউনিস্ট রাশিয়াকে তো বটেই, এমনকী জাতীয়তাবাদী রাশিয়াকেও ভয় পায় পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদ। কারণ ইউরোপের পুঁজিপতিরা সর্বদাই, হিটলারের মতোই, রাশিয়ার বিশাল ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠের স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে রাশিয়াকে উপনিবেশ করে সেখান বিশাল বাজার লুঠ করার। এভাবেই টিঁকে রয়েছে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের লুঠের পরিকল্পনা। প্রকাশের তারিখ: ০৭-ফেব্রুয়ারি-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |