পরিযায়ী শ্রমিকের বয়ান

উর্বা চৌধুরী
“ছেলেটা ঘর ছেড়ে গেছে চোদ্দ বছর বয়সে। লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হল। গুজরাটের আমেদাবাদে হেল্পারের কাজ করত। ক’বছর আগে এখানে এসে বিয়ে করল, ছেলে হল, সেই ছেলের বয়স এখন তিন। তারপর একদিন জানা গেল উঁচু ভাড়া থেকে পড়ে গেছে। বাঁচল না। ভাবি, লেখাপড়াটা শেষ করলে এ কাজ হয়তো করতে হত না। অন্য কোনও কাজ পেত। কিন্তু কী করে পেত? কাজ তো নাই!” কোচবিহারের মাথাভাঙার এক গ্রামের বৃদ্ধা বলে চলেন তাঁর ছেলের পরিযায়ী শ্রমিক, শিশুশ্রমিক জীবনের বেঁচে থাকার কাহিনী এবং আচমকা মারা যাওয়ার কাহিনীও। একের পর এক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে পশ্চিমবঙ্গ-সহ নানা রাজ্য থেকে মজুরের কাজ করতে চলে যাচ্ছে বাইরের রাজ্যে।

“আমাদের গাঁয়ে ১৮ থেকে ৩৫ বছরের জোয়ান ছেলে খুঁজে দেখান তো!” – পুরুলিয়ার পুঞ্চা ব্লকের মহেশতলা গ্রামের বৃদ্ধ মজুর বলেন এক সমীক্ষককে। তবে এখন তিনি আর খাটতে পারেন না। এখানে বলে রাখা দরকার যে, বৃদ্ধ মানুষটির সঙ্গে কথা হচ্ছিল কর্মসংস্থান নিয়ে, পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে নয়। বৃদ্ধের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল – এই গ্রামে বেশিরভাগ মানুষজনের পেশা কী? বৃদ্ধ খানিক বিরক্ত ও হতাশ হয়ে জানান, তাঁর গ্রামের যুববয়সী মানুষজন নিজের “ঘরে বাস করে” বা নিজের পরিবারের সঙ্গে থেকে রোজগারের কাজ করতে পারে না। কারণ “এলাকায়”, এমনকি পুরুলিয়া শহরেও, কাজ নাই। তাঁর কথায় জানা যাচ্ছিল যে, জলসংকটে ভোগা পুরুলিয়ার মানুষ চাষাবাদের মাধ্যমে আয় করতে পারেন না সেভাবে কোনওদিনই, আর নেই সেরকম কোনও কারখানা যা সেখানকার মানুষের উপার্জনের জায়গা হয়ে উঠতে পারবে। এই কর্মসংস্থানহীনতার পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হওয়ায় কাজের জন্য রাজ্য ছাড়তে হচ্ছে শ্রমবাহিনীকে। 

শ্রমিকের পরিযান অর্থনীতির অংকের বিচারে ইতিবাচক ঘটনা হিসাবে আলোচিত বরাবরই। পরিযায়ী হিসাবে যেখানে যাচ্ছেন শ্রমিক সেই লক্ষ্যস্থলের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে, কারণ উৎপাদন সচল থাকে, সেখানে শ্রমিকের ঘাটতি মেটে। একই সঙ্গে যেখান থেকে শ্রমিকেরা গেছেন সেই উৎসস্থলের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে শ্রমিকের আয়ের মাধ্যমে পারিবারিক ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে, সব “পরিযান” নয় সমান। বিরাট সংখ্যক শ্রমিকের পরিযান এ রাজ্যে, মায় দেশে ঘটছে চরম বঞ্চনা আর নিরুপায়তার কারণে (অর্থনীতির লব্জে “পুশ মাইগ্রেশান”)। কর্মসংস্থান না থাকা বা অপর্যাপ্ত হওয়ার কারণে ঘটা বঞ্চনায় যখন শ্রমিক নিজের অঞ্চল ছাড়তে বাধ্য হন, তখন এও বুঝে নিতে হয় যে শ্রমশক্তি বেচার বাজারে তাঁর দরাদরি করার ক্ষমতা কমার প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে এও ঠিক যে শ্রমিকের দরাদরি ক্ষমতা যত কমতে থাকে, তাঁর এবং তাঁর পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের সার্বিক মানবোন্নয়নের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ দেশের সত্য হল, পরিবার ছেড়ে, নিজের অঞ্চল থেকে দূরে গিয়ে থাকা শ্রমিককে ভাল রাখতে পারছে না, ভাল রাখতে পারছে না তাঁর পরিবারকে, ভাল রাখতে পারছে না প্রতিবেশকে। পরিযান যদি অনিবার্যভাবে উৎপাদনশীলই হবে, তাহলে বাসস্থান ছেড়ে দূরে থেকে কাজ করা নিয়ে বা নিজের অঞ্চলে কাজ না থাকা নিয়ে এত আক্ষেপ কেন? কেবলই কি পরিবারের থেকে দূরে থাকতে হবে বলে? 

কী কী ঘটে পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিটে-ছাড়া হওয়ার কারণ এবং প্রভাবের চক্রাকার প্রক্রিয়ায়?  

“টাকা নিয়ে বাইরের লোক ঢোকায়। রাজনীতির খেল। অধিকাংশ লোক টাকা খাচ্ছে। আমরা জমিহীন লোক, আবার কাজও পাই না। কী করব? বাইরে না খাটলে যদি আপনার মেয়ে, ছেলে, পরিবারের সবাই মারা যায়, আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবেন? তাই যেতে হল বাইরে।” – পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর ২ ব্লকের চরণবাঁধ গ্রামের নিজের বাসা ছেড়ে বিহারের বক্সারে চলে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক অমল কর্মকারের মুখে তাঁর কর্মজীবন নিয়ে শোনা কথার সূত্রে জানা যায় এই ব্যাখ্যা। চল্লিশ পেরোনো এই শ্রমিক বক্সারে রাস্তা তৈরির কাজে দিনমজুর হিসাবে যুক্ত। রাজ্য ছেড়ে বাইরে গেছেন ঠিকাদারের যোগসূত্রে। অমলের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল – তাঁর বাসস্থান বা আশপাশের এলাকায় কাজ কি নাই? তিনি জানান “কাজ কেন থাকবে না! বিহারে আছে, ঝাড়খণ্ডে আছে, এখানে নাই? এই তো ডুমডুমির প্লান্টে, আমাদের মতো লোকাল লোক নেবেই না। বাইরের রাজ্য থেকে কম মজুরিতে লেবার রাখবে, আমাদের রাখবে না। আমরা তো মজুরি নিয়ে, ছুটি নিয়ে দরাদরি করতে পারি। বাইরের লোক করবে না। যা দেবে মেনে নেবে।” অর্থাৎ পরিযানের অন্যতম কারণ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বাসস্থান এলাকায় আঞ্চলিক শ্রমিক কাজে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে বাদ পড়ছেন। একইসঙ্গে সংকটের মুখে পড়ছে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, ছুটির মতো বুনিয়াদি অধিকার।

শহরের কাহিনীও দুর্দশাগ্রস্ত। হলদিয়া শহরের তরুণদের কথায় জানা যায় যে, একের পর এক এলাকায় দরিদ্র পরিবারের ছেলেরা ঘর ছেড়ে, রাজ্য ছেড়ে চলে গেছে উপার্জনের তাগিদে, তবু স্থানীয় অঞ্চলে বা কাছাকাছি কোথাওই কিছু উপার্জনের সুযোগ পাননি। অভিযোগ সেই একই, মালিকের সঙ্গে শ্রমিকের দরাদরি সংক্রান্ত— “লোকাল ছেলে নেবেই না। বাইরে থেকে লোক এনে কারখানায় কাজ করাবে, তবু আমাদের নেবে না”। অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের নিরাপত্তার অভাবের কারণে, দূর থেকে এসে শ্রমিকের ন্যূনতম “দাপটের” সবটুকু খুইয়ে ফেলার কারণে, আর্থিক অনটন দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়ে ভিটে ছাড়া করার কারণে – গোটা শ্রমিকবাহিনীর এই পরিযায়ী অংশটি বিশেষত বিপন্ন। 

এই উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকের “অধিকার” তো বিপন্ন বটেই, বিপন্ন পরিযায়ী শ্রমিকের নিজের “অধিকারবোধও”!    

“ছুটি নিলে তো আমারই লস, টাকা যাবে। টাকা না কেটে ছুটি হলে, তখন ছুটি ভাল” – ৩৩ বছর বয়সী যুবক, রমেশ রুইদাসের কথায় জানা যায় তাঁর শ্রমিক জীবনের অধিকারের কথা। টাটানগরে একটি প্লাস্টিক কোম্পানিতে কাজ করেন রমেশ। ওঁর নিজের গ্রাম পুরুলিয়ার মাঠা। দুবছর কলেজে পড়ার পর ছেড়ে দিয়েছিলেন অসুস্থ বাবার দেখাশুনা করার জন্য। তারপর রোজাগারের জন্য শুরু হয় পুরুলিয়ায় কাজ খোঁজা। কাজ পান না। ঠিকাদারের সূত্রে চলে যান টাটানগর। তাঁর ছুটি প্রসঙ্গে মজুরি কাটা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে আরেক তাৎপর্যপূর্ণ কথা— “রবিবার হাফবেলার ছুটি থাকে। তার বেশি ছুটি নিয়ে করব কী? পরিবারই তো নাই, পরিবার না থাকলে ছুটির মানে নাই।” পারিবারিক বা সামাজিক জীবনের অভাবে “বিশ্রামের দরকারের” প্রতিও তাঁর আর আগ্রহ নাই। তাই “বিশ্রামের অধিকারকে”ও আর গুরুত্ব দেন না রমেশ। সপ্তাহে কাজ করেন ৭৬ ঘন্টা। প্রশ্ন ওঠে, রমেশের মতো শ্রমিকদের জীবনের জন্য জীবিকা, না কি জীবিকার জন্য জীবন! 

মহাত্মা গান্ধী ন্যাশানাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি (এমজিএনরেগা) যোজনায় সিদ্ধান্ত হয় যে, গ্রামের মানুষদের অন্তত ১০০ দিনের কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত করবে যৌথভাবে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার। আমরা সকলেই জানি, সেই কাজ বা কাজের মজুরি দিতে না পারলে দ্রুত চালু করতে হবে আবেদনকারীর জন্য বেকার ভাতা (আনএমপ্লয়মেন্ট অ্যালাওয়েন্স)। এ রাজ্যে গত সাড়ে তিন বছর ধরে গ্রামের মানুষের জন্য এমজিএনরেগা-র অন্তর্ভুক্ত কোনও কাজ, অর্থ বরাদ্দ করেনি কেন্দ্রীয় সরকার, বকেয়া রয়েছে শ্রমিকদের খেটে দেওয়া কাজের মজুরিও। কেন্দ্র কারণ দেখিয়েছে রাজ্যের শাসকদলের করা দুর্নীতির শাস্তিস্বরূপ বরাদ্দ বন্ধ। শাসকের দুর্নীতি অবশ্যই এ রাজ্যের মারাত্মক এক বাস্তবতা, একইসঙ্গে এও ঠিক যে, রাজ্যের শাসকের দুর্নীতির জন্য শ্রমিকের কাজ, মজুরি আটকে রাখা কেন্দ্রের শাসকের তরফে নির্মাণ করা এক ছুতা— আসলে কেন্দ্রের শাসক ভাতে মারতে চায় শ্রমিককে। অর্থাৎ একদিকে কৃষিকাজে আয় অত্যন্ত কম, যা দিয়ে সংসার চলে না, কলকারখানায় কাজ নাই, উপরন্তু ১০০ দিনের কাজ বন্ধ। দুই শাসকের যাবতীয় অনাচারের কারণে এ রাজ্যের শ্রমবাহিনী নিজের এলাকায় তো দূরের কথা, গোটা রাজ্যেই তেমন কাজ পাচ্ছেন না। এ রাজ্যের মানুষের জীবন-জীবিকার মৌলিক, সাংবিধানিক, আইনি অধিকারের চরম লঙ্ঘন করেও দুই শাসক দিব্য রাজত্ব জাঁকিয়ে বসে আছে।  

এ রাজ্যের শ্রমিকদের পরিযানের সামাজিক প্রভাব বহুমুখী— অপ্রাপ্তবয়সেই মজদুরি করতে চলে যেতে হচ্ছে অনেককে ভিটে ছেড়ে! 

পরিযায়ী শ্রমবাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশ নাবালক। শ্রমের অধিকারের দুর্দশা শুরু হওয়ার আগেই বা সমান্তরালে তাঁরা হারাচ্ছেন শিক্ষার অধিকার— “ছেলেটা ঘর ছেড়ে গেছে চোদ্দ বছর বয়সে। লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হল। গুজরাটের আমেদাবাদে হেল্পারের কাজ করত। ক’বছর আগে এখানে এসে বিয়ে করল, ছেলে হল, সেই ছেলের বয়স এখন তিন। তারপর একদিন জানা গেল উঁচু ভাড়া থেকে পড়ে গেছে। বাঁচল না। ভাবি, লেখাপড়াটা শেষ করলে এ কাজ হয়তো করতে হত না। অন্য কোনও কাজ পেত। কিন্তু কী করে পেত? কাজ তো নাই!” কোচবিহারের মাথাভাঙার এক গ্রামের বৃদ্ধা বলে চলেন তাঁর ছেলের পরিযায়ী শ্রমিক, শিশুশ্রমিক জীবনের বেঁচে থাকার কাহিনী এবং আচমকা মারা যাওয়ার কাহিনীও। একের পর এক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে পশ্চিমবঙ্গ-সহ নানা রাজ্য থেকে মজুরের কাজ করতে চলে যাচ্ছে বাইরের রাজ্যে। নাবালকেরা চলে যাচ্ছে হোটেলে শ্রমিকের কাজে, নির্মাণ ক্ষেত্রে, গয়নার কাজ করতে; নাবালিকারা যাচ্ছে গৃহ সহায়ক শ্রমিক, সেবাকাজের শ্রমিক (“আয়া”) হিসাবে। এদের অনেকেই কাজে যোগ দেওয়ার আগেই স্কুলছুট, তবে বিরাট সংখ্যক কাজ করতে বাইরে যেতে হবে বলে স্কুলছুট।  

পশ্চিমবঙ্গে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বররের মধ্যে ১১২৭ জন নাবালক, নাবালিকা পাচার হয়েছে বলে অনুমান করেছে ‘বচপন বাচাও’ নামক একটি সংস্থা। সবচেয়ে বিপজ্জনক হল, অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিক বানানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলছে প্রবল মানবপাচারও। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা, উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলায় এই পাচারের ঘটনা ঘটে উল্লেখযোগ্য রকমের। গত জুলাই ২০২৫ সালেও খবরে উঠে এসেছে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশান থেকে ৩০-এরও বেশি তরুণীকে কাজ দেওয়ার ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল দক্ষিণ ভারতে, পরে জানা যায় এটি ছিল এক পাচারচক্রের কীর্তি। এঁরা উদ্ধার হন স্টেশান থেকেই। 

কেমন আছে, কেমন থাকে, পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারের মানুষেরা? 

“আমার বয়স হয়েছে, ছেলের বউ আর ছোট ছোট পাঁচ নাতি নাতনি। ছেলেকে বাইরে থাকতে হয়। সব বিপদ-আপদ আমরা দুই মেয়েমানুষ সামলাতে পারি না। লেখাপড়াও জানি না। ছেলেটা থাকলে বলভরসা হয়। কিন্তু রোগব্যাধিতেও কাছে পাই না।” – বন থেকে জোগাড় করা কাঠ মাথায় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলছেন অমলা কর্মকার। শীর্ণ চেহারার ষাটোর্ধ্ব অমলার পরিবারে একজন উপার্জনকারী তাঁর ছেলে। সেই ছেলে দিনমজুরের কাজ করার জন্য থাকেন বিহারে। 

এ রাজ্যের গ্রামগুলি থেকে পুরুষদের বাইরে চলে যাওয়ার সঙ্গে অর্থনীতির উন্নয়ন বা অবনয়নের সম্পর্ক যেমনই হোক, সামাজিক ও পারিবারিক সংকট যে তৈরি হচ্ছে, তা অনস্বীকার্য। কারণ আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা মানুষের পাশে নাই। নারী, বৃদ্ধ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ বা শিশুদের নিজ নিজ অধিকার লঙ্ঘন যেভাবে ঘটতে থাকে, তাতে ঘরের পুরুষ বাইরে গেলে বাড়ির পরিস্থিতি বিপজ্জনক অবধি হয়ে ওঠে। নিরাপত্তাহীনতা, পারিবারিক সংকট সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে অসহয়তা ঘরে থাকা মানুষগুলিকে বিপন্ন করে তোলে। মূলত পরিবারের নারী সদস্যেরা এই সংকটগুলির সম্মুখীন হন এবং একা হাতে সমস্যা সামাল দিতে দিতে নাজেহাল হয়ে যান। কোনও কোনও পরিবারের নারী সদস্যেরা জানেনও না তাঁদের পরিবারের পুরুষেরা তাঁদের গ্রামের গণ্ডির বাইরে কাজ করতে গিয়ে কোথায় থাকেন, কী কাজ করেন? পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি ১ ব্লকের গৃহবধূ মা, বউয়ের কাছে পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁরা বলেন “মহারাষ্ট্রে গেছে জানি, কোথায় কী কাজ করে জানি না।” এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, গুরুতর পরিস্থিতিতে বা পারিবারিক আপদকালীন পরিস্থিতিতেও বহু ক্ষেত্রে পরিবারের মানুষজন পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে পাচ্ছেন না বলে বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। উত্তর চব্বিশ পরগণার মিনাখাঁ ব্লকের এক গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব বিধবা নারী বলছেন “আমার ছেলের বউয়ের দ্বিতীয় বাচ্চাটা হওয়ার সময়, বাড়িতে দাই ডেকে প্রসব করিয়েছি। ওর আরেকটা ছোট বাচ্চা আছে, আমার ছেলে বাড়িতে থাকে না, বাইরে কাজ করে। আমরা দুই মহিলা, হাসপাতালে বাচ্চা হলে, বারবার হাসপাতাল-বাড়ি কে করবে? সেজন্যই ঘরে বাচ্চা হয়েছে।” – এই ঝুঁকি যে সাধারণ ঝুঁকি নয়, সে কথা বলাই বাহুল্য। 

নিরাপত্তাহীনতার পরিণামে পরিযায়ী শ্রমিকেরা যে বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন, তার আরও এক উদাহরণ দেওয়া জরুরি— “মাধ্যমিকটুকু পাশ করাইয়াই, মেয়েটার বিয়ার কথা ভাবব। আমি থাকি না, ওর বাবা থাকে না। কোনও একটা অঘটন ঘইট্যা গেলে, কী করব!” – নিজের মেয়ে সম্পর্কে বলেন শিবানী। কোচবিহারের শীতলকুচি ব্লকের একদা ছিটমহলের অন্তর্গত গ্রামের শিবানী এবং তাঁর বর পেশায় ইটভাটার শ্রমিক। বছরের ৬ মাস তাঁরা থাকেন বিহারের গ্রামে – সাময়িক পরিযান। ঘরে তাঁর সন্তানেরা বৃদ্ধ, অশক্ত ঠাকুমা ছাড়া আর কোনও প্রাপ্তবয়স্কের অভিভাবকত্ব বা সুরক্ষা পায় না। ফলে, শিবানী ও তাঁর বরের বাধ্যত ভিন রাজ্যে কাজ করতে চলে যাওয়া, মেয়ের নিরাপত্তা এবং পরিবারের আর্থিক সংকট শিবানীকে দিয়ে নাবালক মেয়ের বিয়ে দেওয়ার মতো বিপজ্জনক এক সিদ্ধান্ত নেওয়াচ্ছে, এবং এই সিদ্ধান্ত মেয়ের স্কুলছুট হওয়াকেও প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছে।

পরিসংখ্যান লক্ষ করলে বোঝা যায় যে, বিগত শতকের আট ও নয়ের দশকে, এমনকি এই শতকের গোড়ার দশকেও, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, রাজস্থানের মতো বেশি দারিদ্রের রাজ্য থেকে কম দারিদ্রের রাজ্যে বেশি শ্রমিক পরিযায়ী হচ্ছিলেন। ২০১০ সালের পর থেকে এই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের নামও যুক্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের শহরাঞ্চল থেকে বহু মানুষ ২০১০-এর আগেও বাইরের রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজের খোঁজে বা কাজ করতে যেতেন; কিন্তু ২০১০ পরবর্তী সময়ে শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চল থেকে এই পরিযানের মাত্রা বেড়ে যায় অনেকটা। কর্মহীনতা (আনএমপ্লয়মেন্ট) বা মজুরি ও কর্মদিবসের প্রশ্নে অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের (আন্ডার এমপ্লয়মেন্ট) কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রামীণ অঞ্চল থেকে বাইরের রাজ্যে চলে যেতে থাকেন (মিস্ত্রি ২০২১)। এই বিপুল পরিমাণ বহির্মুখী পরিযানের পরিস্থিতি আজও বহাল রয়েছে, বেড়েছে। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, মালদহ, উত্তর-দক্ষিণ দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, পুরুলিয়া তো বটেই, পূর্ব-পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলি, হাওড়া, উত্তর-দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মতো তুলনায় কম সংকটপূর্ণ জেলাগুলির গ্রামীণ অঞ্চল থেকেও বহু মানুষ নিজের জেলা, রাজ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বাইরে। রাজ্য ছেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য, দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, পুনা, হায়দ্রাবাদ, আহমেদাবাদ, কেরালা যাওয়ার প্রবণতা যেমন রয়েছে, তেমনই ঝাড়খণ্ড, বিহার, ছত্রিশগড়ের মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা রাজ্যে গিয়ে কাজ করার পথও বাছতে বাধ্য হচ্ছে অনেক পশ্চিমবঙ্গবাসীকেই। ২০১১ সালের সেনসাস অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের ৬৯% কর্মীবাহিনীর মধ্যে ৪৭% যুক্ত রয়েছেন কৃষিকাজের সঙ্গে এবং ২২% যুক্ত রয়েছেন শিল্পাঞ্চলে অকৃষি শ্রমিক হিসাবে। নানা ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান রাজ্যের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে- এই বৃদ্ধির হার বর্তমান শতকের প্রথম দশক থেকে কমতে শুরু করে ২০১০-এর পর থেকে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে কৃষিক্ষেত্র। আবার পরিষেবা ক্ষেত্রে যোগদানের প্রশ্নে কর্মীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব হয়ে দাঁড়াচ্ছে মূল বাধা। কোভিড অতিমারির সময়ে বিরাট সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক নিজ রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গ) ফিরে এলেও, তার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ ফের কাজের জন্য ফিরত চলে যেতে চাইছেন ভিন রাজ্যের শহরে। আগে অন্যান্য রাজ্য থেকে এ রাজ্যে কাজ করতে আসা শ্রমিকের সংখ্যা (‘মাইগ্র্যান্ট স্টক’) বেশি থাকলেও, ২০০০ সালের পর থেকে এ রাজ্য থেকে শ্রমিকদের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে থেকেছে। ফলত পরিযানের নেট ব্যালান্স (কোনও রাজ্যে কাজের জন্য বাইরে থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিক ও সেই রাজ্য থেকে কাজের জন্য বাইরে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকের মধ্যেকার তফাত) প্রথমবারের জন্য নেগেটিভ-এ চলে গেছে (মিস্ত্রি ২০২১)।   

পরিযায়ী শ্রমিকেরা এ দেশের যেখানেই কাজ করতে যান, বিভিন্ন সময় মূলত “ক্রয়ক্ষমতা” সংক্রান্ত সংকটের মধ্যে থাকেন। আর এই আলোচ্য “ক্রয়ক্ষমতা” আধিক্যের ক্রেতা হওয়ার প্রসঙ্গে নয়, ন্যূনতমটুকুর ক্রেতা হওয়ার প্রসঙ্গে, প্রাপ্য মৌলিক অধিকারটুকু কিনতে পারার প্রসঙ্গে। পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা, বাসস্থান, লেখাপড়া সবের জন্যই পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বাড়তি সংগ্রাম বরাদ্দ হচ্ছে। এমন ঘটনাও ঘটছে যেখানে কাজ করিয়ে নিয়ে মজুরি দেওয়া হচ্ছে না, বা মজুরির জন্য এতদিন অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে যে প্রবাসে হাতখালি অবস্থায় টিঁকে থাকা অসম্ভব। এই ধরনের সংকট থেকে খানিক মুক্তি পেতে সারা দেশে পরিযায়ী শ্রমিকের একটি অভিন্ন পরিচয়পত্র জরুরি, সকল প্রশাসনিক দপ্তর যে পরিচয়পত্রকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য থাকবে। অবশ্যই জরুরি হল, আন্তঃ-রাজ্য স্বাস্থ্য কার্ড ও সাধারণ একটি রেশন কার্ড। যাতে দেশের সর্বত্র অবাধে, বিনাব্যয়ে এই শ্রমিকেরা খাদ্য, স্বাস্থ্য, চিকিৎসার সুযোগ পান। আরও জরুরি একটি এমন পরিচয় পত্র যা ব্যবহার করে পরিযায়ী শিশুশ্রমিক বা পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবারের শিশুরা দেশের বিভিন্ন জায়গায়, কোনওপ্রকার স্কুলছুট দশার সম্মুখীন না হয়ে স্কুলে ভর্তি হতে পারে।   

সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির, বিভাজনের রাজনীতির, অপরায়নের রাজনীতির প্রকোপে পরিযায়ী শ্রমিকদের “অপর” হিসাবে দেখেন স্থানীয় মানুষও। কখনও কখনও সেই স্থানীয় মানুষ পরিযায়ী শ্রমিকের সমবিত্তেরই, একই শ্রেণির তো বটেই। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা থেকে হরিয়ানায় গিয়ে আবর্জনা তোলার কাজ করতেন পরিযায়ী শ্রমিক সাবির মল্লিক। এক বছর আগে বয়স ছিল ২২ বছর। গত ২৭ অগাস্ট ২০২৪, গরুর মাংস খাওয়ার সন্দেহে তাঁকে কিছু স্থানীয় লোক লাঠি, রড দিয়ে পিটিয়ে খুন করে। সাবির মল্লিকের খুনের ঘটনা গো-রক্ষকদের অকথ্য ধর্মোন্মাদনার পরিণতি ঠিকই, আবার একই সঙ্গে “পরিযায়ী” শ্রমিকের “স্থানীয়” শ্রমজীবীদের কেউ না হয়ে উঠতে পারার পরিণতিও বটে। 

শেষ দফায় উল্লেখ করা দরকার অবিশ্বাস্য এক বাস্তবতার কথা— পরিযান আয় বাবদ কী দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমবাহিনীকে? 

ন্যাশানাল সাম্পল্‌ সার্ভের ৭৮তম রাউন্ডের অন্তর্গত মাল্টিপ্‌ল্‌ ইন্ডিকেটর সার্ভে (এমআইএস) ২০২০-২১ অনুযায়ী, পরিযায়ী শ্রমিকদের আয়ের ধরনকে বুঝতে হলে তিনটি বিষয় লক্ষ করা জরুরি- পরিযায়ী হওয়ার পর আয়ের বৃদ্ধি, আয় হ্রাস, আয় অপরিবর্তিত। এমআইএস ২০২০-২১ রিপোর্টে দেখা গেছে যে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে পরিযানের আগে থেকেই উপার্জনশীল শ্রমিকদের (শেষ ইউজুয়াল প্লেস অফ রেসিডেন্স (ইউপিআর)-এ উপার্জনকারী পরিযায়ী মানুষদের) আয় পরিযায়ী হওয়ার পর কমেছে— ৫৬.৪%। পশ্চিমবঙ্গের মাত্র ৩৩% পরিযায়ী শ্রমিকের পরিযানের ফলে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ১০.৬% পরিযায়ী শ্রমিকের আয় তাঁদের শেষ ইউপিআর-এর মতোই রয়েছে। ভারতের জাতীয় ক্ষেত্রে সমষ্টিগত হিসাব দেখাচ্ছে যে, পরিযানের ফলে ৪৬.৫ শতাংশ পরিযায়ী মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, ৩০ শতাংশ শ্রমিকের আয় হ্রাস পেয়েছে এবং ২৩.৫ শতাংশ পরিযায়ী মানুষের আয় পরিযানের পরও পরিবর্তিত হয়নি। জাতীয় ক্ষেত্রে পরিযান-পরবর্তী আয়ের অবস্থা হতাশাজনক হলেও, পশ্চিমবঙ্গে তা অত্যাধিক হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হল, এ রাজ্যের আর্থিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রটি শ্রমিকের জন্য আদৌ অনুকূল নয় যে সে বাসস্থানের বেশি আয় ত্যাগ দিয়ে ভিন রাজ্যে গিয়ে কম আয় করছে? বেশ কিছু ক্ষেত্রে চাষাবাদ বা ঘরের ব্যবসার দায়িত্ব পরিবারের বাকিদের উপর রেখে দিয়ে, শ্রমিকেরা বাইরে যাচ্ছেন বাড়তি রোজগার করতে, কিন্তু ভাল সংখ্যকের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য নয়। 

মোটের উপর পুঁজিবাদী বন্দোবস্তে “পরিযান” অবধারিত হলেও, তাকে অবধারিতভাবে “উৎপাদনশীল”, “ইতিবাচক”, “গতিশীল” ইত্যাদি শব্দে বিশেষিত করা যাচ্ছে না। গোটা উৎপাদন কাঠামোটাই যেহেতু শ্রমিকদের শুষছে বলে গতিশীল থাকছে, সেহেতু পরিযান তার যাবতীয় “স্বাভাবিকত্ব” নিয়েও শ্রমিকদের শোষণের বিশেষ রীতি চালু করবেই। এমতাবস্থায়, পরিযায়ী শ্রমিকের মজুরি, ছুটি, কর্মঘন্টা, প্রাপ্য রেশন, বাসস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের অধিকারগুলি যাতে উপরন্তু দুর্দশার কবলে না পড়ে, বরং সেসব অধিকার রূপায়নের মানোন্নয়ন ঘটে, শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের জীবনের মানোন্নয়ন ঘটে সেদিকে নজর দিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম ও আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া জরুরি। একইসঙ্গে জরুরি পরিযানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, মানবপাচারের মতো উৎপীড়ন প্রতিরোধের সংগ্রাম এবং রাজ্যের, দেশের অর্থনীতিকে “সভ্য” সমাজের পদবাচ্য করে তোলার সংগ্রাম বহাল রাখা।  

তথ্যসূত্র:
১) মিস্ত্রি, অভিজিত (২০২১), মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কারস ফ্রম ওয়েস্ট বেঙ্গল সিন্স ১৯৯১ ফ্রম দি লেফট টু টিএমসি গভর্নমেন্ট, ভল. LVI, নং ২৯, ১৭ জুলাই ২০২১, ই পি ডব্লু
২) ন্যাশানাল সাম্পল্‌ সার্ভের ৭৮তম রাউন্ডের অন্তর্গত মাল্টিপ্‌ল্‌ ইন্ডিকেটর সার্ভে (এমআইএস) ২০২০-২১


এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল


প্রকাশের তারিখ: ১২-সেপ্টেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org