সিপিআই(এম)-এর একটি প্রতিনিধি দল এমন একটি সময়ে চীন সফরে গিয়েছিল যখন একই সঙ্গে গোটা বিশ্ব ও চীন অসাধারণ সব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে। সেপ্টেম্বর মাসের ২৩ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে আমাদের ৬ জনের প্রতিনিধি দল পরিদর্শন করেছেন বেজিং, হুবেই ও ঝেজিয়াং প্রদেশ।
আমি প্রথম চীনে যাই ৪০ বছর আগে, ১৯৮৫ সালে। তখন গিয়েছিলাম আন্তর্জাতিক যুব সমাবেশে অংশ নিতে। আমি আবার চীনে যাই এই শতাব্দির প্রথম দশকে, এবং তখন আশ্চর্যজনক সব পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলাম। বেজিংয়ের তিয়েন আন মেন স্কোয়ারে ভূগর্ভস্থ কালচারাল কমপ্লেক্স— ন্যাশনাল সেন্টার ফর পারফর্মিং আর্টস, যা এশিয়ার সর্ববৃহৎ থিয়েটার কমপ্লেক্স— লোকমুখে যাকে ডাকা হয় জায়ান্ট এগ বা বিশাল ডিম নামে, সেটি স্থাপত্যবিদ্যার সূক্ষ্মতার একটি নজরকাড়া উদাহরণ। জায়গাটা এতই বড় যে সেখানে এক সঙ্গে চার-পাঁচটি বৃহৎ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। পরিকাঠামোর উন্নয়নে উদ্ভাবন ক্ষমতা এবং প্রাণবন্ত সংস্কৃতি গড়ে তোলায় চীনের ক্ষমতা কতদূর, এই সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সটি তারই প্রমাণ। সেবার পরিদর্শনের সময়ে আমি ভালভাবে জায়গাটার চারপাশ ঘুরে দেখেছিলাম এবং পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। এবার সেখানেই আমরা ভায়োলিন-গিটারের একটি চিত্তাকর্ষক সঙ্গীতানুষ্ঠান উপভোগ করেছি।
২০২১ সালটা ছিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ। সে বছর শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসাবে সিপিসির সিদ্ধান্ত মোতাবেক একটা বিরাট জনকল্যাণকর কর্মসূচি কার্যকর করা হয়েছিল এবং সেই কর্মসূচি গোটা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সেবার ৮০ কোটি মানুষকে চীন তুলে এনেছিল দারিদ্রসীমার ওপরে; যে দারিদ্রসীমা চিহ্নিত করে দিয়েছিল বিশ্ব ব্যাঙ্ক। প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, চীনের এই উদাহরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং রাজ্যের বস্তুগত পরিস্থিতির বদলানোর প্রয়াসে, সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বাধীন কেরলের বাম ও গণতান্ত্রিক সরকার একটা প্রগতিশীল উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ হল, চরম দারিদ্রের অবসান ঘটানো। নভেম্বর মাসের মধ্যে কেরালাই হবে ভারতের প্রথম রাজ্য যেখানে চরম দারিদ্রের অবসান ঘটানো হবে।
চীনের পার্টির শতবর্ষে বেজিংয়ে ১৬ জুলাই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একটি মিউজিয়ামের উদ্বোধন করা হয়। একটা দেশের ও একটা পার্টির ইতিহাসকে কীভাবে তুলে ধরতে হয় আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে, এই মিউজিয়াম তারই উদাহরণ। এই মিউজিয়ামে পাওয়া যাবে সিপিসির দীর্ঘ এক শতাব্দির যাত্রাপথের সব কাহিনি, সেই পার্টির গঠনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের সাফল্য পর্যন্ত। এই সবই উপস্থাপিত করা হয়েছে ডিজিটাল ও কৃত্রিম পরিবেশ সৃষ্টির হাতিয়ারের সাহায্যে, যাতে করে পুরো জিনিসটাই একেবারে জীবন্ত বলে মনে হয়।
সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক ক্ষমতার জোয়াল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য সিপিসির সংগ্রাম, সংগ্রামের বিভিন্ন পর্বে, বলা যায় একেবারে গোড়ার যুগ থেকে শুরু করে, পার্টি যেসব রণনীতি ও রণকৌশল কাজে লাগিয়েছিল, তার সবকিছুই উদাহরণ সহযোগে দেখানো হয়েছে। মাও জে দংয়ের নেতৃত্বের পর্ব, কুয়োমিনতাংয়ের সঙ্গে জোট, ১৯২৭ সাল থেকে দলে ভাঙন ও সংগ্রাম, লং মার্চ, মহান আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বিপ্লবের বিজয়, দেঙ শিয়াও পিংয়ের নেতৃত্বে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ, পরে জিয়াং জেমিন ও হু জিনতাওয়ের নেতৃত্বে আধুনিকীকরণ— সবই প্রদর্শিত হয়েছে মিউজিয়ামে। শেষ হয়েছে ২০১২ সাল থেকে পার্টিতে ও দেশে শি জিনপিংয়ের বর্তমান পর্বের নেতৃত্বের পর্বে এসে।
এই মিউজিয়ামে রয়েছে ৪৫৪৮টি প্রদর্শ সংগ্রহ। এর মধ্যে রয়েছে কার্ল মার্কসের ব্রাসেলস নোটবুক, চীনের গণ-প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পর্ব ঘোষণার সময় মাও জেদং যে কোট ও টুপি পরেছিলেন সেগুলি, মাওয়ের নিজের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, চেন ওয়াংদাওয়ের করা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর চীনা অনুবাদ, লং মার্চের সময় ব্যবহার করা বেল্ট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ৩১ নম্বর পদাতিক রেজিমেন্টের পতাকা যা চীনের বাহিনী তাদের হারিয়ে দখল করেছিল।
এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল
এই সফরে বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সিপিসি নেতৃত্বের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা। সেই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন দলের পলিটব্যুরো সদস্য লি শুলেই। সেই বৈঠকে সিপিসি ও সিপিআই(এম)-এর মধ্যে গভীর ও দীর্ঘকালীন সম্পর্কর ওপর জোর দেওয়া হয়। দুই দলের পক্ষ থেকেই এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীন মার্কিন রাষ্ট্র নিজেদের আধিপত্য কায়েম করার জন্য একমেরু বিশ্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ‘দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলি’— উন্নয়নশীল দেশগুলিকে— এর প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে। এই প্রসঙ্গে, তিয়ানজিনে শাংহাই কো-অপারেশেন অর্গানাইজেসনের ২০২৫ সালের শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অংশগ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
এই বছরটা ভারত ও চীনের মধ্যে কূটনেতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৭৫ তম বার্ষিকী। এসসিওতে দু-দেশের সহযোগিতা ছাড়াও দুটি দেশই ব্রিকস-এর মধ্যেও তাদের নিজ নিজ ভূমিকা পালন করে চলেছে। আগামী বছরগুলিতে পালা করে ব্রিকসের চেয়ারম্যানশিপের দায়িত্ব পড়বে ভারত ও চীনের ওপর। দুই দলের প্রতিনিধিদের আলোচনায় এই বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে যে, ভারত ও চীনকে তাদের মধ্যে থাকা সমস্যাগুলির অবশ্যই আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। ভারত ও চীনের সম্পর্কের উন্নতি হলে তাতে শুমধুমাত্র দুটি দেশই উপকৃত হবে না, তা বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা ও প্রগতিতেও ভূমিকা রাখবে। সুতরাং দুই দেশকে ধৈর্যের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট প্রয়াস চালাতে হবে যাতে দু-দেশের সীমান্তে উত্তেজনা কমিয়ে আনা যায়। এটা ঘটনাচক্রে খুবই ভাল ব্যাপার যে, আমাদের সফরের সময় এই লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঘটছিল, যেমন ভারত ও চীনের মধ্যে সরাসরি উড়ান পরিষেবার শুরু।
যখন শুল্ক সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের প্রায় সব দেশকে হুমকি দিচ্ছেন এবং তাদের ওপর হামলা করছেন, তখন চীন অবিচলভাবে তার বিরোধিতা করছে এবং দৃঢ়ভাবে এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। এর ভিত্তি রয়েছে চীনের অর্জিত অর্থনৈতিক শক্তি এবং সিপিসির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর ওপর। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ছাড়াও, আলোচনায় এসেছে সেই সব আঞ্চলিক পরিস্থিতি যেখানে চীন ও ভারত প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি।
আমাদের সফরের স্মরণীয় ঘটনা হল মাও জেদঙ-এর সমাধিস্তম্ভ পরিদর্শন। সেখানে সুগন্ধির সাহায্যে তাঁর দেহ সংরক্ষণ করা রয়েছে এবং সেই দেহে কোনও ক্ষয়ের চিহ্ন নেই। সেখানে গিয়ে আমরা শ্রদ্ধা জানিয়েছি। সেখানে দর্শকদের জন্য রাখা সরকারি খাতায় সিপিআই(এম)-এর পক্ষ থেকে কয়েক লাইন লেখার সুযোগ পাওয়াটা ছিল আমাদের একেবারে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা। কমরেড মাও জে দঙ এবং অন্যান্যদের নেতৃত্বে চীনা কমরেডদের সাহস তাঁদের সবার কাছেই অনুপ্রেরণার এক চিরস্থায়ী উৎসস্থল যাঁরা লাল পতাকা উঁচুতে তুলে ধরেছেন এবং শোষণমুক্ত পৃথিবী গড়ার জন্য লড়াই করছেন।
ভাষান্তর: সুচিক্কন দাস সূত্র : পিপলস ডেমোক্রেসি
প্রকাশের তারিখ: ১৬-অক্টোবর-২০২৫ |