সোবিয়েৎ দেশের গৃহযুদ্ধে বিশ্বের শ্রমজীবী জনগণ

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ
তিনি লিখেছেন যে-সকল ভারতীয় সৈন্য ব্রিটিশ সেনাদল ত্যাগ করে এসেছিলেন তাঁদের সঙ্গে ইরানী বিপ্লবীদের ও রুশ কমিউনিস্টদের নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠনের চেষ্টা হয়। এই চেষ্টা সফল হয়েছিল। ভারতীয় সৈন্যরা ছিলেন সীমান্তের পাঠান। রাইফেল হাতে নিলে তো তাঁরা চিরদিনই দুর্ধর্ষ ছিলেন। এবার আন্তর্জাতিক ব্রিগেডে যোগ দিয়ে মেশিনগান প্রভৃতি উচ্চতর গ্রামের যন্ত্রগুলির ব্যবহারেও তাঁরা খুব তাড়াতাড়ি পারদর্শী হয়ে উঠলেন। বৃটিশ সৈন্যদলে তাঁদের এসব অস্ত্র স্পর্শও করতে দেওয়া হতো না।

১৯১৭ সালে রাশিয়ার নভেম্বর বিপ্লব সমস্ত পৃথিবীর চোখের সামনে একটি অভিনব সমাজব্যবস্থা তুলে ধরল। এই ব্যবস্থায় মজুরশ্রেণীর রাজনীতিক দল— কমিউনিস্ট পার্টির অধিনায়কত্বে শোষিত, নির্যাতিত ও পর-পদদলিত মেহনতী মানুষেরা পেলেন রাষ্ট্র-ক্ষমতা। কিন্তু রুশ দেশের এই সামাজিক পরিবর্তন সাম্রাজ্যবাদী জগৎকে অত্যন্ত বিচলিত করে তুলল। তারা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল, এই যে নতুন আদর্শ জগতের জনগণের সামনে স্থাপিত হলো তা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের পক্ষে কখনও মঙ্গলকর হতে পারে না।

অন্যদিক হতে জার্মানির সহিত সোবিয়েৎ দেশের সন্ধি স্বাক্ষরিত হওয়ায় মিত্রপক্ষ প্রমাদ গণল। কারণ, জার্মানির অর্ধেক সৈন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিয়োজিত ছিল। মিত্রপক্ষ ভাবল এবার পূর্ণ শক্তিতে তাদের বিরুদ্ধেই জার্মানি যুদ্ধে লেগে যেতে পারবে। এই সম্ভাবনা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদীদের প্রধান চিন্তা হলো কি করে গোড়াতেই জনগণের সোবিয়েৎ শক্তিকে পায়ের তলায় গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। চক্রান্ত শুরু হলো। এই চক্রান্তে যোগ দিল আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জাপান প্রভৃতি চৌদ্দটি শক্তি। আবার সোবিয়েৎ দেশের ভিতরকার শ্বেত প্রতিবিপ্লবীরা মাথা তুলল। নভেম্বর বিপ্লবের ফলে ক্ষমতা ও মুনাফা দু'-ই যারা হারিয়েছিল সেই জমিদার ও ধনিকরা তো শ্বেত প্রতিবিপ্লবী দলে ছিলই, আরও তাতে যোগ দিল ক্যাডেট ও সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারি প্রভৃতি রাজনীতিক দল। তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের নিকট হতে অস্ত্র ও অর্থের সাহায্য পেতে লাগল।

যুদ্ধের সময়ে যে সকল বিদেশী সৈন্য রাশিয়ায় বন্দী হয়েছিল, সোবিয়েৎ সরকার তাদের মুক্তি দিয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। তাদের ভিতর হতে কিছু কিছু সৈন্য বিপ্লবী লালফৌজে যোগ দিলেন। আর খুব বেশির ভাগ যোগ দিল শ্বেত প্রতিবিপ্লবী দলে। অস্ট্রিয়া কয়েক হাজার চেক্ ও স্লোভাক সৈন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠিয়েছিল। তাদের প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্য রুশের হাতে বন্দী হয়। এই সৈন্যরা অস্ট্রিয়ার ওপরে খুশি ছিল না। তারা স্থির করেছিল জারের পক্ষে তারা যুদ্ধে যোগ দেবে। নভেম্বর বিপ্লবের পরে সোবিয়েৎ সরকার চেক্ ও স্লোভাক সৈন্যদের দেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। তারা সাইবেরিয়ার ভিতর দিয়ে দেশে ফিরবে বলে অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের উস্কানিতে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করল। তাদের সঙ্গে যোগ দিল প্রায় বিশ হাজার শ্বেত প্রতি-বিপ্লবী। এই প্রবল গৃহযুদ্ধের বিরুদ্ধে সোবিয়েৎ দেশের শ্রমজীবী জনগণ অসম সাহসের সহিত লড়তে লাগলেন। এই সময়েই লালফৌজ গড়ে উঠল। লেনিনের নেতৃত্বে সোবিয়েৎ দেশের কমিউনিস্ট পার্টি শুধু গৃহযুদ্ধের পরিচালনাই করছিল তা নয়, পার্টি ও সোভিয়েতের সাংগঠনিক কাজও এই সময়ে পূর্ণ মাত্রায় চালু ছিল। গৃহযুদ্ধের ভিতরেই কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস ও সোবিয়েৎ সমূহের কংগ্রেসের অধিবেশন হয়। তৃতীয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের আনুষ্ঠানিক ও প্রথম কংগ্রেসের অধিবেশনও এই সময়েই ১৯১৯ সালে হয়েছিল। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ছিল বিশ্ব কমিউনিস্ট পার্টি অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি সমূহের সমবায়। লেনিন ঘোষণা করেছিলেন, কমিউনিস্ট পার্টি আন্তর্জাতিক মজুরশ্রেণীর পার্টি। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল গঠনের দ্বারা তারই তাৎপর্য প্রমাণিত হলো। লেনিন বললেন, অনেকে বলে থাকেন যে, কমিউনিস্টরা স্বপ্নাচারী। কিন্তু "এই দু' বছরের জগতের ইতিহাস প্রমাণ করে দিয়েছে যে আমরা যা বলছি, তা হাজার বার সত্য” (ডিসেম্বর, ১৯১৯)।

গৃহযুদ্ধের সময়ে যদিও চৌদ্দটি দেশ সোবিয়েৎ দেশকে আক্রমণ ও অবরোধ করেছিল, তবুও এই চৌদ্দটি দেশের তো বটেই, পৃথিবীর আরও বহু দেশের নির্যাতিত মানুষ গৃহযুদ্ধের সময়ে সোবিয়েৎ দেশকে সক্রিয় সাহায্য করেছেন। এই সকল দেশের হাজার হাজার সৈন্য সোভিয়েতের মাটিতে দাঁড়িয়ে লাল ফৌজের সঙ্গে পা মিলিয়ে নভেম্বর বিপ্লবের অবদানকে বাঁচাবার জন্যে যুদ্ধ করেছেন এবং যুদ্ধ করতে গিয়ে জীবনোৎসর্গ করতেও পিছপা হননি। ওপরে আমি চেক্ ও স্লোভাক সৈন্যদের বিপ্লবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথা বলেছি। কিন্তু এই চেক্ ও স্লোভাকদেরই ভিতর হতেও কম পক্ষে দশ হাজার সৈন্য লালফৌজে যোগ দিয়েছিলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল এই কারণে যে নভেম্বর বিপ্লব হতে যা পাওয়া গিয়েছিল সেই পাওয়াকে সমস্ত পৃথিবীর মেহনতী মানুষরা নিজেদের একান্ত পাওয়া হিসাবে ধরে নিয়েছিলেন। লেনিনের শিক্ষায় যা প্রকাশ পেয়েছিল তা থেকে বিশ্বের মেহনতী মানুষরা অনুভব করেছিলেন যে সোবিয়েৎ দেশ তাঁদেরও দেশ, সোবিয়েৎ ভূমির সীমানার ভিতরে যাঁরা জন্মেছেন কিংবা বাস করছেন কেবল তাঁদেরই দেশ নয়। এই চেতনা দুনিয়ার মেহনতী মানুষের মনে না জন্মালে তাঁদের ভিতর হতে কেউ বিদেশ-বিভুঁইয়ের জন্যে এমনভাবে অকাতরে প্রাণ দিতে পারতেন না।

পৃথিবীর কত দেশের কত হাজার হাজার লোক গৃহযুদ্ধের সময়ে সোবিয়েৎ দেশের পক্ষ নিয়ে লড়াই করেছেন। তাঁদের সকলের কথা এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। অনেক অচেনা সৈন্যদের কথা এখনও অজ্ঞাত। খুব সংক্ষেপে আমি শুধু কয়েকটি দৃষ্টান্ত এখানে দিব।

চীনের লি চেং-তুং বলেছেন: “আমার কমরেডরা ও আমি ক্ষুধার তাড়নায় ১৯১৬ সালে পুরনো চীন ছেড়েছিলাম। রাশিয়ায় কাজ করার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলাম এক সঙ্গে আমরা বারো হাজার চীনা মজুর। পেট্রোগ্রাদের কাছাকাছি এক জায়গায় বড় বড় গাছের গুঁড়ি উঠানো-নামানোর কাজ আমরা করতাম। সুখের খোঁজে আমরা দেশ ছেড়েছিলাম, কিন্তু রাশিয়ায় যে-ধরনের শ্রমের কাজ আমাদের করতে হতো তা ছিল প্রায় গোলামির মতো। চীনের ধনিক ডাকুদের মতোই ছিল জার শাসিত রাশিয়ার ধনিক ডাকুরা। রাশিয়ায় ধনতন্ত্রের পতন যখন হলো এই কারণেই তখন আমরা চীনা মজুররাও রুশ মজুরশ্রেণীর নেতৃত্বে মহান নবেম্বর সমাজবাদী বিপ্লবেক বাঁচানোর কাজে যোগ দিলাম। নভেম্বর বিপ্লবের প্রথম দিনগুলিতেই আমরা পেট্রোগ্রাদে বিপ্লবী চীনা মজুর লীগ গঠন করলাম। অনেক চীনা মজুর সঙ্গে সঙ্গেই লালরক্ষী বাহিনীতে (রেড্ গার্ড) যোগ দিলাম।

অন্য সব রুশ শহরে অবস্থিত চীনা মজুরেরাও এই একই পথের অনুসরণ করেছিলেন। মস্কোর বিভিন্ন কারখানায় বিরাট সংখ্যায় চীনা মজুর কাজ করতেন। তাঁরাও তাঁদের রুশ মজুর ভাইদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বৈপ্লবিক সংগ্রামে যোগ দিয়েছেন। চীনা মজুরদের প্রথমে যাঁরা রেডগার্ডে যোগ দিয়েছেন পরে তাঁরা লালফৌজেও শামিল হয়েছেন।”

লি চেং তুং-কে লাল ফৌজের সৈনিক হিসাবে ককেশাসে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে তিনি একাধিক বার সুনাম অর্জন করেছেন। পিং কাই-চ্যাং-এর নেতৃত্বে ওডেসাতেও চীনারা বিপ্লবের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন। 

১৯১৮ সালের ১৩ই জুন তারিখে "কুলিরাও বিপ্লবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন" এই শিরোনাম দিয়ে "ক্রাস্নায়া আর্মিয়া" নামক কাগজে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাতে লেখা হয়েছিল: 

“আগে হতেই ফ্রেঞ্চ, ব্রিটিশ, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ান মজুরদের দ্বারা গঠিত আমাদের ইন্টারন্যাশনাল ব্যাটালিয়ান সমূহ আছে।”

“বিপ্লব চীনা কুলিদেরও জাগিয়ে তুলেছে। দুরবস্থার তাড়না এই চীনাদের রাশিয়ায় টেনে এনেছিল। মর্‌শানস্কিয়ে ইজভেজস্তায়া-র খবর হতে জানা যায় তাঁরা নিজেদের একটি রেজিমেন্ট গঠন করেছেন। এই রেজিমেন্ট এখন দক্ষিণে সমাজবাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত আছেন।”

“এই রেজিমেন্টের সংগঠকের নাম সাং-ফু-ইয়াং। শিশুকাল হতেই দুঃখ ও দারিদ্র্য তাঁর সাথী হয়েছিল। তিনি চীনা সোস্যালিস্ট পার্টির সভ্য। বিপ্লবে তিনি সক্রিয় সহায়তা করেছেন।”

“সোভিয়েতের বিরুদ্ধে রুমানিয়ান আক্রমণের সময়ে তিরাসপুলে আহত সোবিয়েৎ বিপ্লবী সৈন্যদের দ্বিতীয় কংগ্রেসে সাং-ফুং-ইয়াং প্রস্তাব করেন যে তিনি চীনাদের রেড্ বাটালিয়ন সমূহ গড়ে তুলবেন।”

“এই ব্যাটালিয়নগুলিতে সৈন্যদের কেবল গরিব কৃষক ও মজুর খনি-মজুরদের ভিতর হতেই নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন তথাকথিত কুলি......।”

“কঠোর শৃঙ্খলা ও সহনশক্তি তাঁদের উৎসাহী সৈন্যে পরিণত করেছে।”

“ইতিমধ্যেই এই হাজার আট শতের বেশি চীনা সৈনিক লাল ফৌজে আছেন। এ সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।”

“বিশেষ করে সামারা ও সাইবেরিয়ায় সাফল্যের সহিত চীনা সৈন্য দল গঠনের কাজ চলেছে। আশা করা যায় যে তাঁরা কম পক্ষে দশ হাজার লোক আমাদের পাঠাতে পারবেন।

“চীনারা রুশ বিপ্লবের অগ্রগতির ওপরে বিশেষ নজর রাখছেন। তাঁরা প্রায় প্রতিদিনই মিটিং করছেন। চীনা সৈন্য দলকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে অদূর ভবিষ্যতে চীনা বলশেভিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হওয়ার আশা করা যায়।”

লি সি-হুয়াই বাইরেকার আক্রণমকারী ও শ্বেত প্রতিবিপ্লবীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণকারীদের একজন। তিনি বলছেন: আমি শুনেছি বিপ্লবের পূর্ব মুহূর্তে রাশিয়ায় দুই লক্ষ চীনা ছিলেন। আমি তাঁদেরই একজন।

“যুদ্ধ চলাকালীন রাশিয়ার কল-কারখানার মজুর, খনিতে কাজ করার মজুর, রাস্তা বাঁধানোর মজুর ও গাছের গুঁড়ি ওঠানো-নামানোর মজুরের অভাব হয়ে পড়েছিল। এই অভাব পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে আমাদের খুব বড় অংশকেই চীনের ভিতরে সংগ্রহ করা হয়েছিল। আমাদের সামান্য মজুরি দেওয়া হতো, খাওয়াও দেওয়া হতো খারাপ। তবুও যে আমরা রাশিয়ায় গেলাম তার কারণ ছিল এই যে আমাদের দেশে আমাদের খাওয়া ছিল আরও খারাপ। এক পেয়ালা ভাত জোগাড়ের মতোও আমরা রোজগার করতে পারতাম না।”

“রাশিয়ায় যে-সব চীনা মজুর কাজ করতেন তাঁদের খুব বেশিরভাগ ছিলেন চীনের উত্তর-পূর্ব প্রদেশগুলির লোক। আমরা সকলে একই বুলিতে কথা বলতাম। এই একই বুলি হওয়ার কারণে আমাদের কাজের অনেক সুবিধা হয়েছিল। রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকা হতে যে-সকল চীনা আন্দোলনকারী আমাদের ভিতরে আসতেন তাঁদের ভাষা আমরা সহজেই বুঝতে পারতাম। পেট্রোগ্রাদ হতে যে-কাগজখানা বার হয়েছিল তার সম্বন্ধেও ওই একই কথা ছিল। একজন চেঁচিয়ে পড়লেই আর সকলে তা বুঝতে পারতেন। আমরা বলশেভিক পার্টিকে লালপার্টি বলতাম, আর লেনিনের প্রত্যেকটি কথা একান্তভাবে বোঝার চেষ্টা করতাম...” ইত্যাদি।

গ্রিগরি ত্রেতিয়াকভ পেং তি-সাঙের অধিনায়কত্বে পরিচালিত চীনা সৈন্যদলের কথা বলেছেন। পেং-তি-সাং কমিউনিস্ট ছিলেন। তিনি কার্যভার গ্রহণ করেছিলেন এস. এম. কিরভের হাত হতে। এই কার্যভার তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়ার সময়ে এস. এম. কিরভ বলেন: 

"রুশ বিপ্লবের বিজয়ের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে আপনারা চীনের মুক্তির জন্যেই সংগ্রাম করবেন। এমন এক সময় আসবে যখন রাশিয়ার মজুরেরা চীনের বীর জনগণের প্রতি তাঁদের ভ্রাত্রীয় হস্ত প্রসারিত করবেন, আর সে-সময়ে চীনের জনগণ তাঁদের নির্যাতকদের হাত হতে মুক্তিলাভ করবেন।"

চীনা যোদ্ধাদের তরফ হতে বলতে গিয়ে কমান্ডার পেং তি-সাং বললেন:

“বিপ্লবী রাশিয়া আমাদের দ্বিতীয় মাতৃভূমিতে পরিণত হয়েছে। আমরা প্রতিজ্ঞা করছি যে আমরা রাশিয়ার জন্যে ও বিপ্লবের স্বার্থে যুদ্ধ করব।”

গ্রিগরি ত্রেতিয়াকভ বলছেন যে, চীনারা তাঁদের কথা রেখেছিলেন।

৮১-নম্বর রেজিমেন্টের রেজিমেন্টাল স্কুলের সেকশন কমান্ডার চুং কিং-লিং আসিজানকে "অর্ডার অফ্ দি রেড ব্যানার”-এর উচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল। ইস্টার্ন ফ্রন্টের ভল্‌চিয়ে নামক গ্রামে ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শত্রুর লাইনের পেছনে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তিনি অসম সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। নিজে আহত হয়েও তিনি দু'জন মেশিনগান চালককে ধরে ফেলেছিলেন এবং একটি মেশিনগানও কব্জা করে নিয়েছিলেন।

সোবিয়েৎ দেশের আরও কত জায়গায় চীনারা যে কত বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন তার তথ্য আজও উদ্‌ঘাটিত হয়নি। ইউরোপের সব দেশের লোকেরা যে রুশ বিপ্লবকে সাহায্য করেছেন তার উল্লেখ আমি আগেই করেছি। আমেরিকাও এই সাহায্য করা থেকে বাদ যায়নি।

অনেক আন্তর্জাতিক সৈন্যদল যে গঠিত হয়েছিল সে কথাও বারে বারে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় সৈন্য দলের কথা কিছুই বলা হয়নি। লালফৌজের অন্তর্ভুক্ত আন্তর্জাতিক সৈন্যদলে ভারতীয় সৈন্যরাও ছিলেন। তাঁরা ১৯১৮ সালে ইরান হতে ব্রিটিশ দখলকার সৈন্যদলের সঙ্গে ট্রান্স-ককেশাসে এসেছিলেন। ব্রিটিশ অফিসারদের মনে সর্বদা এই ভয় ছিল— পাছে ভারতীয় সৈন্যদের মনে লালদের মতবাদের ছোঁয়াচ লেগে যায়। এই কারণে তাঁদের ওপরে কড়া নজর রাখা হয়েছিল। স্থানীয় লোকদের সঙ্গে তাঁদের মেলামেশা সম্পূর্ণ বারণ ছিল।

কিন্তু বৃটিশ অফিসারদের এত সতর্কতাও বিফল হয়ে গেল। বিপ্লবের ধারণাগুলি ব্যারাকের পুরু দেওয়াল ভেদ করেও তার ভিতরে পৌঁছে গেলো। তার ফলে ভারতীয় সৈন্যদের ভিতরে একটা উত্তেজনা দেখা দিল। কিছু সংখ্যক ভারতীয় সৈন্য বৃটিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে লালফৌজে এসে যোগ দিলেন।

নিকোলাই গিকালোর সৈন্যদলে যে-সকল ভারতীয় সৈন্য যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের কথা এখন কিছু কিছু জানা গেছে। এই সকল সৈন্যরা দাগেস্তান ও কাবাদরি পার্বত্য অঞ্চলে লড়াই করতেন। এই দলে একজন ভারতীয় অফিসারের নাম ছিল মুর্তজা আলী। তিনি যে দুর্দান্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন তার জন্যে তাঁর কথা আজও লোকের মনে জাগরুক হয়ে আছে। শ্বেত কসাক প্রতিবিপ্লবীদের মনে তিনি ভীতির প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর সাহস, নির্ভীকতা ও উপস্থিত বুদ্ধির কথা জনশ্রুতিতে পরিণত হয়েছিল।

পিয়াটিগক্স হতে প্রকাশিত "কমিউনিস্ট পথ” নামক কাগজখানা ১৯২২ সালে লিখেছিল:

“নিকোলাই গিকালোর সৈন্যদলে শেষ পর্যন্ত যাঁরা ছিলেন তাঁদের ভিতরে মুর্তজা আলী একজন। তিনি ছিলেন শত্রুর মনে ধোঁকা সৃষ্টিকারী পার্বত্য যোদ্ধা, শ্বেত প্রতিবিপ্লবীদের মনে তিনি ছিলেন মূর্তিমান ভীতি, আর শত্রুর ওপরে তিনি ছোঁ মারতেন ঠিক বাজপাখীর মতো।”

গৃহযুদ্ধের বীর সেনানী গিকালোর ভগ্নী ভেরা ফিয়োদোরোভনা তাঁর ভ্রাতার সৈন্যদলের আন্তর্জাতিক সৈন্যদের সম্বন্ধে অনেক কথা মনে রেখেছেন। তিনি বলছেন: “আজ যখন আমি দু'টি বিশাল ভূমি— সোভিয়েৎ দেশ ও ভারতের মধ্যে প্রীতির বন্ধনের কথা পড়ি তখন আমি অতীত দিনের কথা ভাবি। আমি ভাবি সাহসী ও বিনয়ী আন্তর্জাতিকতাবাদী যোদ্ধাদের কথা। হতে পারে সংখ্যায় তাঁরা কম ছিলেন, কিন্তু সাহসী মুর্তজা আলীর মতো কর্তব্যের নির্দেশে আত্মবলিদানে তাঁরা কখনও পিছ-পা হননি।”

“আমাদের বন্ধুত্ব রণক্ষেত্রের রক্তের মোহরে দৃঢ়ীভূত হয়েছে। জাতিসমূহের ভিতরকার এই বন্ধুত্ব বরাবর অটুট থাকবে।”

ভেরা ফিয়োদোরোভনা গিকালোর লেখা হতে বোঝা যায় যে মুর্তজা আলী আত্মবলিদান করেছেন, খোলাখুলি তিনি বলেননি তাঁর কি হয়েছিল। অন্য এক জায়গায় আমি পড়েছি যে একদিন যুদ্ধ করতে গিয়ে মুর্তজা আলী আর ফিরে আসতে পারেননি।

মানবেন্দ্রনাথ রায় তাঁর “স্মৃতিকথা”য় ভারতীয় সৈন্যদের সম্বন্ধে আরও কিছু তথ্যের উদ্‌ঘাটন করেছেন। এটা অবশ্য তুর্কমানিস্তান অঞ্চলের কথা। তিনি লিখেছেন যে-সকল ভারতীয় সৈন্য ব্রিটিশ সেনাদল ত্যাগ করে এসেছিলেন তাঁদের সঙ্গে ইরানী বিপ্লবীদের ও রুশ কমিউনিস্টদের নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠনের চেষ্টা হয়। এই চেষ্টা সফল হয়েছিল। ভারতীয় সৈন্যরা ছিলেন সীমান্তের পাঠান। রাইফেল হাতে নিলে তো তাঁরা চিরদিনই দুর্ধর্ষ ছিলেন। এবার আন্তর্জাতিক ব্রিগেডে যোগ দিয়ে মেশিনগান প্রভৃতি উচ্চতর গ্রামের যন্ত্রগুলির ব্যবহারেও তাঁরা খুব তাড়াতাড়ি পারদর্শী হয়ে উঠলেন। বৃটিশ সৈন্যদলে তাঁদের এসব অস্ত্র স্পর্শও করতে দেওয়া হতো না। পাঠানরা খুব কষ্টসহিষ্ণু। তাই মরুভূমির যুদ্ধ তাঁরা অনায়াসে চালাতে পারলেন। গৃহযুদ্ধের আরম্ভ হতেই যে-সকল রুশ অফিসার গেরিলা যুদ্ধে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন প্রথমে তাঁরাই ভারতীয় সৈন্যদলের পরিচালনা করছিলেন, কিন্তু অল্পদিনের ভিতরে ভারতীয়দের ভিতর হতেই অফিসার সৃষ্টি করা হলো। এর ফল হলো আশাতীতরূপে ভালো। যে-সকল ভারতীয় সৈন্য তখনও বৃটিশ সৈন্যদলে ছিলেন তাঁদের ভিতর হতে আরও বহুসংখ্যক সৈন্য এসে আন্তর্জাতিক ব্রিগেডে যোগ দিতে লাগলেন। ট্রান্স-ককেশিয়ান রেলওয়ের ক্রাস্‌নোভদ্‌স্ক হতে মার্ভ পর্যন্ত রেল লাইনের ওপরে কড়া পাহারা রাখতে হয়েছিল। এই লাইনে গোলমাল হলে মধ্য এশিয়ায় ককেশাসের তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ইরানের খোরাসান প্রদেশের মাশ্‌হাদ ছিল ব্রিটিশ সেনার একটি ঘাঁটি। তাই, হামলা শুরু হলো মাশ্‌হাদ-আশ্‌কাবাদ রোডের ওপরে। আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের ইরানী বিপ্লবীরা নানা ছদ্মবেশে ইরানের ভিতরে ঢুকে গিয়ে মাশ্‌হাদের পেছন হতেও বৃটিশ সৈন্যের ওপরে নানান রকম উৎপাত শুরু করেছিল। এদিকে ভারতীয় সৈন্যরা মেশিনগান নিয়ে ওৎ পেতে থাকতেন। তাঁরা ব্রিটিশ সৈন্যদের পেলেই অলক্ষিতে আক্রমণ ক'রে বসতেন। সব কিছু মিলিয়ে অবস্থা এই দাঁড়ালো যে এক বৎসরের কম সময়ের ভিতরে সোবিয়েৎ সীমানা হতে ব্রিটিশ সৈন্যরা অপসারিত তো হলোই, ইরানের সমগ্র খোরাসান প্রদেশ হতেও বৃটিশরা তাদের সৈন্য ঘাঁটিগুলি গুটিয়ে নিতে বাধ্য হলো। তুর্কমানিস্তানে বৃটিশের প্ররোচনায় তুর্কমেনরা যে বিদ্রোহ করেছিল সে বিদ্রোহেরও দমন হয়ে গেলো।

আমি মানবেন্দ্র রায়ের 'স্মৃতিকথা' হতে শুধু কিছু তথ্য নিয়েছি, তাঁর লেখার অনুবাদ কোথাও করেনি। রায় আমাদের জানাননি যে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ভারতীয় পাঠান সৈন্যরা কোথায় ছিলেন? তুর্কমানিস্তান ও ট্রান্স-ককেশিয়ায় যে সকল ভারতীয় সোভিয়েতের পক্ষ নিয়ে লড়েছিলেন তাঁদের মধ্য হতে একমাত্র মুর্তজা আলীর নাম ছাড়া আর কোনো নামও আমরা জানতে পারিনি। জানিনা সোবিয়েৎ দেশে আরও কাগজপত্র পড়ার পরে আরও কিছু তথ্য উদ্‌ঘাটিত হবে কিনা।*

* এই লেখার বেশির ভাগ তথ্য In Common They Fought নামক পুস্তক হতে নেওয়া হয়েছে। মস্কোর ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস্ পাবলিশিং হাউস বইখানা ১৯৫৭ সালে প্রকাশ করছেন। - লেখক

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় “স্বাধীনতা” শারদীয় সংখ্যা ১৩৬৯ (১৯৬২) সালে।


প্রকাশের তারিখ: ০৩-আগস্ট-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org