|
আগাগোড়া অসাম্প্রদায়িক আব্বাসউদ্দীনসুখবিলাস বর্মা |
|
লোকসংগীতের জগৎ বিখ্যাত গায়ক ও প্রচারক আব্বাসউদ্দীন আহমেদকে সংগীত জগতের বিখ্যাতজন নানা নামে ভূষিত করেছেন । ‘আমার যুগ আমার গান’ স্মরণিকায় পঙ্কজ মল্লিক বলেছেন, ‘আব্বাস উদ্দীন ছিলেন পল্লীগীতির অপ্রতিদ্বন্দী শিল্পী …তিনি তাঁর জীবনকে বাংলার লোকসংগীতের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।’ হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁকে ‘বাংলার লোকসংগীতের অমর শিল্পী’ বলে অভিহিত করেছিলেন। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন তাঁকে নাম দিয়েছিলেন ‘অঞ্জনা তীরে খঞ্জনা পাখি’। তাঁর এক নিষ্ঠাবান জীবনীকার অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী তাঁকে অভিহিত করেছেন ‘সুরের চারণ’ নামে। তাঁর প্রিয় পত্নী লুৎফুন্নেসা আব্বাসের কাছে তিনি ছিলেন ‘পাখি’। স্ত্রীকে লিখিত অধিকাংশ চিঠিই তিনিও শেষ করেছেন ‘তোমার পাখি’ বলে। আমিও আব্বাসউদ্দীনকে নিয়ে ‘সোপান’ প্রকাশিত বই-এর নাম দিয়েছি ‘গানের পাখি আব্বাসউদ্দীন’। পাখি রূপে তিনি গানকে, বিশেষ করে ভাওয়াইয়া চটকাকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমরা আব্বাসউদ্দীন স্মরণ সমিতির সদস্যরা ২০০১ সালের ২৭শে অক্টোবর রবীন্দ্র সদনে তাঁর জন্মশতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান এবং ২০০২ সালে কলকাতা ময়দানে ‘আব্বাস মেলা’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু করেছিলাম আমার সুর সংযোজনে মিনতি অধিকারীর লেখা গান দিয়ে- সোনার এক পঙ্খি আসিল গাঁও বলরামপুরে জাফর আলি আব্বা তাঁকে দানাপানি দ্যায় রে।। ……………………………………… ………………………………………।। উত্তর-পূর্ব ভারতের করদ মিত্র রাজ্য কুচবিহারের তুফানগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত কালজানি নদীর পারে বলরামপুর গ্রামে ১৯০১ সালের ২৭শে অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন লোকসংগীতের এই পঙ্খি আব্বাসউদ্দীন। ‘স্মৃতির পট’ গ্রন্থে পল্লীকবি জসীমউদ্দীন (১৯০৪-৭৬) কুচবিহারকে ‘রূপকথার দেশ’ হিসেবে অভিহিত করে বর্ণনা দিয়েছেন— ‘বাঙলার প্রান্তে কুচবিহার একটি ক্ষুদ্র রাজ্য। এখানে তখনও জনগণ দুধে-ভাতে খায়। মাঠঘাট ধনধান্যে ভরা। ভাওয়াইয়া গানে আর মনসামঙ্গলের কাহিনীতে সমস্ত দেশ মুখর। এই দেশের সবচাইতে আপনার জন - সব চাইতে শ্রদ্ধার পাত্র, জিন্নাহ নহেন -গান্ধী নহেন, কিম্বা নেহরুও নহেন। এদের একমাত্র ভালবাসার ব্যক্তি রাজাবাহাদুর -কুচবিহারের মহারাজা। ……………রাজাবাহাদুর শুধু মানুষই নন - যেন নররূপে কোনো দেবতা। এঁর রাজ্যে অভাব নাই - কোনো অভিযোগ নাই। গত দুর্ভিক্ষে যখন বাঙলার লক্ষ লক্ষ লোক মৃত্যুবরণ করিল তখনও কুচবিহার রাজ্য ধনধান্যে ভরা।’.২০১৮ তে Cambridge University Press প্রকাশিত “The Mortal God-Imagining the Sovereign in Colonial India” গ্রন্থে অধ্যাপক মিলিন্দ ব্যানার্জী মহোদয়ও রাজাবাহাদুর নররূপে দেবতা - রাজতন্ত্রের এই বৈশিষ্ট্যের কথা বিস্তৃত আলোচনা করেছেন । ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ পুস্তকে আব্বাস তাঁর মনের উপর প্রকৃতির অসীম প্রভাবের কথা বলেছেন। তাঁর ছেলেবেলার দিনগুলো অধিকার করে রেখেছিল প্রাকৃতিক শোভা, গ্রামীন সংগীত ও সংস্কৃতি এবং গ্রামের সহজ সরল জীবনধারা। তিনি লিখেছেন - আমাদের বাড়ির পূর্বে দিগন্ত মাঠ - তারপর বয়ে চলেছে কালজানি নদী। বর্ষায় চেয়ে চেয়ে দেখতাম তার অপরূপ শোভা। সারাটা মাঠ সবুজ ধানে ভরে উঠত। পুবালি বাতাসে সেই ধানে ঢেউ খেলে যেত। …… বলরামপূর স্কুল থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন তিনি। স্কুলের পোশাক ছিল এক প্রস্থ ধুতি শার্ট। প্রাইমারী শিক্ষার পর তুফানগঞ্জ হাই স্কুলে তিনি সংস্কৃত পড়েছিলেন। সংস্কৃতে ব্যাকরণতীর্থ উপাধিও লাভ করেছিলেন। তিনি বলেছেন - অতি ছোটবেলা থেকে গান বাজনার উপর কী নিদারুণ ঝোঁকটাই না ছিল আমার। যাত্রাদলের প্রতিও ছিল প্রবল আকর্ষণ। খরস্রোতা পাহাড়ী নদী তোর্ষার তীরে তীরে গান গেয়ে চলেছে মোষের পিঠে চড়ে দোতোরা বাজিয়ে মোষ চালক মৈশালের দল। তাদের কণ্ঠের সুর ছোটবেলায় আমার কণ্ঠে বেঁধেছিল বাসা। পাগারু নামে এক বৃদ্ধ গায়কের দোতোরা বাজিয়ে ভাওয়াইয়া গান আমাকে খুব টানত। তার বাদনভঙ্গি ছিল অসাধারণ। পাগারুর গান তাঁর বালক মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। বাড়িতে বসত ধলাই মিয়াঁ, পেনকেটু বর্মণ প্রমুখ আধিয়ার কৃষি মজুরদের ভাওয়াইয়া গানের আসর। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে বসা সেই আসরে যোগ দিয়ে গান শিখেছিলেন তিনি। এটাই ছিল কোচবিহার রাজ্যের ঐতিহ্য। প্রধান জনগোষ্ঠী রাজবংশী; তাদেরই এক অংশ ধর্মান্তরিত হয়ে নষ্ট বা ‘নস্য সেখ’ ধর্ম ছাড়া বাকি সব এক রেখে রাজবংশীদের সংগে মিলেমিশে বাস করছে। বিয়ের পরও তাঁর গানের নেশা কেমন ছিল সেকথা লিখেছেন বেগম সাহেবা লুৎফুন্নেসা - বাড়িতে গরুর গাড়ি রয়েছে, কোন ফাঁকে তিনি গরুর গাড়ি জুড়ে বিষহরী, খোনাই যাত্রা, মহুয়া, আলিবাবা হচ্ছে সেখানে সারারাত থেকে গান শুনে বা যাত্রা দেখে সকালে বাড়িতে ফেরেন। তাই এখানে এই পরিবেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভাব হয়নি কখনও। ১৯৮১ সালে আমি যখন বালুরঘাটের জেলা শাসক সেই সময়ে কলকাতার একটি সংস্থা আমাকে এক সেমিনারে ভাওয়াইয়া গানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিষয়ে বক্তব্য রাখার অনুরোধ জানান। কোনও গান খুঁজে না পেয়ে আমি তাদের জানিয়ে দিই যে ভাওইয়াতে এই ধরণের গান নেই কারণ কোচবিহার রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভাবের ঘটনা ছিল অত্যন্ত বিরল। তাই কোনও ভাওয়াইয়া গীতিকার এই বিষয় নিয়ে গান রচনা করেন নি । এমন এক পরিবেশে কৈশোর ও যৌবনের দিন কাটিয়ে আব্বাস গেলেন কলকাতায় বন্ধু শৈলেন রায়ের বিয়েতে। সেখানে সান্নিধ্য পেলেন কে মল্লিক, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন-এর মত আদ্যোপান্ত অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব সহ অসংখ্য হিন্দু গায়ক বাদক ও সংগীত রসিক মানুষের । গ্রামোফোন রেকর্ডে গাইলেন শৈলেন রায়ের লেখা গান ‘কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল ঝরে গো’ এবং সেই সংগে আরও অনেক আধুনিক গান। গ্রামোফোন রেকর্ডের দরজা খুলে গেল। এরপর গাইলেন জসীমউদ্দীনের লেখা অনেক গান - আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে, প্রাণ সখিরে ঐ শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে, আমার হাড় কালা করলাম রে, আমায় ভাসাইলিরে আমায় ডুবাইলিরে অকুল দরিয়ায় বুঝি কুল নাই রে, ও আমার দরদী আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় চড়তাম না, তোরা কে কে যাবি রে জল আনতে, নদীর কুল নাই কিনার নাইরে, ও বাজান চল যাই চল মাঠে লাঙ্গল বাইতে ইত্যাদি সব প্রাণ মাতানো মন মাতানো ভাটিয়ালি গান। গাইলেন নজরুলের ভাটিয়ালি - কুচ বরণ কন্যা রে তোর মেঘ বরণ কেশ, গাঙে জোয়ার এল ফিরে, নদীর নাম সই অঞ্জনা, বন্ধু আজও মনে পড়েরে আম কুড়ানোর খেলা। এ ছাড়াও গাইলেন গিরিন চক্রবর্তীর সারি - নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে; জালালউদ্দীনের - আরে ও ভাটিয়াল গাঙের নাইয়া, ঘরবাড়ি ছাড়িলাম রে; গাইলেন প্রচলিত কিছু ভাটিয়ালি এবং কানাই শীল সংগৃহীত ও প্রাচীন গীতির অন্তর্ভুক্ত অনেক বিচ্ছেদী, দেহতত্ত্ব, গুরুবাদী, মারফতি ও মুরশিদি গান। অমর শিল্পীর সেই সব অমরগীতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য - থাকতে পারঘাটাতে তুমি পারের নাইয়া, আল্লা মেঘ দে পানি দে, বৈঠা জোরে বাও রে বন্ধু, মাঝি বায়া যাও রে, ময়ুরপঙ্খী নৌকা আমার মেঘনার পারে বাড়ি, ও মন গুরু ভজরে ওরে সোনার চান, গুরুর পদে প্রেম ভক্তি হোল না মন হবার কালে, ও সুখের ময়না রে ঘাটের পারে, জলের ঘাটে কদম তলে, প্রাণ বন্ধুর বিরহে আমার, কোন রঙ্গে বাইন্ধাছ ঘরখানা মিছা দুনিয়ার মাঝে। এরই মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর কীর্তন গান - ঐ না মাধবী বনেতে বন্ধু ছিল সই লো বন্ধু আমার কোন বনে লুকালো । এরই মাঝে তিনি গেয়েছিলেন বাংলা সংগীতে নতুন এক নতুন ধারার গান যা তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন কাজী সাহেবের সংগে যৌথ উদ্যোগে ‘ইসলামী সংগীত’ নামে কাজী সাহেবের রচনায় কণ্ঠ দিয়ে। রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে সংগীত সম্পর্কে যে বিরূপ ধারণা প্রচলিত ছিল, ধর্ম ও শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে সংগীতকে যেভাবে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা চলছিল, তার বিরুদ্ধাচারণ করে মুসলিম সমাজকে সঠিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য নজরুল লিখলেন ইসলামী গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’ ও ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এল নবীন সওদাগর’। আব্বাসউদ্দীন সেই গান রেকর্ড করলেন এইচএমভি তে ১৯৩২ সালে। আব্বাসের এই রেকর্ড প্রকাশের সংগে সংগে চারদিকে আলোড়নের সৃষ্টি হোল। এরপর কাজী সাহেব আব্বাসের জন্য লিখে চললেন একটার পর একটা ইসলামী গান - আমি আল্লানামের বীজ বুনেছি এবার মনের মাঠে, এই সুন্দর ফুল এই সুন্দর ফল আর মিঠা নদীর পানি খোদা তোমার মেহেরবানি, ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এল রে দুনিয়ায়, তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে ইত্যাদি । উপরে উল্লিখিত গান গেয়ে যেমন রেকর্ড জগৎ মাতিয়ে তুললেন, তেমনি কলেজ, স্কুল সভা সমিতিতেও তাঁর গান জনপ্রিয় হয়ে উঠল । কিন্তু তাঁর মনে শান্তি ও স্বস্তি নেই, কারণ তিনি তাঁর প্রাণের সংগীত ভাওয়াইয়া রেকর্ড করতে পারেন নি। রেকর্ড কোম্পানিগুলি ভাওয়াইয়া-চটকা গানের রেকর্ডে রাজি হন নি। আব্বাস তাই জেদ ধরলেন যে ভাওয়াইয়া গান করতে না দিলে তিনি অন্য গান রেকর্ড করবেন না। নজরুল সাহেবও এইচএমভি-কে অনুরোধ করলেন আব্বাসকে একটা সুযোগ দেওয়ার জন্য। অবশেষে ১৯৩৯ সালে আব্বাসকে গাইতে দেওয়া হল। তিনি গাইলেন - ‘কি ও বন্ধু কাজল ভোমোরা রে কুন দিন আসিবেন বন্ধু কয়য়া যাও কয়য়া যাও রে’, অন্য পৃষ্ঠায় ‘অকি গাড়িয়াল ভাই হাকাও গাড়ি তুই চিলমারির বন্দরে রে’। রেকর্ড বেরোনোর সংগে সংগে সে কি আলোড়ন। এরপরে আব্বাসকে আর পায় কে? গাইলেন অসংখ্য ভাওয়াইয়া। সারা বাংলা মেতে উঠল। আব্বাস হয়ে উঠলেন ভাওয়াইয়ার চারণ, ভাওয়াইয়া সম্রাট। অবশ্য নজরুলের লেখা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়েও গান গেয়েছিলেন তিনি - হিন্দু আর মুসলিম মোরা দুই সহোদর ভাই, ভারতের দুই নয়ন তারা হিন্দু মুসলমান দেশ জননীর সমান প্রিয় যুগল সন্তান ইত্যাদি । সব কিছু লিখতে গেলে প্রচুর সময় শক্তি প্রয়োজন । সেই জন্যই তাঁর উদ্দেশ্যে লিখিত ‘আব্বাস নামা’ কবিতায় কোচবিহার জেলার চ্যাংরাবান্ধার কবি গীতিকার গায়ক বলেছেন- কি হিন্দু কি মুসলমান ভাই, সগারে ওঁয় দীক্ষাগুরু উয়ার দেখা পথ ধরি আইজ, করমো হামরা যাত্রা শুরু। আর না রে ভাই ‘আব্বাস নামা’ নেকির যায়া নেকনু মেলা মুইও এটি শ্যাস করনু ।
সহায়ক গ্রন্থ- ১)সুরের চারণ আব্বাসউদ্দীন, আবুল আহসান চৌধুরী, সূচীপত্র, ৩৮/২ক বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, ফেব্রুয়ারী, ২০০৫ । ২) গানের পাখি আব্বাসউদ্দিন, সুখবিলাস বর্মা, সোপান, ২০৬, বিধান সরণি, কলকাতা ৭০০০০৬ । প্রকাশের তারিখ: ২৭-অক্টোবর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |