তিলোত্তমা, লিঙ্গবৈষম্য এবং মনুবাদ

দীধিতি রায়
মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা প্রদানের জন্য রাজ্য সরকারের তরফে যে ১৭ দফা গাইডলাইন [রাতের সাথী] দেওয়া হয়েছে তার প্রায় প্রতিটিই মহিলাদের সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এর মধ্যে একটি গাইডলাইনে অদ্ভুতভাবে বলা আছে মহিলারা যাতে যথাসম্ভব কম নাইট ডিউটি করেন তা খেয়াল রাখতে হবে। যৌন নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের নির্দিষ্ট কোনও সময় হয় বলে কি মনে করে রাজ্য সরকার ও প্রশাসন? হয়তো তারা ভাবছেন রাতে ডিউটি না-করলে ধর্ষণ রুখে দেওয়া যাবে! কিন্তু যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ সময় বেছে হয় কি-না আমাদের জানা নেই! এখানে আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে যায়— রাতে একজন মহিলা কোথায় থাকবে সেক্ষেত্রে? তার ঘরে? যেন ঘরের ভিতর মহিলারা সুরক্ষিত সেখানে তাদের ওপর হিংসা সংগঠিত হয় না? ভারতে তথ্য অনুযায়ী ৩২% মহিলা প্রতিদিন গার্হস্থ্য হিংসার সম্মুখীন হন।

চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি মাথার ওপর কালো আকাশ। আশপাশ থেকে নাকে এসে ঠেকছে পচা চামড়ার উৎকট গন্ধ। চারদিকটা ভালো করে বোঝার আগেই ধাক্কা খেলাম কিছু একটায়। বেশ কিছুক্ষণ বাদে বুঝলাম আসলে ওটা মৃতদেহ… পোড়া শরীর... লাশের পায়ে একটা ট্যাগে ‘হাথরাস’ লেখা... আরেকটু পর আমার সামনে দিয়ে ভেসে গেল আরেকটা লাশ… পায়ে লেখা ‘হাঁসখালি’ বুঝতে পারলাম একটা এঁদো ডোবায় ভাসছি... পচা ডোবা… জলে এসে মিশছে যাবতীয় আবর্জনা। হঠাৎ হঠাৎ ভেসে উঠছে একেকটা লাশ… কোনোটা উন্নাও, কোনোটা কাঠুয়া, মধ্যমগ্রাম কিংবা কামদুনি... হাঁসফাঁস করছে শরীর, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে কেউ যেন গলা টিপে ধরেছে… চারদিকে থেকে আসছে অজস্র হাত শ্বাসরোধ করে দিতে… হঠৎ চোখ ধাঁধিয়ে গেল তীব্র আলোর ঝলকানিতে, দুর্গন্ধ আর অন্ধকারের মাঝেও কোত্থেকে আসছে এতো আলো! আরেকটা লাশ এনে ফেল্লো এক্ষুনি। পায়ে ট্যাগ ঝুলছে ‘তিলোত্তমা’ লেখা… তার সাথে সাথেই এলো এক মিছিল... আর শত শত মশাল… মিছিল... তারা সবাই মিলে মশাল জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডোবাকে ঘিরে। গত কয়েকদিন ধরে এরকমের দুঃস্বপ্নই ঘুরে ফিরে আসছে ঘুমের মধ্যে। বুঝি এ-একার দুঃস্বপ্ন নয়, কিংবা নয় নিছকই এক রাতের কথা! আরজি কর-এর পর আমরা অনেকেই ঘুমের মধ্যে দেখে চলেছি এমন-ধারা-দুঃস্বপ্ন। সাথে এ-অনুভূতিও রয়েছে ওই তীব্র আলোর ঝলকানির মতো স্বপ্নের ইঙ্গিত। যে-গণ আন্দোলন চলছে গত একমাস ধরে, যারা সে-আন্দোলনের সাথি সকলেরই দুঃস্বপ্নগুলো এক আর স্বপ্ন-সাধের মধ্যেও কোনও তফাৎ নেই। 

গত এক মাস ধরে সবাই এই নোংরা ডোবাকেই আরও একবার পরিষ্কার করতে চাইছে। পিতৃতন্ত্রের আধিপত্য কায়েমের প্রাচীনতম আবর্জনাকে সরাতে চাইছে। লড়াই করছে রাস্তায় নেমে। কবিতায় লেখা হতো— কয়েক দশকে যেন কয়েকদিন বাঁচা হয় আবার কয়েকদিনেই যেন কয়েক দশকের ইতিহাস রচিত হয়। এখন রাজ্যবাসী কয়েকদিনে কয়েক হাজার বছরের আবর্জনাকে সাফ করার আন্দোলনে নেমেছে। এ-লড়াই কঠিন, হাজার হাজার বছর ধরে গেঁথে থাকা ধারণার বিরুদ্ধে এ-লড়াই। কিন্তু এ-লড়াই বুনিয়াদী।

শ্রেণিবিভক্ত সমাজে প্রথম শ্রম-বিভাজন হয় লিঙ্গের ভিত্তিতে। প্রথম দুর্বল-সবলের বাইনারি [বিপরীত যুগ্মক] তৈরি করা হয় লিঙ্গের ভিত্তিতেই। ফলত লিঙ্গবৈষম্য ঘুচিয়ে লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠার লড়াই লড়তে গেলে সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ে অবহিত থাকতে হবে। আসলে লিঙ্গভিত্তিক শ্রম-বিভাজনের দ্বারা সামাজিক সম্পর্ককে গড়ে তুলতে মূল চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করে পিতৃতন্ত্র। এবং এই আধিপত্যবাদ উদ্বৃত্ত উৎপাদন কার মালিকানায় থাকবে সে-বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজে ও পরিবারে মহিলাদের কাজ কার্যত মূল্যহীন, স্বীকৃতিহীন। বরং সন্তানের দেখভাল করা, পুরুষদের যত্ন নেওয়ার মহৎ গৌরবের নামে তাদের কাজের প্রকৃত মূল্য থেকে চিরকাল বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। এঙ্গেলসেরপরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি বই থেকে আমরা জানতে পারি কীভাবে আদি সাম্যাবস্থা থেকে একের পর এক স্তর পেরিয়ে সমাজে মহিলাদের অধিকার সংকুচিত হয়েছে এবং প্রাথমিক অবস্থায় গোষ্ঠী ও পরবর্তীতে পরিবারই হয়ে উঠেছে শোষণ যন্ত্র। আর এই শোষণকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ও গৌরবান্বিত করা হয়েছে ধর্মের নামে। এবং পরিবারেই একজন মহিলাকে নিজের পরিচয় ভুলে কারুর মা, বোন, দিদি, বউ, মেয়ে হিসাবে বাকিদের সেবা যত্ন করে যেতে হয়— এটাই যেন ‘নিয়ম’। তাই তাদের কাজগুলো আসলে কর্তব্য, স্নেহের মোড়কে ঢাকা পরে যায়। এবং তার কোনও অর্থগত মূল্য থাকে না। যার ফলে শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হয় না। এ-প্রসঙ্গে অর্চনা প্রসাদের মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন— ‘শ্রেণি গঠনের প্রক্রিয়াটি নিজেই চরিত্রে একটি লিঙ্গায়িত প্রক্রিয়া। কারণ পুঁজি ও শ্রমের পারস্পরিক যোগাযোগ নারীর মজুরিবিহীন কাজের উপর ন্যস্ত যা কিনা সামাজিক পুনরুৎপাদনের ভিত্তিটি তৈরি করে।’

মহিলাদের ওপর ‘ডবল শিফট’ শোষণ হয়। একজন মহিলার ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয় তার মূল কাজ হল সংসার করা। সন্তান উৎপাদন করা। সে-কারণেই একজন মহিলাকে ঘরের অন্দরে শোষিত হতে হয়। এবং একজন মহিলা যেহেতু সন্তান উৎপাদনে সক্ষম তাই সে-সক্ষমতাকে হাতিয়ার করে ধরে নেওয়া হয় মেয়েরা দুর্বল এবং তারা কেবল সন্তান ও পরিবারের যত্নআত্তির কাজ করে যাবে। মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হবে তাই মেয়েদের সমকাজে সম-মজুরি জোটে না। তাকে কর্মক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে শোষিত হতে হয় এবং এর সাথে সাথেই আছে তার ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-জাত-শ্রেণিভিত্তিক পরিচিতিগুলো। এই ইন্টারসেকশনালিটির ফলে মহিলারা পুঁজিবাদী  নয়া-উদারনৈতিক অর্থনীতিতে প্রবলভাবে শোষিত হন। ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতন্ত্র সমাজের নিম্ন শ্রেণির ও তুলনামূলকভাবে সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জাতের মহিলাদের বাড়ি থেকে বেরোনোর, কাজ করার ক্ষেত্রে কিছু স্বাধীনতা দিলেও তা নারীমুক্তির সন্ধান দেয়নি। 

ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, যৌন হেনস্থা এগুলোর মাধ্যমে নারীদের ওপর পুরুষরা আধিপত্য কায়েম করতে চায়। মেয়েরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ তাই তাদের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নেই— এই বিধানও দেওয়া হয়েছে আমাদের নানা ধর্ম-শাস্ত্রে। মনু বিধান দিয়েছেন, মেয়েদের পুরুষের পায়ের তলায় থাকাই ভবিতব্য। “বাল্যে পিতুর্বশে তিষ্ঠেৎ পাণিগ্রাহস্য যৌবনে।পুত্রাণাং ভর্তরি প্রেতে ন ভজেৎ স্ত্রী স্বতন্ত্রতাম্‌”, অর্থাৎ একজন নারীর সাথে পুরুষ যা ইচ্ছে করতে পারে। সে শৈশবে পিতা, পরিণততে স্বামী আর বার্ধক্যে পুত্রের অধীন থাকবে। মনুসংহিতায় সরাসরি উল্লেখ করা আছে— “স্বভাব এষ নারীণাং নরাণামিহ দূষণম্‌।অতোহর্থান্ন প্রমাদ্যন্তি প্রমদাসু বিপশ্চিতঃ” (২য়, ২১৩) অর্থাৎ কি-না— ইহলোকে নারীদের স্বভাবই হল পুরুষদের দূষিত করা। অতএব পণ্ডিতগণ স্ত্রীলোক সম্বন্ধে অনবহিত হন না। “অবিদ্বাংসমলং লোকে বিদ্বাংসমপি বা পুনঃ।প্রমদা হু্যৎপথং নেতুং কামক্রোধবশানুগম্‌” (২য়, ২১৪), অর্থাৎ সংসারে সকলেই কাম ও ক্রোধের বশীভূত। তাই বিদ্বানই হোন বা মূর্খই হোন নারীগণ তাঁদের অনায়াসে বিপথগামী করতে পারে। এই কথা থেকে বোঝাই যায়, কোনো যৌন নির্যাতন, যৌন হেনস্থা বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে  কেন মহিলাকেই দায়ী করা হয়। কেন প্রশ্ন তোলা হয় মেয়েটির পোষাক নিয়ে, কেন বলা হয় মেয়েটি কেন অনেক রাতে বাইরে ছিল? কেন মেয়েটি তার পুরুষ-বন্ধুর সাথে ঘুরছিল বাসে? এই মানসিকতার বীজ আসলে বহু শতাব্দী ধরে আমাদের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে মনুসংহিতা-র মতো শাস্ত্রগুলি। আমাদের মনে পরে যায় আরজি কর হাসপাতালের ঘটনাটি সামনে আসার পর কেন কলেজ কর্তৃপক্ষ বলেছিল নির্যাতিতা রাতে ওখানে কী করছিল? তিলোত্তমার চরিত্রের শংসাপত্র লেখেন যারা তারা আসলে কোন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। “বিশীলঃ কামবৃত্তো বা গুণৈর্বা পরিবর্জিতঃ। উপচর্যঃ স্ত্রিয়া সাধ্ব্যা সততং দেববৎ পতিঃ” (৫ম, ১৫৪) অর্থাৎ পতি সদাচারহীন, পরস্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কযুক্ত বা গুণহীন হলেও সতী স্ত্রী সেই পতিকে দেবতার মতোই পূজা করবে। মনুর প্রতিটি শ্লোক আসলেই মহিলাদের সম্মান ও স্বাধীনসত্ত্বার পরিপন্থী। বরং মহিলাদের অসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই যে একজন পবিত্র নারীর কর্তব্য তাও তারা বলে দিতে চায়।

মনুবাদকে আধার করে যে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠেছে তা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। আরএসএস-এর সরসঙ্ঘচালকদের মন্তব্য শুনলেই বোঝা যায় তারা কতখানি নারীবিদ্বেষী। মহিলারা এর সদস্যটুকুও হতে পারেন না, তাদের জন্য রয়েছে রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতি যার মূল স্লোগান মাতৃত্ব। আসলে পিতৃতন্ত্র সামাজিকভাবে,  সাংস্কৃতিকভাবে সমাজের ভীষণ গভীরে প্রোথিত।  

মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা প্রদানের জন্য রাজ্য সরকারের তরফে যে ১৭ দফা গাইডলাইন [রাতের সাথী] দেওয়া হয়েছে তার প্রায় প্রতিটিই মহিলাদের সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এর মধ্যে একটি গাইডলাইনে অদ্ভুতভাবে বলা আছে মহিলারা যাতে যথাসম্ভব কম নাইট ডিউটি করেন তা খেয়াল রাখতে হবে। যৌন নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের নির্দিষ্ট কোনও সময় হয় বলে কি মনে করে রাজ্য সরকার ও প্রশাসন? হয়তো তারা ভাবছেন রাতে ডিউটি না-করলে ধর্ষণ রুখে দেওয়া যাবে! কিন্তু যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ সময় বেছে হয় কি-না আমাদের জানা নেই! এখানে আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে যায়— রাতে একজন মহিলা কোথায় থাকবে সেক্ষেত্রে? তার ঘরে? যেন ঘরের ভিতর মহিলারা সুরক্ষিত সেখানে তাদের ওপর হিংসা সংগঠিত হয় না? ভারতে তথ্য অনুযায়ী ৩২% মহিলা প্রতিদিন গার্হস্থ্য হিংসার সম্মুখীন হন। যদিও এই সংখ্যাটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র কারণ যাঁরা সাহস করে অভিযোগ জানান তাঁদের তথ্যের ভিত্তিতেই এই পরিসংখ্যান। ‘রাতের সাথী’ এ-প্রকল্পটি মূলগতভাবে মনুবাদী। কারণ এ-প্রকল্পটি আদতে মহিলাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রটিকে সঙ্কুচিত করে দেয়। যার ফলে চব্বিশ ঘণ্টার একটা অংশ মহিলাদের জন্যে কাজের জন্যে নেই হয়ে যায়। যে-নির্দেশিকা কর্মসঙ্কোচন থেকে মহিলাদের কর্মহীন করে দেওয়ার পথ প্রস্তুতও করে দিতে পারে। এ-ভাবনার সাথে আরএসএস-এর নারী সংক্রান্ত ভাবনার আশ্চর্য মিল আমরা লক্ষ করতে পারি। ফলে রাজ্য সরকারের এই প্রকল্প নিয়ে আমাদের কেবল সতর্ক রইলে চলবে না। প্রতিবাদও করতে হবে। জানান দিতে হবে যে অপরাধ দমনে ব্যর্থ প্রশাসন কিংবা অপরাধীচক্রের মদতদাতা প্রশাসন অপরাধীদের শাস্তি না-দিতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করছে।

এখনও এদেশে যেহেতু বৈবাহিক ধর্ষণ অপরাধ আইনের আওতাভুক্ত নয় ফলত সেই হিসেব উঠেই আসে না। সমীক্ষা বলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একজন নারী প্রথমবার শ্লীলতাহানি কিংবা হেনস্থার মুখোমুখি হন তার পরিবারের সদস্যদের দ্বারাই! ফলত মহিলারা ঘরে-বাইরে কোথাও সুরক্ষিত নন। মহিলাদের নিজের সুরক্ষার দায়িত্ব আংশিকভাবে নিজের হলেও দায় কোনওভাবেই তার নয়। মহিলার সুরক্ষা কেবল তার আত্মরক্ষার বিভিন্ন পন্থাকে অনুশীলন করার মাধ্যমে সুনিশ্চিত করা যায় না। এর দায় এবং দায়িত্ব গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রের। প্রশ্নটা নারী সুরক্ষার নয়, প্রশ্নটা পিতৃতন্ত্রকে নিকেশ করার এবং নারী স্বাধীনতার।

তাই যে-আন্দোলন, যে-গণজাগরণ গত এক মাস ধরে তিলোত্তমার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলছে তার শ্রেণি চরিত্র ধীরে ধীরে শহুরে মধ্যবিত্ত থেকে ব্যাপ্ত হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে সমাজের বাকি অংশে। এই লড়াই আমাদের কয়েকটি আইনের সংস্কার এবং নতুনভাবে কিছু আইন প্রণয়নের জন্য লড়াই। এই লড়াই আসলে প্রতিটি নারীর, প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষের নিজের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিরূদ্ধে সংগঠিত হওয়ার লড়াই। এই লড়াই মানুষের নিজের সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই এবং এই প্রসঙ্গে আরজি করের ঘটনা, তিলোত্তমার ঘটনা আমাদের কয়েকটা মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। যাকে কেন্দ্র করে আমরা বুনিয়াদী আলোচনাগুলোয় আরেকবার ফিরতে পারি, আবারও তুলতে পারি সেই জরুরি প্রশ্নগুলো, যেগুলো কি-না রাষ্ট্রের অপছন্দের। 

প্রথমত, একজন ডাক্তারের তার কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, একজন ছাত্রীর তার শিক্ষাক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠে আসছে। একজন মহিলার শিক্ষাক্ষেত্রে এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য আইসিসি গঠনের আইন আছে। ঘটনাচক্রে ২০১৩ সালে এই আইনের পূর্ববর্তী আইনটি (GSCASH) পাশ হয়। এই আইনের দশ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ সারা ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে এবং কর্মক্ষেত্রে আইসিসি-র চিত্র কী-রূপ তা আমাদের বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার। পশ্চিমবঙ্গের ২৬টি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে খোদ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজেই আইসিসি আইন মেনে হয়নি। আরজি কর মেডিকেল কলেজেও আইসিসি-র মাথায় প্রিন্সিপাল ছিলেন যা আসলে এই কমিটির বৈধতা বাতিল করে। বহু মেডিক্যাল কলেজের আইসিসি-তে আইনজীবী নেই, ছাত্র প্রতিনিধি নেই। আসলে আইসিসি হল একমাত্র কাঠামো অন্তত যার দ্বারা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ছাত্রীদের, মহিলা-ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের যৌন হেনস্থা রুখতে নূন্যতম ব্যবস্থা। এই আইসিসি-র অকার্যকারিতা আদতে মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে শিক্ষাক্ষেত্রে সুরক্ষাহীনতার চিত্রই তুলে ধরে।

দ্বিতীয়ত, একজন জুনিয়র ডাক্তার বা একজন পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েট ট্রেইনিকে ৩৬ ঘণ্টা টানা কাজ করতে হয়েছে। এবং যে কোনও মেডিক্যাল কলেজে গেলেই বোঝা যায়, জুনিয়র ডাক্তারদের কখনও কখনও টানা ৭২ ঘণ্টাও কাজ করতে হয়। অথচ গত ২০০ বছর ধরে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকারের জন্য লড়াই চলছে। কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষার এই নুন্যতম অধিকার টুকুও এখন নেই!

আমাদের সামনে এখন বহু তথ্য উঠে আসছে। এবং তিলোত্তমার ঘটনার পর আমাদের রাজ্যেই শ্লীলতাহানি ধর্ষণ যৌন হেনস্থা মিলিয়ে প্রায় ২৫টির বেশি ঘটনা ঘটেছে। যেহেতু রাষ্ট্রের কাঠামোর পরতে পরতে পিতৃতন্ত্র মিশে আছে, তাই রাষ্ট্রের মেশিনারিগুলো সেই আধিপত্যবাদকেই টিকিয়ে রাখতে চাইবে। এবং সে-কারণে হাথরাস থেকে কামদুনি প্রতি ক্ষেত্রেই ধর্ষকদের বেকসুর খালাস করে এদেশের বিচারব্যবস্থা। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে বিচারব্যবস্থা শ্রেণি নিরপেক্ষ হয় না। তারা সর্বদা ক্ষমতাশীলের হয়েই কথা বলবে এই শোষণের কাঠামোটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য। আর আমাদের এই শোষণের কাঠামোটাকেই ভেঙে ফেলার লড়াই করতে হবে। “শ্রেণীনিরপেক্ষ কোনও নারীমুক্তির আন্দোলন যেমন আজকের পরিস্থিতিতেও হয় না, বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীমুক্তির সামগ্রিক আন্দোলন যেমন কখনও করা যায় না, তেমনি অন্যদিকে সর্বহারা শ্রমজীবী কিছুটা ক্ষমতার অধিকারী হলেই নারীসাম্যের পক্ষ স্বাভাবিকভাবেই অবলম্বন করবে এমনটা নয়। তার চেতনারও বিকাশ চাই।”

আর শ্রেণি সংগ্রাম ব্যতীত লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠার অন্য কোনো পথ নেই। সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যমেই নারীমুক্তি সম্ভব। আমাদের চারদিকে যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন চলছে তার চরিত্রকে স্বীকার করেই এ-আন্দোলনকে প্রত্যক্ষ, যৌথ, সংগঠিত প্রতিরোধের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মহিলাদের স্বাধীনতার লড়াই আসলে সমাজ বদলের লড়াইয়ের মধ্যেই নিহিত।


এ-লেখায় আরজি কর কাণ্ডকে কেন্দ্র করে চলা গণ-আন্দোলনের লিঙ্গ-রাজনীতির দিক নিয়েই নিয়ে কেবল কথা বলা হয়েছে। পুঁজি-রাষ্ট্র-শাসক-দুর্নীতির আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ে কোনও কথা নেই। যদিও আরজি কর কাণ্ডের পেছনে এই আন্তঃসম্পর্কের চরিত্র বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি বিষয়। তা আলাদা একটি লেখার বিষয়।


প্রকাশের তারিখ: ১৭-সেপ্টেম্বর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org