‘তিলোত্তমা’ আন্দোলনের উৎস সন্ধানে

অশোক ভট্টাচার্য
পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে শাসক ও বিরোধী- দুটি দলের মধ্যে রয়েছে এক বাইনারি রাজনীতি। রাজ্যের শাসনে আসীন দলটির কোনও মতাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক- রাজনৈতিক অবস্থান নেই। রাজ্যের বিরোধী দলটির রয়েছে একটি মতাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক অবস্থান, যার ভিত্তি অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ এবং তারা চায় দেশে ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে। এই দুটি দলই তীব্রভাবে বামপন্থা বিরোধী। দুটি দলই উৎসাহিত করে থাকে দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয়কে।

তিলোত্তমার ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন দ্রুত লিঙ্গবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে, যা মূল্যবোধের অধঃপতন ও সামাজিক অবক্ষয়ের সঙ্গে যুক্ত। এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক সারবত্তা। এই আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত হলেও এর মধ্যে আন্দোলনের স্পৃহা আছে, আছে এক সজীবতা। আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ যেমন একটি মাত্র বিষয় নিয়ে সৃষ্টি হয়নি, তেমনি তা এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। এই ক্ষোভ দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত। পুঞ্জীভূত ক্ষোভের সর্বোচ্চ পর্যায় এই আন্দোলন। পুঞ্জীভূত ক্ষোভের উৎস সন্ধানেই এই লেখা।

মনে পড়ে গেল প্রায় ৩৪ বছর আগের একটি অভিজ্ঞতার কথা। সম্ভবত সালটি ছিল ১৯৯০। কলকাতা থেকে রাজ্যের তৎকালীন তথ্য-সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদা আমাকে জানালেন, ‘সত্যজিৎ রায় শিলিগুড়ি যাচ্ছেন তাঁর একটি ছবির শুটিং করতে, তুমি তাঁকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা কোরো।’ আমি তখন শিলিগুড়ি পৌরসভার চেয়ারম্যান। সত্যজিৎ রায় তার টিম নিয়ে শিলিগুড়িতে এলেন। বেশ কয়েকদিন যতটা সম্ভব তাঁর সঙ্গে থেকে কিছুটা সহযোগিতা করেছিলাম। একদিন তিনি আমাকে তাঁদের সঙ্গে ছবিটির শুটিং দেখার আমন্ত্রণ জানান। ছবির নাম ‘শাখা প্রশাখা’। কথা প্রসঙ্গে আমি তাঁর কাছ থেকে জানতে চাই ছবিটির থিম সম্পর্কে। তিনি আমাকে বললেন, ‘ভ্যালুজ, বুঝলেন ভ্যালুজ’! মূল্যবোধ, তা কীভাবে অধঃপতিত হচ্ছে এসবই আছে এই ছবিতে। তিনি আমাকে বলেছিলেন তাঁর পরের ছবির পরিকল্পনা সম্পর্কেও, ‘আগন্তক’। পরে দুটি ছবিই বেশ কয়েকবার দেখেছিলাম। একটি ছেলে দুর্নীতির সঙ্গে আপোস করতে পারল না বলে, অফিসের চাকরিটা প্রতিবাদস্বরূপ ছেড়ে দেওয়াকে তার পরিবারের কেউ কেউ মেনে নিতে পারেনি। পরের ছবিতে সত্যি সত্যি মামা কি না ভাগ্নে তা বিশ্বাস করতে পারছে না। মানুষে মানুষে অবিশ্বাস তা সত্যজিৎ রায় আগন্তুক ছবিটিতে তুলে ধরেছেন। বাকিটা সবারই জানা। এটাকেই তিনি মূল্যবোধ ও সামাজিক অবক্ষয় বলতে চেয়েছিলেন।

এই যে সমাজে মেয়েদের ওপর নানা ধরনের শারীরিক, এমনকি বর্বরোচিত বা নারকীয় ঘটনা ঘটে চলেছে, তার পেছনে অবশ্যই রয়েছে পিতৃতান্ত্রিকতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়, রয়েছে রক্ষণশীলতা ও লিঙ্গবৈষম্যের ভূমিকা, সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি।

পৃথিবীর যে কোনও দেশেই সমাজ-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সরকার, রাষ্ট্র - সব কিছুরই একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে। আছে রাজনৈতিক সারবত্তা। এমন কোনও বিষয় সমাজে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মর্মবস্তু নেই। এসব নিয়েই আজ থেকে বছর দশেক আগে বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাতের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বাড়িতে কথা হচ্ছিল। তিনি আমাকে তাঁর দারিদ্র, বৈষম্য, অসমতার একীভূত তত্ত্বের কথা ব্যাখ্যা করে বলছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলা দেশের বৈষম্যপূর্ণ সমাজ ও তার উৎসের কথা। এ প্রসঙ্গেই তিনি বলেছিলেন তার রেন্ট সিকিং তত্ত্বের কথাও। তাঁর তত্ত্ব অনুসারে, বিত্তবান বা সম্পদশালী হওয়া যায় দুভাবে। এক, সম্পদ সৃষ্টি, যা উৎপাদন ভিত্তিক শিল্পের মাধ্যমে হতে পারে। দুই, অন্যের সম্পদ গ্রহণ, অধিগ্রহণ, দখল, বে-দখল, আত্মস্যাৎ, দালালি ইত্যাদির মাধ্যমে হতে পারে। যার সঙ্গে উৎপাদন ও উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টির কোনও সম্পর্ক থাকে না। এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয় বাংলা দেশ সহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে এক ইনফর্মাল বা অন-আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের অর্থনীতি, যা সৃষ্টি করে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন। এবং এক মৌলবাদী অর্থনীতিও। এই অর্থনীতি সমাজে সৃষ্টি করে স্বল্প সংখ্যক বিত্তশালী মানুষকে, যাদের বিত্ত সৃষ্টিতে উৎপাদনের কোনও ভূমিকা থাকে না। অন্যদিকে সৃষ্টি হয় বিপুল সংখ্যক বিত্তহীন বা দরিদ্র মানুষের। এই ব্যবস্থাতেই সৃষ্টি হয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতা ও লিঙ্গবৈষম্য। এই ধরনের ভোগবাদী সমাজে মেয়েদের ভোগ্যপণ্য বলে মনে করা হয়। এই ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে সৃষ্টি হয় সহিংসতা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ। এই সমাজ সুশাসনকে মূল্যহীন করে দেয়। মানুষের মধ্যে নৈতিক অধঃপতন ঘটায়, মূল্যবোধ ও মানুষে মানুষে বিশ্বাসের সম্পর্ক বিনষ্ট করে। এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক মূল্যবোধেরও অবক্ষয় ঘটায়। রাজনীতিকে ব্যবসায়ীদের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে সাংস্কৃতিক চর্চা, মানুষে মানুষে সংহতিবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসবোধ, মানবিক মূল্যবোধ, সুস্থ জীবনবোধ হ্রাস পায়। এই ধরনের ব্যবস্থায় নৈতিকতা বা প্রতিবাদী মানসিকতা এমন ভাবে হ্রাস পায় যাতে মানুষ যে কোনও অন্যায়কে নীরবে সহ্য করে থাকে। সৃষ্টি হয় এক নীরবে সহ্য করার সংস্কৃতি (Culture of Silence)। বহু মানুষ বহু অন্যায়ের প্রতিও দিয়ে থাকে নীরব সম্মতি। এমনকি বড় বড় দুর্নীতির ক্ষেত্রেও। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত দেখিয়েছেন, এইসবের উৎস রেন্ট সিকিং, যা কখনও শাসক দল ও সরকারের সাহায্য ব্যতীত সৃষ্টি হতে পারে না। এসবের পেছনে থাকে দৃশ্যমান বা অদৃশ্য হাত।

এবার আমরা যদি পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের দিকে তাকাই, তবে দেখব বিগত কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে দুর্নীতি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, অনৈতিকতা, অমানবিকতা, মূল্যবোধহীনতার পাশাপাশি চলছে সহিংসতা, নারী ধর্ষণ বা নির্যাতন ইত্যাদি ঘটনা। আমাদের রাজ্য তথা বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা সরকারগুলি একইভাবে অপরাধী বা অভিযুক্তদের আড়াল করছে বা সুরক্ষা দিচ্ছে। অথচ সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে না নির্যতিতাদের, আক্রান্তদের। ফলে পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি রাজ্যে, যে রাজ্যে এক সময় সততা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সুস্থ সংস্কৃতির একটি পরিমণ্ডল ছিল, তাও আজ ধ্বংসপ্রায়। দুর্নীতি ও হিংসা চরমে পৌঁছেছে। এর পেছনেও যেমন অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে, তেমনি আছে রাজনৈতিক সারবত্তাও। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, আমরা এক পাও এগোতে পারব না। এর সাথেই যুক্ত হচ্ছে জমির দালালি, প্রোমোটারি, সিন্ডিকেট রাজ ও ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজনীতি। এর সঙ্গে যুক্ত নারী নির্যাতন ও লিঙ্গবৈষম্য।

পশ্চিমবঙ্গের যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরম্পরা আছে সেই অতীতকে স্মরণ করা এই মুহুর্তে ভীষণ প্রয়োজন। ইতিহাসে দেখা গেছে, বাংলায় যখনই রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অভাব ঘটেছে, তখনই বাংলার সামাজিক অবস্থার অবক্ষয় বা অধঃপতন ঘটেছে। ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়েছে অনেক ধরনের বিচ্যুতি ও অনৈতিকতা।

ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকেই সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেশের অন্য অনেক প্রদেশের চেয়ে বাংলার ছিল কিছু ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য। অন্য অনেক প্রদেশের আগেই বাংলায় সৃষ্টি হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আধুনিকীকরণের প্রভাব। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উত্থান, যাকে বলা হয় বাংলার নব জাগরণ, তা সংঘটিত হয়েছিল। স্বাধীনতার আগে বা পরে বাংলার রাজনীতিতে ধর্ম বা জাত বা বর্ণের কখনও বড় প্রভাব পড়েনি। প্রভাব ছিল সংগঠিত শ্রমিক কৃষকদের আন্দোলনের। ১৯৩৬ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বাংলায় সমাজের প্রগতিশীল অংশের মানুষরা সামিল হয়েছিলেন বিপুল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। কেউ কেউ তাকে বলেছিলেন সাংস্কৃতিক সাম্যতন্ত্রের উত্থান।

'৪০ এর দশকের প্রথম দিকে যাওয়া গেেল দেখা যাবে ১৯৪০ সাল থেকেই তৎকালীন ভারতের সর্ববৃহৎ মহানগর কলকাতার সামাজিক অধঃপতন শুরু হয়েছিল। বৃদ্ধি পেতে শুরু করে দরিদ্র, গরিব ও বস্তিবাসীদের সংখ্যা। ব্যাপক মন্দা দেখা দেয় পাট শিল্পে। ফলে বহু মানুষ হয় কর্মহারা। বৃদ্ধি পায় মুদ্রাস্ফীতি, কর্মহারা মানুষেরা খুঁজে পায়নি অসংগঠিত ক্ষেত্রে বিকল্প কোনও কাজ। সাধারণ মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকার মতো দৈনন্দিন সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়ে উঠেছিল কঠিন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় সৃষ্টি হয় মনুষ্যসৃষ্ট এক দুর্ভিক্ষ। যার জন্যে বহু মানুষকে বাধ্য হতে হয়েছিল গ্রাম থেকে কলকাতা শহরে আসতে। সৃষ্টি হয়েছিল বহু বুভুক্ষ ও নিঃস্ব মানুষের। দেখা দেয় কলেরা, ম্যালেরিয়া, বসন্ত রোগ। কলকাতা মহানগরে ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পায় মৃত্যুর হার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আগ্রাসী জাপানকে রুখতে কলকাতায় আগমন ঘটে কয়েক হাজার ইংরেজ ও আমেরিকান সৈন্য বাহিনীর। এই সময়েই দেখা দেয় বহু বেশ্যালয়, বৃদ্ধি পায় দুর্নীতিগ্রস্ত এবং কালোবাজারিদের সংখ্যা। শুরু হয় কলকাতা তথা বাংলার মানুষের মধ্যে নৈতিক অধঃপতন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়। সেই সময় থেকেই বাংলার মানুষের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সচেতনতা ও ঐক্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। যদিও ১৯৪৫ সালের ২১শে নভেম্বর ডাক দেওয়া হয় আই এন এ দিবস পালনের। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিষ্ট পার্টি ঐক্যবদ্ধভাবে আই এন এ বন্দীদের মুক্তির দাবিতে অভিযান করে ডালহৌসি স্কোয়ারে। ১৯৪৬ সালে ১১ ফেব্রুয়ারি আই এন এ আধিকারিক আব্দুল রশিদকে ৭ বছর কারাদণ্ড প্রদানের বিরুদ্ধে শ্রমিকেরা শুরু করে আন্দোলন। সেই আন্দোলনকে সমর্থন করে এবং তাতে অংশগ্রহণ করে নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্বে ছাত্র সমাজ। ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগষ্ট পৃথক পাকিস্তানের দাবিতে মুসলিম লীগ কলকাতায় ডাক দেয় এক আন্দোলনের। যাকে বলা হয় ডাইরেক্ট  অ্যাকশন। শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। হিন্দু-মুসলমান বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় বহু গৃহ, লুট হয় অসংখ্য দোকান। পরে এই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে নোয়াখালি, খুলনা, বিহার ও পাঞ্জাবে। যা অব্যাহত ছিল ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। কলকাতার ওই দাঙ্গায় সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও নির্যাতিতা হয়েছিলেন উভয় ধর্মের মহিলারা। বহু মহিলা ধর্ষিতা হয়ে খুন হয়েছিলেন। বাদ ছিলেন না সন্তানসম্ভবা নারীরাও। ১৯৪৬ সালে এই সমস্ত ঘটনা ঘটতে পেরেছিল একদিকে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মানুষের ঐক্য দুর্বল হওয়ার ফলে এবং অন্যদিকে মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অধঃপতনের কারণে।

বাংলা বা পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ যে একটি ব্যতিক্রমী রাজ্য ছিল তা দেখা যায় এ রাজ্যের রাজনীতিতে ধর্ম ও জাতপাতের প্রভাব কম থাকার মধ্য দিয়ে। এক্ষেত্রে সব চাইতে বড় ভূমিকা ছিল বামপন্থীদের শ্রেণি আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের। যদিও ১৯৭২ সালের পর থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মন্ত্রিসভার সময় বিনষ্ট হয় বাংলার গণতন্ত্র ও রাজনীতিতে মূল্যবোধ। সেই সময়ে নানা ধরনের হিংসার ঘটনার কথা আমরা জানি। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও। পরে বামফ্রন্ট সরকারই বাংলায় গণতন্ত্র ও সংস্কৃতির পুনরুত্থান ঘটিয়েছিল। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গণতন্ত্র ও রাজনীতিতে মূল্যবোধ, জনগণের প্রতি রাজনীতিবিদদের মমত্ববোধ, সুস্থ জীবনবোধ, পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ, আদর্শভিত্তিক রাজনীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা।

এই লেখাটির শুরুতেই ভ্যালুজ বা মূল্যবোধের কথা লিখতে গিয়ে এর অবক্ষয় বা অধঃপতনের উৎস সন্ধানে কিছু কথা উল্লেখ করেছিলাম। এবার লেখাটির শেষের দিকে এসে সাম্প্রতিক সময়কালের কিছু প্রসঙ্গে আসতে চাইছি। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে কাস্ট বা জাতের প্রশ্নটা প্রথম আনে ২০০৯ সালে তৃণমূল কংগ্রেস দল। নির্বাচনী রাজনীতিতে ধর্মের বিষয়টি প্রথম আনে বিজেপি, ২০১৯ সালে। বাংলার রাজনীতিতে এই দুটোকেই ব্যতিক্রমী বলা যেতে পারে। এই ব্যতিক্রমের দায় অবশ্যই তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি, দুটি দলের। আজ রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অধঃপতন ও অবক্ষয়ের দায়ভার অবশ্যই এই দুটি দলের।

পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে শাসক ও বিরোধী- দুটি দলের মধ্যে রয়েছে এক বাইনারি রাজনীতি। রাজ্যের শাসনে আসীন দলটির কোনও মতাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক- রাজনৈতিক অবস্থান নেই। রাজ্যের বিরোধী দলটির রয়েছে একটি মতাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক অবস্থান, যার ভিত্তি অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ এবং তারা চায় দেশে ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে। এই দুটি দলই তীব্রভাবে বামপন্থা বিরোধী। দুটি দলই উৎসাহিত করে থাকে দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয়কে।

তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেই রাজ্যে দাপট বা দমন পীড়নের রাজনীতি শুরু করে। তারা প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে লুম্পেন বা দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতিকে, সাথে সাথে সৃষ্টি হয়েছে উচ্চস্তরে দুর্নীতি। এই দলটি এমন কিছু নীতি বা বিশ্বাসকে অনুসরণ করে চলেছে যা অতীতে বাংলায় কখনও অনুসরণ করা হয়নি। যেমন, তারা এ রাজ্যে চালু করেছে স্তাবকতা, নেত্রী পূজা, এককেন্দ্রিকতা এবং অসহিষ্ণুতার রাজনীতি। যা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরিপন্থী, যা প্রশ্রয় দেয় সংস্কৃতিহীনতা ও মতাদর্শহীনতাকে। তারা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়। অপরাধীদের আড়াল করে তারা। দলটি চলে নেত্রীর একক ইচ্ছায় আর সে জন্যেই নির্মাণ করা হয়েছে নেত্রীর তথাকথিত দেবীসুলভ ইমেজ। আজ রাজ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। মুখে তারা মহিলাদের ক্ষমতায়নের কথা বললেও তারা বিশ্বাসী মহিলাদের ওপর কর্তৃত্বে। তারা মনে করে তাদের সরকার মহিলাদের অনেক ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা প্রকল্পের সুবিধা দেয় বলে মহিলারা বাধ্য তাদের দলকে ভোট দিতে বা মিছিলে আসতে। তৃণমূল কংগ্রেস হুমকি দেয়, মিছিলে না গেলে এই সমস্ত সরকারি সুযোগ সুবিধাগুলি কেড়ে নেওয়া হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই বহু মহিলা এই দলকে সমর্থন করে থাকে। একে কখনও মহিলাদের ক্ষমতায়ন বলা যেতে পারে না।

এই দলনেত্রী প্রথম থেকেই চাইছেন যে কোনও ঘটনার দোষীদের আড়াল করতে, সে যত বড় ধর্ষক বা অপরাধী হোক না কেন। নারী সুরক্ষা তৃণমূল কংগ্রেস দলের অ্যাজেন্ডাতে নেই। মহিলাদের ক্ষমতায়নের কোনও নীতিতে তাদের বিশ্বাস নেই। এ রকম অনেক উদাহরণ দিয়ে এই লেখাটির কলেবর বৃদ্ধি করতে চাইছি না।

নারী ধর্ষণ ও লিঙ্গবৈষম্যের উৎস রয়েছে এখানেই। লড়াইটাকে তাই বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে বৈষম্যবাদী সমাজের, বিশেষ করে লিঙ্গবৈষম্যের অবসানের লড়াই এর মধ্যে। এই লড়াইটা হবে সমাজ পুনরুদ্ধারের (Retrieval of Society) লড়াই। এই লড়াই হবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই এর সাথে সম্পৃক্ত।

পশ্চিমবঙ্গে চলমান লড়াইয়ের প্রকৃতি সামাজিক ও অরাজনৈতিক হতে পারে। এদের অনেকের মধ্যে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থা বা বিশ্বাস না থাকতে পারে। তবে আন্দোলনকারীদের বোঝা প্রয়োজন এর ভেতরের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক সারবত্তাকে। আমরা যারা বামপন্থী, তাদের আরও গভীরে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন এই আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি। পশ্চিমবঙ্গে কোনও সামাজিক ও স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের অভিজ্ঞতা আমাদের কম। সেদিক দিয়ে এই আন্দোলন আমাদের কাছে শিক্ষনীয় হতে পারে। কারণ এই আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে স্বতঃস্ফূর্ততা, সৃজনশীলতা ও আন্দোলন করার একটি স্পৃহা। সর্বোপরি রয়েছে ব্যাপকতম সংখ্যায় মহিলাদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব দান। পশ্চিমবঙ্গের এই চলমান আন্দোলনটিকে আমাদের বুঝতে হবে আরও গভীরে গিয়ে। কারণ এই আন্দোলন কোনও সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক উদ্যোগের ফল নয়।


প্রকাশের তারিখ: ০৪-অক্টোবর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org