|
বস্তি উচ্ছেদ রুখতে যেতে হবে ব্রিগেডেসুদীপ্ত বাগচী |
ছোটো ছোটো আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলে ব্রিগেডের সমাবেশে যেতে হবে। এই সমাবেশ যে বৃহৎ আত্ম (শ্রেণি) পরিচয়ের উপলব্ধি জন্ম দেবে, তা ভবিষ্যতে লাগাতার লড়াইগুলোর জন্ম দিতে পারে যদি আমরা আরও নিবিড়ভাবে বস্তিবাসী মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকি, হয়ে থাকি তাঁদের যন্ত্রণা-আনন্দের শরিক। আসলে প্রান্তিক এই জীবনে অবিরল উচ্ছ্বসিত প্রাণ ধারা বয়ে চলেছে। |
বস্তির মানুষ ব্রিগেডে যাবেন। তৃণমূলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই ব্রিগেডে যাবেন। কলকাতা-হাওড়ার ঠিকা বস্তিবাসী, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্ছেদের চেষ্টার বিরুদ্ধে লড়াকু শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর, বর্ধমান, কাটোয়ার শ্রমজীবী বস্তিবাসী মানুষ ট্রেনে-বাসে-হেঁটে ব্রিগেড যাবেন। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের নামে যে তিন হাজার বস্তিবাসীকে (আপাতত) উচ্ছেদ করার চেষ্টা হচ্ছে, যারা ঘাটাল পুরসভাকে ঘিরে দিয়েছিলেন, তাঁরাও ব্রিগেডে যাবেন। শ্রমিক, চাষী, খেতমজুরের মহাসঙ্গমে শহরের বস্তিবাসী শ্রমজীবী মানুষকে সামিল করানোর দায়িত্ব আজ আমাদের। বস্তিতে বসবাস করেন ছাত্র, যুব, মহিলা-সহ অসংগঠিত শ্রমিক, স্বনিযুক্ত মানুষ, তাঁদের নিজস্ব দাবিতে যেমন ব্রিগেডs যাবেন, তেমনি বস্তির সমস্যা সমাধানের লড়াইতেও ব্রিগেডে যাবেন। বস্তিবাসী মানুষকে নিতে হবে ব্রিগেডে। শহরের সবচেয়ে অবহেলিত অংশই বস্তি। সবচেয়ে অবদমিত, প্রান্তিক জন-অংশ যাঁরা জীবনমানের প্রত্যেক সূচকের নিরিখে সবচেয়ে অনিরাপদ অবস্থায় রয়েছেন। প্রতি মুহূর্তে উৎপাদনের উপকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাদ অসংখ্য মানুষকে তার পেশা থেকে উৎখাত করেছে। আরও বেশি উদ্বৃত্তের সন্ধান স্থায়ী কাজের ধরনের পরিবর্তন ঘটিয়ে জন্ম দিয়েছে কনট্রাক্টচুয়াল, অস্থায়ী কাজের ধরনের। এই ধরনের কাজ যারা করেন তাদের একটা বড় অংশ বাধ্য হন বস্তিতে বাস করতে। পুঁজির শোষণের আদিম সঞ্চয় পদ্ধতি আজকে ভারতবর্ষে কৃষি ও প্রচলিত উৎপাদনের ধরন থেকে উৎখাত করে মানুষকে পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত করেছে। বহু শহরে সর্বহারা এই মানুষগুলোর ঠিকানা হয়েছে সেখানকার বস্তি। জীবনের উপর সব (এমনকি নিজের জীবনের উপর) অধিকার হারানো এই মানুষদের জন্যই বোধহয় প্রলেতারিয়েত শব্দটা প্রিকারিয়েত-এ বিবর্তিত হয়েছে। “নাহি জানে কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে/ দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে/ মরে সে নীরবে।” এই সব মূঢ় মূক মুখে ভাষা দেওয়ার জন্য, এই সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে আশা ধ্বনিত করার দায়িত্ব আমাদের উপর। এই মহান দায়িত্ব পালন করার কার্যভার নিয়েছিলেন জ্যোতি বসু, গণেশ ঘোষ, বঙ্কিম মুখার্জি সহ এরকম আরও অনেক বামপন্থী নেতৃত্ব। ১৯৫৭ সালে বিধানসভায় স্লাম ক্লিয়ারেন্স বিল আনেন বিধানচন্দ্র রায়। ১৯৫৮ সালের মার্চ মাসে এ-নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায়। প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ সমবেত হন বিধানসভার সামনে। বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে মানুষের সেই দাবিকে অস্বীকার করতে পারেনি সেদিন বিধান রায়ের সরকার। পারেনি বস্তি উচ্ছেদ করার বিল কার্যকর করতে। লড়াই ছাড়া মানুষ জাগে না। লড়াই করতে গিয়েই তারা চেনে 'কে ভাই ,কে দুশমন'। বস্তি যত পুরোনো হোক বা নতুন, বস্তিবাসীদের একটাই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা প্রতিদিন ঘটছে - সেটা হল উচ্ছেদ। উচ্ছেদের আশঙ্কায় সারা জীবন কাটে তাদের। আসলে অধিকাংশই তো আর আইনিভাবে স্বীকৃত রেজিস্টার্ড বস্তি নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, জবর দখল এলাকার যে সমস্ত বস্তি গড়ে উঠেছে সেইসব বস্তিগুলোকে সরকার কোনও রকম স্বীকৃতি দেয়নি। আইনি নয় অথচ যেগুলো সরকারের নথির মধ্যে আছে, সেগুলো নোটিফায়েড বস্তি। আর সেন্সাসের সময়ে ৩০০ জন বাস করে কিংবা একসঙ্গে ষাট ঘর রয়েছে এরকম যে সব এলাকাকে সরকার বস্তি বলে আইডেন্টিফাই করতে পারে, সেগুলো আইডেন্টিফায়েড বস্তি। যে ধরনের বস্তিই হোক না, উচ্ছেদ থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছে না। সে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস কিংবা কেন্দ্রের বিজেপি যে সরকারই হোক, নির্বিচারে তারা বস্তি উচ্ছেদ করছে। লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে কলকাতা, দুর্গাপুর, খড়গপুর, হাওড়া, কাটোয়া, মেমারি, কুলটি, বীরভূম বিভিন্ন জায়গায় বস্তি উচ্ছেদ প্রতিরোধ করা গেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধ করা যায়নি। আসলে লুটেরা পুঁজি তার অভিযাত্রায় যে কোনও ধরনের ধান্দা জন্য মরিয়া। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাধারণ ও সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে এই সব পুঁজিপতি ও তাদের লেঠেল বাহিনীর যোগ ঘটায় পুলিশ আর সমাজবিরোধীরা, যারা একসঙ্গে কাজ করছে। যত বস্তি উচ্ছেদ হবে তত সেই সব জমি জমি-হাঙরদের হাতে যাবে। সরকার এই লুটেরাদের জন্য কলকাতা-হাওড়ার ঠিকা টেনান্সি অ্যাক্টকে সেভাবে পরিবর্তন করছে; রাজ্যের অন্যত্রও জমি আইনকে সেভাবে পাল্টেছে। এই লুঠকে প্রতিরোধ করতে গেলে আরও সংগঠিত, ধারাবাহিক, লড়াকু আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী বিকাশের এই পর্বে সংগঠিত উৎপাদন ক্ষেত্র কমছে, টুকরো হচ্ছে, শহর ছেড়ে শহরতলি, গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। শহরের শ্রমজীবী মানুষ পরিষেবামূলক বিভিন্ন কাজে, অসংগঠিত বিভিন্ন পেশাতে যুক্ত হচ্ছেন। এই অসংগঠিত শ্রমজীবী মানুষ যত টুকরো হচ্ছেন ,তত একা হচ্ছেন, অস্থিরতা জন্ম নিচ্ছে ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে। এই মানুষকে যদি ছোটো ছোটো লড়াইয়ের মধ্যে না-আনা যায়, তাহলে এঁরা আরও বিচ্ছিন্ন হবেন, আরও হতাশ হবেন। এই পথ ধরেই লুটেরাদের আক্রমণের সামনে প্রতিরোধের ইচ্ছেটাই কমে যাবে। পরিশেষে ওদের বাহিনীতে পরিণত হবেন বস্তিবাসী মানুষের একটা বড়ো অংশ। এজন্য ছোটো ছোটো আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলে ব্রিগেডের সমাবেশে যেতে হবে। এই সমাবেশ যে বৃহৎ আত্ম (শ্রেণি) পরিচয়ের উপলব্ধি জন্ম দেবে তা ভবিষ্যতে লাগাতার লড়াইগুলোর জন্ম দিতে পারে যদি আমরা আরও নিবিড়ভাবে বস্তিবাসী মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকি, হয়ে থাকি তাঁদের যন্ত্রণা-আনন্দের শরিক। আসলে প্রান্তিক এই জীবনে অবিরল উচ্ছ্বসিত প্রাণ ধারা বয়ে চলেছে। বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ খুবই খারাপভাবে জীবনধারণ করতে বাধ্য হন। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পৌর বাজেটের প্রায় পঁচিশ শতাংশ টাকা বস্তি উন্নয়নে বরাদ্দ হত। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে কলকাতার বস্তিতে মাসে দু-দিন জঞ্জাল পরিষ্কার হত। খাটা পায়খানার মল যেটুকু মাথায় করে বহন করা হত তার বাইরে বাকি মল রাস্তায় ঢেলে দেওয়া হত। তখনও কেরোসিন আর গ্যাসের আলো। জমিদারের আদেশে তিন ফুটের উপর ঘরের গাঁথনি হত কাঁচা। কলকাতার বস্তিতে পরিশ্রুত পানীয় জল, স্নানের জল এল বাম আমলে। বিদ্যুত এল সে সময়ে। ২০১০ সালে মাত্র তিনশো সাতষট্টি টাকায় শয়ে শয়ে বস্তিতে বিদ্যুত সংযোগ করা হয়েছে। আজ ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড রয়েছে, বাপ-ঠাকুদ্দার আমল থেকে বসবাস করছেন এরকম বস্তি নির্বিচারে উচ্ছেদ করছে দুটো সরকার। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় জায়গা জমির কাগজ না-থাকলেও ঘর পাবার যে-অধিকার তা খর্ব করা হয়েছে। আজ বস্তিবাসী মানুষকে উচ্ছেদ করে শহর থেকে অনেক দূরে যেতে বাধ্য করে তাঁদের বেঁচে থাকার অধিকারকে গলা টিপে দেওয়া হচ্ছে। পেশার সঙ্কট এমন জায়গায় গেছে যেখানে সপরিবারে উৎখাত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন রাজ্যে বহু বস্তিবাসী। করোনার সময় থেকে স্কুলছুট বেড়েছে। বেড়েছে ১৪-১৫ বছরের মধ্যে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার ঘটনা। রক্তাল্পতা, অপুষ্টি, অপরিণত মাতৃত্ব সাংঘাতিকভাবে বাড়ছে। বস্তিতে যেহেতু তপশিলী জাতি, উপজাতি, জনজাতি, দলিত ও সংখ্যালঘু মানুষ সবচেয়ে বেশি থাকেন, সেজন্য যেকোনও অর্থনৈতিক আঘাত অনেক বেশি করে এই অংশের মানুষের জীবনে। ব্রিগেড সমাবেশ আদতে শ্রেণির মানুষের সমাবেশ। বিভিন্ন শ্রেণির এ-সমাবেশে বস্তির শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষকেও গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে সপরিবারে আসার জন্য আহ্বান জানাতে হবে। তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হবে, আবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে জীবন সংগ্রামের আর শ্রেণি-সংগ্রামের ময়দানে। প্রকাশের তারিখ: ১৬-এপ্রিল-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |