|
রফীক আহ্মদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত (দ্বিতীয় পর্ব)মুজফ্ফর আহ্মদ |
|
কির্কির পথে তুর্কমেনিস্তানের কির্কিতে একটি দুর্গ আছে। এই দুর্গই যে আমাদের লক্ষ্য হবে তা আর জানতাম না। ষ্টীমার আসার তারিখ যখন আমাদের জানা নেই তখন আমরা স্থির করলাম নৌকাতেই যাব। আমরা আশি জন দু’খানা নৌকায় চড়ে আমুদরিয়ার জলপথে রওয়ানা হলাম। তিরমিজ (এখন উজবেকিস্তান রিপাবলিকের এলাকা) হতে কিছু দূর এগিয়ে গেলে তুর্কমেনদের এলাকা পড়ে। এই এলাকা এখন তুর্কমেনিস্তান রিপাবলিকে পরিণত হয়েছে। সেই সময়ে তুর্কমেনরা বিপ্লবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। আমরা যখন তাদের এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন তারা মাল্লাদের ডেকে নৌকা কূলে ভিড়াতে বলল। কেন তারা আমাদের নৌকা কুলে ভিড়াতে বলছে তার কারণ আমরা বুঝতে পারিনি। একথা আমাদের কল্পনায়ও আসেনি যে ব্রিটিশের অত্যাচারে দেশত্যাগী আমরা– আমাদের কোনও ক্ষতি মুসলিম তুর্কমেনরা করতে পারে। ঘুণাক্ষরেও তাদের মনের ইচ্ছা বুঝতে পারলে নৌকা আমরা আফগান এলাকায় ভিড়িয়ে দিতে পারতাম। নদীর অপর পারে তখনও আফগান এলাকা ছিল। নৌকা তুর্কমেনদের তীরে ভিড়িয়ে ডাঙায় নামা মাত্রই তারা এসে আমাদের চারদিক হতে ঘিরে ফেলল। বলল, “তোমরা এখন এখানেই থাকবে, আমাদের কালান্তর এসে অনুমতি দিলে তবে যেতে পাবে।” আমরা কেউ তুর্কি ভাষা জানিনে। সরফরাজ আমাদের পারসী ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন তুর্কমেনরা কী বলল। 'কালান্তর' শব্দের মানে সর্দার। বুঝতে পারলাম আমরা বন্দী হয়েছি। সেই রাত্রি তুর্কমেনদের পাহারায় আমাদের নদীর কুলেই কাটাতে হল। ভোর হতেই দেখলাম লাঠি হাতে প্রায় এক হাজার তুর্কমেন সেখানে জড়ো হয়ে গেছে। প্রথমেই তারা আমাদের প্রত্যেকের শরীরের ও জিনিস-পত্রের তলাশি নিল। আমাদের নিকটে কোনো হাতিয়ার নেই এই বিষয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা 'হাইকো' 'হাইকো' বলে আমাদের তাড়া করা শুরু করে দিল। ‘হাইকো’র মানে নাকি জলদি চল। আমরা সরফরাজের মারফতে অনেক অনুনয় করে তাদের বোঝালাম যে আমরা ভারতের মুসলমান, ইংরেজের অত্যাচারে জর্জারিত হয়ে দেশত্যাগ করে এসেছি। শুনেই তারা বলল, “ইংরেজ? তারা তো ভালো মানুষ। তাদের নিকট হতেই তো আামরা সাহায্য পাচ্ছি।" আমাদের কোনো কথাই তারা শুনতে চাইল না। তারা ধরে নিয়েছিল আমরা বলশেভিক। মিঞা মুহম্মদ আকবর শাহের চেহারা এমন যে অনায়াসে তাঁকে ইউরোপীয় বলে সন্দেহ করা যায়। তার গায়ের রং শুধু ফরসা নয়, তাঁর চোখও নীল। তুর্কমেনরা আমাদের পশুর মতো তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের পিঠের ওপরে মারও পড়ছিল। দুপুরের সময় আমাদের আশি জনকে একটি কামরায় ঠাসাঠাসি বন্ধ করে দিয়ে তারা সকলে খেতে চলে গেল। কিছু সময় পরে ফিরে এসে আবার আমাদের মার্চ করানো শুরু করে দিল। আমাদের এইভাবে চলার সময়ে গ্রামের ছেলে মেয়ে, বুড়ো-বুড়ী সকলেই বাড়ীর বা'র হয়ে আসছিল এবং প্রত্যেকেই কোনো কিছু দিয়ে একটি আঘাত আমাদের ওপরে হানছিল। তাদের ধারণা ছিল যে তারা ধর্মযুদ্ধের পুণ্য হাসিল করছে। রাত হয়ে যাওয়ায় আমাদের একটি সরাইখানায় আটক করে রাখা হল। তারা বলল, আমাদের নিকটে পয়সা থাকলে আমরা রুটি কিনে খেতে পারি। গ্রামের ছেলেরা রুটি নিয়ে এসেছিল। খুব চড়া দামে তা আমাদের নিকটে বেচল। ক'দিন আমরা এই সরাইখানাতেই থাকলাম। আমাদের ভিতরে অনেকে নামাজ পড়ছিলেন এবং কোরান পাঠ করছিলেন। তা দেখে তুর্কমেনরা বলতে লাগল, “দেখ দেখ, কাফেরেরা নামাজ পড়ছে আর কোরান পাঠ করছে।" এরই মধ্যে এক দুপুর বেলা কয়েকজন মৌলবী সাহেব তাঁদের ছোকরা চেলাদের সঙ্গে নিয়ে ওখানে এলেন। তাঁদের পোশাক ভালো তো ছিলই, চেহারা দেখে মনে হল তাঁরা খানাপিনাও করেন ভালো। তাঁরা আমাদের বললেন, “আপনাদের কিছু জিনিস তো এরই মধ্যে লুঠ হয়ে গেছে, বাকী জিনিসগুলিও আপনারা হারাতে পারেন। ভালো হবে আপনারা যদি জিনিসগুলি আমাদের হাতে সোপর্দ করে দেন।" তাঁরাই জিনিসগুলির পৃথক পৃথক তালিকা তৈয়ার করে নিলেন। আমাদের ভিতরে এমন সব বোকাও কিছু কিছু ছিলেন যারা তাদের টাকা-কড়িও মৌলবী সাহেবদের হাতে সঁপে দিলেন। মৌলবী সাহেবেরা আমাদের জিনিসগুলি উটের পিঠে বোঝাই করে নিয়ে চলে গেলেন। তারপরে আবার আমাদের মার্চ করানো শুরু হল। আমাদের এমন একটি খোলা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল যার চারদিক গাছে ঘেরা। এখানেই আমাদের বিচার আরম্ভ হয়ে গেল। আমাদের গুলি ক’রে মারা হবে এই আলোচনা চলছিল। তা শুনে আমাদের তুর্কি সঙ্গী সরফরাজ কাঁদছিলেন এবং আমাদেরও তিনি বলে দিচ্ছিলেন কী ঘটতে যাচ্ছে। আমাদের ভিতরেও অনেকে কান্না জুড়ে দিলেন। তখন আমাদের নেতা মুহ্ম্মদ আকবর খান চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন "ভাইরা, তোমরা ঘাবড়িয়ো না। কুকুরের মরণ আমরা কিছুতেই মরব না। হিন্দুকুশের দুর্বিষহ কষ্টে যখন আমরা মরিনি তখন এখানেও আমরা মরব না।" আমাদের ভিতরে কেউ কেউ একথাও ভাবছিল যে যখন আমাদের ওপরে ওরা গুলি করতে আসবে তখন আমরা প্রত্যেকেই একজন তুর্কমেনকে সর্বশক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরব। আমাদের গুলির মুখে মৃত্যুর হুকুম হয়েই গিয়েছিল এমন সময়ে ঘোড়ায় চড়ে এক বৃদ্ধ সেখানে এল। এই বৃদ্ধের ঘোড়ার রং সাদা ছিল, তার চুল দাড়ি সবই ছিল সাদা, এমনকি তার পোশাকও ছিল সাদা। বৃদ্ধ ঘোষণা করল: “বন্দীদের নিকটে আফগান সরকারের কাগজ-পত্র পাওয়া গেছে। আমরা যদি এখন তাদের মেরে ফেলি তবে আফগান সরকার আমাদের ওপরে হামলা করতে পারে। আর, এদিকে লাল ফৌজ তো আক্রমণ করবেই। ভালো হবে এই লোকগুলিকে এখন বন্দী ক’রে রাখা।” তুর্কমেনরা এই নির্দেশ মেনে নিল। আমাদের তখন ছোট ছোট দলে ভাগ করা হল এই জন্যে যে আমাদের বিভিন্ন তাঁবুতে বন্দী করে রাখা হবে। এটা কির্কির দুর্গের কাছাকাছি একটা স্থান ছিল। এই দুর্গের এক দিকে আমুদরিয়া, আর এর তিন দিকে দূরে দূরে তুর্কমেনরা তাঁবু ফেলে থাকত। তারও কিছু দূরে ছিল তুর্কমেনদের গ্রাম। এই সকল তাঁবু ও গ্রাম হতে দুর্গ আক্রমণ করার চেষ্টা তখন চলছিল। প্রত্যেক তাঁবুতে গ্রাম হতে খাবার আসত। আমাদের এইসব তাঁবুতে রাখা হল। তাঁবুওয়ালারা রাত্রে বাইরে শুতে যেত। একটি তাঁবুতে আমরা চারজন ছিলাম। রাত্রে শুয়ে পড়লে আমাদের প্রত্যেকের দু'খানা পা তাঁবুর কিনারা দিয়ে বাইরে গলিয়ে দিতে হত। তখন তুর্কমেনরা পা দুখানা এমনভাবে বেঁধে দিত যে পাগুলি চেষ্টা করলে ভিতরে নিয়ে আসা যেত না। আমাদের এই বন্দীদশায় তুর্কমেনরা তাদের খাওয়া হতে আমাদের ভাগ দিত। প্রায় এক সপ্তাহ আমাদের এইভাবে কেটে যায়। আর তিন জনের সঙ্গে যে তাঁবুতে আমি ছিলাম তা থেকে ২০-২৫ গজ দূরে কাঁচা রাস্তা ছিল। একদিন রাত্রি আন্দাজ দু'টার সময় সেই রাস্তা হতে আমরা নানান রকম পায়ের শব্দ শুনতে লাগলাম। চাঁদনি রাত ছিল। আমরা মাথা উঁচু করে তাবুর ফুটোর ভিতর দিয়ে দেখলাম বহু লোক জিনিসপত্র ও জন্তু-জানোয়ার নিয়ে পালাচ্ছে। আরও দেখলাম আমাদের ৭/৮ জন সাথীকেও তারা তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছে। পা-বাঁধা অবস্থায় আমাদের নড়চড় করার কোনও উপায় ছিল না। তাই, আমরা নিঃসাড় হয়ে পড়ে থাকলাম। সকাল হওয়ার পরে মানুষের সাড়াশব্দ কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। ভাবলাম আমাদের পাহারাওয়ালাও পালাল নাকি। খানিকটা পরে কিন্তু সে এসে আমাদের পায়ের বাঁধন খুলে দিল। বলল, “তাঁবুর ভিতরেই তোমরা বসে থাকবে। বাইরে বেরুবার চেষ্টা করলেই তোমাদের গুলি করে মারব।" কিছুক্ষণ আমরা তাঁবুর ভিতরে বসে থাকলাম। তার পরে বুঝা গেল এই লোকটিও পালিয়েছে। আমরা বের হয়ে রাস্তায় এলাম। কোথাও কেউ নেই। পরিষ্কারভাবে কিছু ভাবতেও পারছিলাম না যে কোন দিকে যাই। এক রকম না ভেবেই রাত্রে যে দিকে লোকেরা গেছে সে দিকেই চললাম। বেশ কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটি গাছের তলায় আমাদের ৭/৮ জন বসে আছেন। আরও দেখা গেল আমাদের আরও কিছু কিছু লোক নানান দিক হতে আসছেন। সব নিয়ে চল্লিশ জন ওখানে আমরা জমায়েত হলাম। ইতোমধ্যে রাত হয়ে গেছে। ওখানে শুয়েই আমরা রাত কাটালাম। নিকটে ক'টি তাবুও খাটানো ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম ক্ষুধায় পেট জ্বলে যাচ্ছে। গত রাত্রে ও আগের সমস্ত দিন কিছুই পেটে পড়েনি। আমরা ৩/৪ জন গাঁয়ের দিকে গেলাম যদি কিছু খাওয়ার জিনিস পাওয়া যায়। গ্রামে ঢুকেই দেখি এক ঠেলা ভর্তি পীচ পড়ে আছে। একটি ঘরে ঢুকে দেখলাম এক কড়াই দুধ চুলোর ওপরে রয়েছে। এইভাবে খুঁজতে খুঁজতে ডিম ও শুকনো রুটি প্রভৃতি অনেক কিছু পাওয়া গেল। সব জিনিস বন্ধুদের নিকটে পাঠিয়ে দিলাম। আমরা আরও এগিয়ে গেলাম। একটা বাড়ীর দরজায় দেখা গেল একজন বৃদ্ধা, একটি যুবতী ও একটি যুবক দাঁড়িয়ে আছে। আমরাও তাদের নিকটে এগিয়ে গেলাম । আমার মাথায় কী ভাব এসেছিল জানি না, আমি বাঁ হাতে যুবকটির হাত চেপে ধরে ডান হাতে খুব কষে তার গালে এক চড় মারলাম। ওরা তিনজনেই চেঁচিয়ে উঠল। যুবকটি ইশারা করে আমাকে একটা ঘরের দুয়ার দেখিয়ে দিল। এর মধ্যে সরফরাজ ওখানে পৌঁছে গেছেন। আমি দুয়ার খুলেই দেখলাম ঘরের অর্ধেকটায় অনেকগুলি চায়ের পেটি স্তূপীকৃত হয়ে আছে, আর অর্ধেকে রয়েছে আমাদের জিনিসগুলি– যে জিনিসগুলি মৌলবী সাহেবেরা নিয়েছেন সেগুলি তো বটেই, যেগুলি লুট হয়েছিল সেগুলিও। তবে, কিছু কিছু মাল নেই দেখা গেল। যুবকটি এগিয়ে এসে কিছু বলল। সরফরাজ বুঝিয়ে দিলেন আমাদের মালগুলি আমরা নিয়ে যেতে পারি, কিন্তু চায়ের পেটিগুলি নয়। এগুলি তার মনিবের। আমরা হাতে হাতে আমাদের মালগুলি নিয়ে নিলাম। আমরা ঠিক করলাম রুশীয় দুর্গের দিকেই আমাদের যেতে হবে, কিন্তু কোন দিকে আছে সেই দুর্গ? সরফরাজ একটি দিক দেখিয়ে বললেন, ওই দিকেই হবে দুর্গটি। কারণ তোপের আওয়াজ ওই দিক থেকে এসেছিল। আমরা সেই দিকে চললাম। কিন্তু শত্রু ভেবে আমাদের ওপরে রুশরা যদি গুলি চালিয়ে দেন? আমরা খুঁজে খুঁজে জওয়ার বা ভুট্টার শক্ত ডাঁটা বের করলাম। তাতে সাদা কাপড় বেঁধে দিলাম। এই সাদা পতাকা উড়িয়ে একজন আগে আগে চললেন, আর সকলে চললেন তাঁর পিছে পিছে। দুর্গের বাইরে কাঁটা তারের বেড়া। বেড়ার ভিতরে আছে ব্যারাক। আমরা দেখলাম কাঁটা তারের বেড়ার ভিতরে ঘোড়ার পিঠে একজন রুশ সৈন্য বসে আছেন। সরফরাজ রুশ ভাষায় আমাদের সব কথা এই সৈনিককে বললেন। আমরা হাতে যে জিনিসগুলি বয়ে নিয়েছিলাম সেইগুলি মাটিতে নামিয়ে সৈনিকটি আমাদের দু'হাত তুলে দাঁড়াতে বললেন। আমরা সকলে তাই করলাম। তারপরে আমাদের সকলকে বেড়ার ভিতরে ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হল। একজন রুশ অফিসার আমাদের সব কথা জিজ্ঞাসা করলেন এবং আমরা যে সব কথার জওয়াব দিলাম। সেই সময়ে একজন আফগান ব্যবসায়ী দেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনিই আমাদের অনুবাদকের কাজ করলেন। আমরা পারসীতে যা বলছিলাম তিনি রুশ ভাষায় তা রুশ অফিসারকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। সৈনিক ব্যারাকে আমাদের থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল। আমাদের প্রত্যেককে বিছানাও দেওয়া হয়েছিল। লাল সৈনিকেরা আমাদের সাথীদের খুঁজে খুঁজে আনলেন। তৃতীয় দিনে এসে পৌঁছলেন মুহম্মদ আকবর খান, আমাদের কাফেলার নেতা। আমরা সব মিলিয়ে ষাট জন হলাম। আর বিশ জনের কোনও পাত্ত পাওয়া গেল না। মনে হয় তুর্কমেনরা তাদের মেরে ফেলেছিল। আমরা স্থির করলাম আর নৌকাতে নয়, স্টীমার আসলে তাতেই চারজও যাব। সেখানে রেলওয়ে স্টেশন আছে। [চারজও এখন তুর্কমেনিস্তান রিপাবলিকের একটি বড় শহর।] একদিন আমি আমাদের ব্যারাকের বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখলাম একজন রুশ ঘোড়সওয়ার তাঁর ঘোড়ায় একজন সৈনিকের মৃতদেহ নিয়ে ছুটে আসছেন। তিনি ইশারায় জলপান করতে চাইলেন। আমি তখনই জলপাত্র নিয়ে তাঁর সামনে ধরলাম। জলপান করে তিনি দুর্গের দিকে ছুটে গেলেন। আগেই বলেছি আমাদের ব্যারাকটি ছিল দুর্গ সংলগ্ন ব্যারাক। দুর্গ হতে খুব জোরে জোরে ঘন্টা বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যিনি যেখানে ছিলেন মোর্চার দিকে ছুটে এলেন। ব্যারাকের অফিসার এসে আমাদের বললেন, "এখানে আপনাদের থাকা নিরাপদ নয়। আপনারা আমাদের অতিথি। আপনাদের নিরাপদে রাখা আমাদের কর্তব্য। এখনই আপনারা দুর্গের ভিতরে চলে যান। সেটা হবে আপনাদের জন্যে নিরাপদ স্থান।" আমরা ২০ জন এগিয়ে এসে বললাম, “আমাদের হাতে হাতিয়ার দিন, আমরাও লড়াই করব।" অফিসার খুশী হয়ে আমাদের রাইফেল দিয়ে বললেন, “আমুদরিয়ার দিকটা আপনাদের রক্ষা করতে হবে।" প্রতি ট্রেঞ্চে আমরা দুজন করে ডিউটি দিতে লাগলাম। এইভাবে আমরা এক সপ্তাহ প্রতিবিপ্লবীদের আক্রমণের প্রতিরোধ করলাম। এর পরে দুর্গের কমান্ডার এসে আমাদের জানালেন, "আমাদের ওপরে প্রতিবিপ্লবীদের যে আক্রমণ চলেছিল তা আমরা সফলভাবে রুথেছি। ষ্টীমার যোগে আমাদের নূতন সৈন্যরা এসে গেছেন। এবারে আমরা আমাদের শত্রুদের ওপরে আক্রমণ চালাব। এই আক্রমণে আপনারা আমাদের সঙ্গে যোগ না দিলেও চলতে পারে। তবে যদি ইচ্ছা করেন আপনারাও যোগ দিতে পারেন।" শত্রুদের ওপরে আক্রমণেও আমরা তিনজন যোগ দিয়েছিলাম — শওকত উসমানী, মসউদ আলী শাহ্ ও আমি। [শওকত উসমানী মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা চলার সময়ে দুর্বলতা প্রকাশের অপরাধে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি হতে বহিষ্কৃত হয়েছেন। কার্যকলাপ হতে পরে বোঝা গিয়েছে যে মস্উদ আলী শাহ্ ব্রিটিশের চর। কিন্তু ব্রিটিশের চররূপেই সে প্রথমে দেশত্যাগ করেছিল কিনা তা বলা কঠিন। আশ্চর্য নয় যে চরবৃত্তি নিয়েই সে দেশ ছেড়েছিল।] মাত্র তিনদিনের আক্রমণের পরে তুর্কমেন প্রতি-বিপ্লবীরা সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয়ে যায়। তাসকন্দের পথে এবারে আমাদের কির্কি ছাড়ার পালা। সৈন্য নিয়ে যে স্টীমার এসেছিল আমরা ষাট জন তাতেই চড়ে বসলাম। স্টীমার আমাদের চারজও নিয়ে গেল। লালফৌজের সৈন্যরা ব্যান্ড বাজিয়ে স্টীমার ঘাটে এসে আমাদের স্বাগত জানালেন। চারজওতে আমরা তিন দিন ছিলাম। এখানে আমাদের খুবই অতিথি-আপ্যায়ন হয়। চারজওতে থাকাকালেই আমরা নিজেদের ভিতরে পরস্পরের মনের পরিচয় পেলাম। তার আগে আমাদের নিকটে পরিষ্কার হয় নি কার মনে কী আছে। চারজও একটি রেলওয়ে জংশন। এখান থেকে নানান দিকে ট্রেন যায়। আমাদের ভিতরে অর্ধেক লোক বললেন তাঁরা আনাতোলিয়া যাবেন। সোবিয়েৎ সরকারের তরফ হতে সেই ব্যবস্থা করে দেওয়া হল ৷ আর বাকী আমরা তাসকন্দ যাওয়ার উদ্দেশে ট্রেনে চড়ে বসলাম। আমাদের দলে ছিলেন আমাদের কাফেলার নেতা ১) মুহম্মদ আকবর খান, ২) মীর আবদুল মজীদ, ৩) সুলতান মাহমুদ, ৪) ফিরোজুদ্দীন মনসুর, ৫) গওহর রহমান খান, ৬) মিঞা মুহম্মদ আকবর শাহ্, ৭) আবদুল কাদির সেহরাই, ৮) ফেদা আলী, ৯) গোলাম মুহম্মদ, ১০) জাফর, ১১) আবদুল্লা সফদর, ১২) আবদুল মতীন, ১৩) আবদুর রহীম, ১৪) শওকৎ উসমানী, ১৫) তাজুদ্দীন, ১৬) মসউদ আলী শাহ্, ১৭) মুহম্মদ হোসায়ন, ১৮) আবদুল কাইয়ুম ও ১৯) রফীক আহ্মদ প্রভৃতি। আমরা চারজও হতে বোখারায় গেলাম। বোখারা রেলওয়ের শাখা লাইনে ছিল। বোখারায় না গিয়েও আমরা তাসকন্দে যেতে পারতাম। কোথায় কী অসুবিধা ছিল জানি না, বোখারায় আমাদের তিন দিন থাকতে হল। আমীরের অতিথিশালাতে আমরা ছিলাম। আমীর তখন পালিয়েছেন। রাজভাণ্ডার হতে আমাদের প্রত্যেককে একটি করে ফারগুল (জোব্বা) দেওয়া হয়। বোখারা হতে রওয়ানা হয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত তাসকন্দে পৌছি। ইতোমধ্যে আবদুর রব পেশোয়ারী তাঁর দলবল নিয়ে তাসকন্দে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর লোকেদের সঙ্গে আমাদের কাবুলে দেখা হয়েছিল। এই লোকেরাই স্টেশন হতে ‘ইণ্ডিয়া হাউসে’ আমাদের নিয়ে যান। একটি বাড়ীর নাম ‘ইণ্ডিয়া হাউস' রাখা হয়েছিল। আবদুর রব এই বাড়ীতে থাকতেন। পরে বোঝা গিয়েছিল আমরা যে ওখানে পৌঁছাব সে-খবর এই বাড়ীতে পৌঁছেছিল। আবদুর রব আর কাউকে এই সংবাদ না দিয়ে তাঁর লোক পাঠিয়ে আমাদের রেলওয়ে স্টেশন হতে আনান। আমরা পৌঁছাবার কিছুক্ষণ পরে মানবেন্দ্রনাথ রায় (এম. এন. রায়), তাঁর স্ত্রী এভেলিন রায়, অবনী মুখার্জি ও তাঁর রুশীয় স্ত্রী এবং মুহম্মদ শফীক আমাদের সঙ্গে দেখা করেন। শফীক যে কখন কীভাবে ওদেশে গিয়েছিলেন তা আমি জানতাম না। আবদুর রব আমাদের তাঁর দলে ভেড়াবার জন্যে বিশেষভাবে চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু কী যে তাঁর দল ও রাজনীতি তার কিছুই আমরা বুঝলাম না। তিনি যে বারেবারে নিজেকে বিপ্লবীদের পিতা বলছিলেন এটাই শুধু আমরা বুঝলাম। পরে এম. এন. রায়ও আমাদের সঙ্গে সুবিস্তৃত আলোচনা করলেন। ভারতে বিপ্লব কোন্ পথে অগ্রসর হবে এই সব কথা তিনি আমাদের বোঝাবার চেষ্টা করলেন। আমাদের রাজনীতিক জ্ঞানের পরিধি সঙ্কীর্ণ ছিল। তবুও আমরা এম. এন. রায়ের কথা সব না বুঝলেও অনেক কিছু বুঝলাম। তখনও আমরা কমিউনিস্ট পার্টি বুঝতাম না। স্থির করলাম এম. এন. রায়ের নেতৃত্বে আমরা কাজ করব। পরে ত্রিমূল আচারিয়া এসেও আবদুর রবের সঙ্গে যোগ দিলেন। রায়ের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ফলে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালে ভারত সম্পর্কিত ব্যাপারে তাঁর আসন অপেক্ষাকৃত দৃঢ় হয়েছিল। যতটা মনে পড়ে ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমরা তাসকন্দে পৌঁছেছিলাম। একটি কথা এখনও বলা হয় নি। আমি আগেই বলেছি, আফগানিস্তানের জবলুস সিরাজ হতে দু'টি কাফেলা রওয়ানা হয়েছিল। মুহম্মদ আকবর খানের নেতৃত্বে প্রথম কাফেলায় আমরা ছিলাম, আর দ্বিতীয় কাফেলা রওয়ানা হয়েছিল পেশোয়ারের মুহম্মদ আকবর জানের নেতৃত্বে। পরে খবর পেয়েছিলাম এই কাফেলা বোখারায় পৌঁছেছিল। মুহম্মদ আকবর জানের এক ভাই বোখারায় আফগান কন্সালের অফিসে কাজ করতেন। সম্ভবত এই কারণেই সে কাফেলাকে বোখারা নিয়ে গিয়েছিল। এই কাফেলায় হবীব আহমদ নসীম ছিলেন। তাঁর সঙ্গে মুহম্মদ আকবর জানের মনোমালিন্য হওয়ায় তাঁকে আকবর জান গিরেফ্তার করিয়ে দেয়। হবীব প্রথমে বোখারার জেলে ছিলেন। তারপরে তাঁকে তাসকন্দের জেলে পাঠানো হয়৷ এই খবর পাওয়ার পরে আমরা এম. এন. রায়কে তা জানাই এবং তাঁর হস্তক্ষেপে হবীব জেল থেকে মুক্তি পান। মুহম্মদ আকবর জানের কাফেলার বেশীর ভাগ লোক দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। আর, যারা দেশে ফিরে নি তারা আনওয়ার পাশার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। আনওয়ার প্রথমে সোবিয়েৎ সরকারের আশ্রয়ে মস্কোতে ছিলেন। পরে মধ্য এশিয়ায় গিয়ে সোবিয়েতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা ক’রে যুদ্ধে নিহত হন । আমরা তাসকন্দে পৌঁছানোর ক'দিন পরে দেখা গেল যে উসমানী কোথাও চলে গেছেন। তারপরে এম. এন. রায় আমাকে ডেকে আন্দিজান ও ওসে যেতে বলেন। আন্দিজান সম্রাট বাবরের জন্মস্থান ছিল। আমায় ওই সব জায়গায় পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল ভারতে যাওয়ার পথ বা’র করার চেষ্টা করা। মুন্শী ফাজিলের কোর্স পর্যন্ত আমি পারসী ভাষা পড়েছিলাম। সম্ভবত এই কারণে আমায় আন্দিজানে পাঠানো হয়। আমি আন্দিজানে পৌঁছে দেখলাম শওকৎ উসমানী ওখানেই আছেন একই উদ্দেশ্যে। সিন্ধুর অধিবাসী কিছু সংখ্যক হিন্দু ব্যবসায় উপলক্ষে স্থায়ীভাবে আন্দিজানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। শওকৎ উসমানী তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। আন্দিজান হতে আমি ওসে যাই। ওস পার্বত্য এলাকা, তখনই বরফে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। আমি নিশ্চিত বলতে পারি না, হয়তো এই এলাকাকেই তখ্তে সুলায়মান বলা হত। ওসে আমার কাজ কিছুই হল না। তুষারপাতের ভিতর দিয়ে পথ কোথায় খুঁজে পাব? অত্যধিক শীতে ও বরফের কামড়ে আমার পা ফুলে গিয়েছিল। তাসকন্দে ফিরে এলাম এবং নবপ্রতিষ্ঠিত ইণ্ডিয়ান মিলিটারি স্কুলে শিক্ষা গ্রহণ শুরু করলাম। মিলিটারি শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে মিলিটারি স্কুলে আমাদের রাজ-নীতিক শিক্ষাও দেওয়া হত। আমরা মেশিনগান চালানোর শিক্ষা পেয়েছিলাম। তোপ চালানোর শিক্ষাও আমাদের আংশিকভাবে হয়েছিল। একজন হাওয়াই জাহাজ চালানো শিখছিলেন। ড্রিল ইত্যাদি তো হতই। ব্রিটিশের সঙ্গে সোবিয়েৎ দেশের বাণিজ্যিক চুক্তির কথাবার্তা চলেছিল। তার একটি শর্ত ছিল তাসকন্দের মিলিটারি স্কুলটি তুলে দিতে হবে। ব্রিটেন চাইত না যে মধ্য এশিয়াতেই কোনো ভারতীয় থাকেন। আমরা তাসকন্দে থাকার সময়কার একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করব। ইণ্ডিয়া হাউসে থাকার সময়ে আবদুল কাদির এক দিন রাস্তায় হাওয়া খাচ্ছিল। সেই সময়ে কি করে জানিনে, গোলা-গুলি ইত্যাদির গুদামে (magazine-এ) আগুন লেগে যায়। আগুন দেখে আবদুল কাদির পালাতে শুরু করে। তাকে পালাতে দেখে কর্মরত সৈনিক তার পায়ে গুলি করে দেয়। আবদুল কাদির পড়ে যায়। যখন দেখা গেল সে ভারতীয়দের একজন তখন তাকে হসপিটালে ভর্তি করে দিয়ে ইণ্ডিয়া হাউসে খবর দেওয়া হয়। হসপিটালে তাকে খুবই যত্ন করা হয়েছিল। [এই আবদুল কাদির পরে পেশোয়ার কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার অভিযুক্ত হয়েছিল। মোকদ্দমা হতে সে ছাড়া পেয়ে যায়। ছাড়া পাওয়ার পরে কিন্তু সে চুপ ক'রে বসে থাকে নি। ভারতীয় পুলিস ও ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের সঙ্গে মিশে গিয়ে অনেক কুকর্মই সে করেছে। সে সোবিয়েৎ দেশ, কমিউনিস্ট ইনটারন্যাশনাল ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে বহু প্রবন্ধ লিখে লণ্ডনের কাগজে ছেপেছে। এই সবের পুরস্কার স্বরূপ সে লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পশতু ভাষা পড়াবার চাকরিও পেয়েছিল। সে পেশোয়ারের অধিবাসী। হিজরতকারীদের সঙ্গে দেশের বাইরে যাওয়ার আগে সে পেশোয়ারের ব্রিটিশ অফিসারদের পশতু ভাষা শিক্ষা দিত। তার পরবর্তী কার্যকলাপ হতে তার ওপরে এ সন্দেহও করা যেতে পারে যে ব্রিটিশ অফিসাররাই তাকে হিজরতকারীদের সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন। তাসকন্দের ম্যাগাজিনে আগুনও কি সে-ই লাগিয়েছিল? কে জানে ?] প্রথম প্রকাশ— পরিচয়, ভাদ্র-আশ্বিন, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ; সেপ্টেম্বর, ১৯৬০। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর, ১৯৬১ তে সুরেন দত্ত কর্তৃক কলকাতার ন্যাশনাল বুক এজেন্সি মারফত প্রকাশিত মুজফ্ফর আহ্মদের প্রবাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন বইটিতে এই লেখাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। লেখার মূল বানান এখানে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেবল ‘কি’ এবং ‘কী’ এই দুটি ক্ষেত্রেই সম্পাদনা করা হয়েছে। –মার্কসবাদী পথ
প্রকাশের তারিখ: ১৭-অক্টোবর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |