|
ট্রাম্পের আগ্রাসনে ভেনেজুয়েলাটিম মার্কসবাদী পথ |
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এ-ধরনের হস্তক্ষেপে কয়েক দশক ধরে এই মহাদেশ এক তুমুল অস্থিরতা, গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ-সহ কর্তৃত্ববাদী শাসনের মতো বিপর্যয়কর পরিণতির সাক্ষী— যা আমেরিকার ‘খিড়কির উঠোন’ গোটা লাতিন আমেরিকায় দাগ ফেলেছে। |
এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় আক্রমণের হুমকি দিয়েছেন, দেশের ভিতরে চলমান সিআইএ-র গোপন অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম বোমারু বিমানগুলিকে তার উপকূলের বাইরে বৃত্তাকারে উড়তে নির্দেশ দিয়েছেন। যা ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে পদত্যাগে বাধ্য করাতে এক বেনজির শক্তি প্রদর্শন। ভেনেজুয়েলা, বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি মাদুরোর প্রতি সংহতি জানিয়ে কিউবার রাষ্ট্রপতি মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলার জন্য আমাদের সর্বস্ব ত্যাগ করা উচিত।’ তিনি বলেছেন, ‘আজ, কিউবা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হোসে মার্তির সেই আহ্বানের প্রতি: ‘আমাকে সেবা করার জন্য ভেনেজুয়েলাকে দাও, আমার মধ্যে রয়েছে তার একটি সন্তান,’ সেইসঙ্গেই ফিদেলের কথা: ‘ভেনেজুয়েলার জন্য, আমাদের অবশ্যই সর্বস্ব ত্যাগ করতে হবে।’ এর আগে, গত কয়েক সপ্তাহে ক্যারিবীয় জলসীমায় সন্দেহজনক ‘মাদকবাহী’ দোহাই দিয়ে ভেনেজুয়েলার নৌকাগুলিতে অন্তত পাঁচটি হামলা চালিয়েছে আমেরিকা, যা আন্তর্জাতিক আইনের বেপরোয়া লঙ্ঘন। প্রথমে ২ সেপ্টেম্বর। এতে নিহত হন ১১ জন। পরে ১৫ ও ১৯ সেপ্টেম্বর আরও দু’টি হামলা। এতে তিনজন করে নিহত হন। চতুর্থ হামলা ৩ অক্টোবর, নিহত হন চারজন। সর্বশেষ ১৪ অক্টোবর, নিহত ৬ জন। মোট সাতাশ জন। আর এভাবেই এই অঞ্চলকে নতুন করে অস্থিতিশীল করতে চাইছে ওয়াশিংটন। নিউ ইয়র্ক টাইমস পর্যন্ত স্বীকার করে নিয়েছে ট্রাম্প-প্রশাসনের কর্তারা জানিয়েছেন ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য আসলে জমানা-বদল! ‘মাদক’ এখন ওয়াশিংটনের কাছে নতুন ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’! এই মুহূর্তে ক্যারিবীয় অঞ্চলে রয়েছে ১০,০০০ মার্কিন সেনা, আটটি রণতরী ও একটি ডুবোজাহাজ। গোটা পরিস্থিতি নিজে দেখছেন নব্য-রক্ষণশীল যুদ্ধবাজ মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও। আগে থেকেই মাদুরোকে গ্রেপ্তারে সহায়ক তথ্য দিতে পারলে পাঁচ কোটি ডলার পুরস্কারের কথা ঘোষণা করে রেখেছে আমেরিকা। এই পদক্ষেপগুলি মনে করিয়ে দিচ্ছে গত শতকে সিআইএ-র কুৎসিত চেহারাকে। ১৯৫৪-তে গুয়াতেমালায় অভ্যুত্থান, ষাটের দশকে কিউবায় বে অফ পিগস, ব্রাজিল ও ইকুয়েদর, বলিভিয়া, চিলিতে ১৯৭৩ সালের অভ্যুত্থানে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সালভাদোর আলেন্দের মৃত্যু, ওই দশকেই লাতিন আমেরিকার ছয় দেশে ‘অপারেশন কনডোর’, আটের দশকে এল সালভোদর, গ্রানাদা ও পানামায় অভিযান থেকে নিকারাগুয়ায় কন্ট্রা যুদ্ধ। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এ-ধরনের হস্তক্ষেপে কয়েক দশক ধরে এই মহাদেশ এক তুমুল অস্থিরতা, গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ-সহ কর্তৃত্ববাদী শাসনের মতো বিপর্যয়কর পরিণতির সাক্ষী— যা আমেরিকার ‘খিড়কির উঠোন’ গোটা লাতিন আমেরিকায় দাগ ফেলেছে। ২০২৪ সালে ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনে মাদুরোর জয়ের পর তাঁর অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার সঙ্গে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সংকটের কারণে লক্ষ লক্ষ ভেনেজুয়েলাবাসী দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই কলম্বিয়া, ভয়ংকর ডারিয়েন গ্যাপ এবং মেক্সিকো হয়ে মার্কিন মুলুকে প্রবেশ করেছেন। এই উদ্বাস্তু স্রোত ট্রাম্প প্রশাসনকে অভিবাসন ইস্যুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে। তারা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ তুলছে, যাতে তারা সাভেজপন্থী ‘সাভিস্তাদের’ বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারে। কোনও তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই মাদুরোকে ‘মাদক সন্ত্রাসীবাদী’ বলে দেগে চলেছেন ট্রাম্প। দাবি করছেন যে দেশটি কাজ করছে একটি ‘মাদক-করিডোর’ হিসেবে, আর মাদক-পাচারকারী সংস্থাগুলি রয়েছ মাদুরোর নিয়ন্ত্রণে। ট্রাম্পের লক্ষ্য আসলে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল ভাণ্ডার। সেই সঙ্গেই মজুত রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস। রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক রেখেছে ভেনেজুয়েলার। কিউবার সঙ্গে রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যা এই অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্যের জন্য একটি ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। অতীতেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাসের বৈরিতা ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের মতো এমন নির্লজ্জ ছিল না। মাদুরোর নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে কারও প্রশ্ন, ভিন্ন মত থাকতেই পারে। কিন্তু তা ঠিক করবেন ভেনেজুয়েলার মানুষ। অবৈধ মার্কিন হস্তক্ষেপ নয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে আন্তর্জাতিক মহলকে দায়িত্ব নিতে হবে। ট্রাম্প-জমানার অবৈধ ও ঠাণ্ডা যুদ্ধ-যুগের জমানা-বদলের নীতির বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ। পরিবর্তে, এমন কূটনৈতিক সমাধানসূত্র বের করতে হবে যা ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে এবং দেশটির প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তিকে সমর্থন করে। বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ভেনেজুয়েলা তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারবে। প্রকাশের তারিখ: ১৯-অক্টোবর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |