|
ট্রাম্পের হার, স্বস্তি এবং চ্যালেঞ্জশান্তনু দে |
|
এক সার্বিক প্রত্যাখ্যান। রিচার্ড নিক্সনের পর গত পাঁচদশকে হোয়াইট হাউসে থাকা কোনও রাষ্ট্রপতির দলের এমন শোচনীয় পরাজয় দেখেনি আমেরিকা। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির এহেন বিপর্যয় আসলে উগ্র দক্ষিণপন্থী রাজনীতির পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে এক ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ইঙ্গিত— যা মার্কিনমুলুকে দশকের পর দশক ধরে দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে। ট্রাম্প আরও দু’বছর হোয়াইট হাউসে থাকবেন। কিন্তু, সেনেট ও প্রতিনিধিসভা— মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই কর্তৃত্ব খুইয়েছেন। সেনেটে অন্তত সাতটি আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা, যার মধ্যে ছ’টি এমন প্রদেশে, যেখানে ট্রাম্প তিনবার জয়ী হয়েছেন। প্রতিনিধিসভায় তিরিশটি আসন অতিরিক্ত পেয়ে ডেমোক্র্যাটরা এখন ২৪০। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সাকুল্যে ১৪৭। আর এই পরিবর্তন দেশের প্রতিটি অঞ্চলে এবং জনসংখ্যার প্রতিটি অংশেই স্পষ্ট। ট্রাম্প তাঁর সমর্থনের মূল ভিত্তি বলে যাঁদের দাবি করেন, সেই গ্রামীণ কাউন্টি, তরুণ এবং কলেজের ডিগ্রি না থাকা শ্রমিকের মধ্যে এই পরিবর্তন আরও বেশি প্রকট। ট্রাম্প এই নির্বাচনকে তাঁর প্রতি এক গণভোটের চেহারা দিয়েছিলেন। দাবি করেছিলেন ‘প্রতিটি আসনে আমিই প্রার্থী’। এবং গোহারান হেরেছেন। দ্বিদলীয় একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যে— যেখানে বৃহৎ কর্পোরেট স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী দু’টি দলের বাইরে অন্য কোনও বিকল্পের সুযোগ নেই— সেখানে মানুষের এই রায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি, জীবনমানের অবনমন, চরম সামাজিক অসাম্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আক্রমণের প্রতি সরব বিরোধিতার এক জোরালো প্রতিফলন। গতবছর লক্ষ লক্ষ মানুষের ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ এবং এবছরের শুরুতে মিনিয়াপোলিস-সহ অন্যান্য শহরে আইসিই-র হাতে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণবিক্ষোভেরই একটি ধারাবাহিকতা এই জনাদেশ। এই ভোট তরুণ ও শ্রমিকদের ব্যাপক গণবিক্ষোভের আন্তর্জাতিক আন্দোলনের একটি অংশ, যা গত দু’মাস ধরে ছড়িয়ে পড়েছে ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, স্পেন ও জার্মানিতে। শুধু তাই নয়, ট্রাম্পের এই ভরাডুবির মাত্র দু’সপ্তাহ আগেই ব্রাজিলে পরাস্ত হয়েছেন তাঁর বিশ্বস্ত মিত্র নব্য-ফ্যাসিবাদী জুনিয়র বোলসোনারো। চতুর্থবারের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থী লুলা। ভোটের সাতদিন আগে ইজরায়েলের ভোটেও তেমন কোনও সুখবর দিতে পারেননি তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা এখনও অনিশ্চিত। যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু, না কি তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ গাদি আইজেনকট— শেষ হাসি কে হাসবেন, বলবে ভবিষ্যৎ। তবে এই অচলাবস্থার মধ্যে একটি ফলাফল স্পষ্ট: আরব দলগুলির চমকপ্রদ সাফল্য। ভোটের চারদিন আগে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং প্যালেস্তাইনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিশ্বজুড়ে পাঁচ মহাদেশের বাইশটি দেশে ১১৩টি বন্দরে ধর্মঘট করেছেন ডক শ্রমিকরা। আজ সাধারণ ধর্মঘট স্তব্ধ ফ্রান্স। এগারোতে হবে স্পেনে। ২০ নভেম্বর ইতালিতে। পঁচিশে গ্রিসে। পর্তুগালের ট্রেড ইউনিয়নও ধর্মঘট ডাকার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়নি। এটা ঠিক, এই নির্বাচন খানিক স্বস্তি এনেছে। আবার এও ঠিক, ট্রাম্প এখনও রাষ্ট্রপতি রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছে ভোটারদের একটি বৃহৎ অংশ। এবং তিনি তাঁর ফ্যাসিবাদী কর্মসূচি বাস্তবায়নে অবিচল। বর্তমান সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা রিপাবলিকান জন থুন তাঁর পদ খোয়ানোর আগে যেমন সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের করা সমস্ত কাজ যদি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কট্টর বামপন্থী, সোশ্যালিস্ট অংশ নস্যাৎ করতে চায়, তবে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব না।’ এনবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেই দিয়েছেন: ‘আমি মিস্টার ভেটো হয়ে যাব’! ট্রাম্পের ভেটো দেওয়া বিল পাস করাতে হলে সেনেট এবং প্রতিনিধইসভা দু’জায়গাতেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন। ১০০ সদস্যের সেনেটে সংখ্যাটা ৬৭। ৪৩৫ আসনের হাউসে ২৯০। এতটা সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনও কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের নেই। শুধু তাই নয়, সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা-আবেগের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অবস্থানের মধ্যে রয়েছে এক বিশাল ও অলঙ্ঘনীয় ব্যবধান। ক্যাপিটল হিলে রাজনৈতিক অঙ্ক ডেমোক্রেটিক পার্টিকে সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড় করালেও তাদের শ্রেণিস্বার্থে প্রশ্নের কোনও সমাধান করবে না। এই নির্বাচন ট্রাম্প-ঘেঁষা নীতিগুলির প্রশ্নে একটি নির্ণায়ক পরাজয় এবং খোদ ট্রাম্পের জন্যই এক শোচনীয় হার হলেও, এটি মার্কিন ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভাবমূর্তিকে পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। এই মুহুর্তে আমেরিকায় ৩ কোটি ৪৫ লক্ষ মার্কিন নাগরিক, জনসংখ্যার ১০.২ শতাংশ রয়েছেন দারিদ্র্যসীমার নিচে। মানে প্রতি দশজনে একজন। বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ১৩.১ শতাংশ মানুষ। সরকারি হিসেবেই গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৭,৪৫,৬০০। এছাড়াও আরও অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, যাঁরা বিভিন্ন যানবাহনে বা অস্থায়ী আবাসে বসবাস করছেন, তাঁরা থেকে গিয়েছেন এই সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে। ২ কোটি ৬৭ লক্ষ মানুষের নেই কোনও ধরনের স্বাস্থ্য বীমা। নির্বাচনের এই ফলাফলে এঁদের কি কোনও পরিবর্তন হবে? ১৯৯২, বিল ক্লিন্টন নির্বাচিত হওয়ার পরে ডেমোক্র্যাটরা নেয় ঘাটতি কমানোর নীতি। তুলে দেয় কল্যাণমূলক কর্মসূচি। ২০০৮, বারাক ওবামা নির্বাচিত হওয়ার পর উদ্ধার করে কর্পোরেট ব্যাঙ্কগুলিকে। অন্যদিকে, অর্ধেক করে দেয় নতুন নিয়োগ পাওয়া অটোমোবাইল শ্রমিকদের মজুরি। রিপাবলিকানদের সঙ্গে একটি ‘বড় সমঝোতা’র আশায় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কাটছাঁটের প্রস্তাব দেয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের পরে ডেমোক্র্যাট রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। গাজায় গণহত্যায় অস্ত্র সরবরাহ করেন। এবং ট্রাম্পের ফিরে আসার পথ প্রশস্ত করেন। ঠিকই, এবারে মার্কিন কংগ্রেসে পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু মার্কিন রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায়নি। আসলে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টি উভয়ই একই সাম্রাজ্যবাদী মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। উভয়ই মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রতিনিধি। দুইয়ের বিদেশনীতিই এক। আর এ ব্যাপারে ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকানদের মধ্যে রয়েছে বরাবরের দ্বিদলীয় সহমত। যেমন বলেছেন ভ্লাদিমির লেনিন। ১৯১২, ‘মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল ও তাৎপর্য’ শিরোনামে লেনিন লিখছেন: ‘তথাকথিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টি হলো, এক সময়ের দাস-প্রভুদের দল। আর পুঁজিপতিদের দল, যারা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের দাসত্ব থেকে মুক্তির পক্ষে ছিল, তাদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল রিপাবলিকান পার্টি। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষরা দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে এই দুই দলের মধ্যে ফারাক কমে গিয়েছে। এখন মূলত আমদানি রপ্তানি শুল্ক নিয়ে এই দুই দলের লড়াই। সাধারণ জনগণের জন্য তাদের এই লড়াইয়ের বিশেষ কোনও গুরুত্ব নেই। দুই বুর্জোয়া দলের জমকালো এবং অর্থহীন দ্বৈরথের মধ্যে দিয়ে মানুষকে তাদের অপরিহার্য স্বার্থগুলির থেকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। আমেরিকা এবং ব্রিটেনে তথাকথিত যে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা বজায় রয়েছে, তা স্বাধীন শ্রমিকশ্রেণির উত্থান, অর্থাৎ প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক পার্টির উত্থানকে বাধা দেওয়ার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী একটি ব্যবস্থা’ (প্রাভদা, ৯ নভেম্বর, ১৯১২)। বিশ শতকে প্রাভদায় লেনিন যখন লিখছেন, তখন সোস্যালিস্ট প্রার্থী ডেবস পেয়েছিলেন ৮,০০,০০০ ভোট। একুশ শতকের এই নির্বাচনে বিশ্বের বামপন্থীরা আশার আলো দেখছেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে থাকা ডেমোক্র্যাটিক সোস্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ) এবং কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দলগুলির মধ্যে। ডেমোক্র্যাটদের এই বিপুল জয়ের নেপথ্যে এবারে তাঁরাই জমি তৈরি করে দিয়েছেন। এবারে প্রতিনিধিসভায় ডিএসএ সদস্যের সংখ্যা দুই থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮। নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া, মিশিগান, কলোরাডো ও ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নবনির্বাচিত ছয় সদস্য এবারে যেগ দেবেন ওকাসিও কোর্তেজ ও রাশিদা তালিবের সঙ্গে। কোর্তেজ এবং রাশিদা দু’জনেই এবারে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। গতবছর নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ডিএসএ সদস্য জোহরান মামদানি। এই মুহর্তে সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ১,২০,০০০। দেশের পঞ্চাশটি প্রদেশেই রয়েছে সংগঠন। অন্ধকারে আশার আলো ডিএসএ। এবং পথের বিক্ষোভ। ১-৭ নভেম্বর ‘কমিউনিস্ট-বিরোধী সপ্তাহ’ যখন ট্রাম্প ঘোষণা করছেন, তখন ৪৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক সমাজতন্ত্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। এবছর ২৩ সেপ্টেম্বর গ্যালপ পোলের জনমত সমীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে এই তথ্য। ২০১০-এ এনিয়ে সমীক্ষা শুরুর পর থেকে এটিই সর্বকালীন রেকর্ড। এই মনোভাব আরও তাৎপর্যপূর্ণ জেন-জি এবং মিলেনিয়ালদের মধ্যে। ১৮-৩৪, তরুণদের মধ্যে ৫৭ শতাংশই সমাজতন্ত্রের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন। সেকারণে ডেমোক্র্যাটরা নয়। দুনিয়া তাকিয়ে থাকবে বার্নি স্যাণ্ডার্স, ওকাসিও কোর্তেজ, রাশিদা তালিব, জোহরান মামদানি-সহ বামপন্থা ঘেঁষা প্রগতিশীলদের দিকে। সেইসঙ্গেই জেন-জি, জেন-আলফা, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার, নারী আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলনের দিকে। তাদের সাফল্য-ব্যর্থতার উপর নির্ভর করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ বিশ্বের ভবিষ্যৎ। প্রকাশের তারিখ: ০৫-নভেম্বর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |