ট্রাম্পের শুল্ক আগ্রাসন

প্রভাত পট্টনায়েক
ট্রাম্প যে শুল্ক যুদ্ধ শুরু করেছেন সাধারণত সেজন্য দায়ী করা হচ্ছে তার ‌‘‌পাগলামি’–কে অথবা বলা হচ্ছে, বাকি বিশ্বকে তাঁর ‘‌উপেক্ষা করার’ মনোভাবই এর জন্য দায়ী। এবং এধরনেরই একাধিক কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু বস্তুত এই সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে আরও গভীর একটি দ্বন্দ্ব থেকে, যে দ্বন্দ্বের শিকড় রয়েছে পুঁজিবাদের বিকাশ এবং পুঁজিবাদ আরও পরিণত হওয়ার ওপর। শুধুমাত্র ট্রাম্পের ‘‌পাগলামি’‌র ওপর এই দায় চাপিয়ে দেওয়াটা হবে পুরোপুরি সারগর্ভহীন একটা ব্যাখ্যা।…ট্রাম্পের এই যে আগ্রাসী নীতি তার তাৎপর্য হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ গোলার্ধের সর্বত্র কাজকর্ম ছড়িয়ে দেওয়ার যুগের সমাপ্তি এবং তার ফলে নিও লিবারাল নীতি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে কোনও যুক্তির অবতারণা করারও আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি।

যদি কোনও বিষয়ে কোনও বৌদ্ধিক অবস্থান নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে — সেই অবস্থান শুধু সঠিক হলেই চলবে না, সঠিক অবস্থানটা সঠিক কারণের ওপর দাঁড়িয়ে হতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে আক্রমণাত্মক উপায়ে শুল্ক আরোপ করছেন, প্রায় সর্বজনীনভাবে তার সমালোচনা করা হচ্ছে। এই সমালোচনা সঠিক। তবে ভুল কারণে সঠিক। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনার পিছনে ব্যাপক মাত্রায় একথা অনুমান করে নেওয়া হয়েছে যে, অবাধ বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সবার পক্ষেই মঙ্গলজনক। এবং এই স্বীকৃত নীতি থেকে ট্রাম্প বিচ্যুত হয়েছেন। এই বিচ্যুতি ন্যক্কারজনক ও একইসঙ্গে ট্রাম্পের নির্বুদ্ধিতার সামিল। সংক্ষেপে ট্রাম্পের নীতির বেশির ভাগ সমালোচনার ভিত্তিই হল অবাধ বাণিজ্যের যুক্তিকে স্বীকার করে নেওয়া। এবং এটা চলে আসছে সেই ডেভিড রিকার্ডোর আমল থেকে। তবে অবাধ বাণিজ্যই সর্বরোগহর দাওয়াই, এই যুক্তি পুরোপুরি ভ্রান্ত।

অবাধ বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সকলের পক্ষে ভাল, এই যুক্তিটি দাঁড়িয়ে রয়েছে সে–র সূত্রের (Say’s Law) ওপর ভিত্তি করে। এই নিয়মে বলা হয়েছে, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে কখনই চাহিদার সঙ্কট থাকে না। এমনটা স্পষ্টতই অবাস্তব। সে-র নাম মার্কস দিয়েছিলেন ‘মামুলি শ্রী সে’ (“trite M Say”)। সেই মামুলি শ্রী সে-র কৃতিত্ব, অর্থাৎ তাঁর সূত্রকে যদি আমরা বাদ দিই তাহলে যা দাঁড়াবে তা হল, অবাধ বাণিজ্য-নীতিই যদি অনুসরণ করা হয়, অথবা যদি শুল্ক আরোপ করা হয়, দুটি ক্ষেত্রেই বাণিজ্য-নীতির লক্ষ্য হল অন্যদের বঞ্চিত করে নির্দিষ্ট একটি দেশের উৎপাদকদের জন্য বৃহত্তর বাজার করায়ত্ত করা। অন্যভাবে বললে, মুক্ত বাণিজ্য-নীতি থেকে সবার লাভ হবেই এমন কোনও কথা নেই। এবং তাই অবাধ্য বাণিজ্য-নীতি থেকে সরে যাওয়ার জন্য ট্রাম্পকে দোষারোপ করাটা দাঁড়াবে ভুল কারণের জন্য তাঁকে দোষারোপ করা। 

প্রগতিশীল মহলে ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অন্য একটা যুক্তি দেওয়া হয়। বলা হয়, শীর্ষস্থানীয় মেট্রোপলিটান অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক আরোপ করার মানে এটা একটা সাম্রাজ্যবাদী পদক্ষেপ।  কারণ, দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে মুক্ত বাণিজ্য চালু রাখা রয়েছে। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন শুল্ক চাপাচ্ছে তখন দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলি থেকে সেদেশে রপ্তানির দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শীর্ষস্থানীয় মেট্রোপলিটান অর্থনীতি থেকে বেকারি দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে রপ্তানি করা হবে। যদিও এখনকার আশু যে প্রসঙ্গ সেপ্রসঙ্গে এই যুক্তিটা অনুরূপভাবে খেটে যায়, তবে এটা সাধারণভাবে সাম্রাজ্যবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণকারী বৈশিষ্ট্য নয়। উদাহরণস্বরূপ, ঔপনিবেশিক যুগের দ্বিতীয়ার্ধে, দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির ওপর মুক্ত বাণিজ্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবং একই সঙ্গে তখনকার শীর্ষস্থানীয় মেট্রোপলিটান অর্থনীতি ব্রিটেনেও চালু ছিল মুক্ত বাণিজ্য-নীতি। জোর করে মুক্ত বাণিজ্য নীতি চাপিয়ে দেওয়ার ফলে ভারত ও চীনের মতো অর্থনীতিগুলির দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। এর জেরে শিল্প বিপ্লবের পর সস্তায় উৎপাদিত পণ্য ব্রিটেন থেকে ভারত ও চীনে রপ্তানি করা হয়েছিল। ফলত, এসব দেশে প্রাক-পুঁজিবাদী উৎপাদকেরা উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল এবং দেশগুলির বি-শিল্পায়ন ঘটেছিল। 

দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির ওপর মুক্ত বাণিজ্য চাপিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি টিকে ছিল দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী পর্ব পর্যন্ত। এই পর্বেই মহামন্দার পরিপ্রেক্ষিতে একটা রাজনৈতিক ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল গোটা লাতিন আমেরিকাকে। এবং তার ফলে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটা শাসনের উদ্ভব হয়েছিল যারা সংরক্ষণ-নীতি চালু করেছিল এবং শুল্ক প্রাচীরের আড়ালে শিল্পায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। ভারতেও দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী পর্বে অত্যন্ত অনিচ্ছাসহকারেই  ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে সামান্য সংখ্যক কিছু শিল্পের গোড়াপত্তন করতে হয়েছিল একধরনের ‘বৈষম্যমূলক নিরাপত্তা’ দিয়ে (‘শিশু শিল্পের’ অজুহাতে)। এবং দেশীয় বুর্জোয়াদের বিকাশের জন্য কিছুটা পরিসর তাদের ছাড়তে হয়েছিল। সংক্ষেপে শীর্ষস্থানীয় মেট্রোপলিটান দেশে সাম্রাজ্যবাদ সর্বদাই সংরক্ষণবাদী হবে এবং দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির ওপর মুক্ত বাণিজ্য চাপিয়ে দেবে, এটা ঠিক নয়। সাম্রাজ্যবাদ কী ধরনের বাণিজ্য-নীতি নেবে তা নির্ভর করবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ওপর। 

সাম্প্রতিক পর্বে মেট্রোপলিটান পুঁজি অনেক বেশি আগ্রহী তাদের প্লান্টগুলি দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে সরিয়ে আনতে। কারণ তারা বিশ্ব বাজারের জন্য উৎপাদন করার স্বার্থে এই সব দেশের কম মজুরির সুযোগ নিতে চায়। বিশেষ করে এটা চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেট্রোপলিটান পুঁজি। তারা এই সুযোগটা নিতে চায় অবাধ বাণিজ্যের পরিমণ্ডলে। বিশেষত,  নিও লিবারাল নীতিসমূহ ভারতের মতো দেশগুলির কাছে বিক্রি করা হয়েছিল নির্দিষ্টভাবে এই প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে যে যদি পুঁজির চলাচলের পথে সব বাধা দূর করা যায় তাহলে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলি থেকে এই সব দেশে উৎপাদনমূলক কাজকর্ম সরিয়ে আনা যাবে এবং এতে তাদের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বাড়বে। ট্রাম্প এখন এই বিষয়টাই বন্ধ করতে চাইছেন।  

দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলি থেকে, বিশেষ করে চীনের কাছ থেকে, কর্মসংস্থান ছিনিয়ে নেওয়া, এটাই ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদের একমাত্র চালিকা শক্তি নয়। আরও অতিরিক্ত জোরালো কারণ হল ব্যালান্স অফ পেমেন্টের ক্ষেত্রে আমেরিকার ক্রমশ বেড়ে চলা চলতি হিসাব (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) খাতে ঘাটতি। এই ঘাটতির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম দেনাগ্রস্ত দেশ। ট্রাম্পের আশা, এখন সংরক্ষণবাদকে আঁকড়ে ধরলে এই পরিস্থিতির সংশোধন করা যাবে।  

তবে এখানে এমন একটা দ্বন্দ্ব রয়েছে যা সাধারণত চোখে পড়ে না। যে দেশ পুঁজিবাদী দুনিয়ার নেতা তার হলমার্কই হল তার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলির তুলনায় নিজেদের চলতি খাতে ঘাটতি চালিয়ে যাওয়া। এটা চালিয়ে যাওয়া দরকার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলির কিছুটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য এবং নিজেদের নেতৃত্ব বজায় রাখার জন্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ব্রিটেন ছিল পুঁজিবাদী দুনিয়ার নেতা, তখন কন্টিনেন্টাল ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষিতে তারা ধারাবাহিক ভাবে চলতি খাতে ঘাটতি বজায় রাখত। অথচ তখন কন্টিনেন্টাল ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ছিল নতুনভাবে উদীয়মান ক্ষমতাধর দেশ। ব্রিটেনকে এটা করতে হত এই দেশগুলির উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কিছুটা জায়গা দেওয়ার জন্য এবং যাতে তারা ব্রিটেনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে তা নিশ্চিত করার জন্য।  

তবে সেজন্য ব্রিটেন দেনাগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়নি। বরং, ব্রিটেন সেই সময় হয়ে দাঁড়িয়েছিল অন্যতম প্রধান ঋণদায়ী দেশ – বিপুল পরিমাণে পুঁজি রপ্তানি করত এবং তাও নির্দিষ্টভাবে করত সেই সব দেশে যাদের সঙ্গে চলতি হিসাব খাতে তার ঘাটতি ছিল। এটা তারা করতে পারত কারণ তারা তাদের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলের উপনিবেশগুলির রপ্তানিজাত নীট আয় একেবারে মাগনায় আত্মসাৎ করতে পারত (উদ্বৃত্তকে ‘নিঃস্ব করা’)। এবং একইসঙ্গে ওই দেশগুলিতে এমন পণ্য রপ্তানি করতে পারত যা উপনিবেশগুলির ‘বি-শিল্পায়ন’ ঘটায়, কারণ ওই দেশগুলি ছিল কার্যত ‘মার্কেটস অন ট্যাপ’ বা যখন খুশি ব্যবহার করা যায় এমন বাজার (অর্থনীতির ইতিহাসকার এস বি সলের ভাষায়)। সেদিনের ব্রিটেন এবং আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মৌলিক ফারাক হল ব্রিটেনের মতো করে আজকের দিনে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলি থেকে তাদের নীট রপ্তানিজনিত আয়কে ‘নিঃস্ব করে’ নিয়ে চলে আসা এবং ‘বি-শিল্পায়নের’ সম্ভাবনাকে চাপিয়ে দেওয়ার পথ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে খোলা নেই। 

এক কারণ দ্বিবিধ। এখন যে সাম্রাজ্যবাদকে আমরা দেখি তার উপনিবেশ নেই। তাছাড়া, যদি তেমন কোনও উপনিবেশের অস্তিত্ব থেকেও থাকে তাহলেও সেগুলির ওপর ভিত্তি করে একটা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার একটা সীমা আছে: তাছাড়া যত বেশি বেশি করে প্রাক পুঁজিবাদী উৎপাদকেরা উৎখাত হয়, ততই আরও বেশি করে ‘বি-শিল্পকরণের’ সুযোগ হ্রাস পায়। একইভাবে আরও বেশি করে ‘নিঃস্বকরণ’ বাড়ানোর সুযোগও কমে কারণ স্থবির ঔপনিবেশিক অর্থনীতি থেকে তুলনায় আরও অনেক বেশি উদ্বৃত্ত নিষ্পেষণ করে নিয়ে নেওয়া হয়। সাম্রাজ্যবাদের এই যে সীমাবদ্ধতা তার প্রতি প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন রোজা লুক্সেমবার্গ। যদিও কেন সাম্রাজ্যবাদ আবির্ভূত হয় সে সম্পর্কে তাঁর উল্লেখ করা কারণগুলির সীমবদ্ধতা আছে, তবে সেই যুক্তির মধ্যে এই গুণটাও আছে যে তিনিই একথার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন যে, মেট্রোপলিটান দেশের পুঁজিবাদ যত উন্নত হয়েছে ততই বেশি করে সেটি সমস্যার মধ্যে গিয়ে পড়েছে।

ট্রাম্প যে শুল্ক যুদ্ধ শুরু করেছেন সাধারণত সেজন্য দায়ী করা হচ্ছে তার ‌‘‌পাগলামি’–কে অথবা বলা হচ্ছে, বাকি বিশ্বকে তাঁর ‘‌উপেক্ষা করার’ মনোভাবই এর জন্য দায়ী। এবং এধরনেরই একাধিক কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু বস্তুত এই সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে আরও গভীর একটি দ্বন্দ্ব থেকে, যে দ্বন্দ্বের শিকড় রয়েছে পুঁজিবাদের বিকাশ এবং পুঁজিবাদ আরও পরিণত হওয়ার ওপর। তাই শুধুমাত্র ট্রাম্পের ‘‌পাগলামি’‌র ওপর এই দায় চাপিয়ে দেওয়াটা হবে পুরোপুরি সারগর্ভহীন একটা ব্যাখ্যা। পরিহাসের বিষয় হল, ট্রাম্পের বসানো শুল্ক আমেরিকার পক্ষে কাজ করতে পারে দুদিক থেকেই। এর ফলে একদিকে তাদের দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে আবার একইসঙ্গে তাদের চলতি হিসাব খাতে ঘাটতি কমবে। তবে এটা হতে পারে তখনই যদি অন্য দেশগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপানো শুল্কের নিরিখে পাল্টা শুল্ক না চাপায়। কিন্তু যদি অন্য দেশগুলি প্রতিশোধ নিতে শুরু করে তাহলে আমেরিকার চাপানো শুল্ক আর আমেরিকার পক্ষে কাজ করবে না। বরং, এধরনের প্রতিশোধ নেওয়া হলে গোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পক্ষেই বিষয়টা আরও ক্ষতিকর হয়ে উঠবে।

এমনটা ঘটবে কারণ উঁচু হারে শুল্ক আরোপ মানে সর্বত্র মুদ্রায় মজুরির নিরিখে জিনিসের দাম বাড়বে। ফলে মজুরির অংশ থেকে পুঁজি সরে যাবে মুনাফায়। যেহেতু মূল্যবৃদ্ধির কারণে পুঁজিপতির মুনাফার তুলনায় শ্রমিকের মজুরির একটা বড় অংশ খরচ হয়ে যাবে উপভোগে, তাই এধরনের ঘটনা ঘটলে মোট উৎপাদনে উপভোগের স্তর আরও বেশি নেমে যাবে। এর ফলে থোক চাহিদাই (‌এগ্রিগেট ডিমান্ড)‌ কমে যাবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানটাই কমে যাবে। এটা নিশ্চিতভাবেই ঠেকানো যেতে পারে যদি সরকারি খরচ যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি করা যায়। এর জন্য অর্থ সংগ্রহ করা যেতে পারে হয় ধনীদের ওপর কর বসিয়ে নতুবা রাজকোষ ঘাটতি বাড়িয়ে। তবে এই দুই উপায়ে রাষ্ট্রের বাড়তি খরচের অর্থ যোগাড় করার মানে দাঁড়াবে বিশ্বায়িত ফিনান্সের পক্ষে অভিসম্পাত বা গর্হিত কাজ। তাই যদি গোটা দুনিয়া জুড়ে শুল্ক বাড়ানোর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে তাতে বিশ্ব পুঁজিবাদের দশা আরও করুণ হবে। এমনকী এই ধরনের ঘটনা যদি ঘটেও, তাহলেও সেটা হবে বিশ্ব পুঁজিবাদের বুনিয়াদি দ্বন্দ্বের প্রকাশ। এবং মোটেই তা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেহাত ‘‌পাগলামির’‌ ফল নয়।

তাহলে আমাদের সামনে প্রশ্নটা হল: ট্রাম্পের বসানো শুল্ক নিয়ে প্রতিক্রিয়া কী হবে? ট্রাম্পের এই যে আগ্রাসী নীতি তার তাৎপর্য হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ গোলার্ধের সর্বত্র কাজকর্ম ছড়িয়ে দেওয়ার যুগের সমাপ্তি এবং তার ফলে নিও লিবারাল নীতি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে কোনও যুক্তির অবতারণা করারও আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। এই পরিস্থিতিতে ভারতের মতো দেশের পক্ষে গতিপথ বদলের সময় এখন এসে গেছে। এই পরিবর্তনকে অবশ্যই শুরু হতে হবে অর্থনীতির সংরক্ষণ করে এবং দেশীয় বাজারের বিস্তার ঘটিয়ে। শুধুমাত্র সংরক্ষণই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে অবশ্যই থাকতে হবে সরকারি খরচের বৃদ্ধি যার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আসবে ধনীদের ওপর কর বসিয়ে, জনকল্যাণের মাত্রা আরও প্রসারিত করে এবং কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্পের বিকাশে আর গতি এনে যাতে একই সঙ্গে দেশীয় বাজারের আয়তনও বাড়ে।

রাষ্ট্রের তরফে এধরনের যে কোনও সক্রিয়তা দেখানো হলে খুব সম্ভবত লগ্নি পুঁজি এদেশ থেকে সরতে শুরু করবে। যদি লগ্নি পুঁজির সরে যাওয়া ঠেকাতে হয় তাহলে পুঁজির ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি করতে হবে। সংক্ষেপে বললে, ট্রাম্পের চাপানো এই শুল্ক এই তথ্যের দিকে লোকচক্ষু উন্মীলন করে দিচ্ছে যে, এই সন্ধিক্ষণে ভারতের মতো দেশগুলির সামনে সমতাবাদী, জনকল্যাণমুখী, দেশীয় বাজার নির্ভর, এবং রাষ্ট্র সমর্থিত উন্নয়ন‌–নীতির বিকল্প কিছু থাকতে পারে না। 

সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি, ১৩ এপ্রিল ২০২৫ 
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ১৪-এপ্রিল-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org