ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ আসলে নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের আহ্বান  

সাত্যকি রায়
কম্পিউটার, স্মার্ট ফোন, ইলেকট্রিক ব্যাটারী, থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক সরঞ্জাম, খেলনা, জামা কাপড় এসবের মার্কিন আমদানির একটা বড় অংশ আসে চীন থেকে। ইচ্ছে করলেই রাতারাতি এগুলি নিজের দেশে উৎপাদন করা সম্ভব নয় বা পছন্দ মত সাপ্লাই চেইন নির্মাণ করাও সহজ নয়। অন্যদিকে চীন আমেরিকা থেকে কেনে মূলত কৃষিজাত পণ্য যা সহজেই অন্য দেশ থেকে আমদানি করা সম্ভব। চীন ইতিমধ্যেই ব্রাজিল থেকে সয়াবিন আমদানি করা শুরু করেছে। আমেরিকা নানাভাবে চীনকে একঘরে করার চেষ্টা করবে। চীনা কোম্পানিগুলিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টক এক্সচেঞ্জে ডি-লিস্ট করার প্রক্রিয়াও চলতে পারে, অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলিতে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ কমানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক সম্পর্কিত ঘোষণাগুলি যতই অবাস্তব ও অবিবেচক মনে হোক না কেন আসলে পৃথিবীর বাণিজ্য জগতে একটি আলোড়ন সৃষ্টি করাই  মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রধান উদ্দেশ্যওয়াশিংটনে অবস্থিত চরম দক্ষিণপন্থী গবেষণা সংস্থা হাডসন ইনস্টিটিউটে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টামন্ডলীর প্রধান স্টিফেন মাইরান একটি বক্তৃতা করেন যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সে প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক শুল্ক যুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ এখন পরিষ্কার ভাবে এ কথা মনে করে যে ব্রেটন-উডস পরবর্তী পৃথিবীতে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে উৎপাদন ও আর্থিক ব্যবস্থার পরিকাঠামো রচনা করেছিল তা শেষ বিচারে তাদের দেশের জন্য আর বিশেষ উপযোগী নয়মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির তুলনায় আমদানি অনেক বেশি এবং চলতি খাতে ঘাটতির পরিমাণ ক্রমবর্ধমানডলার পৃথিবীর নির্ভরযোগ্য মুদ্রা হওয়ার কারণে যে সমস্ত দেশ আমেরিকায় জিনিস বিক্রি করে নিজেদের দেশের বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত তৈরি করে সেই উদ্বৃত্ত আসলে নিরাপদ অ্যাসেট হিসেবে ডলার সম্বন্ধিত অ্যাসেট সমূহে জমা করা হয়ে থাকেএ কারণেই পৃথিবীর স্টক মার্কেটে মোট যা বিনিয়োগ হয় আজও তার আশি শতাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিকডলারের এই আধিপত্য যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল সুবিধা এনে দিয়েছে একই সাথে অন্য দেশের মুদ্রার সাপেক্ষে ডলারের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত জিনিস অন্যান্য দেশে দুর্মূল্য হয়ে উঠেছেএর অবধারিত ফলস্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে এসেছেমার্কিন কর্তৃপক্ষ মনে করে এবং সুস্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করেছে যে বিশ্ব বাণিজ্যের যে বহুমাত্রিক ব্যবস্থাপনাগুলো ছিল এবং পুঁজিবাদের নেতৃত্ব হিসেবে যে সমস্ত সংস্থাগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ ছিল মূলত দুনিয়াব্যাপী তাদের আধিপত্য কায়েম রাখার জন্য---সেই ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন ঘটানো দরকারপৃথিবীর প্রায় ৮০০ টি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা আছেমার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে পৃথিবীর উদার গণতন্ত্রী দেশগুলি এই নিরাপত্তা পাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকেইএকই সাথে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিনিস বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছে এবং ডলার নিরাপদ মুদ্রা হওয়ার কারণে পৃথিবীর সমস্ত উদবৃত্ত ডলার সম্বন্ধিত নিরাপদ অ্যাসেটে জমা রাখার সুযোগ পাচ্ছে অন্যান্য দেশএই সমস্ত সুযোগ তাদের মতে সব দেশকে এখন থেকে একই ভাবে দেওয়া যাবে নামার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু ও শত্রু দেশ চিহ্নিত করে পৃথিবীর উৎপাদন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার নতুন কাঠামো তৈরি করতে হবে যেখানে ডলারের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিনিসপত্র বিক্রি করতে গেলে অন্যান্য দেশকে কার্যত কর বা সেলামি দিতে হবেযারা মার্কিন বশ্যতা স্বীকার করবে তাদের জন্য শুল্ক কম এবং চীন ও তার বন্ধু দেশগুলির জন্য কার্যত অর্থনৈতিক অবরোধের নানা প্রকার ব্যবস্থাপনা তৈরী করা হবেপৃথিবীর বিভিন্ন দেশগুলির উপরে প্রধানত যে ধরনের শর্ত চাপানোর কথা ভাবা হচ্ছে সেগুলি মোটামুটি এই রকম:  দেশের বাজার খুলে দিতে হবে মার্কিনি রপ্তানির জন্য এবং প্রতিরক্ষা বাজেট ক্রমাগত প্রসারিত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কিনতে হবে অথবা মার্কিন ট্রেজারিতে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে বিনিয়োগ করতে হবে কম রিটার্নের বিনিময়েযারা মার্কিনী বর্ধিত শুল্ক হারের জবাবে মার্কিনী রপ্তানির উপরে সমপরিমাণ শুল্ক হার চাপাবে অথবা ডলারের পরিবর্তে অন্য কোন মুদ্রায় বিশ্ব বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করবে তাদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ অপেক্ষা করছে

ট্রাম্পের গত তিন মাস ধরে বিভিন্ন শুল্কহারের ঘোষণা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যবস্থাপনাকে ওলট পালট করে দিয়েছেতারা মনে করছে বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থ ব্যবস্থার পুরনো কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলির ভাঙচুর আসলে নতুন উৎপাদন ও আর্থিক বিশ্ব কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরিআসলে এই প্রক্রিয়ার পরেই সমস্ত দেশ ট্রাম্পের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি হবে এবং আমেরিকা তখন সেই সমস্ত দেশের শুল্ক কমানোর বিনিময় তাদের বাজারে মার্কিন রপ্তানির জায়গা করে নেবে তারা ভেবেছিল যে চীনও এই আলোড়নের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পের সাথে আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হবেচীন ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে যে বিশ্ব বাণিজ্যের ব্যবস্থাপনায় এই একতরফা হামলা তারা কিছুতেই মেনে নেবে না বরং প্রত্যাঘাতের ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দিয়েছে১৯৮৫ সালে এভাবেই আমেরিকা প্লাজা চুক্তি চাপিয়ে দিয়ে ছিল তার সহযোগী দেশ জাপান ব্রিটেন ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানির উপরেতার ফলস্বরূপ জাপান ডলারের সাপেক্ষে ইয়েনের বিনিময় হার বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয় যার গভীর নেতিবাচক প্রভাব প্রায় এক দশক ধরে জাপানি উৎপাদন ক্ষেত্রে পড়েছিলকিন্তু আজকের দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপ সৃষ্টি কতটা সফল হবে তা ভবিষ্যতে বলবে কিন্তু যেটা খেয়াল রাখা দরকার যে পৃথিবীর অর্থনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব অতীতের তুলনায় গভীরভাবে সংকুচিত হয়েছেপৃথিবীর মোট জিডিপিতে ১৯৬০ এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল প্রায় ৪0 শতাংশ যা কমে অর্ধেক অর্থাৎ ২৬ শতাংশ হয়েছেক্রয় ক্ষমতার তুলনামূলক বিচার অনুযায়ী পৃথিবীর মোট জিডিপির ১৯ শতাংশ এখন চীনের দখলে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকারে রয়েছে ১৫ শতাংশ১৯৪৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ছিল পৃথিবীর ম্যানুফ্যাকচারিং হাব যা বর্তমানে চীন শুধু তাই নয় প্লাজা চুক্তির সময় আমেরিকার মোট ঋণের পরিমাণ তার দেশের জিডিপির ৪০  শতাংশ ছিল যা এখন বেড়ে ১২০ শতাংশ হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত গতি সুপার কম্পিউটার এখন চীনের দখলেচীনের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরশীলতা মূলত শিল্প পণ্যেকম্পিউটার, স্মার্ট ফোন, ইলেকট্রিক ব্যাটারী, থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক সরঞ্জাম, খেলনা, জামা কাপড় এসবের মার্কিন আমদানির একটা বড় অংশ আসে চীন থেকেইচ্ছে করলেই রাতারাতি এগুলি নিজের দেশে উৎপাদন করা সম্ভব নয় বা পছন্দ মত সাপ্লাই চেইন নির্মাণ করাও সহজ নয়। অন্যদিকে চীন আমেরিকা থেকে কেনে মূলত কৃষিজাত পণ্য যা সহজেই অন্য দেশ থেকে আমদানি করা সম্ভবচীন ইতিমধ্যেই ব্রাজিল থেকে সয়াবিন আমদানি করা শুরু করেছেআমেরিকা নানাভাবে চীনকে একঘরে করার চেষ্টা করবেচীনা কোম্পানিগুলিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টক এক্সচেঞ্জে ডি-লিস্ট করার প্রক্রিয়াও চলতে পারে, অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলিতে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ কমানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হতে পারেঅন্যদিকে চীনের মোট রপ্তানির মার্কিন অংশ ক্রমাগত কমে এসেছে এবং চীন এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিবিড় করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে চীনের সরকারি বিনিয়োগ সংস্থার বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলির প্রাইভেট ইকুইটিতে রয়েছেএই বিনিয়োগ চীন ধীরে ধীরে কমাবে বলে আশঙ্কা করছে মার্কিন কোম্পানিগুলি  অতএব আজকের পৃথিবীতে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এতটাই বাস্তব যে চীনকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কঠিনআজকের বাস্তবতা এটাই যে পৃথিবীর অর্থনৈতিক বৃদ্ধি মূলত এশিয়ার দেশগুলোর উপরে নির্ভরশীল বাজার এখানেই প্রসারিত হচ্ছেউৎপাদন ব্যবস্থা গভীরভাবে এই ভূগোলেই প্রোথিতশুধু তাই নয়, একদিকে যেমন এটা সত্য যে মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটি বন্ড থেকে এই সমস্ত দেশের বিনিয়োগ কমতে শুরু করলে ডলারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে আবার একই সাথে যেহেতু এই সমস্ত দেশ ডলার সম্বন্ধিত অ্যাসেটে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করে থাকে তাই ডলারের দাম ব্যাপকভাবে কমে গেলে এই দেশগুলিরও বিনিয়োগ ও সম্পদেরও রিটার্ন কমে যাবে। এই বাস্তবতার মধ্যেই দ্বিমেরু পৃথিবীর মার্কিনি কল্পনাটির সম্ভাবনা আগামী দিনে আবর্তিত হবেএকবিংশ শতাব্দীতে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান বিভিন্ন দেশকে চীনের কাছাকাছি এনে দিয়েছে ভারতও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রমবর্ধমান বাজার-- যে দেশের বৃদ্ধির হার এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সবচাইতে বেশিমনে রাখা দরকার যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছেপৃথিবীর মোট জিডিপির অর্ধেকের বেশি অধিকার করে রয়েছে ব্রিক্স অন্তর্ভুক্ত উন্নয়নশীল দেশগুলিঅতএব পৃথিবী আজকে আর একটি দুটি বড় দেশের পছন্দ অনুযায়ী আবর্তিত হবে এরকম ভাবার কোন কারণ নেইপ্রত্যেকটি দেশই পরিবর্তিত বিশ্বে নিজেদের স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় অবস্থান গ্রহণ করবেআগামী দিনগুলিতে বিভিন্ন ভূখণ্ডে অবস্থিত দেশগুলির এক জায়গায় আসার সম্ভাবনাও প্রবল হয়ে উঠছেখেয়াল করলে দেখা যাবে যে আপাতভাবে যথেষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না থাকলেও জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া চীন এই বাণিজ্য যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছেএরকম অজস্র সম্ভাবনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দমত পৃথিবী তৈরি করার কল্পনাকে দুর্বল করবেএই ধরনের আঞ্চলিক বোঝাপড়া ও পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্য ডলারের আধিপত্যকেও ক্রমাগত খর্ব করবেদুনিয়াব্যাপী মার্কিন আধিপত্য কায়েম করার নতুন কৌশলকে পরাস্ত করার এরকম অজস্র সম্ভাবনার দিকে চেয়ে থাকবে উন্নয়নশীল দেশগুলির শ্রমজীবী মানুষঅন্যদিকে নিজেদের দেশের সরকারেরও কোনো ধরনের মার্কিনি তাঁবেদারির প্রবণতার বিরুদ্ধে শ্রমজীবী জনগণের সজাগ থাকা আজ অত্যন্ত জরুরী  


প্রকাশের তারিখ: ২৯-এপ্রিল-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org