|
ইউক্রেন: ন্যাটো বনাম রাশিয়া (১)সুচিক্কণ দাস |
ওয়ারশ চুক্তি জোট তুলে দেওয়া হলে ন্যাটোর অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। এরপরেও ন্যাটো আছে বহাল তবিয়তে এবং সোভিয়েতের ভাঙনের পর মার্কিন প্রশাসন কথা দেওয়া সত্ত্বেও ন্যাটো তার পূবমুখী সম্প্রসারণ বাড়িয়ে চলেছে। এই সম্প্রসারণ কর্মসূচির শেষতম লক্ষ্য ছিল কিয়েভে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র বসানো। এবং সেই প্রয়াসকে ঘিরেই আজকের রাশিয়া-ইউক্রেন সঙ্ঘাত। এখানে জেলেনস্কিকে শিখণ্ডী সাজিয়ে আসল লড়াইটা লড়ছে আমেরিকা ও ন্যাটো। |
১। ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ৯ মাস পেরিয়ে দশমাসে পড়ল ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান। একথা এখন সবারই জানা যে, যুদ্ধটা আসলে ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার নয়। এই যুদ্ধ আসলে মার্কিন নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক সংঘাত। এবং ইউক্রেনকে সামনে রেখে বকলমে এই যুদ্ধ চালাচ্ছে আমেরিকা ও ন্যাটো জোট। এই যুদ্ধের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিকগুলির গুরুত্ব খুবই বেশি এবং ইতিমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব খুবই গভীর। ইদানীং এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ ও সেগুলোর তাৎপর্য সম্পর্কে বিভিন্নভাবে আলোচনা চলে আসছে। যদিও বেশির ভাগ নিবন্ধ ও পরিবেশিত তথ্যগুলি পশ্চিমী সূত্রে আসা। সেকারণে যুদ্ধে ইউক্রেনের সাফল্য এবং রাশিয়ার ব্যর্থতার কথাই বারে বারে বলা হচ্ছে। রাশিয়ার দিক থেকে গত ৯ মাসের সামরিক ঘটনাবলীকে কীভাবে দেখা হচ্ছে সেসব বিষয়ে রাশিয়ার সূত্রে পাওয়া তথ্য খুবই সংক্ষিপ্ত। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে ঠিক কী ঘটছে তা পশ্চিমী সংবাদমাধ্যমের একপেশে রিপোর্ট থেকে উদ্ধার করা কঠিন। তবে অতি সম্প্রতি এই যুদ্ধ সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। যেহেতু শীত পড়ে গেছে তাই ইউক্রেনের যেসব অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে সেই এলাকাগুলি বরফে ঢেকে গেছে। নদীর জলও জমাট বাঁধা। কর্দমাক্ত পথঘাটের যা অবস্থা তাতে এখন কোনও পক্ষই যুদ্ধ চালানোর মতো পরিস্থিতিতে নেই। ফলে গোটা শীতটা, আগামী তিন থেকে চার মাস, যুদ্ধ কার্যত বন্ধই থাকবে। বিবিসি–র ভাষায় যুদ্ধের গতি ‘শ্লথ’ হবে। এর মানে পরবর্তী আক্রমণ বা পাল্টা আক্রমণ শুরু না হওয়া পর্যন্ত আগামী দুই বা তিন মাস ইউক্রেন যুদ্ধে স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে। এটা গোটা ইউরোপের চরম আতঙ্কের কারণ। কারণ যুদ্ধ না থামলে রাশিয়ার জ্বালানি ও ইউক্রেনের গমের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না। ফলে প্রবল শীতে ইউরোপ জুড়ে জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হবে, দামও বাড়তে থাকবে এবং পাল্লা দিয়ে বাড়বে ইউরোপের শহরে শহরে মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কতদূর তার প্রমাণ মিলেছে ব্রিটেনে চেস্টার শহরের উপনির্বাচনে। এই নির্বাচনে চেস্টার আসনে লেবার পার্টি ফের জিতেছে তাদের ভোট বাড়িয়ে। এর আগের ভোটে ক্ষমতাসীন টোরি দলের প্রার্থীর চেয়ে লেবার পার্টির প্রার্থী পেয়েছিলেন ১১.৩ শতাংশ বেশি ভোট। এবার ব্যবধান বেড়ে হয়েছে ৩৩.৮ শতাংশ। এই আসনে লেবার পেয়েছে ৬১.২ শতাংশ ভোট এবং টোরি প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ২২.৪ শতাংশ ভোট। ঋষি সুনক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ক্ষমতাসীন টোরি দলের ভোট শতাংশ ৩৮.৩ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২২.৪ শতাংশে। বোঝাই যাচ্ছে ব্রিটেনে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির জমানায় ভোটদাতারা কী বার্তা দিতে চাইছেন। চলতি বছরে কী আমেরিকায়, কী ব্রিটেনে মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড মাত্রা ছুঁয়েছে। ইতিমধ্যেই পুতিন বার্তা দিয়েছেন এই বলে যে ‘This might be a lengthy process’ (RT news, 7 Dec., 2022)। অন্যদিকে কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিটসচকো জানিয়েছেন, ইউক্রেনের পাওয়ার গ্রিডে ক্রমাগত রুশ হামলা কিয়েভে বিপর্যয় ঘনিয়ে তুলতে পারে এই শীতে। দেখা যেতে পারে হলিউড ছবির মতো ভয়ঙ্কর দৃশ্য। (RT news, 7 Dec., 2022)। অর্থাৎ প্রবল শীতে বিদ্যুৎ পরিকাঠামো ধ্বংস করে জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত করে ইউক্রেনকে চাপে রাখতে চাইছে রাশিয়া। এইযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে ধরে নিয়ে ডিসেম্বরের গোড়ায় সুর বদল করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বাইডেন। তিনি ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন যে, পুতিন রাজি থাকলে তিনি যুদ্ধ মেটানোর বিষয়ে আলোচনায় রাজি। ফরাসি রাষ্ট্রপতি ম্যাঁক্রর সঙ্গে বৈঠকের পরেই এই মন্তব্য করেছেন বাইডেন। অন্যদিকে একই সঙ্গে জার্মান চ্যান্সেলর প্রায় তিন মাস বাদে ফোন করে টানা এক ঘণ্টা পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন তাঁর মন বোঝার জন্য। এর মানে, জ্বালানি-সহ অর্থনীতির সঙ্কটের মোকাবিলায় ফ্রান্স ও জার্মানি চাইছে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হোক দ্রুত এবং তাতে সাড়া দিন পুতিন। এবং ইউরোপের নেতারা এই অভিযোগ তুলছেন যে, এই যুদ্ধের সুযোগে একদিকে ইউক্রেনকে অস্ত্র বিক্রি করে এবং অন্যদিকে ইউরোপকে চড়া দামে তেল বিক্রি করে মুনাফা লুঠছে রাশিয়া। সেকারণে অর্থনৈতিক স্বার্থ ঘিরে ইউরোপ এবং আমেরিকার দ্বন্দ্বও বাড়ছে। এরই পাশাপাশি, চেয়ারম্যান অফ দ্য ইউ এস জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ জেনারেল মার্ক মিলি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মস্কোর সঙ্গে আলোচনার যে কোনও সুযোগকেই আঁকড়ে ধরা উচিত। এতে রীতিমতো ক্ষিপ্ত মার্কিন রাজনীতিকদের একাংশ। ফলে সন্দেহ করা হচ্ছে, জেলেনস্কিকে সমর্থন দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের উচ্চস্তরইে দ্বিমত রয়েছে। এসব কিছুর ভিত্তিতে বিবিসির ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্ট পল অ্যাডামসের প্রশ্ন, Can we expect peace talks to Begin? (বিবিসি, ৩ মার্চ, ২০২২) একদিকে প্রতিদিন যখন পশ্চিমী সংবাদ মাধ্যম যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর বিপুল ব্যর্থতা দেখছে এবং আশা করছে যে, শীত শেষ হলেই জেলেনস্কির নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী খেরসন শহর দখল করে রুশ বাহিনীকে বিধ্বস্ত করে ফেলবে, তখন তাদের নেতারা কেন রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনার রাস্তা খুলতে চাইছেন? এই প্রশ্নের উত্তর বহুমাত্রিক। তবে আমরা এখানে আমরা সামরিক ক্ষেত্রের একটি দিক নিয়ে আলোচনা করব, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়ত হওয়ার ক্ষেত্রে যার গুরুত্ব খুবই বেশি।
এবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে ডনবাস সাধারণতন্ত্রের ডনেৎস ও লুগানস্ক ছাড়াও মারিয়ুপল, মেলটিওপল, খেরসন, ঝপোরিঝঝিয়া অঞ্চল দখল করে রুশ বাহিনী পৌঁছে যায় নীপার নদী পেরিয়ে কিয়েভের দোরগোড়ায়। সেটা ছিল মার্চের গোড়ার দিকে। পশ্চিমী সংবাদ মাধ্যমের খবর, এরপর থেকে কিয়েভ বাহিনী পাল্টা প্রতিরোধ করায় ২৯ মার্চ রুশ বাহিনী কিয়েভ ছেড়ে পিছু হঠে। এরপর ইউক্রেনের প্রতিরোধ বাড়লে ক্রমাগত পিছু হঠতে থাকে রুশ বাহিনী। মাঝখানে রুশ বাহিনীর অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় জেনারেল সের্গেই সুরভিকিনকে যিনি সিরিয়ায় মার্কিন হমালার হাত থেকে আসাদ সরকারকে রক্ষা করতে এবং নতুন করে ওই অঞ্চলে রুশ প্রভাববলয় তৈরি করতে রুশ বাহিনীকে সফল নেতৃত্বে দিয়েছিলেন। সুরভিকিন দায়িত্ব নেওয়ার পর রুশ সেনাবাহিনীর সামরিক কৌশল বদলায়। ক্রমশ পিছিয়ে এসে নীপার নদীর দুপাড়ে ছড়িয়ে থাকা খেরসনে এসে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্রমশ জোরদার করতে থাকে রুশ সেনা। লক্ষ্য, দীর্ঘ শীতকালের সুযোগে রুশ বাহিনীর পিছনের শক্তিকে আরও সংহত করা। এবং খেরসনে ঘাঁটি গেড়ে বসে থেকে যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করা। ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ইউক্রেনে রুশ সামরিক অভিযানের মধ্যে একটা ছক আছে। প্রথমে আকাশপথে হামলা চালিয়ে ইউক্রেনের সামরিক ও অন্যান্য পরিকাঠামো ধ্বংস করা। এরপর ট্যাঙ্ক ও গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে দ্রুত নিষ্পত্তির যুদ্ধে (সামরিক পরিভাষায় War of Quick Decision) কিয়েভের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। এতে পদাতিক বাহিনীর ভূমিকা কম এবং সেনাবাহিনীর প্রাণের ক্ষতিও কম হয়। কারণ এই যুদ্ধ মূলত উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর। মূলত চেচেনিয়া ও সিরিয়ার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে অভিযানের এই কৌশল সূত্রায়িত করেন রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর জেনারেলরা। প্রশ্ন হল, এরপর কেন কিয়েভে ঘাঁটি গেড়ে বসে না থেকে রুশ বাহিনী প্রথমে কিয়েভ ছাড়ে এবং পরে বেশ কয়েক হাজার মাইল এলাকা ছেড়ে পিছিয়ে এসে খেরসনে ঘাঁটি গাড়ে। ইউক্রেনের পিছনে ন্যাটো ও আমেরিকা আছে জেনেই রাশিয়া ইউক্রেন অভিযান শুরু করেছিল। তাহলে কেন দ্রুত নিষ্পত্তির যুদ্ধের কৌশলে মস্কো থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে রণাঙ্গন ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সরবরাহ লাইনকে অনিশ্চিত করে তুলে বাহিনীকে বিপন্ন করে তুলতে চাইবেন রুশ সেনানায়কেরা? ন্যাটোর বিশেষজ্ঞদের দাবি, আসলে ইউক্রেনের সফল প্রতিরোধের (মার্কিনী ও ন্যাটোর সমরাস্ত্রে পুষ্ট) কারণেই রুশ বাহিনীর এই পশ্চাদপসরণ। তবে এই পশ্চাদপসরণকে অন্যদিক থেকেও দেখা যায়। মনে রাখা দরকার যে, জারের আমলের পর সোভিয়েত সেনাবাহিনীর একটা মৌলিক চরিত্রগত পরিবর্তন ঘটে। পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী সেনাবাহিনীর মতো, সোভিয়েতের সেনাবাহিনীর আগ্রাসী বাহিনী হিসাবে কাজ করার ইতিহাস নেই। প্রথমে গৃহযুদ্ধের সময় ও পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাল ফৌজ ছিল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন-প্রতিরোধী মুক্তিবাহিনী। বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে নবগঠিত লাল ফৌজ ১৯১৮ থেকে ১৯২১ এই তিন বছরের গৃহযুদ্ধে দেশের ভিতরের ও বাইরের আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী ও বুর্জোয়া শক্তির বাহিনীগুলিকে পরাস্ত করে সর্বহারার বিপ্লবকে রক্ষা করেছিল। দ্বিতীয় দফায় লাল ফৌজ নাৎসি জার্মানির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে শুধুমাত্র সামরিক বাহিনীর যুদ্ধে সীমাবদ্ধ না রেখে একে জনযুদ্ধে পরিণত করার সফল রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছিল। এই কৌশলের সাহায্যেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভেতর থেকে কমিউনিস্ট সহ নানা রাজনৈতিক শক্তির গড়ে তোলা পার্টিজান বাহিনীগুলির সহায়তায় নাৎসি শাসন থেকে ইউরোপকে মুক্ত করেছিল। নাৎসি আগ্রাসন বিরোধী জনযুদ্ধ— এই চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী বাহিনীদের থেকে লাল ফৌজকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছিল। এবং এই সামরিক কৌশলের পিছনে ছিল যুক্তফ্রন্টের রাজনীতি। অর্থাৎ সোভিয়েতের রাজনীতি তৈরি করে দিয়েছিল লালফৌজের সামরিক কৌশল। এই বৈশিষ্ট্য থেকে সোভিয়েতের সামরিক বাহিনী বিচ্যুত হয়েছিল আফগানিস্তানে। স্ট্র্যাটেজিক কারণে মার্কিন বিরোধী সামরিক ভারসাম্য তৈরির লক্ষ্যে আফগানিস্তানে যায় সোভিয়েত ফৌজ। সেখানকার জনগণের ও রাজনৈতিক শক্তির একটা অংশ অবশ্যই সোভিয়েত বাহিনীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আফগানভূমির বৈশিষ্ট্য এবং আফগানিস্তানের বৃহত্তর জনসমাজ অর্থাৎ উপজাতিগুলির স্বাধীনতা প্রিয়তা, গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো ভূপ্রকৃতি, এসব রাজনৈতিক ও সামরিক উপাদানগুলি ঠিকমতো বিবেচনা না করায় আফগানিস্তানে রুশ বাহিনী তাদের সামরিক অভিযানকে জনযুদ্ধে পরিণত করতে পারেনি। বরং, মার্কিনীরাই সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান উপজাতিগুলিকে সমাবেশিত করতে সক্ষম হয়েছিল। এবং আফগানিস্তানের মানুষের একটা অংশের কাছে সোভিয়েত বাহিনী দখলদার হিসাবেই চিহ্নিত হয়েছিল। এই রাজনৈতিক ভুলের কারণেই শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত সেনার আফগানিস্তান অভিযান ব্যর্থ হয়। লালফৌজের যে রাজনৈতিক ও সামরিক বিশিষ্টতা তাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অজেয় করেছিল, আফগান অভিযানে তা মেনে না চলার কারণেই এই ব্যর্থতা। ৩। ইউক্রেন যুদ্ধের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য যে কোনও নির্দিষ্ট যুদ্ধের মতো ইউক্রেন যুদ্ধের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রুশ ভাষাভাষী ও ইউক্রেনবাসীদের সম্পর্ক, বিশেষত জারের পরবর্তী সোভিয়েত সরকারের আমল থেকে, অনেকটা বাংলাদেশের ঘটি-বাঙালদের মতো। দুপক্ষই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে প্রথমে গৃহযুদ্ধে ও পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে। সোভিয়েতের অনেক নেতা, বিজ্ঞানী, ক্রীড়াবিদ এসেছেন ইউক্রেন থেকে। এঁদের মধ্যে অন্যতম ট্রটস্কি ও লিওনিদ ব্রেজনেভ। একসময় শিল্প স্থাপনের প্রয়োজনে বহু রুশ পরিবার ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। একইভাবে বহু ইউক্রেনিয় পরিবার চলে আসে রাশিয়ায়। এখনও রাশিয়া ও ইউক্রেনের বহু পরিবার রয়েছে যেখানে একই পরিবারের সদস্য হিসাবে বাস করছেন রুশি ও ইউক্রেনিয়রা। মানে, সোভিয়েত নীতিতে জারের আমলের নিপীড়ণ না থাকায়, রুশি ও ইউক্রেনিয়দের মধ্যে অবাধ মেলামেশার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন হিসাবে রাশিয়া ক্রিমিয়া এলাকা ইউক্রেনের সাধারণতন্ত্রকে উপহার দিয়েছিল। তবে ২০১৪ সালে রাশিয়া ফের ক্রিমিয়া দখল করে নেয়। এই উল্টোরথ যাত্রার শুরু মার্কিন মদতে ইউক্রেনে কমলা বিপ্লবের পর্বে। পশ্চিনী মদতে পরিকল্পিত এই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় তৎকালীন নির্বাচিত শাসক ইয়ানুকোভিচের সরকার। ইয়ানুকোভিচ ও তাঁর সরকার ছিল রুশ ঘেঁষা। তখন থেকেই মার্কিনপন্থী ইউক্রেনের শাসকেরা ইউক্রেনিয় সমাজে রুশ বিরোধী বিষ ছড়াতে শুরু করে এবং সেই আক্রমণ মূলত নেমে আসে ইউক্রেনের বাসিন্দা রুশ ভাষাভাষীদের ওপর। এঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ খারকভ, ডনেৎস, লুগানস্ক ইত্যাদি এলাকায়। রুশ বিরোধী হিংসা ছড়িয়ে দেওয়ার পর্বে ওডেসা শহরের ট্রেড ইউনিয়ন অফিসে আগুন লাগিয়ে কমপক্ষে ৪২ জন রুশপন্থীকে পুড়িয়ে মারা হয় ২০১৪ সালের মে মাসে। এভাবেই তিক্ততা বাড়িয়ে ইউক্রেনের মার্কিন ও ন্যাটোপন্থী শাসকেরা ইউক্রেনে বসবাসকারী রুশ ভাষাভাষীদের বিচ্ছিন্ন করা শুরু করে। এবং আক্রমণ নামে তাঁদের পেশা ও সংস্কৃতির ওপর। এসবের মূল লক্ষ্য ছিল, ইউক্রেনকে রাশিয়া-বিরোধী ঘাঁটি হিসাবে গড়ে তুলে কিয়েভে মার্কিনী পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র বসানো, যে ক্ষেপণাস্ত্রের মস্কো পৌঁছতে সময় লাগবে ৯ মিনিট। পরিস্থিতিটা অনেকটা কিউবান মিসাইল সঙ্কটের মতো পরিণতি পেতে শুরু করে। ওয়ারশ চুক্তি জোট তুলে দেওয়া হলে ন্যাটোর অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। এরপরেও ন্যাটো আছে বহাল তবিয়তে এবং সোভিয়েতের ভাঙনের পর মার্কিন প্রশাসন কথা দেওয়া সত্ত্বেও ন্যাটো তার পূবমুখী সম্প্রসারণ বাড়িয়ে চলেছে। এই সম্প্রসারণ কর্মসূচির শেষতম লক্ষ্য ছিল কিয়েভে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র বসানো। এবং সেই প্রয়াসকে ঘিরেই আজকের রাশিয়া-ইউক্রেন সঙ্ঘাত। এখানে জেলেনস্কিকে শিখণ্ডী সাজিয়ে আসল লড়াইটা লড়ছে আমেরিকা ও ন্যাটো। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনে জনসংখ্যার গঠন যা আমরা দেখলাম তাতে রাশিয়ার সামরিক অভিযানকে সব ইউক্রেনবাসী সমর্থন করবেন না এটাই স্বাভাবিক। জেলেনস্কি ও তাঁর অনুগামী বাহিনী, যারা ন্যাটোয় যোগ দিয়ে আমেরিকা ও পশ্চিমী শক্তিকে ইউক্রেনে ডেকে আনাতে চায় তাদের রুশ বিরোধিতার কারণ স্পষ্ট। কিন্তু এই ছক না বুঝে জাতীয়তাবাদী আবেগ থেকেও অনেক ইউক্রেনবাসী রুশ বিরোধী যুদ্ধে যোগ দিতে পারেন। এই অংশের চোখে রাশিয়া হল আগ্রাসী দেশ। এর মানে ইউক্রেনভাষীদের একাংশের কাছে রুশ বাহিনী মুক্তি ফৌজ নয়, বরং আগ্রাসী, দখলদারি শক্তি। এটা রাশিয়ার দিকে থেকে মূল সমস্যা। আবার ইউক্রেনের নির্যাতিত রুশ ভাষাভাষীরা এবং ন্যাটো বিরোধী ইউক্রেনের নাগরিকেরা রাশিয়ার অভিযানকে স্বাগত জানাবেন, এটাই স্বাভাবিক। এটা রাশিয়ার অ্যাডভান্টেজ। সব মিলিয়ে রাশিয়ার দিক থেকে দেখলে, ইউক্রেনের রাজনৈতিক সমস্যা রীতিমতো জটিল। ফলে আধুনিক যুদ্ধের নিয়ম বিমান হানা ও ট্যাঙ্ক পাঠিয়ে ইউক্রেনের বড় বড় শহরগুলি যখন রুশ সেনা দখল করতে চাইছে, তখন জেলেনস্কি ও পশ্চিমীদের পাঠানো ভাড়াটে বাহিনী ছাড়াও (ভাড়াটেরা যে আছে তার প্রমাণ আজভস্টাল কারখানার লড়াই) রুশ বাহিনীকে ইউক্রেনের জনতার একাংশের বিরোধিতায় পড়তে হচ্ছে। অথচ লাল ফৌজের আরবান ওয়ারফেযার বা শহর অভিযানের মূল নীতি ছিল, ‘In urban reconnaissance, for example, “a thorough search is conducted with the assistance of the workers, the poor, and the strata of the population close to us.” The first task of reconnaissance in urban warfare was to determine “the political condition of the urban population and the possibility of enlisting the workers in active struggle.”(Field Regulations of the Red Army, 1929 (Foreign Broadcast Information Service, 1985), translation of Polevoiustav RKKA 1929, hereafter Red Army 1929. See parts. 331–339, pp. 119–123.) এর মানে শহর যুদ্ধের মূল চরিত্রটি ঠিক করে দেবে রাজনীতি, সামরিক নীতি নয়। যে শত্রু-শহরে অভিযান হবে সেখানকার শ্রমিকশ্রেণি, গরিব মানুষ এবং লালফৌজের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্নদের সহযোগিতা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তবেই সেই শহরে সামরিক অভিযান সফল হতে পারবে। এবং এই ধরনের অভিযানে লালফৌজের ভূমিকা হবে দখলদারি ফৌজ নয়, মুক্তিফৌজের ভূমিকা। এই কারণেই লেনিন বলেছিলেন, ‘Politics is the guiding force, and war is only the tool, not vice versa. Consequently it remains only to subordinate the military point of view to the political.’ (লেনিন, কালেক্টেড ওয়ার্কস, ভল্যুম ১২, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৩১, পৃষ্ঠা ৪৩৭। এই উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে ভি ডি সকোলোভস্কির লেখা সোভিয়েট মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ থেকে। ১৯৬৩র এপ্রিলে বইটি প্রকাশ করে ইউনাইটেড স্টেটস এয়ারপোর্ট প্রজেক্ট রান্ড)। প্রকাশের তারিখ: ১১-ডিসেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |