|
ইউক্রেন: ন্যাটো বনাম রাশিয়া (২)সুচিক্কণ দাস |
স্তালিনগ্রাদে জার্মানরা ঢুকে পড়ার কয়েকদিন আগে ১৯৪২ এর ৩ সেপ্টেম্বর স্তালিন জুকভকে লিখছেন, 'স্তালিনগ্রাদের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। শহরের ২ মাইল বাইরেই রয়েছে শত্রু। আজ কিংবা কাল স্তালিনগ্রাদ দখল হয়ে যেতে পারে। এখন দেরি করাটাই অপরাধ।' |
৪। আরবান ওয়ারফেয়ার ও লাল ফৌজ ১৯৪২ সালের শরৎকালে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর পরাজয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। লালফৌজের সেই অভিযানের নাম ছিল অপারেশন ইউরেনাস। এই অভিযানের কৌশল রচনায় ভূমিকা ছিল ১৯২০ সালে রচিত ভ্লাদিমির ট্রিয়ান্ডাফিলভের সামরিক তত্ত্বের। জারের আমলের এই তত্ত্বকে পরে পরিশীলিত করেছিলেন জারের আরেক সেনাপতি মার্শাল মিখাইল তুকাচেভস্কি। ১৯৩৭ সালের সোভিয়েত বিরোধী চক্রান্তের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অপরাধে তুখাচেভস্কির মৃত্যুদণ্ড হয়। তবে তাঁর তৈরি সামরিক কৌশল পুরোপুরি খারিজ করে দেয়নি লালফৌজ। নেপোলিয়নকে হারানোর পর্বে তৎকালীন রুশ সেনানায়ক জেনারেল কুটুজভ যেভাবে ক্রমাগত পশ্চাদপসরণ করে নেপোলিয়নের বাহিনীকে মস্কোর উপকণ্ঠে টেনে এনে পর্যুদস্ত করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল নেপোলিয়নের ‘ওয়ার অফ কুইক ডিশিনস’কে এড়িয়ে দীর্ঘায়ত যুদ্ধের কৌশল নেওয়া। এবং নিজের সুবিধামতো জায়গায় শত্রু বাহিনীর মোকাবিলা করা। রুশ বাহিনী সেবার মস্কো থেকে আরও পিছিয়ে চলে গিয়েছিল। তত দূর ধাওয়া করার মতো সামরিক লজিস্টিক নেপোলনিয়নের বাহিনীর ছিল না। তাছাড়া কুটুজভের বাহিনী মস্কোয় আগুন লাগিয়ে দিয়ে লুঠপাটের লাভ থেকে ফরাসি বাহিনীকে বঞ্চিত করে। সব মিলিয়ে ক্লান্ত নেপোলিয়নের পিছনে ফেরা ছাড়া আর উপায় ছিল না। আর তখনই শেষ আঘাত হানে রাশিয়ার ‘জেনারেল উইন্টার’। পর্যুদস্ত হয় ইউরোপজয়ী নেপোলিয়ন বাহিনী। কুটুজভের এই কৌশলও হারিয়ে যায়নি। যে ব্লিৎসক্রিগের জেরে নাৎসিরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল দ্বিতীয় বিশ্বুদ্ধের আমলে, তার গতি পরিকল্পিত উপায়ে শ্লথ করে দিয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘায়ত করাই ছিল স্তালিনের নেতৃত্বে স্তাভকার লক্ষ্য। ফলে নাৎসি বাহিনীর ব্লিৎসক্রিগ ঠেকাতে মস্কোর পথে পর পর সাজানো হয় পাঁচটি প্রতিরোধ ব্যূহ। প্রতিরোধের একটি লাইন ভাঙলে পরের লাইনে গিয়ে জড়ো হতে রুশ সৈন্যরা। তৈরি হত আরও দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ। এভাবে চারটি অবরোধ ভেঙে জার্মান বাহিনী যখন মস্কোর কাছে পৌঁছয়, তখন তারা বিধ্বস্ত এবং সামনেই শীত। অতএব অভিযানে স্থিতাবস্থা এবং রুশ বাহিনীর শক্তি সংহত করার সুযোগ। ইতিমধ্যে সামরিক ও অসামরিক উৎপাদন ব্যবস্থা সরিয়ে ফেলা হয়েছে সুদূর কুইবিশেভ শহরে যাতে মস্কোর পতন হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যায়। তবে যুদ্ধ দীর্ঘাযত হওয়ারা কারণেই মস্কো রক্ষা পেয়ে যায়। এবং দেশের হিন্টারল্যান্ড বা পশ্চাদভূমি থেকে অব্যাহত থাকে সামরিক সরবরাহ। প্রতিরোধ করতে করতে পিছিয়ে গিয়ে নাৎসি অভিযানকে দীর্ঘায়ত করে ক্লান্ত ও অবসন্ন করে ফেলা, ব্লিৎসক্রিগের গতিকে দুর্বল করে ফেলা— স্তালিন এবং স্তাভকার এই কৌশল এক অর্থে জেনারেল কুটুজভের কৌশলেরই ধারাবাহিকতা। স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর পরাজয়ের আরও একটি বড় কারণ যুদ্ধের অন্যতম মূল উপকরণ নাৎসি বাহিনীর জ্বালানি তেলের ভাণ্ডার শেষ হয়ে যাওয়া। ফলে মূল অভিযান থেকে সেনা সরিয়ে হিটলারকে নজর দিতে হয় বাকু ও গ্রজনির তেলের খনি এবং ডনবাসের ধাতু খনির দখলে। আর এভাবে মূল বাহিনী ভাগ হয়ে যাওয়ায় জার্মান আক্রমণের ধারটাই কমে যায় যার অ্যাডভান্টেজ পেয়েছিল লালফৌজ। হিটলারের জেনারেলরা একে হিটলারের ভুল সিদ্ধান্ত বলে রুশ কৌশলের সাফল্যকে ধামাচাপা দিতে চান। আসল কথা হল, ক্রমাগত প্রতিরোধ গড়ে তুলে যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করে জার্মান বাহিনীকে রণক্লান্ত করে ফেলাটাই ছিল ব্লিৎসক্রিগকে দুর্বল করে ফেলার কৌশল। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়ত হয়েছে ততই টান পড়েছে জার্মানির তেলের ভাণ্ডারে, আর সেকারণেই বাধ্য হয়ে অভিযানের লক্ষ্য বদল করার পরিণামে স্তালিনগ্রাদে হিটলারের পরাজয়। আসলে এই যুদ্ধে অর্থনৈতিকভাবেও হেরেছিল জার্মানি এবং রাশিয়ার মতো বিশাল দেশে কাজে লাগেনি হিটলারের ব্লিৎসক্রিগ, একথাটা এখনও জার্মানি ও পশ্চিমী ঐতিহাসিকেরা স্বীকার করতে চান না। এখানেই এসে পড়ে আরবান ওয়ারফেয়ার প্রসঙ্গ। নাৎসি অভিযানের শুরুর দিকে লাল ফৌজ প্রতিরোধ গড়ে তোলে বড় বড় শহরে। এগুলোর মধ্যে ছিল ওডেসা, তুলা, কিয়েভ, সেভাস্তোপোল, লেনিনগ্রাদ। লেনিনগ্রাদ বাদে বাকি শহরগুলিতে দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ গড়ে তুলে শেষে পরাজিত হয়ে শহর ছাড়ে লালফৌজ। এগুলোকে পরাজয় বলা হবে নাকি সামরিক পরিভাষায় War of Attrition বা শক্তিক্ষয়কারী যুদ্ধ বলা হবে সেনিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারণ দীর্ঘ প্রতিরোধের পর লালফৌজ যখন সেভাস্তোপোল ছেড়ে পিছু হঠে, তখন সেই শহরে লুঠ বা দখল করার মতো অবশিষ্ট আর কিছুই ছিল না। ফলে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওই শহরে দখলে পদাতিক সেনা না পাঠিয় জার্মান সেনাপতি এরিখ ভন ম্যানস্টেইন আকাশপথে ও গোলন্দাজ বাহিনীর বিপুল হামলা চালিয়ে শহরটাকে ধ্বংস করে দেন। ততক্ষণে অবশ্য সরে গেছে লালফৌজ। ১৯৪১ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে এই শহরগুলির প্রতিরোধের একটা ছক ছিল লালফৌজের। প্রতিরোধ গড়ো, জার্মানদের অগ্রগতি থমকে দাও এবং ব্লিৎসক্রিগকে শ্লথ করে দাও। যাতে পশ্চাদভূমিতে সামপির উৎপাদন ও সরবরাহ অক্ষুন্ন রাখা যায়। অন্যদিকে জার্মানদের দীর্ঘ সরবরাহ লাইনে অন্তর্ঘাত গড়ে তোল পার্টিজান বাহিনীর সাহায্য। এভাবে শত্রুর পশ্চিদভূমিকেও দুর্বল করে দাও। স্তালিনগ্রাদে এসে আরবান ওয়ার ফেয়ারের এই কৌশলটা বদলে যায়। এবং এই ক্ষেত্রে কৌশলের একটা গুণগত উত্তরণ ঘটানো হয়। ডিফেন্স ফর দ্য সিটি থেকে উত্তরণ ঘটানো হয় ডিফেন্স ইন দ্য সিটিতে। এই তত্ত্বের আইডিয়া দেন রুশ জেনারেল ভাসিলি চুইকোভ। পরে তাতে সিলমোহর দেন স্তালিন। স্তালিনগ্রাদে জার্মানরা ঢুকে পড়ার কয়েকদিন আগে ১৯৪২ এর ৩ সেপ্টেম্বর স্তালিন জুকভকে লিখছেন, ‘স্তালিনগ্রাদের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। শহরের ২ মাইল বাইরেই রয়েছে শত্রু। আজ কিংবা কাল স্তালিনগ্রাদ দখল হয়ে যেতে পারে। এখন দেরি করাটাই অপরাধ।’ (Stavka order 170599 to Zhukov, 3 September 1942, Velikaiaotechestvennaia (Moscow: Terra 1996) 5(2), doc. 552, p. 387.)। এর ঠিক তিন সপ্তাহের মধ্যে সুর বদল হচ্ছে। ভাসিলি চুইকোভের বাহিনীর পলিটিক্যাল কমিশার ক্রুশ্চভ জানাচ্ছেন, ফ্যাশিস্ট আক্রমণের গতি কমছে এবং তাদের হামলার লেখচিত্র এবার নীচের দিকে নামছে। কীভাবে সম্ভব হল পরিস্থিতির এই বদল? এক কথায় শহরে লড়াইয়ের কৌশলে বদল। ১৯৩৬ সালের সোভিয়েট অস্থায়ী ফিল্ড ম্যানুয়ালে বলা হয়েছিল শহরের প্রতিটি বাড়িকে দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করতে হবে, শহরের চারপাশের প্রতিরোধ জোরদার করতে হবে, এবং ঘেরাও হয়ে পড়লে অবরুদ্ধ অবস্থানকেই প্রতিরোধের কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। মূল এই আইডিয়ার ভিত্তিতে ১৯৪২ সালের অক্টোবরের গোড়ায় স্তালিনগ্রাদ ফ্রন্টে স্তালিনের নির্দেশ পাঠালেন, শুধু আত্মরক্ষা নয়, প্রবল প্রতি আক্রমণও চালাতে হবে। এবং সেজন্য ‘স্তালিনগ্রাদ শহরের প্রতিটি বাড়ি ও প্রতিটি রাস্তাকে দুর্গে পরিণত করতে হবে।’ কদিন পরে একই নির্দেশ পাঠাল স্তাভকা। ১৪ অক্টোবর স্তাভকা জানাল, ‘স্তালিনগ্রাদের উত্তর ও দক্ষিণে প্রতিরোধের বৃত্ত গড়ে তুলতে হবে, পুরো এলাকাকে বিবেচনা করতে হবে দুর্গ হিসাবে এবং শহরের চারপাশে থাকা সব গ্রাম ও ছোট শহরে সামগ্রিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি ব্লককে দুর্গ বানিয়ে ফেলে সেগুলিকে প্রতিরোধের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে হবে।’ এর সঙ্গে চুইকোভ ঘোষণা করে দিলেন, ভোলগার অন্য পাড়ে রাশিয়ার কোনও অস্তিত্ব নেই। অতএব পিছু হঠার প্রশ্নও নেই। হয় এখান থেকে জিতে ঘুরে দাঁড়াতে হবে, নতুবা ভোলগার জলে ডুবে মরতে হবে। এভাবেই ওডেসা, তুলা, সেভাস্তোপোল, কিয়েভ শহরের আরবান ওয়ারফেয়ার থেকে গুণগত উত্তরণ ঘটল স্তালিনগ্রাদে— ডিফেন্স অফ সিটি থেকে ডিফেন্স ইন এ সিটিতে। এই কৌশল পরে ১৯৪৪ সালে সোভিয়েত সেনার ফিল্ড ম্যানুয়ালে নথিবদ্ধ করা হয়। কীভাবে স্তালিন ও স্তাভকার নির্দেশ কার্যকর করেছিলেন চুইকোভ, তার বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে তাঁর স্মৃতিকথায়। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টা বোঝা যাবে। ট্যাঙ্ক মোবাইল যুদ্ধের হাতিয়ার। জার্মানরা ভাঙাচোরা স্তালিনগ্রাদে ট্যাঙ্ক নিয়েই হামলা চালাত। কিন্তু চুইকোভের নির্দেশে শহরের বহু জায়গায় গর্ত খুঁড়ে ট্যাঙ্কের নীচের দিকটা মাটিতে পুঁতে এবং ওপর থেকে ঢেকে রেখে সেগুলি নন-মোবাইল ইউনিটে বদলে ফেলা হয়। ট্যাঙ্কের নীচে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করে জ্বালানি তাজা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর জার্মান ট্যাঙ্ক কাছে এলেই কিছু বোঝার আগেই পাল্টা হামলা করা হত স্থিতিশীল ট্যাঙ্ক ইউনিট থেকে। এভাবে মোবাইল যুদ্ধের হাতিয়ার ট্যাঙ্ককে স্তালিনগ্রাদে পরিণত করা হয়েছিল নন-মোবাইল বা স্টেশনারি যুদ্ধের হাতিয়ারে। কীভাবে ছোট ছোট প্রতিরোধ ইউনিটগুলিকে সমন্বয় গড়ে তোলার মাধ্যমে সুসংহত হামলার কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছিল, সেটাও কৌশল উন্নত করার নিদর্শন। এভাবে আমরা দেখতে পাব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্তালিনগ্রাদকে কেন্দ্র করে লাল ফৌজ তাদের আরবান ওয়ারফেয়ারের রণনীতি ও রণকৌশলকে কীভাবে উন্নত করেছিল। জার্মান ও পশ্চিমী ঐতিহাসিকদের ইতিহাস ব্যাখ্যায় এতদিন এই সব তথ্য আড়াল করে রাখা হয়েছিল। মস্কোর মহাফেজখানা বেশ কিছু নথি প্রকাশের সুযোগ থাকায় এখন বিষয়গুলি সামনে আসছে। প্রশ্ন হল, রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের আলোচনায় আরবান ওয়ারফেয়ার ও স্তালিনগ্রাদের আলোচনা প্রাসঙ্গিক কেন।
আমরা আগেই দেখেছি, একবিংশ শতকে যুদ্ধের মূল রণকৌশলই বদলে গেছে। আকাশপথে ও জলপথে উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর হামলা চালিয়ে শত্রুবাহিনীর পরিকাঠামো প্রথমে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এরপর ট্যাঙ্ক ও গোলন্দাজ বাহিনী বাকি কাজটুকু করে শত্রুকে পরাস্ত করে। এতে প্রাণের ক্ষয়ক্ষতি হয় সবচেয়ে কম। এটাই আধুনিক যুদ্ধের কৌশল। ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর অভিযানের গোড়ার পর্বেও এটাই ছিল কৌশল। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে পিছু হঠে রুশ সেনারা। অনেকগুলি শহর থেকে পিছু হঠে বাহিনী। ছেড়ে দেয় প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার এলাকা। এর মধ্যে এমন এলাকা রয়েছে যেখানে শুধুই চাষ হয়। এবার যুদ্ধের কারণে সেখানে বসন্তকালীন গম চাষ হবে না। ফলে আগামী বছরে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে। এখানে প্রশ্ন এই পিছু হঠা কি স্রেফ পরাজয়, নাকি কৌশল? মনে রাখতে হবে, ইউক্রেনের যুদ্ধ মূলত আরবান ওয়ারফেয়ার। কিন্তু পুতিনের বাহিনী লাল ফৌজ নয়। আবার লাল ফৌজের যুদ্ধের সফল রণকৌশলগুলি তারা জলাঞ্জলি দিয়েছে এমনও নয়। তাহলে চেচনিয়া ও সিরিয়ায় এই একই বাহিনী সফল হতে পারত না। অন্যদিকে, লাল ফৌজের এই সব কৌশল ইউক্রনের সেনানায়কদেরও জানার কথা। বিশেষ করে রণাঙ্গন যদি হয় ইউক্রেন, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরবান ওয়ারফেয়ারের কৌশল কাজে লাগতেই পারে। রুশ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা একথাও জানেন যে, ইউক্রেন দখলে যদি ভেতর থেকে সেখানকার মানুষের সমর্থন না মেলে তাহলে খেরসন থেকে কিয়েভ এই দীর্ঘ এলাকা দখলে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে দখলদার, আগ্রাসী দেশ হিসাবে পুতিনের রাশিয়ারও কোনও ইতিহাস নেই। সেক্ষেত্রে অভিযানের লক্ষ্য হতে পারে শত্রুর পরিকাঠামো এমনভাবে ধ্বংস করো যাতে তারা দীর্ঘায়ত প্রতিরোধে যেতে না পারে। রাশিযার দাবি, মূলত সেই লক্ষ্য অনেকটা পূরণ হতেই পিছু হঠেছে রুশ সেনা। কারণ তাদের জানা আছে যে, দুর্গের ভেতর থেকে জোরালো সমর্থন না পেলে দুর্গ দখল সম্ভব নয়। এবার যদি আমরা মানচিত্রের দিকে তাকাই তাহলে দেখব নীপার বা নিপ্রো নদীর দুপাড় জুড়ে ছড়িয়ে থাকা খেরসন এলাকায় ঘাঁটি গেড়েছে রুশ বাহিনী। খেরসন এলাকা স্ট্র্যাটেজিক ভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থলপথে ক্রিমিয়ায় পৌঁছনোর একমাত্র রাস্তা রয়েছে খেরসন থেকে। আবার খেরসনের উজানে রয়েছে কাখোভা বাঁধ যেখান থেকে ইউরোপের সর্ববৃহৎ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ঝাপোরিঝঝিয়ায় পরমাণু চুল্লি ঠাণ্ডা করার জল সরবরাহ করা হয়। এই কেন্দ্রটি এখন রাশিয়ার বাহিনীর দখলে। ক্রিমিয়া উপদ্বীপের নিজস্ব পানীয় জলের ভাণ্ডার নেই। আগে জল সরবরাহ করত ইউক্রেন সরকার। যুদ্ধ শুরুর পর সেই সরবরাহ বন্ধ। ফলে ক্রিমিয়া দখলে রাখতে জন্য নীপারের জলভাণ্ডারের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ রাখা অতিমাত্রায় প্রয়োজন। খেরসনের পিছনেই রয়েছে মেলিটোপোল, মারিওপোল, ডনেৎস্ক, লুগানস্কের মতো এলাকা। অর্ধচন্দ্রের আকারের, রুশ ভাষাভাষী প্রধান এই এলাকাগুলি গণভোটের মাধ্যমে দখলে নিয়েছে রাশিয়া। সব মিলিয়ে এই পশ্চাদভূমিকে ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করে খেরসনকে প্রতিরোধের দুর্গে পরিণত করেছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেন এবং ন্যাটোও জানে খেরসন রুশ বাহিনীর হাতছাড়া হওয়া মানে জল সরবরাহ বন্ধ হয়ে ক্রিমিয়ার অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়া। খেরসন হাতছাড়া হলে স্থলপথে রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে ক্রিমিয়া। ঝাপোরিঝঝিয়া রুশ বাহিনীর হাত থেকে কেড়ে নিলে সুবিধে হবে এবং তাতে বিদুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। রাশিয়াও জানে খেরসন হাতছাড়া হওয়ার মূল্য কতটা। ফলে শীত কেটে গেলে বসন্তের শুরুতে এই অঞ্চলে শুরু হতে পারে মরণপণ যুদ্ধ। দুপক্ষই যদি সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাহলেও যুদ্ধ হবে দীর্ঘস্থায়ী। এবং এর পর যদি আরবান ওয়ার ফেয়ারের প্রতিরোধ কৌশল রুশ বাহিনী কার্যকর করে তাহলে যুদ্ধ আরও চলবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেল ও গম সরবরাহ শৃঙ্খল আরও ভেঙে পড়বে। এশিয়া ও আফ্রিকায় দেখা দেবে খাদ্য সঙ্কট। আর ইউরোপে তীব্রতর হবে জ্বালানি সঙ্কট। এই সঙ্কট চলতেই থাকলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে ফ্রান্স ও জার্মানি মার্কিন নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করতে বাধ্য হবে। এতে ইউরোপিয় ইউনিয়নের সঙ্গে আমেরিকার দূরত্ব বাড়বে। নিজেদের স্বার্থে ইউরোপের দেশগুলি চাইবে রাশিয়ার সঙ্গে বোঝাপড়া। সেকারণেই ইদানীং ম্যাঁক্র বলছেন, নিরাপত্তা নিয়ে রাশিয়া যে গ্যারান্টি চায় তা নিয়ে ভাবতে হবে ন্যাটোকে। নিবন্ধের শুরুতেই আমরা উল্লেখ করেছি যে, ইউক্রেন যুদ্ধ মেটানো নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন বাইডেন, ম্যাঁক্র ও ওলাফ স্কোলজ। এই বাধ্যবাধকতার উৎস হল, খেরসনকে ঘিরে দীর্ঘ ও তিক্ত যুদ্ধের সম্ভাবনা। এবং ইউক্রেন ও রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ, উভয়পক্ষই আরবান ওয়ারফেয়ারের কৌশল অবলম্বন করলে যুদ্ধে দ্রুত ফযসালার সম্ভাবনা কম। পুতিনের এই চাল বুঝেই নড়েচড়ে বসেছে ওয়াশিংটন, প্যারিস ও বার্লিন। ফলে এখন দেখার, শীতকাল চলাকালীন কোনও সমঝোতা সূত্রে বেরোয় কিনা। যদি তা না হয়, তবে এই যুদ্ধ আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে সন্দেহ নেই। সূত্র প্রকাশের তারিখ: ১৩-ডিসেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |