|
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ও বিজেপি-আরএসএস-এর মতলব (১)মালিনী ভট্টাচার্য |
তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আসলে এই বহুবিবাহের প্রশ্ন। এরকম বলা হয় যে একটা মুসলিম ৪টি বিয়ে করে আর তাদের ৪০ টা বাচ্চা হয়। যদি অন্য প্রশ্ন বাদই দিই, তবু শুধু অংকের যুক্তিতেও এ প্রচার একেবারেই দাঁড়ায় না। প্রতিটি সম্প্রদায়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক পুরুষ, নির্দিষ্ট সংখ্যক মহিলা থাকে। সেই মেয়েদের সন্তানধরণের ক্ষমতা কিন্তু একইরকম। চারজন মহিলা একজন পুরুষের সঙ্গে বিবাহিত হলেও যা, একজন মহিলা একজন পুরুষের সঙ্গে বিবাহিত হলেও তাই। এতে মহিলার সন্তানধারণ ক্ষমতার হেরফের হয় না। |
প্রথম পর্ব আমার দীর্ঘ জীবনে বহু মুসলিম মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। বহু মুসলিম বন্ধু রয়েছেন আমার। শহরে, গ্রামে, বাংলায়, বাংলার বাইরে। কিন্তু যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আমার কতজন পরিচিত মুসলিম পুরুষ বহুবিবাহ করেছেন, তাহলে অনেক ভেবেচিন্তেও আমি মনে করতে পারব না। তার মানে, এই কুপ্রথাটি আসলে মুসলিম সমাজের মধ্য থেকেও উঠে যাচ্ছে। দেশের সাধারণ বাতাবরণ যদি অন্যরকম হত, আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে যদি জনমত গড়ে তোলা যেত, তাহলে আইনত এই প্রথাকে রদ করলে হয়তো সম্প্রদায়ের ভিতর থেকে তার অনুমোদন অতটা কঠিন হত না। কিন্তু বিজেপি-আরএসএস যেরকম আগ্রাসী দমনমূলক চেহারায় এটা আমাদের সামনে নিয়ে আসছে তার ফলেই এটাকে মেনে নেওয়া কঠিন হচ্ছে। এমনভাবে বলা হচ্ছে যেন বহুবিবাহ হচ্ছে পুরুষের এক বিশেষ সুবিধা। আমি তো এই বিশেষ সুবিধা পাচ্ছি না, তাইলে তুমি এটা কেন পাবে! ঠিক যেমন শোনা যায়, আমার তো সংরক্ষণ নেই, তোমার কেন সংরক্ষণ থাকবে! কিন্তু এই যুক্তিই তো আসলে কুযুক্তি। এই যুক্তি মেয়েদের পক্ষে ও প্রতিটি মানুষের পক্ষে অপমানকর যুক্তি। এই যুদ্ধং দেহি অবস্থান মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা কট্টরপন্থী তাদের সুবিধা করে দেবে। তারা বলবে, এটা আমাদের ওপর হিন্দুদের জুলুম, আমাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য। তাই মুসলিম ভাইয়েরা, এর বিরুদ্ধে এক হও! বিজেপি-আরএসএস ঠিক এটাই চায়; গোটা মুসলিম সম্প্রদায়কে যত পশ্চাৎপদ এবং সংস্কারাচ্ছন্ন বলে দেখানো যায় ততই তাদের পক্ষে সুবিধা! মানুষকে এভাবেই বোঝায় তারা। আমরাও মানুষের কাছে গেলে তাদের দিক থেকে এধরনের প্রশ্নই উঠে আসবে৷ বহুদিন ধরে আরএসএস-বিজেপি ভারতের মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে যে নিবিড় অপপ্রচার করেছে তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আসলে এই বহুবিবাহের প্রশ্ন। এরকম বলা হয় যে একটা মুসলিম ৪টি বিয়ে করে আর তাদের ৪০ টা বাচ্চা হয়। যদি অন্য প্রশ্ন বাদই দিই, তবু শুধু অংকের যুক্তিতেও এ প্রচার একেবারেই দাঁড়ায় না। প্রতিটি সম্প্রদায়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক পুরুষ, নির্দিষ্ট সংখ্যক মহিলা থাকে। সেই মেয়েদের সন্তানধরণের ক্ষমতা কিন্তু একইরকম। চারজন মহিলা একজন পুরুষের সঙ্গে বিবাহিত হলেও যা, একজন মহিলা একজন পুরুষের সঙ্গে বিবাহিত হলেও তাই। এতে মহিলার সন্তানধারণ ক্ষমতার হেরফের হয় না। সুতরাং চারটে বিবাহ মানেই সেই সম্প্রদায়ের মধ্যে অত্যধিক দ্রুতহারে জনসংখ্যার বৃদ্ধি হবে এমনটা মোটেই না। তার প্রমাণ রয়েছে আমাদের জনগণনার যা হিসাব তার দশকভিত্তিক তালিকাতেও। যাঁরা জনসংখ্যা নিয়ে কাজ করেন তাঁদের কাছে এইসব বললে তাঁরা হেসে উড়িয়ে দেবেন। অথচ সব জেনেও বিজেপি-আরএসএস ধারাবাহিকভাবে এই ভ্রান্ত প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এতক্ষণের আলোচনায় যদি মনে হয় অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিপদ শুধু মুসলিমদের, অ-মুসলিমদের কোনো বিপদ নেই, তাহলেও কিন্তু ভুল হয়ে যাবে। কারণ এর পিছনে আরও উদ্দেশ্য আছে। আরএসএস-বিজেপির বক্তব্য শুধু মুসলিমদের লক্ষ্য করে নয়। নীতি আয়োগের মাথায় আছেন এমন একজন মহাপণ্ডিত যিনি দুইদিন আগেই বললেন, আমাদের গোটা সংবিধানকেই নতুন করে ভেঙেচুরে তৈরি করা দরকার। কী প্রচণ্ড দুঃসাহস থাকলে প্রকাশ্যে একথা বলা যায় আর পার-ও পেয়ে যাওয়া যায়! তাই এই কথা শুনে নীরবে মেনে নিলে চলবে না। কেন বলা হচ্ছে এসব তা বুঝতে হবে। আসলে সংবিধান ও ‘সংহিতা’ এক নয়। বিজেপি যে ‘সংহিতা’র প্রস্তাব আজ তুলছে তা দেশের মাথার উপর চাপিয়ে দেওয়া অকাট্য অনড় নিয়মাবলী যা প্রশ্নাতীতভাবে মেনে যাওয়া আপনার দায়িত্ব। কিন্তু সংবিধান তৈরি হয়েছে দেশের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা বিতর্কের, সাধারণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। সংবিধান অনেকটা বটগাছের মত। মূলনীতির শিকড়গুলিকে রক্ষা করে তা ডালপালা ছড়াতে পারে, নতুন ঝুরিও নামাতে পারে, নিয়মের পুনর্বিবেচনা হতে পারে । সংবিধানের মূল যে বিষয় তা হল গণতন্ত্র ও বহুত্ব। গণতন্ত্র ও বহুত্বের উপাদানগুলি বটগাছের শিকড়ের মতো। গণতন্ত্র ও বহুত্ব যদি বিপন্ন হয় তাহলে শুধু মুসলিমরা নয়, যে যেখানেই আছি, তারাই বিপন্ন হব। এই বহুত্বের কথা ভেবেই যাঁরা সংবিধান তৈরি করেছিলেন তাঁরা বহুরকম পারিবারিক আইনের পরিসর তার মধ্যে রেখেছিলেন, আবার রাষ্ট্রের নির্দেশক নীতিগুলির মধ্যে ৪৪ নম্বর ধারায় বলেছিলেন, রাষ্ট্রের প্রয়াস থাকবে এক সমান দেওয়ানি বিধি প্রচলন করায়। কারণ পারিবারিক আইনগুলিতে এমন অনেককিছু থাকতে পারে যা পরিবারের মধ্যেই অসাম্যকে জিইয়ে রাখে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পরে মহারানি ভিক্টোরিয়া যখন ভারতসম্রাজ্ঞী হলেন, তখন তাঁর সনদে বলা ছিল প্রজাদের ধর্মে আমরা হাত দেব না। সতীদাহ বিরোধী আইন ও বিধবা বিবাহ আইন তার আগেই তৈরি হয়েছিল। রামমোহন-বিদ্যাসাগরকে কত রাত জেগে পরিশ্রম করে হিন্দুশাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করতে হয়েছে কঠিন লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে, যে সতীদাহ নিবারণ বা বিধবা বিবাহ হিন্দুশাস্ত্রমতেও সম্ভব। তখন যদি ভিক্টোরিয়ার এই সনদ থাকত তাহলে ওঁদের লড়াই আরও কঠিন হয়ে যেত। তারপরে ১৯৪১ সালে বি এন রাও কমিটি তৈরি হয়। সেসময়ে সরকারের হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকেই একটা হিন্দু কোড বিল উঠে আসছে হিন্দুসম্প্রদায়ের কিছু মানুষের নিজস্ব উদ্যোগেই। আমাদের কমিউনিস্ট পার্টির নারীকর্মীরাও সেসময়ে AIWCর মতো সর্বভারতীয় নারীসংগঠনের হয়ে এর পক্ষে নানান সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করেন সাধ্যমতো। তারপরেও বি এন রাও কমিটির প্রস্তাবগুলি পরামর্শ আকারেই থেকে গেল, তা কোনো বিধি হয়ে উঠল না। তারপরে ১৯৪৭-৪৮ সালে সাধারণ দেওয়ানি বিধির বিষয়টি নিয়ে কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলিতে আলোচনা হয়। প্রথমে সংবিধানের ৩৫ তম ধারায় এটি ছিল। পরে এটাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ৪৪ নং ধারায়। ৩৫তম ধারার অর্থ মৌলিক অধিকার। তারপরের ধারাগুলি হল রাষ্ট্রের দিকনির্দেশক নীতিসম্বন্ধে। তাহলে মৌলিক অধিকারের জায়গা থেকে দিকনির্দেশক নীতির পরিসরে এই যে সরিয়ে আনা হল তার কারণ রয়েছে কিছু। মৌলিক অধিকারের মধ্যে থাকলে তা প্রবর্তন করতেই হোতো। তাহলে পারিবারিক আইনগুলির অস্তিত্ব আর থাকত না; সেটা কেউই চাননি। ১৯৫১ সালে হিন্দু কোড বিল নিয়ে আলোচনা হলেও কিন্তু একে পাশ করানো যায়নি। ১৯৫৫-৫৬ সালে অবশেষে হিন্দু বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদি সংক্রান্ত সংশোধিত আইন পাশ হয়। রাও কমিটির পরে এতটা সময় লেগেছিল এই পরিবর্তনগুলো করতে। হিন্দু আইনের কিছু পরিবর্তন হল। বাকিগুলোয় তখন তেমনকিছু পরিবর্তন হল না। হিন্দু আইনেও যে সমতার স্বার্থে সব পরিবর্তন করা গেল তা বলা চলে না। এখনও সম্পত্তির অধিকারের যে হিন্দু আইন রয়েছে তাতে মেয়েদের সমানাধিকার কিছুটা এসেছে, সবটা আসেনি। অনেক জায়গায় যেটুকু অধিকার খাতায় কলমে আছে, মেয়েরা বাস্তবে তার সুযোগ পায় না। অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রেও মেয়েরা সমানাধিকার পায় না, সুযোগ পায় না। কাজেই এ কথাটা বলা ভুল যে হিন্দু আইনে সব সংশোধন হয়ে গেছে বা সেটাই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মডেল হওয়া উচিত। আবার আম্বেদকর সেসময়ে একথাও বলেছিলেন যে আমাদের দেশে এক সাধারণ ফৌজদারি আইনই শুধু নয়, দীর্ঘ আলাপ আলোচনার মধ্যে দিয়ে আমরা এক সাধারণ দেওয়ানি বিধির কাঠামোর কাছাকাছিও পৌঁছাতে পেরেছি। শুধু দুটো বিষয়ে ছাড়া। বিবাহ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, আম্বেদকরের কথা মত এই দুটি জায়গা নিয়েই আমাদের আলোচনা করতে হবে। যখন পারিবারিক আইনগুলি সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেল, তখন আমাদের সংবিধানপ্রণেতারা এটাও ভেবে দেখলেন যে এই পারিবারিক আইনগুলির মধ্যে সংবিধানের মৌলিক যে অধিকার, সাম্যের অধিকার তার পরিপন্থী ভাবনা রয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই অসাম্য চূড়ান্ত। বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কজাত শিশুরা তাদের ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না। বর্তমানে যেবিষয়টি আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে তা হল নারী-পুরুষ পরিচিতির বাইরে যে মানুষেরা আছেন, তাঁরাও কিন্তু এই পারিবারিক আইনের মধ্যে দিয়ে বঞ্চিত হচ্ছেন। পারিবারিক আইনগুলো ধর্মীয় বিধান না। এগুলি মানুষের তৈরি আইন। আর বিচারব্যবস্থার মূল দৃষ্টিভঙ্গি থাকা দরকার এইটাই যে আইনের মধ্যে যদি অসাংবিধানিক কিছু ভাবনা থেকে থাকে তাহলে সেটাকে পাল্টাতে হবে। যেখানে পারিবারিক আইনের মধ্যে মেয়েদের প্রতি, শিশুদের প্রতি, অন্যান্য লিঙ্গ পরিচিতির মানুষের প্রতি অসাম্য আছে, সেখানে এগুলিকে অবশ্যই পাল্টাতে হবে। প্রশ্ন হল, কীভাবে তা করা যায়? নরেন সেন স্মারক বক্তৃতার অনুলিখন প্রকাশের তারিখ: ২৯-সেপ্টেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |