আর্বান নকশালঃ যুক্তির বিনাশে এক ফ্যসিবাদী কৌশল

নন্দন রায়
কিন্তু সাইবাবা যদি সত্যি সশস্ত্র মাওবাদী ভাবধারায় বিশ্বাস করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দায়ের করা কি অসঙ্গত? এটাই সরকারের সেরা ‘ডিফেন্স’। যদি সাইবাবার বিরুদ্ধে, অথবা কারাগারে অন্তরীণ অন্য যে কারও বিরুদ্ধে সরকারের হাতে এমন কোনও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ থাকে যে তারা ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী কোনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন, তাহলে নিবর্তনমূলক আটক আইনে তাদের গ্রেফতার করে দিনের পর দিন জেলে পচিয়ে রাখা হচ্ছে কেন? অবিলম্বে আদালতে তাদের পেশ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা হচ্ছে না কেন? বিচারহীনভাবে ভীমা-কোরেগাঁও কান্ডের বন্দিরা একেকজন যতদিন জেলে আছেন, ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকরা মহাত্মা গান্ধীকেও একলপ্তে এতদিন বিনাবিচারে বন্দী করে রাখতে সাহস করেনি।

কয়েক মাস আগে দেশের আপামর মানুষ যখন তাদের জীবন-মরণের সমস্যা, যেমন ক্ষুধা, দারিদ্র ও কাজের অভাবে অতিষ্ঠ হয়ে অগ্নিপথ প্রকল্পের ভাঁওতার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ক্রোধে রেল অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার স্বভাবসিদ্ধ কৌশল অনুযায়ী কিছুদিন মৌনী হয়ে থেকে ‘নকশালবাদ’ খতম করার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘নকশালবাদ যে রূপেই থাকুক—  বন্দুক নিয়ে অথবা পেন  নিয়ে’—  তারা দেশের নিরাপত্তার পক্ষে বড় বিপদ, তাদের নিশ্চিহ্ন করতে হবে। যদিও সেই মুহূর্তে নকশালপন্থীরা যথেষ্ট কোনঠাসা অবস্থাতেই ছিলেন, এবং দেশের সুস্থিতির পক্ষে তাৎক্ষনিক কোনও বিপদ হিসেবেও হাজির হয়নি, কিন্তু গুরুবাক্য অমান্য করবে কে? গেরুয়াধারীদের মধ্যে এখন যেমন, তখনও তেমনি আর একটাও ‘ছাপ্পান্ন ইঞ্চি’ দেখা যায়নি। ফলে গেরুয়াবাহিনী তৎপর হয়ে উঠলো। এবং সকলে ‘নকশালবাদের বিপদ’ চারিদিকে খুঁজতে লাগলো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মোদীর ভাষ্যে নকশাল কারা? তারা কি আর্বান নকশাল (শহুরে নকশাল), দেশদ্রোহী, নাকি ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’?

আসলে তারা সবাই। বিশেষত, শহুরে সক্রিয় বুদ্ধিজীবি এবং গরিবের ও নিপীড়িতদের দাবি নিয়ে সোচ্চার সমাজকর্মীরা। তাঁরা নকশালপন্থায় বিশ্বাসী হোন বা না হোন, কারণ একবার তাদের ‘নকশাল’ বলে দাগিয়ে দিতে পারলে, বিনা বিচারে তাদেরকে বন্দি করে রাখা সুবিধাজনক।  

।দুই।

ইতালির বিখ্যাত মার্কসবাদী চিন্তাবিদ এবং সক্রিয় কমিউনিষ্ট আন্তনিও গ্রামশির বিচারের সময় মুসোলিনি সরকারের আইনজীবি সরকারের সাজানো আদালতে দাবি করেছিলেন, এই মস্তিষ্কের সক্রিয়তা অন্তত আগামী দশ বছরের জন্য জেলে পুরে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হোক। যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির মত মোদী জমানার খোদ বিচারকই প্রায় একই ধরণের যুক্তি সাজিয়ে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসুস্থ ও পঙ্গু শিক্ষক জি এন সাইবাবাকে জেলে আটক রাখার সাজা শুনিয়েছেন। বিচারের নামে প্রহসনের এই সমাপতনের দ্বারা মোদীর জমানা কী বার্তা দিতে চাইছে?

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়েক বলেছেন, একথা সকলেই জানেন ফ্যাসিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকটের সমাধানের উপায় খোঁজার যাবতীয় আলোচনার থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ফ্যসিবাদী নায়ক এবং তাদের থিঙ্ক-ট্যাঙ্কের মাথারা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার সামনে তাদের সব সমস্যার মূল হিসেবে হতভাগ্য সংখ্যালঘুদের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলে। এবং তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণার আগুন খুঁচিয়ে তোলে। হিটলার তার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছিল ইহুদীদের। বর্তমানে ইউরোপের দেশগুলিতে ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি বেছে নিয়েছে যুদ্ধদীর্ণ দেশগুলি থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের। এবং আমাদের দেশে মুসলিমদের। মুসলিমদের প্রতি ঘৃণার চাষ এদেশে আরও প্রয়োজনীয়, কারণ আমাদের দেশে যে ফ্যাসিবাদী শক্তিশাসন ক্ষমতায় আসীন, তারা যে কেবল ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে চায় তা-ই নয়, উপরন্তু হিন্দু-রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই অহরহ রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে যুগপৎ রাস্তার গুন্ডাদেরও মুসলিমদের ওপর লেলিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু যত যাই হোক না কেন, ১৪০ কোটির দেশে শুধু পুলিশ আর গুন্ডাদের দিয়ে এই রক্তপাতময় শাসন জারি রাখা যায় না। তার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটা চাই, তা হলো মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা জাগানোর ভাষ্যটিকে দৈনন্দিন ডাল-রুটির চেয়ে বেশি জরুরি হিসেবে প্রতিপন্ন করা চাই। কিন্তু জনতা এই অদ্ভুত উলটো যুক্তি মেনে নেবে কেন? জনতা এই যুক্তি তখনই মেনে নেবে যখন তারা নিজেদের কিসে ভালো আর কিসে মন্দ, সেই ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে, যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে ভুলে যায়, যখন তারা (মার্কসের কথায়) ইতিহাসের অচেতন যন্ত্র হিসেবে কাজ করে। তাই যুক্তির বিনাশ প্রয়োজন। তাই যারা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করেন, যারা বিদ্যমান ঘটনাবলীকে যুক্তি দিয়ে বিচার করে দেখতে চান, তাদের ওপরে ফ্যসিস্টদের ভীষণ রাগ। এবং যুক্তি-বুদ্ধির চর্চা যেহেতু অবধারিত ভাবে যে কোনও মানুষকে বামপন্থার দিকে ঠেলে দেবে, তাই ফ্যাসিস্টদের  সবচেয়ে আপসহীন শত্রু বামপন্থীরা। জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখট বলেছিলেন, ‘ভুখা মানুষ, হাতে তুলে নাও বই’। 

যে কোনও মুক্ত যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনার প্রতি ফ্যাসিস্টদের বিরাগ নানাভাবে প্রকাশিত হয়। যেমন ১৯৩০-এর দশকে হিটলারের জার্মানিতে লাইব্রেরীর বই-এর বহ্নি-উৎসব, ইতালিতে গ্রামশির মত বুদ্ধিজীবিকে জেলে আটকে রেখে বিশ্বকে তার বুদ্ধিবৃত্তির অবদান থেকে বঞ্চিত রাখার চেষ্টা, ‘আর্বান নকশাল’ বলে দাগিয়ে দিয়ে গারদের পেছনে ভীমা-কোরেগাঁও কাণ্ডে স্ট্যান স্বামী, ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজ প্রমুখদের শুধু নয়, যে কোনও বিরুদ্ধ মতের বিদগ্ধ মানুষদের আটকে রেখে  তাদের সৃজনশীলতা রুদ্ধ করার প্রয়াস আজ ক্রমশ পরিব্যাপ্ত হয়ে এখন এলোপাতাড়ি—  যাকে তাকে কারান্তরালে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এর পরিণতিতে যুক্তির বিকাশকে একদিকে যেমন যেমন ধ্বংস করা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে মুক্ত চিন্তার প্রবক্তারা যেন সাবধান হয়ে যায়। শয়তানি বুদ্ধি এখন এত বেশি বেপরোয়া যে পেগাসাস সফটওয়্যার ব্যবহার করে এইসব কারাগারে বন্দি মানুষদের কম্পিউটার অথবা ফোনে দেশবিরোধী দলিল ইত্যাদি ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের সাথে উগ্রবাদীদের যোগাযোগ আদালতে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হচ্ছে। কম্পিউটার পরীক্ষাগারে ওইসব যন্ত্রে পেগাসাস স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে ভুয়ো দলিল-চিঠিপত্র ঢুকিয়ে দেওয়ার অকাট্য প্রমাণ দেশের সর্বোচ্চ আদালতে পেশ করা সত্ত্বেও, বিচার ব্যবস্থারও কোনও হেলদোল নেই। ফ্যাসিস্ট শাসকদের সকলেই সমীহ করে চলছে। যে সমাজে যুক্তির এইরূপ ধ্বংসসাধন করা হয়, সেই সমাজ যে কেবল অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মত বুকে হেঁটে জীবনধারণ করে শুধু তাই নয়, এক স্বাধীন পরিচয়ে বেঁচে থাকাই তার দায় হয়ে ওঠে। অন্যের থেকে ধার করা আদর্শ নিয়ে সেই সমাজকে বেঁচে থাকতে হয়। এখনকার দুনিয়ায় সেই ধার করা আদর্শ হচ্ছে পাশ্চাত্যের নয়া উদারবাদী আদর্শ। আর্বান নকশালবাদ (যাদের অস্ত্র বলতে হাতের কলম) সহ যাবতীয় নকশালবাদ, অর্থাৎ যাবতীয় বিরোধিতার দমনের ফলশ্রুতি হচ্ছে বিদেশের কাছে দেশের ইন্টেলেকচুয়াল দাসত্ব স্বীকার।

।তিন।

কিন্তু সাইবাবা যদি সত্যি সশস্ত্র মাওবাদী ভাবধারায় বিশ্বাস করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দায়ের করা কি অসঙ্গত? এটাই সরকারের সেরা ‘ডিফেন্স’। যদি সাইবাবার বিরুদ্ধে, অথবা কারাগারে অন্তরীণ অন্য যে কারও বিরুদ্ধে সরকারের হাতে এমন কোনও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ থাকে যে তারা ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী কোনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন, তাহলে নিবর্তনমূলক আটক আইনে তাদের গ্রেফতার করে দিনের পর দিন জেলে পচিয়ে রাখা হচ্ছে কেন? অবিলম্বে আদালতে তাদের পেশ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা হচ্ছে না কেন? বিচারহীনভাবে ভীমা-কোরেগাঁও কান্ডের বন্দিরা একেকজন যতদিন জেলে আছেন, ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকরা মহাত্মা গান্ধীকেও একলপ্তে এতদিন বিনাবিচারে বন্দী করে রাখতে সাহস করেনি। ফ্যাসিবাদ এমনই পাশব। একথা বোঝাই যাচ্ছে যে এত দীর্ঘদিন জেলের অন্ধকার কুঠুরীতে আটকে রাখার উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানসিক ও শারীরিকভাবে তাদের পঙ্গু করে ফেলা। এবং জেলের বাইরে থাকা বিরূদ্ধবাদীদের এই মর্মে হুঁশিয়ারি দেওয়া যে সরকারের বিরুদ্ধতা না পরিত্যাগ করলে তাদেরও এই পরিণতি হবে। এটি একটি সন্ত্রাসবাদী কাজ নয়? 

এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করে দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী বিপ্লব অথবা ক্রান্তি কোনও অপরাধ নয়। এমনকি জয়প্রকাশ নারায়ণও ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তির’ আহবান জানিয়েছিলেন। আমাদের দেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী কেউ যদি সাংবিধানিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে, অথবা বিশেষ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ঐরূপ অভ্যুত্থানে সাহায্য করে এবং মদত (aiding and abetting) দেয়, তাহলে সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।

‘যারা বন্দুক অথবা কলম চালিয়ে দেশের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে, তাদের নিশ্চিহ্ন করার’ জন্য যখন প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানান, তখন কি তিনি হিংসায় প্ররোচনা দিচ্ছেন না? যতক্ষন পর্যন্ত না কেউ কলম চালিয়ে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনও প্রতিষ্ঠানকে সশস্ত্র উপায়ে উৎখাত করার ডাক দিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে বন্দুক ব্যবহার করে সশস্ত্র উপায়ে সরকারকে উৎখাত করার উদ্যোগীদের সাথে একাসনে বসানো যায় না। আমেরিকার কমিউনিষ্ট পার্টির বিরুদ্ধে একটি মামলায় আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য “asking for” এবং “aiding and abetting” শব্দদুটি ভিন্ন অর্থ বহন করে বলে সেই মামলা খারিজ করে দিয়েছিল। 

‘আর্বান নকশালের বিপদ’ বলে মোদী যে ধুয়া তুলেছে তা যদি সত্যি হতো, তাহলে মাওবাদী আন্দোলন এখন যে অবস্থায় রয়েছে তার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী হতো। পুলিশ ওয়াধা সামরিক বাহিনীর নিরন্তর হত্যালীলায় এবং অসংখ্য নিরীহ গ্রামবাসীর মৃত্যুর বিনিময়ে এই আন্দোলনের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছে। সুতরাং আর্বান নকশালের ধুয়ো তোলার পিছনে স্পষ্ট উদ্দেশ্য হচ্ছে বুদ্ধিজীবি ও যুক্তিবাদী নাগরিকদের সন্ত্রস্ত করে রাখা।

অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে এবং বামপন্থীরা সমষ্টিগতভাবে বিনা বিচারে বুদ্ধিজীবিদের জেলবন্দি করে রাখার এই নির্দয়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রভাত পট্টনায়েক, রোমিলা থাপার, এন রাম প্রমুখ আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বুদ্ধিজীবিরা সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছেন। ইতিহাসবিদ রামচদ্র গুহ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছেন, নাট্যকার গিরীশ কারনাড ব্যাঙ্গালোরের ব্যাস্ত এক চৌমাথায় দাঁড়িয়ে পুলিশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছেন, এস, আমাকে গ্রেপ্তার করো, আমি আর্বান নকশাল। সেনা, বায়ু ও নৌ বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অধিনায়করা এবং একদা দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত আমলারা রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখে তাদের প্রতিবাদ লিপিবদ্ধ করেছেন। এমন অনেক প্রতিবাদই হয়েছে। বুদ্ধিজীবিদের সন্ত্রস্ত করে বিরুদ্ধ মত প্রকাশের যাবতীয় পথ বন্ধ করার এই উদ্দেশ্য প্রণোদিত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এই রকম বিভিন্ন উপায়ে প্রতিবাদ জ্ঞাপন সম্পূর্ণ আইনসঙ্গত প্রতিক্রিয়া। গণতন্ত্রে বিরুদ্ধ মত প্রকাশ একান্তই প্রয়োজনীয় শর্ত। গণতন্ত্রকে দুর্বল করার যে ষড়যন্ত্র মোদি-জমানার বৈশিষ্ট্য হ’য়ে উঠেছে, তার বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ এই প্রতিবাদ।

।চার।

বুদ্ধিজীবিদের এইভাবে সন্ত্রস্ত করার ষড়যন্ত্রটি শুধুমাত্র তাদের কন্ঠস্বর রুদ্ধ করে রাখার এবং মোদী জমানার বিরুদ্ধতা করা থেকে পিছিয়ে আসার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য নয়, তার আরও একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মনে এই ধারণা গেঁথে দেওয়া যে দেশের বিরুদ্ধে নানা রকম অন্তর্ঘাত চলছে, দেশের নিরাপত্তা সত্যিই আজ বিপন্ন। অহরহ ‘দেশ বিপন্ন’ বলে চিৎকার করে এমন এক ত্রাসের আবহাওয়া গড়ে তোলা হয় যে জনমানসে এই তথাকথিত দেশের বিপন্নতার ভাষ্যটি অগ্রাধিকার পেতে থাকে এবং মানুষের দৈনন্দিন প্রকৃত সমস্যাগুলি—  যেমন মূল্যবৃদ্ধি, বেরোজগারি, ক্রমশ বেড়ে চলা আয়ের অসাম্য  এবং ক্রমবর্ধমান চরম দারিদ্রের মত নয়া উদারবাদের উপহার দেওয়া ও মোদী-জমানায় তুঙ্গে পৌছে যাওয়া বিষময় ফলগুলি দুরীকরণের আলোচনার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ পিছু হঠে যায়।

এখন অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে কেউ যদি জনগণের এইসব জরুরি বিষয়গুলি আলোচ্য হিসেবে উত্থাপন করে, সরকারের যন্ত্রগুলি এই বলে তাকে অভিযুক্ত করে যে এই লোকটি নিশ্চয়ই আর্বান নকশাল, নইলে দেশের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা যখন নিদারুণ বিপন্ন, তখন তাকে গুরুত্ব না দিয়ে লোকটি গুরুত্বহীন কথা বলে লোক ক্ষেপিয়ে বেরাচ্ছে। অর্থাৎ জনতার জরুরি সমস্যা নিয়ে কথা বলা চলবে না। বরং এই সুযোগে তাকে আর্বান নকশাল বলে ছাপ মেরে দেওয়ার এটাই সুযোগ।

সরকারের মনোভাবটি কেমন কদর্য তার একটি উদাহণ দেওয়া যাক। সুচিকিৎসার জন্য ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় অভিযুক্ত গৌতম নাভলাখাকে সুপ্রিম কোর্ট জামিন দিয়েছিল এই শর্তে যে পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত তাঁকে মুম্বাই-এর আশেপাশে কোনও জায়গা খুঁজে নিয়ে থাকতে হবে। অন্য কোনও অজুহাত খুঁজে না পেয়ে দেশের সলিসিটার জেনারেল তখন এই বলে নাভলাখার জামিনের বিরোধিতা করলেন যে অভিযুক্ত যে বাসস্থানটি পছন্দ করেছেন, সেটি সিপিআই(এম)-র একটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের পাশে! দেশের সলিসিটার জেনারেলের চোখে সিপিআই(এম)-ও মাওবাদীর মধ্যে, রাজনৈতিক কর্মী ও সমাজকর্মীর মধ্যে, মানবিক অধিকার নিয়ে লড়াই করা কর্মী ও দেশবিরোধীর মধ্যে কোনও তফাৎই নেই! তার ধারণায় মানুষ মাত্রই দু প্রকারের হয়—  সে আমাদের পক্ষে নতুবা আমাদের বিপক্ষে, এবং আমাদের বিপক্ষে হলে সে নিশ্চয়ই আর্বান নকশাল, আর এই কারণেই সে দেশের শত্রু! এই “l’etat,c’estmoi”(আমি নিজেই হলাম দেশ) মনোভাব থেকেই আর্বান নকশাল শব্দবন্ধের উদ্ভব এবং ফলত এরূপ মনোভাব ভয়ানকভাবে গণতন্ত্র-বিরোধী।

।পাঁচ।

মুসোলিনির জমানা থেকে শুরু করে মোদীর জমানা পর্যন্ত যে মিলগুলির কথা আমরা এতক্ষণ ধরে আলোচনা করলাম, তার মধ্য দিয়ে কি এই ঈঙ্গিত পরিস্ফুট হয় না যে আমাদের দেশ একটা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে, যেখানে বিরোধিতার টু শব্দটির উচ্চারণ পর্যন্ত সহ্য করা হবে না এবং যেখানে প্রতিবাদের লেখনী যে উত্তোলন করবে তাকে অন্ধকূপে নিক্ষেপ করা হবে? হ্যাঁ। আমরা অবধারিত ভাবে সেইদিকেই যাত্রা শুরু করেছি, কিন্তু একটি ব্যতিক্রম আছে। 

ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের থেকে বর্তমান জমানাকে তফাৎ করে দেখানোর জন্য আমরা একে বলছি নয়া-ফ্যাসিবাদ। যদিও পুরনো ফ্যসিবাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য গুলি—  যথা, বিরোধীদের যথেচ্ছ দমন, হতোভাগ্য সংখ্যালঘুদের ‘অপর’ বলে চিহ্নিত করা, মিথ্যা প্রচার এবং যত রকম সম্ভব কারসাজি ও জালিয়াতির মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাসিল করা, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সঙ্গে রাস্তার গুন্ডাদের সন্ত্রাসের সমন্বয় ঘটানো এবং সর্বোপরি সাধারণভাবে একচেটিয়া পুঁজির সঙ্গে এবং বিশেষভাবে তারই মধ্যেকার এক ধান্ধাবাজ গোষ্ঠির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নেক্সাস গড়ে তোলা—  এসব আগের ফ্যসিবাদের বৈশিষ্ট্যগুলি সবই বর্তমান জমানায় রয়েছে, কিন্তু একটা গুরুতর তফাৎও রয়েছে। বর্তমান ফ্যাসিস্ট জমানাকে কাজ করতে হয় বিশ্বায়িত লগ্নীপুঁজির সার্বিক আধিপত্যের কাঠামোর মধ্যে থেকে। ফলে পুরনো ফ্যাসিবাদ যেমন কর্মসংস্থানের সমস্যার মত কিছু সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিল, বর্তমান ফ্যাসিবাদী জমানা কোনও সমস্যার সাময়িক সমাধান করতে তো পারেই না, উপরন্তু বিশ্বায়িত পুঁজির কাছে দাসখৎ লিখে দেওয়ার কারণে সমস্যাকে সংকটে পর্যবসিত করে। সংক্ষেপে, নয়া উদারবাদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বন্ধন আজকের নয়া ফ্যসিবাদকে তার চারিত্রিক অনন্যতা প্রদান করেছে। 

এই প্রবন্ধটির মূল কাঠামো নির্মাণে ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ তারিখে দি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রভাত পট্টনায়েকের একটি সাক্ষৎকারের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

—মতামত লেখকের নিজস্ব 


প্রকাশের তারিখ: ১০-মার্চ-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org