সার্কাসের সিংহের মতো ভারতকে ওঠবোস করাচ্ছে আমেরিকা

এম কে ভদ্রকুমার
সর্বোচ্চ পরিহাস হল, যে ট্রাম্প আগে হুকুম জারি করেছিলেন যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে হবে ভারতকে, তিনিই এখন দিল্লিকে ‘অনুমতি’ দিচ্ছেন আগামী ৩০ দিন পর্যন্ত অন্য কোনও আদেশ জারি করা না-হলে, ভারত রাশিয়ার তেল কিনতে পারবে যাতে ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর ঘোষিত যুদ্ধটি মসৃণভাবে চলতে পারে। …সার্কাসের তাঁবুর বাধ্য সিংহরা চাবুকের শব্দে ওঠে বসে। আমাদেরও সেই রকম ওঠবোস করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে আমাদের শাসককুলের দুকান কাটা। কারণ সারা বিশ্বের দর্শকদের সামনে যখন তাদের সঙ্গে খোলাখুলি ও নির্লজ্জভাবে এমন ব্যবহার করা হচ্ছে, ওয়াশিংটনের নির্দেশে যখন ভারতকে একটা তাঁবেদার রাষ্ট্রের পর্যায়ে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখনও এই শাসককুলের কোনও হেলদোল নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতির বাক্সে খুব ভালো করে শান দেওয়া একটা হাতিয়ার রয়েছে। সেটা দিয়ে তারা তাদের তাঁবেদার রাষ্ট্রগুলির নাক ধুলোয় ঘষে দেয়। এটা তারা মাঝে মাঝেই করে এ-কথা মনে করিয়ে দিতে যে, তাঁবেদার রাষ্ট্রগুলি অত্যন্ত নিম্নবর্গের প্রাণী। একই সঙ্গে এই কথাটা তারা গোটা বিশ্বের সামনে জানিয়ে দেয় যে, যে দেশটা একবার তাদের অধীনস্থ হয়েছে, তারা চিরকাল অধীন দেশই থেকে যাবে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানির নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনে অন্তর্ঘাত এর নির্লজ্জ উদারহণ। অতি সম্প্রতি ভারতের সঙ্গেও একই রকম কঠোর আচরণ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি বন্ধ করতে হবে, এই মর্মে আমেরিকার হুকুম মেনে চলতেই হবে। ভারতের কাছে এমনই আদেশ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এবং ভারত যাতে এই নির্দেশ মেনে চলে সেজন্য ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তারা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বিবৃতি দিয়েছেন এবং একই ধরনের কঠোর মন্তব্য করেছেন। তাদের অজুহাত ছিল, ভারতের সঙ্গে তেল বাণিজ্যে রাশিয়ার বাড়তি আয় হচ্ছে এবং সেই টাকা রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ যোগাচ্ছে। 

ট্রাম্প প্রশাসন ভালোই জানত যে এটা ‌পুরোপুরি অবাস্তব একটা যুক্তি। তবুও তাদের উদ্দেশ্যমূলক সিদ্ধান্তের লক্ষ্য ছিল তিনটি: এক, ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যের ঊর্ধমুখী রেখাটিকে নিম্নগামী করা। এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি যখন বর্তমান রপান্তরের পর্বে তখন দু দেশের মধ্যে যে-সম্পর্ক গড়ে উঠছে তার ক্ষতি করা। দুই, রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করে ভারতের লোভনীয় বাজারে আমেরিকার তেল বিক্রি করা (তাও আবার বেশি দামে)। কারণ আগামী কয়েক দশক ধরে ভারতকে তার বিপুল চাহিদা মেটাতে প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি কিনে যেতেই হবে। এবং, তার ফলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি একেবারে নিজের মুঠোয় নিয়ে নেবে আমেরিকা। এই বিষয়টি রণনৈতিক ভাবে দারুন গুরুত্বপূর্ণ।

এবং তৃতীয়ত, এটা দেখিয়ে দেওয়া যে ভারতের বর্তমান শাসককূল যারা গর্বভরে নিজেদের উগ্র জাতীয়তাবাদের পোশাকে সাজিয়ে লোকজনকে মুগ্ধ করে রাখার চেষ্টা করে এবং যারা সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র —‘বিশ্বগুরু’ সহ যাবতীয় বিষয়ের স্বঘোষিত প্রবক্তা, তারা আসলে একেবারে সারবস্তুহীন পদার্থ এবং ভারত সরকার যে দাবি করে তাদের রণনীতিগত স্বশাসন ও স্বাধীন বিদেশ নীতি রয়েছে, সেগুলো বাস্তবে গালভরা ফাঁকা কথা ছাড়া আর কিছুই নয়। 

সহজ করে বললে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান ভারতের শাসককুলের স্বরূপ উন্মোচিত করে দেখিয়ে দিয়েছে যে এরা জালিয়াত এবং মূলত মুৎসুদ্দি চরিত্রের, ভীতু এবং ছিদ্রান্বেষী। এক সময়ে যখন ট্রাম্পের নাটকীয়তা একেবার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছিল তখন তিনি গর্ব করে এই দাবিও করেছিলেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক কেরিয়ার একেবারে ‘শেষ’ করে দিতে পারেন।

ট্রাম্পের সব শীর্ষস্তরের আধিকারিক, যেমন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট, বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক এবং বাণিজ্য ও ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রের বরিষ্ঠ পরামর্শদাতা পিটার নাভারো— এরা নিয়ম করে প্রায় প্রতিদিন মোদি সরকারকে হুমকি দিয়ে গেছেন এবং ভারতকে দুনিয়ার চোখে খাটো করার জন্য উচ্চৈঃস্বরে তর্জন-গর্জন করে গেছেন। গোটা বিষয়টা মনে পড়াটাই অত্যন্ত অসম্মানজনক। এই সব কিছুর পিছনে যে ট্রাম্পের অনুমোদন ছিল সে-নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এ-ছিল ভারতের শাসককুলের মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়ার একটা সুপরিকল্পিত কৌশল। 

‘সত্যের মোহ’ তৈরি করার ব্যাপারে ট্রাম্প একজন পাকা খেলোয়াড়। ‘মিথ্যা কথাটা বার বার বলে যাও এবং দেখবে সেটাই একসময় সত্যি বলে প্রতীয়মান হবে’— এই কথাটাকে প্রায়ই নাৎসি নেতা জোশেফ গোয়েবেলসের উদ্ধৃতি বলে উল্লেখ করা হয়। ট্রাম্প এই আপ্তবাক্যটাকেই অনুশীলন করে গেছেন একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করতে যে— পরমাণু যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য তিনিই ভারত ও পাকিস্তানকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। সম্প্রতি ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে, মার্কিন কংগ্রেসের সামনে স্টেট অফ ইউনিয়নের ভাষণে, ট্রাম্প সে-দেশের এলিট শ্রোতাদের বলেছেন, ‘যদি যুদ্ধ থামাতে আমি মাথা না-গলাতাম তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশে ৩ কোটি ৫০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হত।’

স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, দেশপ্রেমিক যে সব ভারতীয় তাদের দেশের উপনিবেশ পরবর্তী ইতিহাসের জন্য বিপুল গর্ব বোধ করেন, তাঁরা আজ দ্বিধান্বিত এই ভাবনায় যে ট্রাম্প যে ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধ থামানোর দাবি করে যাচ্ছেন তাতে কিছুটা হলেও সত্যের কোনও উপাদান রয়েছে কিনা।

সোজা কথায়, স্ট্র্যাটেজিক অনমনীয়তা তথা অস্বীকার নামক ধোঁয়াটে কাচের আড়ালে দিল্লি নীরবে মার্কিন হুকুমদারির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং রাশিয়ার তেল আমদানি বিসর্জন দিয়েছে। মার্কিন আধিকারিকদের ইতিউতি মন্তব্য থেকে আমরা বুঝতে শুরু করি যে, ভারতের নেতারা আত্মসমর্পণ করেছেন।

গোড়ার দিকে কেউ কেউ ভাবতেন এটা মিথ্যা প্রচার। তবে দ্রুত সেই অবিশ্বাসের ছায়াটা সরে যায়। এবং যে সাদা সত্যটা সামনে চলে আসে তা হল ভারতের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তাজনিত যে স্বাধিকার, তার ওপর ভারত সরকারের আর নিয়ন্ত্রণ নেই। একবার যদি আপনি তা হারিয়ে ফেলেন তাহলে হারালেন চিরকালের জন্য। ভারতের মতো দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয়। তেল আমদানির ওপর ভারতের নির্ভরতা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টাকে জাতীয় স্বাধীনতার সঙ্গে একাসনে বসিয়ে দেওয়া যায়। 

বলা বাহুল্য যে, স্বাধীন বিদেশনীতি রয়েছে এমন একটি দেশ হিসাবে ভারতের ভবিষ্যতের টিকে থাকার যে শিকড় রয়েছে রণনীতিগত স্বাধিকারের মধ্যে, সেটা নিয়েই এখন গভীর সন্দেহ তৈরি হয়ে গেছে। 

মার্কিন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট যখন এক শুক্রবারে ফক্স বিজনেসকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে হেলায় কিছু কথা বলেন তখন আমাদের জাতীয় অহঙ্কারের বর্মটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। বেনেট বলেছেন,

বিশ্বে তেলের অভাব নেই। গতকাল ট্রেজারি এ-বিষয়ে একমত হয়েছে যে, ভারতে আমাদের যারা মিত্র রয়েছে তারা রাশিয়ার সেই তেল কেনা শুরু করে দিক যা ইতিমধ্যে সাগরের ভাসমান ট্যাঙ্কারে রয়েছে।     

ভারতীয়রা খুবই বাধ্য। কথা শোনে। এবছর শরৎকালে আমরা ওদের বলেছিলাম নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়ার তেল না-কিনতে। ওরা ভালো ছেলের মতো আমাদের কথা শুনেছে। রাশিয়ার তেলের বদলে ওরা আমেরিকার তেল কিনবে। তবে এখন বিশ্বজুড়ে সাময়িকভাবে তেলের অভাব দেখা দিয়েছে। এবং সেটা মেটাতে আমরা ওদের অনুমতি দিয়েছি রাশিয়ার তেল নিতে।     

বেসেন্ট আরও বলেন, এখন সাগরের জলে লক্ষ লক্ষ ব্যারেল নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ তেল রয়েছে, এবং মূলত সেই তেলকে নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে এনে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারে ট্রেজারি। আমরা এখন সেই চেষ্টাই করছি। আমরা খুব শিগগিরই ওঠানামা করা কিছু ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করব যাতে ইরানের সঙ্গে সঙ্ঘাত চলাকালীন বাজারে স্বস্তি ফেরে।    

মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট ওই শুক্রবারই এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করেন,

তেলের দাম কম রাখার জন্য আমরা কিছু স্বল্পকালীন ব্যবস্থা নিয়েছি। ভারতে আমাদের বন্ধুদের আমরা অনুমতি দিয়েছি তারা ইতোমধ্যে ভাসমান জাহাজে যে তেল রয়েছে তা তারা নিতে পারে, শোধন করতে পারে এবং সেই দ্রুত বাজারে ছাড়তে পারে। এটা সরবরাহ চালু রাখা ও চাপ কমানোর একটা কার্যকর ব্যবস্থা।     

এ-বিষয়ে সর্বোচ্চ পরিহাস হল, যে ট্রাম্প আগে হুকুম জারি করেছিলেন যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে হবে ভারতকে, তিনিই এখন দিল্লিকে ‘অনুমতি’ দিচ্ছেন আগামী ৩০ দিন পর্যন্ত অন্য কোনও আদেশ জারি করা না-হলে, ভারত রাশিয়ার তেল কিনতে পারবে যাতে ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর ঘোষিত যুদ্ধটি মসৃণভাবে চলতে পারে। জানা গেছে, রাশিয়ার সঙ্গে তেল বাণিজ্য ফের চালু করেছে রিলায়েন্স। রাশিয়ার তেল কিনে অন্যত্র বেচে রিলায়েন্স হঠাৎ করে বিপুল মুনাফা করার উটকো সুযোগ ভালোই কাজে লাগিয়েছে। তবে সেই মুনাফা কামানোর উৎসব বন্ধ হয়ে যায় ট্রাম্পের নির্দেশে।  

সার্কাসের তাঁবুর বাধ্য সিংহরা চাবুকের শব্দে ওঠে বসে। আমাদেরও সেই রকম ওঠবোস করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে আমাদের শাসককুলের দুকান কাটা। কারণ সারা বিশ্বের দর্শকদের সামনে যখন তাদের সঙ্গে খোলাখুলি ও নির্লজ্জভাবে এমন ব্যবহার করা হচ্ছে, ওয়াশিংটনের নির্দেশে যখন ভারতকে একটা তাঁবেদার রাষ্ট্রের পর্যায়ে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখনও এই শাসককুলের কোনও হেলদোল নেই। 

এসব দেখে গান্ধীজি কী ভাবতেন? এই কি সেই ‘নিয়তির সঙ্গে সাক্ষাৎ’ একদা যার স্বপ্ন দেখেছিলেন নেহরু? মনে রাখা দরকার, শুধুমাত্র নুন তৈরির স্বাধীনতা অর্জন করতে গান্ধীজি তাঁর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করেছিলেন গুজরাটের ডান্ডিতে। 

ভারতের আজকের দিনের শাসকদের উচিত গান্ধীজির মতোই নিজেদের বিশেষ অধিকারের জোর খাটিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া। তবে তেমনটা যদি সত্যিই করতে হয়, তাহলে স্মরণে আনতে হবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বাণী, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”। 

সূত্র: ইউরেশিয়া রিভিউ

অনুবাদ- সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ১৩-মার্চ-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org