মানবসভ্যতার দীর্ঘব্যাপ্ত ইতিহাসে, কল্পনার প্রশ্নটি বোধ করি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়। কল্পনার বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন চরিত্র। তা কখনও নিতান্ত ব্যক্তিপরিসরে সীমাবদ্ধ, কখনও বা সমষ্টির স্তরে কার্যকরী। মার্কসের কথায়, মানুষেরা কল্পনার ক্ষমতাই তাকে আর পাঁচটা প্রাণীর থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে। অর্থনৈতিক উৎপাদন হোক কিংবা সামাজিক-নির্মাণের গলিঘুঁজি, মনুষ্য-কল্পনার অবাধ বিস্তার সর্বত্রই ক্রিয়াশীল। এই আপাত-নিরীহ কতকগুলো ভাসা ভাসা কথায় যদি খানিকটা রক্ত-মাংস যোগ করা যায়, যদি মানুষ এবং কল্পনা শব্দ দুটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ভারতবর্ষের মাতৃরূপের কল্পনার দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা যায়, তবে তা ঘোরতর রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে। বোঝা যায়, আক্ষরিক ধারণার সাথে সঙ্গতিহীন এই কল্পনা বিষয়টি আদতেই বেশ গুরুভার। সময় এবং স্থানের শিকড়ে নিবদ্ধ, ঐতিহাসিকতায় যথার্থ সিঞ্চিত মানুষের কল্পনা এক যথার্থ সামাজিক শক্তি হয়ে ওঠে। উক্ত ধারণাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান প্রবন্ধের অবতারণা।
প্রসঙ্গটি ইতিপূর্বে বহুলমাত্রায় আলোচিত। অধুনা ভারত সরকার ‘বন্দে মাতরম্’ গানটির সার্ধশতবর্ষ আবিষ্কার করেছেন। যে কোনো আবিষ্কারের স্বাভাবিক প্রকৃতিস্বরূপ এই নিয়েও দেশব্যাপী হই-হট্টগোল হচ্ছে বিস্তর। তদুপরি গবেষণার নিক্তিতে উক্ত আবিষ্কারের প্রামাণ্যতা নির্ধারণ করতেও যথেষ্ট ছাপার কালি খরচ হচ্ছে। দিল্লিতে লোকসভার মাইকে মাইকে যদি এই বিসংবাদের একাংশের অভিনয় হয়, অন্য অংশটির কেন্দ্র নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গ। এই সমগ্র চিত্রকল্পের আওতায় একই সাথে এসে পড়েছে ভারতীয় এবং বাঙালি জাতিসত্ত্বার প্রশ্ন, ভারতের দেশ রূপে কল্পনার আঙ্গিক, ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বরূপ, ভারতীয় অস্তিত্বের ধর্মীয় পরিচয় সংক্রান্ত প্রশ্ন সহ আরও একাধিক জটিল বিষয়। প্রশ্নগুলি ফেলনা নয়, সংযুক্ত ইতিহাসও যথার্থই গুরুত্বপূর্ণ। তবু একটি প্রশ্ন সর্বাগ্রে, সমস্ত কিছুকে অতিক্রম করে এসে উপস্থিত হয়। তা হল, অধুনা এই দারিদ্র্যক্লিষ্ট, ধোঁয়াটে বাতাসের ভারতবর্ষে উক্ত বিতর্কের প্রয়োজনীয়তা কী রূপ?
‘বন্দে মাতরম্’ গানটির ঐতিহাসিকতা সংক্রান্ত তথ্যাদির অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এই প্রবন্ধটির মূল উপজীব্য বিষয় নয়। বলা বাহুল্য সেই কাজটি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ঐতিহাসিকেরা করেছেন। বরং উক্ত গানটির সার্ধশতবর্ষ আবিষ্কার আজকের ভারতীয় জ্ঞানচর্চার রাজনীতিতে, এবং ইতিহাস নির্মাণে কী রূপে তাৎপর্যপূর্ণ, এই প্রবন্ধটি সেই অনুসন্ধানের একটি প্রয়াস রূপে বিবেচিত হতে পারে। আদিতেই উক্ত বিষয়ে প্রবন্ধকারের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং সে জন্য পাঠকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা প্রয়োজন। তবে অতীতের চেয়েও, কেন বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট অতীতের ঘটনা বা ঘটনা পরম্পরা বিশেষ রূপে গুরুত্ববহ হয়ে উঠছে, সেই খোঁজটি ইতিহাসেরই আরেকটি অংশ বলে বিবেচনা করার কথা বলেছেন ঐতিহাসিক এ.এইচ. কার। তাই এ-প্রচেষ্টাটি একেবারে জলে যাবে না, এই আশা করা যায়।
দুহাজার পঁচিশ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাস আদেও ‘বন্দে মাতরম্’ রচনার সার্ধশতবর্ষ কিনা, সেই সালতামামির বিতর্কটি বহাল তবিয়তে বর্তমান। গানে তৎকালীন অবিভক্ত বঙ্গের জনসংখ্যার উল্লেখ থেকে বঙ্গদর্শন পত্রিকার একপাতা ম্যাটার কম পড়া সংক্রান্ত ঘটনার সূত্র অনুসরণ করে একাধিক বিদগ্ধজন এই বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন, বিগত কয়েকমাসের ব্যবধানেই। ১৮৭৫ না-হলেও, যেহেতু গানের আপাত রচনাকাল ১৮৭২-৭৪ এর মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে বলে বিভিন্ন গবেষণালব্ধ ফলে উঠে এসেছে, তাই সালতামামির এই বিতর্ককে এ-স্থলে অব্যহতি দেওয়া যেতে পারে। বৃহত্তর প্রশ্নটি বোধকরি এইরকম যে, কেন কেন্দ্র সরকারের এহেন ‘বন্দে মাতরম্’-এর সার্ধশতবর্ষ আবিষ্কারের প্রয়োজন পড়ল? হিন্দুত্ব কী কম পড়িয়াছিল?
বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের পাশ্চাত্য-কেন্দ্রিক ধারণা ব্যাতিরেকে তাঁর জাতি/দেশ (নেশন)কে এক কাল্পনিক কৌমগত অস্তিত্ব (ইম্যাজিনড কমিউনিটি) রূপে নির্ধারণ করা তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের দৈনন্দিন যাপনে নিরাকারের স্থান নেই। যা সাকার নয়, তার বলিষ্ঠ কল্পনা ব্যতীত তাকে একটি সামাজিক শক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা করা যারপরনাই কঠিন। দেশের পিতৃ/মাতৃরূপ কল্পনা এই প্রবণতারই যথার্থ প্রকাশ। তদুপরি পাশ্চাত্য অর্থে ‘নেশন-স্টেট’ আধুনিকতার পবিত্রতম এবং সর্বোচ্চ রূপ। ফরাসি বিপ্লব এবং আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে যে-সমস্ত উদারনৈতিক সমাজকল্পনার পথচলা শুরু তার পরিণতি হয় জাতি রাষ্ট্রে, তার একতায়, তার সভ্যতার মানদণ্ড বেয়ে অবিচল পথচলায়। স্বভাবতই ইতিহাসের পথে রাষ্ট্রের জন্মলাভ এবং বিকাশের পরিবর্তে রাষ্ট্র অনুসারী ইতিহাসের নির্মাণ হয়ে ওঠে সর্বপ্রকারে সিদ্ধ। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য অকাদেমির নেহেরু নির্দেশিত আপ্তবাক্য হয়ে ওঠে “ভারতীয় সাহিত্য আদতে এক, তা কেবল বহু ভাষায় লিখিত”। রাষ্ট্রীয় ইতিহাস নির্মাণের প্রয়োজনে কালাতিক্রমণ দোষ যথার্থই বহু পুরাতন।
বিদগ্ধ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে এই দোষের ঊর্ধ্বে স্থাপন করা সম্ভব নয়। তিনি যখন বলেন “বাঙালির ইতিহাস নেই, বাঙালির ইতিহাস লিখিতে হইবে” তখন উক্ত সমস্যার আভাস পাওয়া যায়। তদুপরি এহেন ইতিহাসের নির্মাণ আর পাঁচরকম ইতিহাসের মতোই উদ্দেশ্য নিরপেক্ষ নয়। ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার আক্রমণ প্রতিহত করতে এর সূত্রপাত। দেশকে মাতৃরূপে কল্পনা করতে পারলে, পাশ্চাত্য-আধুনিকতার অভিমুখে একটি পদক্ষেপ নেওয়া যায় এবং স্বদেশের মাটির ছোঁয়াও খানিকটা থেকে যায়। ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধ থেকে স্বদেশি বয়কট আন্দোলন অতিক্রম করে স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষদিন অবধিও এই মাতৃমূর্তি তাই একান্ত তাৎপর্যবহ হয়ে থাকেন। ‘ভারতীয় সভ্যতার’ আদিতম কাল থেকে আজ অবধি সেই মাতৃমূর্তি অক্ষয় এবং তাঁর সন্তানদলের মুখাপেক্ষী এমন ধারণা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নামান্তর হয়ে ওঠে
এক্ষণে ধর্মের প্রসঙ্গটি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। কোন্ ধর্মের মানুষের কাছে এই মাতৃমূর্তি সহজে গ্রহণযোগ্য? আধুনিক জাতীয়তাবাদের আঁতুড়ঘরে ধর্মভেদে জাতি কল্পনার ধরন পৃথক হতে পারে কী? সর্বোপরি ভারতবর্ষকে কী আদৌ একটি জাতিরাষ্ট্র রূপে কল্পনা করা সম্ভব? প্রশ্নগুলি একই সাথে সরল এবং উত্তোরত্তর জটিল আবর্তে প্রোথিত। ঐতিহাসিক সুদীপ্ত কবিরাজ দেখান ঊনবিংশ শতকের গোড়া থেকেই রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হয়ে, ব্রাহ্মসমাজ-হিন্দুধর্মের দ্বন্দ্বে এবং সংস্কৃত কলেজের আধুনিক পাঠ্যক্রমে বা আধুনিক বাংলা ভাষার নির্মাণের আগাগোড়াই হিন্দুত্বের ছাঁচে ঢালা। বাংলার মুসলমানের সেই পংক্তিতে নিজেকে অপাংক্তেয় মনে করার সমস্ত কারণ বিদ্যমান। ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীত, তার সাথে যুক্ত আনন্দমঠ উপন্যাস এবং তৎসংক্রান্ত পরাধীন ও স্বাধীন ভারতের রাজনীতিকে এই সচেতন অথবা অবচেতন অপরায়নের আঙ্গিকে দেখা প্রয়োজন।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী বয়কট আন্দোলনের ধারায় ‘বন্দে মাতরম্’ শব্দ দুটি জাতীয়তর বীজমন্ত্রে পরিণত হয়। পরবর্তী দশকগুলির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কার্যত পথনির্দেশক এই আন্দোলনটিই বাংলার দরিদ্র, নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং মুসলমান কৃষকদের অপরায়িত করেছিল অর্থনৈতিক প্রশ্নে। সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক-সংস্কৃতি জাত বঙ্গদেশের মাতৃকল্পনা, সেটি অবনীন্দ্রনাথের ছবি হোক অথবা বঙ্কিমের গান, দরিদ্র মানুষের কতটা কাছাকাছি পৌঁছে ছিল, সেই প্রশ্ন ইতিহাসে একপ্রকার অনুচ্চারিত থেকে গেছে।
ভারতীয় জাতীয় সংগীত এবং জাতীয় স্তোত্র সংক্রান্ত একটি আলোচনায় ঐতিহাসিক রুদ্রাংশু মুখার্জি বলেন ‘বন্দে মাতরম্’ এবং ‘জন-গণ-মন’ উভয় গানই আমাদের জাতীয় চেতনায় অনুরূপ স্থান দখল করে থাকে। উনিশশো পঞ্চাশ খ্রিস্টাব্দের চব্বিশে জানুয়ারি রাজেন্দ্র প্রসাদ অনুরূপ মন্তব্যেই উক্ত গান দুটিকে তাদের স্বস্থানে অভিষিক্ত করেছিলেন। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হল ‘কাদের জাতীয় চেতনা? আজকের ভারতীয় কেন্দ্র সরকারের ‘বন্দে মাতরম্’ কেন্দ্রিক যাবতীয় আয়োজনের ক্ষেত্রে ওই একই প্রশ্নের উত্থাপন প্রয়োজন।
আরএসএস পরিচালিত বিজেপি সরকারের বর্তমান প্রকল্পে রবীন্দ্রনাথ-বঙ্কিমকে লড়িয়ে দেওয়ার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যটি আদতেই দুর্বোধ্য নয়। পূর্বোক্ত রুদ্রাংশু মুখার্জির আলোচনায় ‘জন-গণ-মন’-এর লেখার প্রসঙ্গটি আলোচিত হয়েছে। যা একাধারে পঞ্চম জর্জের ভারতাগমনের প্রতি একরকম বিদ্রোহ উচ্চারণ এবং ভারতের বহুধা বিস্তৃত সত্তার, তার বৈচিত্র্য এবং তার মানুষের সার্বভৌমত্বের উদযাপন। অন্যদিকে আপাতভাবে দুর্গাবন্দনা সদৃশ ‘বন্দে মাতরম্’ গানের রচয়িতা বঙ্কিমের মানবতাবাদী ধর্মভাবনা এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অর্থনৈতিক সমালোচনা তার বিভিন্ন প্রবন্ধে বিদ্যমান। এক কথায় এহেন বঙ্কিম বনাম রবীন্দ্রনাথ তথা হিন্দুত্ব বনাম উদারনীতির প্রকল্পটি অন্তঃসারশূন্য।
তবে যে প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ, তা হল ‘আমরা ভারতের জনগণ’। ছিয়াত্তরতম সাধারণতন্ত্র দিবস তথা ভারতের জাতীয় স্তোত্র প্রাপ্তির দিনটির গভীরতর তাৎপর্য ভারতের খেটে খাওয়া, অনাহার দীর্ণ, গিগ ইকোনমির যাঁতাকলে পিষ্ট খসখসে মুখের মানুষগুলির চেতনায়। মার্কসীয় তত্ত্বের দীর্ঘ বিশ্লেষণ করে জর্জ রুডে অর্থনীতির ভিত্তিভূমি এবং আদর্শের পরাকাষ্ঠার পূর্বাপর নির্ধারণের চেষ্টা করেন। মার্কস যাকে নির্দিষ্ট সময়ে এক বস্তুগত শক্তিতে পরিণয় সাপেক্ষ বলে চিহ্নিত করেন, সেই আদর্শের পরাকাষ্ঠা বিষয়ে রুডে নির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হন। তবে এই বস্তুগত শক্তির ধারণা দিয়ে এই প্রবন্ধে যবনিকা টানা যায়। ‘বন্দে মাতরম্’ হোক অথবা ‘ভারত ভাগ্যবিধাতা’, দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক সত্যে জারিত এক বস্তুগত শক্তি হয়ে ওঠা উভয় গানের পক্ষেই যথার্থ সম্ভব। হিন্দুত্বের করালগ্রাস থেকে ঔপনিবেশিক অর্থনীতির সংঘর্ষে জন্মলব্ধ সেই রচনাকে উদ্ধার করা, ইতিহাস প্রদত্ত বর্তমানের গুরুদায়িত্ব। আমাদের, ভারতের জনগণের এই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত হওয়া আশু কর্তব্য।
প্রকাশের তারিখ: ২৭-জানুয়ারি-২০২৬ |