আজ ভেনেজুয়েলা, কাল কে?

টিম মার্কসবাদী পথ
এটি শুধু ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে একটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নয়, একইসঙ্গে সেইসব দেশের জন‍্য একটি হুঁশিয়ারিও বটে— যারা ট্রাম্প ডকট্রিনের কাছে মাথা নোয়াতে নারাজ। এটি তৈরি করেছে এমন এক জঘন‍্য নজির, যা জন্ম দিয়েছে কিছু জরুরি প্রশ্নের: এরপর লাতিন আমেরিকার কোন্ দেশ, কোন্ রাষ্ট্রপতি, অথবা কোন্ রাজনৈতিক নেতা হবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী টার্গেট! এটি এমন এক প্রশাসনের কাছ থেকে এসেছে, যারা কেবল কোনও আইনেরই তোয়াক্কা করে না, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ‍্যাসিস্ত ‘বিচারপতিদের’ বিচার থেকেও নিজেদের মুক্ত রাখার বন্দোবস্ত করে রেখেছে। 

নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ। বেপরোয়া বোমাবর্ষণ। মার্কিন একতরফা আগ্রাসন। 

স্বাধীন-সার্বভৌম ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা এবং রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোর অপসারণকে একমাত্র এভাবেই বর্ণনা করা যায়। এটি আন্তর্জাতিক আইনের নির্লজ্জ লঙ্ঘন। একটি চরম অ‍ন‍্যায় এবং অবৈধ পদক্ষেপ। এমনকি 'নিউ ইয়র্ক টাইমস' পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলী পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় ‘যুদ্ধবাজ’ ট্রাম্পের এই আগ্রাসনকে ‘অবৈধ ও নির্বোধের মতো কাজ’ বলে উল্লেখ করেছে। টাইমসের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া: গত কয়েক মাস ধরে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে ক্যারিবীয় এলাকায় বিশাল সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছেন। এতদিন তিনি ওই বাহিনীকে (বিমানবাহী একটি রণতরী, আরও অন্তত সাতটি যুদ্ধজাহাজ, অসংখ্য বিমান এবং ১৫ হাজার মার্কিন সেনা) ব্যবহার করেছেন মাদকপাচার রোধের অজুহাতে ছোট নৌযানে অবৈধ হামলা চালানোর জন্য।

এটি শুধু ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে একটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নয়, একইসঙ্গে সেইসব দেশের জন‍্য একটি হুঁশিয়ারিও বটে— যারা ট্রাম্প ডকট্রিনের কাছে মাথা নোয়াতে নারাজ। এটি তৈরি করেছে এমন এক জঘন‍্য নজির, যা জন্ম দিয়েছে কিছু জরুরি প্রশ্নের: এরপর লাতিন আমেরিকার কোন্ দেশ, কোন্ রাষ্ট্রপতি, অথবা কোন্ রাজনৈতিক নেতা হবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী টার্গেট! এটি এমন এক প্রশাসনের কাছ থেকে এসেছে, যারা কেবল কোনও আইনেরই তোয়াক্কা করে না, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ‍্যাসিস্ত ‘বিচারপতিদের’ বিচার থেকেও নিজেদের মুক্ত রাখার বন্দোবস্ত করে রেখেছে। 


নিউ ইয়র্ক শহরে বিক্ষোভ 

ঘটনাক্রম স্পষ্ট: বোমা হামলা থেকে স্পেশাল ফোর্সের অভিযান— যেমন আগে হয়েছে তেলের ট‍্যাঙ্কারের জবরদখল— এর সঙ্গে মাদকপাচারের কোনও সম্পর্ক নেই— তা সে ট্রাম্প যতই দাবি করুক ('ওয়াশিংটন পোস্ট'-এর হিসেবে, প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ৩০,৫৭৩ বার অসত‍্য বলেছিলেন)— বরং, সম্পর্ক রয়েছে ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে অফুরন্ত তেলের ভাণ্ডার আর সোনা-হীরে, তামা-নিকেলের মতো মহার্ঘ খনিজসম্পদের সঙ্গে। কে না জানেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ অন‍্যান‍্য সাম্রাজ্যবাদী দেশের বহুজাতিক তেল সংস্থাগুলি এর দখল নিতে কতটা মরিয়া! 

গতকাল ছিল নাইজেরিয়া। আজ ভেনেজুয়েলা। আমরা সতর্ক না হলে কাল কিউবা। পরশু ব্রাজিল। কিংবা কলম্বিয়া। 

কাউকেই রেয়াত করা হবে না। ভেনেজুয়েলার পর এবার মেক্সিকো, কলম্বিয়া এবং কিউবাকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। এটিই গত ডিসেম্বরে মার্কিন প্রশাসনের গৃহীত ‘জাতীয় সুরক্ষা নীতি ২০২৫’-এর প্রকৃত চেহারা। ট্রাম্পের কথায়, ‘পশ্চিম গোলার্ধে পুনরুদ্ধার করতে হবে মার্কিন প্রাধান‍্য’। এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো এবং গোটা এলাকা নিজের দখলে রাখার চাহিদা আদতে কুখ‍্যাত ‘মনরো নীতি’র ট্রাম্প-সংস্করণ। 

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

ট্রাম্প পাগল নন। অর্থনৈতিক নেতৃত্ব এবং বিশ্বের নেতৃত্বের জায়গায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরানো অবস্থাকে বজায় রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। ট্রাম্প যখন ‘সর্বাগ্রে আমেরিকা’(আমেরিকা ফার্স্ট), বা ‘আমেরিকাকে ফের একবার মহান করা’র (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন, এমইজিএ) ডাক দিয়ে প্রচারের ঝড় তুলছেন, তখন তিনি আসলেই চাইছেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ফের একবার মহান করতে। 

আজকের বিশ্বের রূঢ় বাস্তবতাকে অতিক্রম করতে। নয়া-উদারবাদের সংকটকে অতিক্রম করতে। ব্রিটিশ 'দ্য ইকনমিস্ট' পত্রিকায় (যাকে লেনিন বলেছিলেন, যারা ‘কথা বলে ব্রিটিশ মিলিওনেয়ারদের জন্য’) শিরোনাম: ‘নব্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’— যেখানে পত্রিকাটি লিখেছে, ‘একশ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে ট্রাম্প হলেন প্রথম রাষ্ট্রপতি, যিনি এক নতুন মার্কিন ভূখণ্ডের ডাক দিয়েছেন— একেবারে মঙ্গলগ্রহ পর্যন্ত’(ইকনমিস্ট, ২১ জানুয়ারি, ২০২৫)। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র থেকে ভারতীয় উপমহাদেশও আর নিরাপদ নয়। ঘৃণা, বিদ্বেষ ছড়িয়ে, ধর্মীয় উন্মাদনা, গণহত‍্যা সংগঠিত করে জমানা পরিবর্তনের রাজনীতি নিয়ে আসা হয়েছে এখানেও। আগে আফগানিস্তান, পাকিস্তানে যা করেছে, এখন পশ্চিম এশিয়া থেকে সেই যুদ্ধক্ষেত্রকে দক্ষিণ এশিয়ায় নিয়ে আসছে আমেরিকা। 

এখন তাই চুপ করে থাকার সময় নয়। এটা বিক্ষোভের সময়। মিছিলে হাঁটার সময়। প্রথম পদক্ষেপ জোরালো গণ-প্রতিবাদ। ওরা মাদুরোকে বন্দি করতে পারে। ভেনেজুয়েলার বলিভারীয় বিপ্লবকে না। 

কলকাতায় প্রতিবাদ মিছিল 

শনিবার সন্ধ্যাতেই দেশের সাংবিধানিক আদালতের সুপ্রিম ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছে— মাদুরোকে অপহরণের পর প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও দেশের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে উপরাষ্ট্রপতি ডেলসি রডরিগুয়েজকে অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতে হবে। মন্ত্রিসভার সকল সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীর সকল কমান্ডার এবং সমস্ত প্রাদেশিক সরকারের নেতৃত্ব বহাল রয়েছেন। ভেনেজুয়েলায় একজনই সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি, তিনি মাদুরো, যাকে অপহরণ করা হয়েছে, শাসনব্যবস্থা কোনও পরিবর্তন হয়নি। জানিয়েছেন ভেনেজুয়েলার ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ, সদ‍্য-প্রাক্তন মাদুরো সরকারের কূটনীতিক কার্লোস রন। সঙ্গে জানিয়েছেন, দেশের বেশিরভাগ অংশ স্বাভাবিক রয়েছে— যোগাযোগ এখনও চালু আছে, সরকারি-বেসরকারি এবং কমিউনিটি মিডিয়া স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। হামলার রাতেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন সামরিক আগ্রাসন এবং রাষ্ট্রপতির অপহরণের বিরুদ্ধে দেশবাসীর সুরক্ষায় একজোট রয়েছে। বিদেশী আগ্রাসনের মুখে সামরিক বাহিনী অসাধারণ ঐক্য আর সংহতি দেখিয়ে চলেছে। দেশবাসী সাধারণভাবে শান্ত এবং স্বাভাবিক রয়েছেন।

মার্কিনমুলুক-সহ বিশ্বজুড়ে মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী-কে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ত‍্যাগ করতে হবে তার আগ্রাসী নীতি। ক‍্যারিবিয়ান সাগর থেকে সরাতে হবে তার সমস্ত সামরিক বাহিনী। লাতিন আমেরিকাকে ‘শান্তির অঞ্চল’ বলে ঘোষণা করতে হবে। কোনও সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না মার্কিন প্রশাসন। ভারত সরকারকে অবিলম্বে আমেরিকার এই অন‍্যায় ও অযৌক্তিক নগ্ন আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানাতে হবে। 


সংহতি সমাবেশে বলেছেন কিউবার রাষ্ট্রপতি মিগুয়েল দিয়াজ ক‍্যানেল

কিউবার রাষ্ট্রপতি মিগুয়েল দিয়াজ ক‍্যানেল এক সংহতি সমাবেশে বলেছেন, এটা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ‘খিড়কির উঠোন’ নয়, এটা কোনও বিতর্কিত ভূখণ্ড-ও নয়। আমরা মনরো ডকট্রিন মেনে নেব না। এটা শুধু ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে হুমকি নয়, গোটা বিশ্ব মানবতার বিরুদ্ধে। এই অপরাধের একমাত্র তুলনা করা যেতে পারে গাজায় ইজরায়েলি জায়নবাদের সঙ্গে। এখন তাই মধ‍্যপন্থা নেওয়ার সময় নয়। ঠিক করতে হবে দুইয়ের মাঝে একটিকে। ফ‍্যাসিবাদ ও সাম্রাজ‍্যবাদী বর্বরতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে দৃঢ়তার সঙ্গে। ভেনেজুয়েলার জন‍্য আমরা এমনকি আমাদের রক্ত দিতে প্রস্তুত, আমাদের জীবন দিতে প্রস্তুত।


প্রকাশের তারিখ: ০৫-জানুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org