|
ভেনেজুয়েলা– একটি দীর্ঘমেয়াদী গতিসূত্ররবিকর গুপ্ত |
কিন্তু ইতিহাসের গতি চিরকাল রুদ্ধ করে রাখার মত শক্তি মার্কিন দেশেরও নেই। ঠিক যে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্যে দিয়ে একমেরু বিশ্বের সৃষ্টিতে মনে হয়েছিল মার্কিন শক্তি অজেয়, সেই সময়েই একে একে লাতিন আমেরিকায় কয়েকটি নতুন বাম ঘেঁষা সরকারের আগমন এই মহাদেশের রাজনীতি বদলে দিল। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলে, বলিভিয়া, উরুগুয়ে, ইকুয়েদর– একদা যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সামরিক একনায়কদের মুক্তাঞ্চল ছিল, সেখানে গণ-আন্দোলনে ভর করে ইভো মোরালেস্, লুলা দা সিল্ভা, রাফায়েল কোরিয়ার মত নেতারা একের পর এক দেশে ক্ষমতায় আসীন হলেন। |
‘… ব্রিটেন ভারতবর্ষ দখল করে বসে আছে; আমেরিকা সেরকম করে কোনও দেশ দখল করার হাঙ্গামা স্বীকার করতে চায় না। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে ধনলাভ, কাজেই তারা অন্য দেশের ধন-সম্পদকে আয়ত্তে আনবারই শুধু চেষ্টা করে। ধন-সম্পদ আয়ত্ত হলেই তখন দেশের প্রজা সহজেই আয়ত্তে চলে আসে, তার পর দেশের জমি আসতেও দেরি হয় না। কাজেই এইভাবে অতি সহজে তারা সে দেশের উপর কর্তৃত্ব করে, তারা সম্পদে ভাগ বসায়; সেজন্যে তাকে বেশি কষ্টও করতে হয় না, দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে লড়াইও করতে হয় না। এই অভিনব পন্থাটির নাম হচ্ছে– অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ। মানচিত্রে এর ছবি থাকে না। ভূগোল বা মানচিত্র খুলে দেখো, একটা দেশকে হয়তো মনে হবে সে স্বাধীন স্বাবলম্বী। অথচ তার অবগুণ্ঠন খুলে যদি দেখতে পারো দেখবে, সে অন্য কোনও দেশের বা শেষোক্ত দেশের ব্যাঙ্কার আর বড়ো বড়ো ব্যবসাদারদের করায়ত্ত হয়ে আছে। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের আছে এই অদৃশ্য সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্য অদৃশ্য, কিন্তু এর ফলপ্রসূতা কারও চেয়ে কম নয়।’ কিশোর পাঠ্য ভাষায় রচিত মার্কিন অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদের স্বরূপের অনবদ্য বিবরণ আমরা পাই পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর ‘বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গ’ (Glimpses of World History)-এর ১২১ তম চিঠিতে। দেরাদুনের ডিস্ট্রিক্ট জেল থেকে কন্যার উদ্দেশ্যে নেহেরু এই চিঠি যখন লিখেছিলেন, তখন ১৯৩৩ সালের জানুয়ারি মাস। জটিল বিষয়বস্তুর সহজ উপস্থাপনার নেহেরু-সুলভ মুনশিয়ানা এই পর্যবেক্ষণকে আলাদা মাত্রা দিলেও, তা কোনও সুগভীর বা অভিনব ভূ-রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ফসল নয়। ‘মনরো নীতি’ ঘোষণার পর থেকেই লাতিন আমেরিকা যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উপনিবেশ– এ ছিল সেই সময়ের একটি সাধারণ জ্ঞান। মানচিত্রে হয়তো দেশগুলি স্বাধীন, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে মেক্সিকো থেকে চিলি– স্যাম চাচার অঙ্গুলি হেলনেই পরিচালিত হয় প্রত্যেকটি পুতুল সরকার। কিউবা, মেক্সিকো, হন্ডুরাস, পানামা– পান থেকে চুন খসলেই মার্কিন বাহিনীর বুটের সশব্দ পদচারণাতে ততদিনে লাতিন আমেরিকা অভ্যস্ত। বিংশ শতকে লাতিন আমেরিকার যে সংগ্রাম, তা আদতে এই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এই সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট গেরিলা ও বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীরা– স্থান ও কালভেদে কখনও পৃথকভাবে, কখনও বা একত্রে। মহাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ‘খিড়কির বাগান’ লাতিন আমেরিকায় এইসব বেয়াদবি কোনওদিনই বরদাস্ত করেনি। লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে যখনই এমন কোনও সরকার এসেছে, যারা ওয়াশিংটনের প্রতি অনুগত হতে রাজি নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক আইনের চাদরের তলা থেকে সামরিক অভ্যুত্থান, অর্থনৈতিক অবরোধ ও কূটনৈতিক ছোরাবাজির লোহার ডাণ্ডা বের করেছে বারংবার। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালা, ১৯৬১ সালে ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ১৯৬৪ সালে ব্রাজিল, ১৯৭১-এ বলিভিয়া, ১৯৭৩-এ চিলে, ১৯৭৬-এ আর্জেন্টিনা, ১৯৮৩-তে গ্রানাডা, ১৯৮৯ সালে পানামা, ১৯৯৪ আর ২০০৪-এ হাইতি, ২০০৯-এ হন্ডুরাস– লাতিন আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতিহাস যেমন সুদীর্ঘ তেমন রক্তাক্ত। মার্কিন দেশের তাঁবেদার না হয়ে এই অঞ্চলে কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারে না– দীর্ঘকাল প্রতিষ্ঠিত এই নিয়মের একটিই ব্যতিক্রম ছিল। সেই ব্যতিক্রম– কিউবা। আমাদের মনে রাখতে হবে, কিউবার বিপ্লব শুধু একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল না– এই বিপ্লব ছিল একটি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনও, যা মার্কিন পুতুল বাতিস্তাকে অপসারিত করে দেশ হিসেবে কিউবার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের প্রতি যে তখন থেকে আজ অবধি সর্বক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর জিঘাংসা দেখিয়ে চলেছে, অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে হাভানার শ্বাসরোধে তার যে এত উৎসাহ– তার কারণ কিউবায় শুধু কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আছে বলে নয়। এ কথা ওয়াশিংটন জানে, যতদিন কিউবায় বর্তমান সরকার রয়েছে, ততদিন লাতিন আমেরিকার প্রত্যেক দেশের সামনে একটি উদাহরণ থাকবে যে একটি সফল ও সার্বভৌম সরকার মার্কিন দেশকে দাসখত না লিখেও পরিচালনা করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাই দীর্ঘকাল মরিয়া প্রচেষ্টা করে গেছে কিউবার এই ‘অবাধ্যতা’-র রোগ যাতে লাতিন আমেরিকায় সংক্রামিত না হয়। কিন্তু ইতিহাসের গতি চিরকাল রুদ্ধ করে রাখার মত শক্তি মার্কিন দেশেরও নেই। ঠিক যে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্যে দিয়ে একমেরু বিশ্বের সৃষ্টিতে মনে হয়েছিল মার্কিন শক্তি অজেয়, সেই সময়েই একে একে লাতিন আমেরিকায় কয়েকটি নতুন বাম ঘেঁষা সরকারের আগমন এই মহাদেশের রাজনীতি বদলে দিল। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলে, বলিভিয়া, উরুগুয়ে, ইকুয়েদর– একদা যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সামরিক একনায়কদের মুক্তাঞ্চল ছিল, সেখানে গণ-আন্দোলনে ভর করে ইভো মোরালেস্, লুলা দা সিল্ভা, রাফায়েল কোরিয়ার মত নেতারা একের পর এক দেশে ক্ষমতায় আসীন হলেন। এঁরা প্রত্যেকেই বাম-ঘেঁষা অথবা মধ্য-বাম রাজনীতিবিদ। অনেকে নিজেদের সমাজতন্ত্রী বলেও পরিচয় দিতেন। কিন্তু এখানে মনে রাখা জরুরি, সমাজতন্ত্রী বলতে ধ্রুপদী অর্থে আমরা যা বুঝি, উৎপাদন ব্যবস্থার উপর সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠা– তা এঁদের কারোর দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক লক্ষ্যের মধ্যেও ছিল না। এঁরা কেউই ক্ষমতায় এসে নিজের নিজের দেশের বেসরকারি ক্ষেত্রের উপর তেমন কোনও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারও প্রচেষ্টা করেননি। তবুও এঁদের বিজয় ছিল ঐতিহাসিক, নব্য-উদারনীতির ‘আর কোনও বিকল্প নেই’ এই ভাষ্যের বিরুদ্ধে তাঁরা নির্মাণ করতে সক্ষম হন এক রাজনৈতিক প্রতিভাষ্য। সমাজতন্ত্রী না হলেও, লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথমবার সফল ভাবে নির্মাণ করার প্রচেষ্টা হয় জনকল্যাণ রাষ্ট্রের। আর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক এই ‘গোলাপি ঢেউ’-এ সওয়ার নবাগত রাষ্ট্রপ্রধানরা কেউই আর মার্কিন দেশের তাঁবে-তে থাকতে প্রস্তুত ছিলেন না। এঁরা প্রত্যেকেই চেয়েছিলেন নিজের নিজের দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। নতুন এই রাজনৈতিক ধারার সর্বাপেক্ষা বৈপ্লবিক বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা গিয়েছিল ভেনেজুয়েলায়। ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষিতে আজকাল সংবাদমাধ্যম খুললেই আমরা শুনতে পাই, কেমন করে একদা ‘সমৃদ্ধশালী স্বর্গ’ ভেনেজুয়েলা সাভেজ ও তাঁর দলের হাতে ‘নরক’ হয়ে গেছে। পরিসংখ্যান কিন্তু আমাদের অন্য কাহিনী শোনায়। ১৯৯৮ সালে সাভেজ ও তাঁর পঞ্চম সাধারণতন্ত্র আন্দোলন নির্বাচনে জয় লাভ করে ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতায় আসার আগে, আমরা দেখতে পাই, ভেনেজুয়েলার প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করতেন, অতি-দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করতেন প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ। ১৯৯২ সালের মে মাসে নিউ ইয়র্ক টাইমস্-এর মত সংবাদমাধ্যমেই রিপোর্ট লেখা হয়েছিল, মাত্র ৫৭ শতাংশ ভেনেজুয়েলার নাগরিক কোনওক্রমে একবেলা খাবার জোটান। এই কি সেই ‘সমৃদ্ধি’-র চিত্র যা সাভেজ এসে ধ্বংস করেছিলেন? সাভেজ ও তাঁর আন্দোলন নিজেদের ‘সমাজতন্ত্রী’ দাবি করতেন। তিনি নিজেও ‘একুশ শতকের সমাজতন্ত্র’ প্রসঙ্গে বহু বক্তব্য রেখেছেন। কিন্তু সাভেজ-এর ক্ষমতায় আগমন কোনও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল না। তাঁরা শুধু একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন ও জাতীয় ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় উৎসাহী ছিলেন। তাঁদের এই খুব নিরীহ প্রচেষ্টাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে রাজি ছিল না। তেল সমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলার জাতীয় সার্বভৌমত্ব মার্কিন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও মার্কিন পুঁজির স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। এই কারণেই তারা ২০০২ সালে সাভেজকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের প্রচেষ্টা করে। সাময়িকভাবে সফল হলেও ভেনেজুয়েলার জনগণ প্রবল বীরত্বের সঙ্গে রাজপথের দখল নিলে এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়ে যায়। সাভেজ ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর খুব স্বাভাবিক ভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রবল শত্রু মনোভাবাপন্ন অবস্থান নেন, কিউবা এবং লাতিন আমেরিকার সকল বাম ঘেঁষা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তোলেন এবং মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক মুগুরের আঘাত প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক-সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে প্রয়াসী হন। তাঁর গণ-কল্যাণমুখী কর্মসূচিরও প্রত্যক্ষ ফল ফলতে শুরু করে। সাভেজ যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন ভেনেজুয়েলায় দারিদ্র্যের অবস্থা কী ছিল, আগেই বলা হয়েছে। ২০১১ সালে এই দারিদ্র্যের হার ৫০ শতাংশ থেকে কমে হয় ৩১.৯ শতাংশ এবং অতি-দারিদ্র্য ১৯.৯ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়ায় ৮.৬ শতাংশ-এ। শিশু অপুষ্টি, বেকারত্ব, শিক্ষার হার– প্রত্যেক পরিসংখ্যানে উল্লেখজনক উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। গড় আয় এবং জিডিপি– যে দুই পরিসংখ্যান-কে অর্থনৈতিক খবর পরিবেশনের সময় মোক্ষ বলে ধরা হয়, তাতেও ভেনেজুয়েলা সাভেজ আমলেই পূর্ববর্তী তিরিশ বছর যে স্থিতাবস্থার মধ্যে ছিল, তা থেকে বের হয়ে আসে। মাসের হিসেবে ১৯৯৮ সালে যেখানে ন্যূনতম মজুরি ছিল ১৬ ডলার, ২০১২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩৩০ ডলার। ভেনেজুয়েলায় ২০০১ থেকে ‘মিশন জামোরা’-এর মাধ্যমে ভূমি সংস্কারের কাজ হয় দ্রুত গতিতে। প্রায় ৭৭ লক্ষ হেক্টর জমি সরকার অধিগ্রহণ করে, কৃষকদের মধ্যে বন্টন করা হয় ৩০ লক্ষ হেক্টর। ২০১৩ সালে যখন সাভেজ প্রয়াত হন, তখন তাঁর মূল্যায়নের সময় ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর মত মার্কিন পুঁজির প্রত্যক্ষ স্বার্থরক্ষাকারী পত্রিকাও তিনি যে সেই দেশের দারিদ্র্য মোচনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা স্বীকার করতে বাধ্য হন। প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টার রাজনৈতিক ভাবে সাভেজ-এর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক মতবিরোধ স্বীকার করে নিয়েও লেখেন– ‘During his 14-year tenure, Chávez joined other leaders in Latin America and the Caribbean to create new forms of integration. Venezuelan poverty rates were cut in half, and millions received identification documents for the first time allowing them to participate more effectively in their country's economic and political life.’ সাভেজ যখন প্রয়াত হলেন, তখন ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি যথেষ্ট সবল, তাঁর পার্টি ‘পার্টিডো সোশ্যালিস্টা উনিডো দে ভেনেজুয়েলা’ রাজনৈতিক ভাবে প্রবল জনপ্রিয়। তাহলে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে কী এমন ঘটে গেল, যে তিন-চার বছরের মধ্যেই ভেনেজুয়েলার সরকারই পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল? এর কারণ পাওয়া যাবে সাভেজ আমলের দু’টি ভ্রান্তির মধ্যে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাভেজ ভেনেজুয়েলার খনিজ তেল রপ্তানি নির্ভরতা হ্রাস করার কোনও প্রচেষ্টাই করেননি। যেখানে ভেনেজুয়েলার সরকারের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ-ই তেল নির্ভর, কোনওভাবে তেলের দাম হ্রাস পেলেই সরকার প্রবল অর্থনৈতিক সঙ্কটের সম্মুখীন হত। তেলের দাম বিশ্ব রাজনীতির নানা যোগ-বিয়োগের সঙ্গে যুক্ত। তাই এর উপর নির্ভর করে কোনও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নীতি গড়ে তোলা যায় না। সাভেজ ঠিক এই ভুলটিই করেছিলেন। তিনি তেল রপ্তানি থেকে আসা যে বিপুল সরকারি আয়, তা নানা জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে লাগিয়েছিলেন। বিশ্ব রাজনীতির বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁর শাসনকালের অধিকাংশ সময়েই তেলের দাম চড়া ছিল, তাই তাঁকে কোনও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়নি। কিন্তু এটা তাঁর এবং তাঁর সরকারের ভাবা উচিত ছিল, যে এমন পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হবে না। ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির তেল নির্ভরতা হ্রাস করার ও অর্থনীতির অন্যান্য অংশকে চাঙ্গা করার প্রয়াস তাঁরা অনায়াসেই এই অনুকূল পরিস্থিতিতে করতে পারতেন। তা করা হয়নি। এর কারণ হল, মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বললেও সাভেজ অর্থনীতিতে সরকারি হস্তক্ষেপের তেমন পক্ষপাতী ছিলেন না। একথা ঠিক, খনিজ তেল ও গ্যাস শিল্পে তাঁর সরকার বহু সংস্থা জাতীয়করণ করেছেন। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলির পূর্বতন অকর্মণ্য ও দুর্নীতিগ্রস্থ বে-সরকারি কর্তাব্যক্তিদের সরানোর কোনও প্রচেষ্টাই হয়নি। তাই দুর্নীতি রয়ে গেছে এই সংস্থাগুলির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অর্থনীতির অন্যত্র সরকারি হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ আরও কম। সাভেজ-এর আমলে সেখানেও পুঁজিবাদী আধিপত্য অব্যহত ছিল। ১৯৯৯ থেকে ২০১১, সাভেজ আমলে অর্থনীতিতে বে-সরকারি প্রভাব কমা দূরে থাক, তা জাতীয় অর্থনীতির ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ, সাভেজ-এর ‘২১-শতকের সমাজতন্ত্র’-এর ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে বেসরকারি পুঁজির প্রভাব ফ্রান্সের থেকেও অধিক। শত্রুর এই অ্যাকিলিসের গোড়ালি সমদুর্বলতা মার্কিন ঈগলের চোখ এড়ায়নি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সাভেজ অনেকগুলি শনির প্রবেশ উপযোগী ছিদ্র রেখে গিয়েছিলেন। ২০০২ সালে তাঁর বিরুদ্ধে যাঁরা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের সকলকেই তিনি ক্ষমা করে দেন। অভ্যুত্থানের অধিকাংশ চক্রীরা কয়েক মাস জেল খেটে ছাড়া পান। অনেকে তো কোনও শাস্তিই পাননি। এই সময়ে ভেনেজুয়েলার সংবাদমাধ্যম কতটা মার্কিন সমর্থিত অভ্যুত্থান-পন্থীদের হাতে রয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে গেছিল। তারপরেও সাভেজ তাঁদের সঙ্গে বিশেষ দ্বন্দ্বে যাননি। বরং ‘TeleSUR’-এর মতো সংবাদমাধ্যম, যারা লাতিন আমেরিকায় বাম ঘরনার সাংবাদিকতায় নতুন যুগ এনেছিল, তারা প্রাথমিক ভাবে সাভেজ-এর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করলেও তাঁর শাসনকালের শেষ দিক থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জোটের নানা অংশের তরফ থেকে বাধার সম্মুখীন হয়। ‘TeleSUR’-এর সাংবাদিকতার মান ও স্বাধীনতা দুই-ই অনেকটা হ্রাস পায়। রাজনৈতিক চেতনার মান বৃদ্ধি, বিকল্প রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ– ইত্যাদি ক্ষেত্রেও কোনও নজর দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে সংস্কৃতি ও বৌদ্ধিক মত নির্মাণের ক্ষেত্রটিতে সাভেজ-এর তুমুল জনপ্রিয়তার দিনেও মার্কিন সমর্থিত বিরোধীরা ফাঁকা মাঠে একের পর এক গোল দিয়ে গেছে। দীর্ঘকাল শাসনব্যবস্থায় থাকার ফলে শাসকদল পিএসইউভি, কমিউনিস্ট পার্টি সহ সহযোগী দলগুলিকে অত্যন্ত হেলাতুচ্ছ করতে আরম্ভ করে। দলের মধ্যে বেনোজল ঢুকতে থাকে হু হু করে। সুবিধাবাদী দুর্নীতিগ্রস্থ নানা লোকজনে দল ভরে যায়। সাভেজ-এর মৃত্যুর পর এই প্রবণতা বৃদ্ধি পেলেও, এর সূচনা তাঁর জীবদ্দশাতে ২০১১ পরবর্তী সময়েই হয়েছিল। এই ফাটলগুলিও ওয়াশিংটনের নজর এড়ায়নি। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই আমরা সাভেজ পরবর্তী সময়ে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’-এর নিপুণ প্রয়োগ দেখতে পাই। কাকে বলে ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ ? NATO Review-এ এই প্রসঙ্গে যে সংজ্ঞা ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়ায় হয়েছে তা তুলে দেওয়া যেতে পারে – ‘To put it simply, hybrid warfare entails an interplay or fusion of conventional as well as unconventional instruments of power and tools of subversion. These instruments or tools are blended in a synchronized manner to exploit the vulnerabilities of an antagonist and achieve synergistic effects. The objective of conflating kinetic tools and non-kinetic tactics is to inflict damage on a belligerent state in an optimal manner. Furthermore, there are two distinct characteristics of hybrid warfare. First, the line between war and peace time is rendered obscure. This means that it is hard to identify or discern the war threshold. War becomes elusive as it becomes difficult to operationalize it. Hybrid warfare below the threshold of war or direct overt violence pays dividends despite being easier, cheaper, and less risky than kinetic operations. It is much more feasible to, let’s say, sponsor and fan disinformation in collaboration with non-state actors than it is to roll tanks into another country’s territory or scramble fighter jets into its airspace. The costs and risks are markedly less, but the damage is real.’ ২০১৫ সালে ওবামা সরকার তেল-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এই প্রকার যুদ্ধ শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফ্র্যাকিং-এর মাধ্যমে দেশীয় তেল উৎপাদন খুব দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব বাজারে এই তেলের বন্যায় খনিজ তেলের দাম কমে যায় দ্রুত (২০১২ সালে ব্যারেল পিছু ১২৫ ডলার থেকে ২০১৬-এর জানুয়ারি মাসে ব্যারেল প্রতি ৩০ ডলার)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই তেলভিত্তিক অর্থনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্য ছিল রাশিয়া আর ভেনেজুয়েলা। রাশিয়া প্রাথমিক ভাবে কিছুটা বেসামাল হলেও আবার অর্থনীতি সামলে নেয়, কারণ তেল রুশ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও একমাত্র অংশ নয়। ভেনেজুয়েলার পক্ষে এই ধাক্কা সামলানো সম্ভব ছিল না। দেশের ৯৬ শতাংশ রপ্তানিই যেখানে খনিজ তেল, সেখানে বিদেশী মুদ্রা অর্জনে ভেনেজুয়েলা স্বাভাবিক ভাবেই তেল নির্ভর, সরকারি বাজেটের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। এই প্রেক্ষিতে বিশ্ব বাজারে তেলের দামের দ্রুত হ্রাসের ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষমতা ব্যপক ভাবে হ্রাস পায়, হ্রাস পায় বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারও। দেশের খাদ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ ভেনেজুয়েলাকে বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। বিদেশি মুদ্রার অভাবে এই আমদানি ব্যাপক ভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়। যেটুকু খাবার আছে, তারও সুষম বন্টন সঠিক ভাবে সম্ভব হয়নি, কারণ খাদ্যব্যবস্থা বন্টনও খুব অনুন্নত। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি স্বাভাবিক ভাবেই আকাশ ছুঁয়ে যায়। এই অর্থনৈতিক সংকটের জন্য সরকারের দূরদর্শিতার অভাব কিছুটা দায়ী হলেও মূল দায় মার্কিন ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’-এর লোহার ডাণ্ডার। কিন্তু কোনও ভাবেই রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সংকটের জন্য দায়ী করে রাখা বক্তব্য সাধারণ জনতার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। এই প্রেক্ষিতেই ২০১৫ সালের ভেনেজুয়েলার আইনসভা নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী জোট বিপুল ভাবে বিজয়ী হয়। ১৯৯৯-এর পর প্রথমবার আইনসভার কর্তৃত্ব চলে আসে সাভেজ-বিরোধীদের হাতে। এই কায়দাই যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলায় তাদের সমর্থিত বিরোধীরা বজায় রাখতেন, তাহলে হয়তো পরের নির্বাচনেই মাদুরো অপসারিত হতেন। সাধারণ জনগণ তখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’-এর বাস্তবতাকে মেনে নেয়নি। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়ে মাদুরো উচ্ছেদে ওবামার মত আর রাখঢাক করে অগ্রসর হলেন না। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসন ভেনেজুয়েলাকে ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি থ্রেট’ বলে ঘোষণা করে তার উপর একের পর এক অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে তাকে ভাতে মারতে চেয়েছিল। ট্রাম্পএই অবরোধ চালু রাখেন ও তার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন। এর ফলাফল কত মারাত্মক, তা বোঝার জন্য ‘সেন্টার ফর ইকনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ’ থেকে প্রকাশিত মার্কিন অর্থনীতিবিদ মার্ক ওয়েইস্ব্রট ও জেফরিস্যাক্স-এর ‘Economic Sanctions as Collective Punishment: The Case of Venezuela’ নামক গবেষণাপত্রটি দেখা জরুরি। এই গবেষণা অনুযায়ী শুধু ২০১৭-১৮ সালেই মার্কিন অবরোধের কারণে প্রায় চল্লিশ হাজার ভেনেজুয়েলাবাসী প্রাণ হারিয়েছেন। রাশিয়ার সঙ্গে ‘তেলের বদলে খাদ্য’ সংক্রান্ত যে চুক্তি ভেনেজুয়েলার সরকার করেছিল, তার উপরেও অত্যন্ত অমানবিক ভাবে অবরোধ চাপানো হয়েছে। ট্রাম্প শুধু এতেই থেমে থাকেননি। ২০১৯ সালে স্বল্প পরিচিত বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো-কে সম্পূর্ণ অ-সাংবিধানিক ভাবে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে যে অভ্যুত্থানের চেষ্টা সংঘটিত হয়, তাতে যে তাঁদের পূর্ণ সমর্থন আছে, তা ট্রাম্প প্রশাসন খোলাখুলিই ঘোষণা করে। ট্রাম্পের জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা জন বোল্টন সিএনএন-এ প্রকাশ্যেই বকলমে স্বীকার করে নেন তাঁরা অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে মাদুরো সরকারকে অপসারণ করার চেষ্টা করছেন। মার্কিন সেনেটর মার্কো রুবিও গুয়াইদো সরকার ক্ষমতায় এসে কী নীতি নেবে, তার ছক অবধি সামাজিক মাধ্যমে লিখে ফেলেছিলেন। একটি অ-নির্বাচিত সরকারকে প্রায় ৬০-টি দেশ ভেনেজুয়েলার বৈধ সরকারের স্বীকৃতি দিয়ে ফেলেছিল। ভারত, চীন, রাশিয়া-সহ অধিকাংশ দেশই অবশ্য মাদুরো সরকার-ই ভেনেজুয়েলার বৈধ সরকার, এই অবস্থানে অনড় থাকে। এই অভ্যুত্থানের চেষ্টা শেষ অবধি ব্যর্থ হয়। গুয়াইদো স্বীকার করে নেন, অভ্যুত্থান সফল করার জন্য সেনাবাহিনীর মধ্যে যে সমর্থন থাকা প্রয়োজন ছিল, তা তাঁর ছিল না। এই প্রকাশ্য অভ্যুত্থানের চেষ্টায় হিতে বিপরীত হয়। ভেনেজুয়েলার জনগণের সামনে ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে যায়, মাদুরো যে মিশ্র-যুদ্ধের কথা বলছিলেন, তা শুধু গা বাঁচানোর প্রচেষ্টায় দেওয়া অজুহাত নয়। স্পষ্টতই, এই দাবিতে যথেষ্ট সত্যতা রয়েছে। তাঁরা এ-ও উপলব্ধি করেন মাদুরো বিরোধিতার নামে ভেনেজুয়েলার বিরোধী পরিসরের একটি বড় অংশ আসলে ওয়াশিংটনের দাসত্ব শৃঙ্খলে আবার দেশকে বাঁধতে চায়। এই অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মাদুরোর জনসমর্থন যে আবার কিছুটা বাড়তে শুরু করে, তার মূল কারণ এটা। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিও ক্রমশঃ কিছুটা উন্নতি করতে শুরু করে। যে কাজ সাভেজ-এর অনেক আগেই করা উচিত ছিল, সেই কাজে মাদুরো হাত দেন। অর্থনীতির তেল নির্ভরতা হ্রাস করার প্রচেষ্টা শুরু হয় এবং অনেকাংশে সফল হয়। তাঁর প্রতিবেশী অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়। বলিভিয়ার অভ্যুত্থান সমায়িক ভাবে সফল হলেও, প্রবল গণ-আন্দোলনের ঢেউ-এ ভর করে মোরালেসের দল আবার ফেরত আসে। ব্রাজিলে লুলা বোলসানারো-কে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আরও গুরুত্বপূর্ণ ভাবে প্রতিবেশী কলম্বিয়া, যা দীর্ঘকাল এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অনুগত মিত্র ছিল, সেখানে গুস্তাভো পেট্রোর মত প্রাক্তন মার্কসবাদী গেরিলা নির্বাচনে জিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। গত ২৯-শে জুলাই ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, এখনও অবধি তাতে দেখা যাচ্ছে মাদুরো আবার ক্ষমতায় ফিরতে চলেছেন। ৫৯ শতাংশ নির্বাচক এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে, যা বিগত নির্বাচনের তুলনায় লক্ষণীয় ভাবে বেশি। ৮০ শতাংশ ভোট গণনার পর মাদুরো পেয়েছেন ৫৩.৬৭ শতাংশ ভোট, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ও সম্মিলিতি বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ পেয়েছেন ৪৬.৩৩ শতাংশ ভোট। এই নির্বাচনী প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়েছে ২০১৯-এর অভ্যুত্থানের চেষ্টার প্রেক্ষিতে ভেনেজুয়েলার জনতার মার্কিন মিশ্র যুদ্ধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, অনুকূল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মাদুরোর অর্থনৈতিক সংকট অনেকটাই সামলে দেওয়ার সাফল্যের প্রেক্ষাপটে। যথারীতি, যা সাভেজ আমলেও আমরা বারংবার দেখেছি, বিরোধী পক্ষ এই নির্বাচনী পরাজয় স্বীকার করতে রাজি হয়নি। ভোট মিটতেই তারা রাস্তা অবরোধ, অগ্নি সংযোগ, সরকারি সম্পত্তির উপর আক্রমণের মত কৌশলে ফেরত গেছে। এ অস্বাভাবিক নয়, কারণ প্রধান বিরোধী নেতাদের মধ্যে মারিয়া করিনোর মতো নেত্রীরাও রয়েছেন, যাঁরা ২০০২ সালে সাভেজ উচ্ছেদে অভ্যুত্থানের চেষ্টায় মূল চক্রীর ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁরা প্রকাশ্যেই বলে এসেছেন এই সরকারকে ফেলে দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য, গণতান্ত্রিক ভোটের মাধ্যমে হলে ভালো, না হলে সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে কীভাবে তা বেঁকাতে হয়, তাও তাঁরা জানেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই আরও চাপ সৃষ্টি করার কথা বলতে শুরু করেছে, আর্জেন্টিনার ঘোষিত নব্য-উদারনীতি ও শিকাগো স্কুলের মহাভক্ত রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিলেই ঘুরিয়ে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীকে আহ্বান করেছেন সামরিক অভ্যুত্থানের। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ মাদুরোর চ্যালেঞ্জের শেষ নয়, শুরু মাত্র। মাদুরোর এই বিজয় আদতে ভেনেজুয়েলার জনগণের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার সপক্ষে মতদান। নয়তো, একথা অনস্বীকার্য, বিগত কয়েক বছরে অর্থনীতির উন্নতির জন্য প্রচেষ্টা ছাড়া মাদুরো অনবরত নানা ভুল পদক্ষেপ নিয়ে গেছেন। কখনও তিনি দীর্ঘকালের পরীক্ষিত মিত্র শক্তি ভেনেজুয়েলার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে দ্বন্দ্বে নেমেছেন (এই দ্বন্দ্বের কারণেই এইবারের নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি মাদুরোকে সমর্থন করেনি), কখনও বাতাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল কলম্বিয়া বা ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিনি অহেতুক উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করে সম্পর্ক খারাপ করেছেন। তাঁকে বুঝতে হবে, তিনি একা এই লড়াই লড়তে পারবেন না। দেশে ও বিদেশে তাঁর মিত্রশক্তি রয়েছে। তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা প্রবল ভাবে জরুরি, যেমন সাভেজ রাখতেন। ভেনেজুয়েলার জনতা তাঁকে এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দিয়েছে, সাভেজ যে ‘বলিভারিয়ান বিপ্লব’-এর মাধ্যমে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে এনেছিলেন তাকে রক্ষা করার। কিন্তু বার বার তাঁর সমস্ত নেতিবাচকদিক উপেক্ষা করে জনতা এই রকম সুযোগ দেবে না। তাঁর শত্রুরাও একই ভুল দুইবার করবে না। এই প্রেক্ষিতে মাদুরোকে তাঁর উপর প্রদত্ত ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হবে সাবধানতার সঙ্গে ও দায়িত্ব সহকারে। যদি ভ্রান্তি হয়, ইতিহাস ক্ষমা করবে না। প্রকাশের তারিখ: ৩১-জুলাই-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |