কুস্তির রিঙ ছাপিয়ে বীনেশ ফোগতের প্রসারিত রণক্ষেত্র

জগমতী সাংওয়ান, ইন্দ্রজিৎ সিং
মহিলা ক্রীড়াবিদদের যৌন হেনস্থা সহ্য করার ব্যাপারটা একটা লাগাতার ইস্যু। এর জন্য বহিরাগতরা দায়ী নয়। বরং দায়ী সেই সব লোকেরাই যাদের ভার দেওয়া হয়েছে কঠোর প্রশিক্ষণ চলাকালীন এবং টুর্নামেন্ট চলার সময় মহিলাদের হেনস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য। সেই হেনস্থার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রামের প্রতীক হলেন বীনেশ।

১৭ আগস্ট প্যারিস থেকে ফেরার পর বীনেশ ফোগতকে বিপুলভাবে, সাড়ম্বরে  এবং আবেগমথিত এক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তার উত্তরে ফোগত বলেন, ‘একটা স্বর্ণ পদকের চেয়ে মানুষের ভালবাসা ও সম্মান পাওয়াটা হাজার গুণ বেশি মূল্যবান।’ ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হরিয়ানার চরখি দাদরি জেলায় তাঁর নিজের গ্রাম বালালির দূরত্ব খুব বেশি হলে ১২০ কিলোমিটার। সমর্থকদের যে বিশাল বাহিনী সেদিন তাঁকে বিমানবন্দর থেকে তাঁর নিজের গ্রামে পৌঁছে দিয়েছিল, ওই পথটুকু পেরোতে তাদের ১৩ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছিল। যেসব সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ বীনেশকে স্বাগত জানিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন অল ইন্ডিয়া কিসান সভা (এআইকেএস)  এবং জনবাদী মহিলা সমিতির (জেএমএস) নেতৃত্ব। যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে যন্তর মন্তরে আন্দোলনে সামিল মহিলা কুস্তিগিরদের ওপর পুলিশি নিপীড়ন এবং অলিম্পিকে কুস্তিতে স্বর্ণপদকের জন্য শেষ রাউন্ডের লড়াইয়ে মাত্র ১০০ গ্রাম ওজন বেশি হওয়ার জন্য বীনেশের বাদ পড়ার পিছনে নোংরা কোনও কারসাজি থাকার সন্দেহ —এই দুই ঘটনায় জনমানসে বিপুল ক্ষোভ জমেছিল। বীনেশকে নজিরবিহীনভাবে সংবর্ধনা জানানোর পিছনে সেই ক্ষোভই ভিন্ন চেহারা নিয়ে সেদিন সামনে এসেছে। এই সংবর্ধনা সেই ক্ষোভেরই রূপান্তরিত প্রতীক। 

প্যারিসে কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টস (সিএএস) রুপোর পদকের জন্য বীনেশ ফোগতের আবেদন যদিও খারিজ করে দিয়েছে, তাহলেও ভারতের খেলাধুলার প্রশাসনের মাথায় যেসব কর্তাব্যক্তিরা রয়েছেন কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের মুখোমুখি তাদের হতেই হবে। 

প্যারিসে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আগে পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে যে বৈষম্যমূলক আচরণ বীনেশকে সহ্য করতে হয়েছে তা নিয়ে জমা হওয়া মানুষের ক্ষোভকে সিএএসে আবেদন জানানোর মাধ্যমে বিপথে চালিত করার চেষ্টা হয়। বীনেশের হয়ে সওয়াল করার জন্য পাঠানো হয় অ্যাডভোকেট হরিশ সালভেকে। এটা আর কিছু নয়, স্রেফ যা ক্ষতি হয়ে গেছে তা সামাল দেওয়ার একটা লোক দেখানো চেষ্টা মাত্র। যাঁরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী তাঁরা বীনেশের সম্পর্কে যে হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর মনোভাব দেখিয়েছেন, সেই মনোভাবের বিরুদ্ধে সমালোচনা যখন ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল তখন তাকে দমিয়ে দেওয়ার জন্যই হরিশ সালভেকে সওয়াল করার জন্য আনা হয়েছিল। যখন বীনেশের প্রতিযোগিতায় নামার সুযোগই খারিজ হয়ে গেল, তখন সেটা ছিল একটা স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো ঘটনা। ফলে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জেতার যে স্বপ্ন বীনেশ এতদিন মনে মনে লালন করছিলেন, তা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। তবে তাঁর আর্জিও খারিজ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, এই প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ জীবনে যে উচ্চতর সম্মানের আসন অর্জন করেছেন, এই খারিজ তাতে কোনও কালির দাগ লাগতে দেয়নি।।

প্যারিস অলিম্পিক্সে যখন প্রতিযোগিতা থেকে বাতিল হয়ে গেলেন বীনেশ, এর জেরে দেশজুড়ে যে ব্যাপক গণ ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছিল, তারপর কোন্‌ সব নাটকীয় ঘটনার জেরে সেই ক্রোধ বীনেশ ফোগতের  জন্য নজিরবিহীন সংহতি ও সহানুভূতিতে পরিণত হল? উত্তরটা হল, বীনেশ আর পাঁচটা অলিম্পিয়ানের মতো একজন  সাধারণ অলিম্পিয়ান নন। কিংবা এটা ভারতের আরেকটি সোনার পদক হাতছাড়া হওয়ার ঘটনাও নয়। বীনেশ বাদ পড়ায় জনমানসে যে এত ব্যাপকভাবে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ল এবং এত বেশি প্রতিক্রিয়ার জন্ম হল, তার একটা নির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে।  সেই পরিপ্রেক্ষিতের গভীর বিশ্লেষণ করা দরকার। 

ইন্ডিয়ান অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (আইওএ) বীনেশের প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ার ইস্যুর সবটাই খুবই বাজে ভাবে মোকাবিলা করেছিল। এতে মানুষের ক্রোধ আরও বেড়েছিল। এবং এর ফলে দুঃখজনক এই গোটা ঘটনার পিছনে কোনও নোংরা েখলা রয়েছে বলে মানুষের সন্দেহ আরও গভীর হয়েছিল। প্রতিযোগিতা চলাকালীন ভারতীয় টিমের এবং ব্যক্তি অ্যাথলিটদের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন যে সব আধিকারিক, তাঁরাও তাঁদের দায় এড়াতে পারেন না। বিশেষ করে দায় এড়াতে পারেন না কুস্তিগিরদের ওজন সংক্রান্ত বিষয়ের দায়িত্ব যাঁদের ছিল। খেলাধুলো সংক্রান্ত আইন বিষয়ে যাঁরা বিশেষজ্ঞ তাঁদের কেউ কেউ একথা বিশ্বাস করেন যে, বীনেশকে বাদ দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত মাত্র ১০০ গ্রাম ওজন বেশি থাকার কঠোর বিধির ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল, সেটার বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ চ্যালেঞ্জ করা দরকার ছিল।  এবং দাবি করা উচিত ছিল ফাইনাল রাউন্ডের খেলা করাতে হবে। ভারতীয় অ্যাথলিটদের সঙ্গে আইন বিশারদদের যে টিম গিয়েছিলেন ব্যাপারটা তাঁদেরই দেখা উচিত ছিল। এটা মোটেই বীনেশের নিজের দায় ছিল না। 

এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক যে আইওএ প্রেসিডেন্ট পি টি ঊষা এতই অসংবেদনশীল ছিলেন যে তিনি যেকোনও ভাবে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছিলেন এবং পুরো দোষটাই চাপিয়ে দিয়েছিলেন বীনেশ ও তাঁর কোচের ওপর। 

এবিষয়ে কোনও সংশয় থাকা উচিত নয় যে, প্রতিটি অলিম্পিয়ানেরই, বিশেষত মহিলাদের বাহিনীর সকলের, সাধারণের প্রশংসা প্রাপ্য। অলিম্পিয়ানেরা সকলেই দেশের সম্পদ এবং কারোর মূল্য অন্যজনের চেয়ে কম নয়, সে তাঁরা পদক জিতুন বা নাই জিতুন। তবু, এরই মধ্যে নিঃসন্দেহে বীনেশ ফোগত ছিলেন খুবই বিশেষ একজন। এবং তা ছিলেন প্যারিস অলিম্পিক্সের জন্য যোগ্যতা অর্জনের আগে থেকেই। প্যারিসে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ফাইনাল রাউন্ড থেকে বাদ পড়ার পর যে অকুতোভয় মেজাজ ও সাহসের পরিচয় তিনি দিয়েছেন, তাতে উচ্চতায় তিনি আরও দীর্ঘতর হয়ে সকলকে ছাপিয়ে গেছেন।   

যে পরিপ্রেক্ষিত বীনেশকে এত বিশেষ এবং বিশিষ্ট করে তুলেছে, সেনিয়ে গভীর ভাবে ভাবনাচিন্তা করার কাজটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

মহিলা ক্রীড়াবিদদের যৌন হেনস্থা সহ্য করার ব্যাপারটা একটা লাগাতার ইস্যু। এর জন্য বহিরাগতরা দায়ী নয়। বরং দায়ী সেই সব লোকেরাই যাদের ভার দেওয়া হয়েছে কঠোর প্রশিক্ষণ চলাকালীন এবং টুর্নামেন্ট চলার সময় মহিলাদের হেনস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য। সেই হেনস্থার বিরুদ্ধে একটা ধারাবাহিক সংগ্রামের প্রতীক হলেন বীনেশ। 

পদকজয়ী সঙ্গী কুস্তিগির সাক্ষী মালিক এবং বজরং পুনিয়ার সঙ্গে মিলে বীনেশরা প্রবল সাহসের পরিচয় দিয়ে এবং খেলার জগতে তাদের কেরিয়ারের ঝুঁকি নিয়েও বিকৃতমনস্ক লুঠেরাদের কুৎসিৎ মুখোশ খুলে দিয়েছেন। এই কুৎসিৎ লোকগুলোই ভারতের কুস্তি অ্যাসোশিয়েশনে রাজত্ব করছে। প্রতিবাদী কুস্তিগিররা মুখোমুখি চ্যালেঞ্জ জানান ব্রিজভূষণ সিংকে, যিনি বিজেপির খুবই প্রভাবশালী একজন সাংসদ এবং প্রতিবাদ চলাকালীন সময়ে ছিলেন ডব্লিউএফআইয়ের প্রেসিডেন্ট। বীনেশরা অভিযোগ করেন, ব্রিজভূষণ অত্যন্ত নিন্দনীয় সব কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে মহিলা কুস্তিগিরদের যৌন শোষণের চেষ্টা করতেন।

যন্তর মন্তরে মহিলা কুস্তিগিরদের প্রতিবাদের কথা কেউ ভুলবে না। এই প্রতিবাদকে বিপুলভাবে সমর্থন করেছিল সারা দেশের একাধিক মহিলাদের সংগঠন, কৃষক সংগঠন, সামাজিক মঞ্চ এবং নাগরিক সমাজের গোষ্ঠী। শাসকচক্রের ভন্ডামি ও আসল চেহারা একেবারে নগ্ন হয়ে গিয়েছিল যখন দিল্লি পুলিশ এফআইআর দায়ের করতে বাধ্য হয় কেবলমাত্র সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের ভিত্তিতে। পুলিশি নিষ্ঠুরতা এবং রাজনৈতিক শত্রুতা সত্ত্বেও, কুস্তিগিরদের বিক্ষোভ আন্দোলন বড়সড় সাফল্য পেয়েছে যখন দিল্লি পুলিশ আদালতে চার্জশিট পেশ করতে বাধ্য হয়েছিল ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট সেই সব ধারায়, যে সব ধারায় মহিলাদের শালীনতা নষ্ট করা ও যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা আছে। এই আইনি লড়াই অনন্য এই কারণে যে, যে লোকটি দিল্লি পুলিশকে দিয়ে মহিলা ক্রীড়াবিদদের রাজধানীর রাস্তা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল, তাকেই শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। ইতিমধ্যে, শাসক বিজেপির পরিপূর্ণ মদতে, ব্রিজভভূষণ মিত্র হিসাবে পেয়ে গেল সঞ্জয় সিংকে। ব্রিজভূষণের বদলে নির্বাচিত হলেন সঞ্জয় সিং এবং ব্রিজভূষণ তখন বুক বাজিয়ে বলতে শুরু করল যে ভারতীয় কুস্তি ফেডারশেনে তার ‘দবদবা’ (পূর্ণ আধিপত্য) অপ্রতিরোধ্য। পরে অবশ্য ভারতীয় কুস্তি ফেডারশেনই সাসপেন্ড হয়ে যায়। 

তবে মহিলা কুস্তিগিরদের নজিরবিহীন সংগ্রাম সফল হলেও তার জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল। অলিম্পিয়ান এবং ন্যায় বিচারের জন্য কঠিন লড়াইয়ে সামিল বীনেশের সঙ্গী সাক্ষী মালিককে কুস্তি থেকে অবসর নিতে হয়েছে। আর বীনেশকে প্রতি পদে প্রায় শত্রুতামূলক আচরণ সহ্য করে যেতে হয়েছে। ‘খোট্টা সিক্কা’ বা অচল পয়সার মতো ব্যক্তিগতভাবে অপমানজনক ইঙ্গিত এবং মর্যাদাহানিকর ভাষা, লোকসমক্ষেই প্রতিবাদী কুস্তিগিরদের উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। তবু, বীনেশ তাঁর লক্ষ্যে স্থির থেকে, দৃঢ় মনোবল সম্বল করে ও সফল হওয়ার ক্ষমতার পরিচয় দিয়ে প্যারিসে পৌঁছে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্যারিস অলিম্পিক্সে প্রতিযোগিতা করার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন তিনি। এবং একই দিনে তিন জন বিশিষ্ট কুস্তিগিরকে পরাস্ত করে নিজের পরাক্রমের পরিচয় দিয়েছিলেন। জাপানের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কুল্তিগির য়ুভি সুসাকি এর আগে কখনও হারেননি। এমনকী তাঁকেও সেদিন দারুনভাবে হারিয়ে জয় পেয়েছিলেন বীনেশ। তখনই বোঝা গিয়েছিল বীনেশের স্বর্ণপদক জেতাটা স্রেফ সময়ের ব্যাপার। এবং স্বর্ণ পদক তিনি জিতবেনই। তবে সেই উল্লাস হতাশায় পরিণত হয়েছিল যখন জানা গেল যে বীনেশ প্রতিযোগিতা থেকেই বাতিল হয়ে গেছেন। এই খবরে সকলেরই মন ভেঙে গিয়েছিল। ৫০ কেজি বিভাগের লড়াইয়ে তাঁর ওজন হয়েছিল মাত্র ১০০ গ্রাম বেশি। 

এই পরিস্থিতিতে, সঙ্গত কারণেই লোকদের রাগ বাড়ছিল এবং তাঁরা প্রাসঙ্গিক সব প্রশ্নগুলি তুলতে শুরু করেছিলেন যেগুলির সন্তোষজনক উত্তর দরকার ছিল। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে হরিয়ানার জনগণ নিঃসন্দেহে এই সব ইস্যুগুলি তুলবেন, প্রশ্ন ছুড়ে দেবেন বিজেপি নেতা ও প্রার্থীদের কাছে, ঠিক যেমন করে তাঁরা লোকসভা নির্বাচনের সময় প্রশ্ন তুলেছিলেন তিন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত কৃষকদের ওপর ভোলা যায় না এমন পুলিশি অত্যাচারের বিষয়ে। যন্তর মন্তরে  মহিলা কুস্তিগিরদের ওপর এবং তাঁদের ন্যায়বিচার চাওয়ার দাবিতে আন্দোলনকে যাঁরা সমর্থন করেছেন, এদের সবার ওপর যে অত্যাচার চালিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে সেই হিসাবও মিটিেয় দেওয়া হবে। 

প্রথমত, অলিম্পিক্সের জন্য যোগ্যতা অর্জনের পর এপ্রিল মাসেই বীনেশ ফোগত প্রকাশ্যে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, তিনি কোনও রকম নোংরা খেলার শিকার হতে পারেন যার মধ্যে পড়ে ডোপিংও। তাঁর আশঙ্কা ছিল, ডোপিংকে কাজে লাগানোর মতো নোংরা খেলা খেলতে পারেন কর্তৃত্বে থাকা সেই সব লোকেরা, যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যারা তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজছিল। বীনেশ অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর কোচ এবং ফিজিওথেরাপিস্টের অ্যাক্রেডিশন কার্ড দেয়নি কর্তৃপক্ষ। তবে তাঁর উদ্বেগকে কর্তৃপক্ষ আদৌ পাত্তাই দেয়নি। 

দ্বিতীয়ত, বিধি মেনে ওজন নেওয়ার জন্য বীণেশের রিপোর্ট করা দরকার ছিল। এখন মনে হচ্ছে, তাঁর ওজন যে ১০০ গ্রাম বেশি রয়েছে, রিপোর্ট করতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সেকথা তাঁকে জানানোই হয়নি।

তৃতীয়ত, সাংসদ কঙ্গনা রানাওয়াতের মতো কিছু কিছু বিজেপি নেতার প্রকাশ্য মন্তব্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। এই সব নেতারা আকারে ইঙ্গিতে বলার চেষ্টা করছিলেন যে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ চলাকালীন বীনেশ মোদিকে অপমান করতেই ব্যস্ত ছিলেন। এইসব মন্তব্যের উদ্দেশ্যই ছিল উদ্বেগজনক। বিজেপির কোনও প্রবীণ নেতা রানাওয়াতের এধরনের মন্তব্যের প্রতিবাদ করেননি। এথেকেই বোঝা  কর্তৃপক্ষ প্রথম থেকেই বীনেশের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে ঝুঁকেছিল। 

চতুর্থত, কেউ কেউ এই প্রশ্নও তুলেছেন যে, পর পর তিনটি রাউন্ডের লড়াইয়ে বীনেশ জেতার পর, এমনকী সুসাকির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ের পরও, প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন বার্তা পাঠাতে কেন অকারণ দেরি হয়েছিল। অথচ অন্য অ্যাথলিটদের সাফল্যের জন্য অভিনন্দন বার্তা পাঠাতে প্রধানমন্ত্রীর দেরি হয়নি। 

পঞ্চমত, যখন প্রতিযোগিতা থেকে বীনেশ বাতিল হয়ে যাওয়ার কারণে সারা দেশ গভীর দুঃখে ভেঙে পড়েছে, তখন কেন ক্রীড়ামন্ত্রী সংসদে বীণেশ ফোগতের প্রশিক্ষণে কত টাকা খরচ করেছে সরকার তার বিস্তারিত হিসাব দিতে গেলেন। ওই সময়ে এই হিসাব দেওয়াটা ক্রীড়ামন্ত্রীর পক্ষে ভীষণই অসম্মানজনক একটা কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। লোকেরা আশা করেছিল, বীনেশের শারীরিক ফিটনেস সহ অন্যান্য প্রয়োজন দেখার ভার যেসব আধিকারিকদের ছিল, তারা বীনেশের ওজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে কেন ব্যর্থ হয়েছিল, সরকার সেসবের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবে।  বীনেশের জন্য সরকারের খরচের হিসাব দেওয়ার বদলে,  মন্ত্রীর বরং সামনে আনা উচিত ছিল নতুন সংসদ ভবন তৈরির পিছনে কী বিপুল টাকা খরচ করা হয়েছে। এবং তারপরেও কেন বৃষ্টির সময় সেই ভবনের ছাদ থেকে জল পড়ছিল। 

ষষ্ঠত, বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন কুস্তিগির জর্ডন বারোজ ওজন নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত টেকনিক্যাল নিয়মের আশু পরিবর্তন বিষয়ে যে সব পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিশেষত লড়াইয়ের সূচি একদিনের বদলে দুদিন করার প্রেক্ষিতে, কেন সেই পরামর্শে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি? বারোজের মতামত ছিল জোরালো এবং তা ছিল বৈজ্ঞানিক যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি েয বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন তা হল, একজন কুস্তিগিরের ওজন পর পর দুদিন একই থাকবে এমন সম্ভাবনা সূদূর পরাহত। তাছাড়া, এ থেকে সহজ একটা প্রশ্ন তৈরি হয়, প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একজন কুস্তিগিরের ওজন যদি ১০০ গ্রাম বেশিও হয় তাহলে সেই কুস্তিগির তার প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আদৌ কি কিছু বাড়তি সুবিধা পাবেন?

তবে কথা হল, খেলা এখনও শেষ হয়নি, আরও অনেক রাউন্ড বাকি আছে। টেকনিক্যাল কারণে ফোগত হয়ত এক রাউন্ডে হেরেছেন, তবে এ হল একটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘকালীন সংগ্রাম, যে ব্যবস্থা ন্যায়বিচার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে, অথচ তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা এই লড়াইয়ে জিততে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই লড়াইয়ে অবশ্যই জিততে হবে কারণ আমাদের সংবিধান সমানাধিকারের গ্যারান্টি দিেয়ছে। 

নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়ার পথে বিপুল সংবর্ধনা পেয়েছেন বীনেশ। সমাজের সব অংশের মানুষের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন তিনি। বীনেশ বলেন, ‘ওরা যদিও আমাকে স্বর্ণপদক দেয়নি, এখানে আমার দেশের লোকেরা আমাকে সেই স্বর্ণপদকই দিয়েছেন। যে ভালবাসা ও সম্মান আমি পেয়েছি, তার মূল্য এক হাজার অলিম্পিক স্বর্ণপদকের চেয়ে বেশি।’



সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি
অনুবাদ: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ২৯-আগস্ট-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org