|
মজুরি, শ্রমকোড এবং ২০২৬-এর ধর্মঘট তরঙ্গটমাস আইজ্যাক |
|
কর্পোরেট মহল ও নয়া উদারবাদীরা ক’দিন ধরেই খুব উৎফুল্ল। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কারখানা শ্রমিকদের বার্ষিক প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে ০% থেকে ১.৫% শতাংশ হারে যা আগের দশকের ২.৫% থেকে ৩.৫% বার্ষিক বৃদ্ধি থেকে কমে এসেছে। পিএলএফএস বা পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি জরিপের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বৃহত্তর অ-কৃষি ক্ষেত্রের প্রকৃত মজুরি শূন্য বা শূন্যাঙ্কের সামান্য তলায় বিরাজ করছে। কারখানা ক্ষেত্রে মূল্য বর্ধনে মজুরি ও ভাতার অংশ হ্রাস পেয়েছে, পাশাপাশি মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে। “শ্রমিকদের কিউআর কোডের মাধ্যমে হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করা হয়”
“রাতারাতি শ্রমিকদের যুক্ত করা হল হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে”
“তদন্তে একাধিক হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপের খবর পাওয়া গেছে”
“বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের গ্রুপে বার্তা পাঠানো হয়েছে”
“প্রতিবাদে ওস্কাতে এবং ছড়িয়ে দিতে বার্তা পাঠানো হয়েছে”
“অভিযুক্তের স্মার্টফোনে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে”
একটি পাকিস্তান ভিত্তিক এক্স হ্যান্ডেলকে চিহ্নিত করাকে সন্দোহতীত প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হল এই বিক্ষোভকে দেশদ্রোহ হিসেবে দেখাতে। মনে হল শ্রমিকদের কোনো অধিকার নেই হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ তৈরি করা বা তার মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর। একটি স্বাভাবিক বার্তা যোগাযোগ মাধ্যমকে কীভাবে শিহরণ জাগানো ‘অনুসন্ধানী’ সাংবাদিকতার বিষয় করা হল তা দেখে বিস্মিত না-হয়ে পারা যায় না। যোগাযোগ বলয় এই ধর্মঘটগুলিকে কে একত্রিত করল? সামাজিক মাধ্যমই ছিল সংযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। ধর্মঘট নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদনকে যাচাই করার পর দেখা যায় যে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে সংগঠিত করার বিষয়টি শুধুমাত্র নয়ডাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গত ফেব্রুয়ারিতে বারাউনি, গুয়াহাটি এবং পানিপথের ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের শোধনাগারগুলিতে যে-ধর্মঘটগুলি হয় সেখানেও অভিন্ন দাবিসনদ উত্থাপিত হয়। বারাউনি শোধনাগারের প্রবেশপথে ২ ফেব্রুয়ারি যে-অবরোধ হয় তার খবর ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এই খবর অন্য শোধনাগারগুলির শ্রমিকদের অনুপ্রাণিত করেছে। শ্রমিকদের দুর্দশার বৃত্তান্ত তুলে ধরা অসংখ্য রিল ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে। কোনো আনুষ্ঠানিক সভা বা সমাবেশ ব্যতিরেকে প্রধানত শুধুমাত্র হোয়াটস অ্যাপে চালাচালি হওয়া বার্তার ভিত্তিতেই ঠিকা-মজুর ও অন্যরা ধর্মঘটের পথে পা বাড়ায়। এর ফলে স্বতস্ফূর্ত প্রতিবাদ উত্তাল তরঙ্গের আকার ধারণ করে। এর গতিবেগ ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয়স্তরের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলি আহুত দেশব্যাপী ধর্মঘটের সাফল্যে সুস্পষ্ট অবদান রাখে। সিআইটিইউ-ও প্রাথমিকভাবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করেছে। পানিপথের প্রতিবাদ নিয়ে সংগঠনের হরিয়ানার সম্পাদক ভগবান সিং-এর পোস্ট প্রচুর প্রচার পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি এই স্বতঃস্ফূর্ত, অঞ্চলভিত্তিক ধর্মঘট আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে এবং তারা মূলত এর সম্প্রসারকের ভূমিকা পালন করেছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহৃত হয়েছে প্রচারের কাজে, অন্যদিকে হোয়াটস অ্যাপ সংগঠিত করার কাজে মূল ভূমিকা পালন করেছে। উল্টোদিকের প্রচার ফেসবুকের অ্যালগরিদম ধর্মঘট সংক্রান্ত ভিডিও ও লেখালেখি, এমনকী জয় ভগওয়ানের ২৫ ফেব্রুয়ারির বক্তৃতার প্রসার সীমিত করে দিয়েছে ‘হিংসাত্মক’ বা বিঘ্নকারী হিসেবে চিহ্নিত করে। ইউনিয়নের পেজগুলিকে শ্যাডো ব্যানিং বা ছায়া নিষিদ্ধতার মতো নিঃশব্দ আঘাত হানা হয়েছে যাতে পরিযায়ী শ্রমিকরা এর খবর না-পায় বা পাল্লা দিয়ে প্রকাশিত হওয়া একের পর এক শ্রমিকদের রিল নাগালের বাইরে থেকে যায়। কর্তৃপক্ষের স্বপক্ষের অ্যাকাউন্টগুলি সিআইটিউ-এর বিরুদ্ধে হিংসা ছড়ানোর অভিযোগ এনে পাল্টা প্রচার চালিয়েছে। একইসঙ্গে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পেজে নজরদারি চালিয়েছে ‘দেশদ্রোহের’ খোঁজে। নয়ডার ঘটনা ঘটতেই সরকারও দৃশ্যপটে হাজির হয়ে গেছে। চাঞ্চল্যকর খবর আসতে থাকে এই দাবি করে যে ধর্মঘটকে সমর্থন জানানো একটি এক্স হ্যান্ডেলের নাকি পাকিস্তানের সাথে যোগ আছে। ২০২১ সালের তথ্য প্রযুক্তি আইন প্রয়োগ করে কেন্দ্রীয় সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। নয়ডায় ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে রাখা হয়। এই সময়পর্বে গিগ শ্রমিকদের তিনটি বিশাল প্রতিবাদ সংগঠিত হয়। নিউ ইয়ারের প্রাক্কালে প্রায় এক লক্ষ শ্রমিক ১০ মিনিটে সরবরাহ মডেলের প্রতিবাদে লগ অফ করে। ৭ ফেব্রুয়ারি ওলা, উবের এবং র্যাপিডোর তরফেও একই ধরনের প্রতিবাদ সংগঠিত হয়। সাধারণতন্ত্র দিবসে গিগ শ্রমিকরা দেশজুড়ে মোবাইল অ্যাপের সুইচ অফ করে দেয়। এর সমগ্র পরিকল্পনা রচিত হয় এনক্রিপ্টেড গ্রুপ বা সংকেতায়িত গ্রুপের মাধ্যমে। হিংস্র দমন নয়ডার প্রতিবাদ সহিংস দমনপীড়নের মুখোমুখি হয়েছে। ৩,০০০-এর চেয়ে বেশি পুলিস মোতায়েন করে ধর্মঘটীদের উপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করা হয়। সরকারিভাবে ৩৯৬ জন বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রেফতার করা হয় প্রায় ১,০০০ জনকে। শ্রমিক মহল্লায় পুলিসি হানা চালিয়ে সন্ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। সিআইটিইউ অফিস ঘিরে ফেলে সংগঠনের নেতা গঙ্গেশ্বর দত্ত শর্মাকে গৃহবন্দি করা হয়। সিপিআইএম-এর সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি সহ সংসদ সদস্য ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে নয়ডা যাওয়ার মুখে আটকে দেওয়া হয়। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী সহ বহু মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। গোটা বৃত্তান্ত দাঁড়িয়ে আছে এখানেই। কিন্তু এটাই সমগ্র কাহিনি নয়। এটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। আগামী দিনগুলি আরো নতুন বার্তা বহন করে আনবে। ভাষান্তর- শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার প্রকাশের তারিখ: ২০-মে-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |