খোলাখুলিই বলছি। আমাদের চোখের সামনেই একটা গণহত্যার পর্ব চলছে। আমাদের সবার ফোনে গণহত্যার একটা লাইভ স্ট্রিমিং চলছে। কেউ একথা বলতে পারবেন না যে তিনি জানেন না ঠিক কী ঘটছে। ভবিষ্যতে কেউই একথা বলতে পারবেন না যে ‘আমরা জানতাম না।’ আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় প্রতিটি দেশের একটি অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব রয়েছে। সেটা হল গণহত্যা যাতে না ঘটে তা দেখা, এবং গণহত্যা যাতে বন্ধ হয় সেবিষয়ে পদক্ষেপ করা। তার মানে অপরাধে মদত দেওয়া বন্ধ করতে হবে, এবং সত্যিকারের চাপ তৈরি করতে হবে। এবং অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। কিন্তু আমরা সেরকম কিছু দেখতে পাচ্ছি না। ন্যূনতম যেটুকু করা দরকার আমাদের সরকারগুলো তাও করছে না। আমাদের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্যালেস্তিনীয়দের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। এমনকী আমাদের সরকারগুলো সবচেয়ে জঘন্য ধরনের যে যুদ্ধাপরাধ ঘটছে তা বন্ধ করার জন্যও কিছু করছে না। এবং আমি কখনও একথা ভেবে উঠতেই পারি না যে মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে কীভাবে। কারণ এরা বেআইনি অবরোধের ফাঁসে আটকা পড়া লক্ষ লক্ষ মানুষকে পরিকল্পিত ভাবে অনাহারে থাকতে বাধ্য করছে।
দশকের পর দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে এই অবরুদ্ধ মানুষেরা অবর্ণনীয় দুর্দশা ভোগ করে চলেছেন দমবন্ধ করা নির্যাতনের মধ্যে থেকে। তাঁদের সহ্য করতে হচ্ছে বর্ণবৈষম্যবাদ ও দখলদারি। যখন আমাদের সরকারগুলি তাদের আইনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ, তখন আমরা গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার সাহায্যে এক কদম আগে বাড়তে চেয়েছিলাম। আমাদের সরকারগুলি মানবাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। তারা একথাও বলছে যে, গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ প্রতিটি সরকারই আমাদের মিশনের নিরাপত্তাটুকু দেওয়ার মতো ন্যূনতম দায়িত্ব পালনেও ব্যর্থ। মনে হয়, এই মিশন না থাকাই উচিত ছিল। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা হল এতাবৎকালের সেই সর্ববৃহৎ প্রয়াস যা সমুদ্রপথ দিয়ে ইজরায়েলের বেআইনি ও অমানবিক অবরোধ ভেঙে ফেলতে চায়। এ হল বৈশ্বিক স্তরে আন্তর্জাতিক সংহতি যখন সাধারণ মানুষেরা এগিয়ে আসছেন এবং আমাদের সরকারগুলি তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। মানুষজনই বলছেন, আমাদের নেতারা, তথাকথিত নেতারা যাদের কাজ আমাদের প্রতিনিধিত্ব করা, তারাই গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে মদত দিয়ে চলেছে। ওরা আমার প্রতিনিধি নয়, এবং এই মিশনকে টিকে থাকতেই হবে কারণ এটাই সর্বশেষ হাতিয়ার। যদিও এমন পরিস্থিতি খুবই লজ্জার।
আমি এখন দীর্ঘ সময় ধরে অনেক অনেক কথা বলতে পারি কীভাবে আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, আমাদের বন্দি করে কী ধরনের অপমানজনক আচরণ করা হয়েছে। আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। তবে এসব কথা আসল কথা নয়। এখানে যা ঘটেছে তা হল, ইজরায়েল গণহত্যা ও গণ ধ্বংসকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে। গণহত্যা কারাটাই ওদের মানসিকতা। একটা গোটা জনগোষ্ঠীকে, একটা গোটা জাতিকে ওরা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং তা করছে একেবারে আমাদের চোখের সামনে। লোকে যখন না খেয়ে রয়েছে, তখনও মানবিক সাহায্যকে গাজায় ঢুকতে না দিয়ে ওরা আবারও আন্তর্জাতিক আইন ভেঙেছে। আমরা এবিষয়েও জোর দিতে চাই যে, আমরা গাজায় ঢুকতে চাই শুধু মানবিক সহায়তা দিতে নয়। আমরা এই অবরোধ, এই দখলদারির অবসান চাই। অবসান চাই নির্যাতনেরও। স্বাভাববিক ভাবেই আমাদের কাজটা ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জের। এমনকী আমাদের প্রবল হিংসার মুখেও পড়তে হয়েছে। এটাই যুদ্ধাপরাধকে ঠেকাচ্ছে। এবং এগুলোই হল আসল কথা। গাজা থেকে, পৃথিবীর যেখানে যত মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন সেখান থেকে, আমরা নজর সরিয়ে নিতে পারি না। ‘সবকিছুই ঠিকমতো চলে যাচ্ছে নামক এই যে ব্যবস্থা’, সেই ব্যবস্থার সামনে রয়েছে কঙ্গো, সুদান, আফগানিস্তান, গাজা, এবং এরকম আরও অনেক এলাকা রয়েছে। আমরা যা করছি তা একেবারে ন্যূনতম।
এই গণহত্যা এবং আরও সব গণহত্যা ঘটছে আমাদের সরকারগুলোর জন্য। তারাই এতে মদত দিচ্ছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলি, আমাদের মিডিয়া, আমাদের কোম্পানিগুলি এতে মদত দিচ্ছে। আমাদের দায়িত্ব হল এই নীরব সমর্থনের পর্বের অবসান ঘটানো। আমরা যা করছি তাতে কেউই প্যালেস্তিনীয়দের উদ্ধারে করতে এগিয়ে আসছি না। আমরা যা করছি তা করছি প্যালেস্তিনীয়দের আর্জিতে সাড়া দিয়ে। কারণ ওঁরা আবেদন জানিয়েছেন সারা বিশ্বের মানুষের কাছে যাতে এই নীরব সমর্থনপর্বের অবসান ঘটে। আমরা যে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছি তাকে কাজে লাগিয়ে এবং বিভিন্ন মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে এর বিরুদ্ধে একটা অবস্থান নিতে চাই। কারণ গাজায় যা ঘটছে সেগুলি কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
প্রকাশের তারিখ: ০৭-অক্টোবর-২০২৫ |