|
সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পশ্চিম আফ্রিকার প্রতিরোধ সংগ্রামপ্রভাত পট্টনায়েক |
কোনও দেশকে যদি তাদের নিজেদের খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার উন্নত করতে হয় তাহলে বহুজাতিক কর্পোরেশনের মাধ্যমে না করে নিজেদের দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সেক্টরের মাধ্যমেই করতে হবে। এর কারণ হল খনিজ সম্পদ এমন একটা জিনিস, যা ফুরিয়ে যায়। যে কোনও দেশেই এই সম্পদ স্বল্প সময়ের জন্য টিঁকে থাকে। যদি খনিজ সম্পদের বেশির ভাগ অংশের মূল্য জাতীয় কোষাগারে সঞ্চিত না হয়, যার সাহায্যে অন্তর্বর্তী পর্যায়ে সেই দেশের অর্থনীতিকে উপযুক্তভাবে এবং নানা দিকে বিকশিত করা যাবে, তাহলে যখন সেই খনিজ সম্পদ ফুরিয়ে যাবে তখন সেই দেশটা একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়। |
এক ক্লিকে ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটসঅ্যাপ বারকিনা ফাসোর বিপ্লবী মার্কসবাদী নেতা এবং একনিষ্ঠ প্যান-আফ্রিকানপন্থী থমাস সাঙ্কারা চেয়েছিলেন তাঁর দেশকে ফরাসি সেনাদের কবল থেকে মুক্ত করতে। অথচ নিজের দলের লোকেরাই অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাঁকে গোপনে হত্যা করে। তবে এটা সকলেই ধরে নেয় যে, অভ্যুত্থানের চক্রীদের পিছনে ফরাসি মদত ছিল। তবে বেশির ভাগ সময়েই অভ্যুত্থানেরও দরকার পড়েনি। এসব দেশে সাধারণ নির্বাচনী রাজনীতিতে যে সব রাজনৈতিক দল জড়িত থাকে তাদের নেতাদের ট্রেনিং হয় ফরাসি দেশে এবং এই সব নেতারা নিজেদের দেশে একটানা ফরাসি সেনা কায়েম থাকার ইস্যুটাকে রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাতেই আনে না। এর ফলে বিদ্যমান ব্যবস্থা অনায়াসেই চলতে থাকে। বরং তার ওপর একটা গণতান্ত্রিক আচ্ছাদন পরানো হয়। তবে সম্প্রতি পশ্চিম আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে সেনাবাহিনীর মধ্যেকার বিপ্লবী মনোভাবাপন্ন লোকেরা নিজেদের দেশের নির্বাচিত অথচ মেরুদণ্ডহীন সরকারগুলির হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটা ঢেউয়ের জন্ম দিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি এই ধরনের ক্ষমতা দখলকে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হিসাবে চিহ্নিত করেছে এবং জানিয়েছে যে, এভাবে ক্ষমতা দখল করার সমালোচনা করতে হবে এবং এর বিরোধিতা করতে হবে। তবে পরিহাসের বিষয় হল, যদিও এই সামরিক শাসকেরা দেশের জনগণের দ্বারা ‘গণতান্ত্রিকভাবে’ নির্বাচিত সরকারকেই উচ্ছেদ করেছে, তা সত্ত্বেও এসব দেশের জনগণ অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে নতুন শাসকদের সমর্থন করছেন। নির্বাচনভিত্তিক প্রশস্ত গণতন্ত্র কীভাবে কাজ করে এবং সেই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ফাঁকটা কোন জায়গায়, সেটা স্পষ্ট হয়ে যায় এইসব দেশগুলির অবস্থা থেকে। নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্রের যে সাজানো গোছানো ছবিটা সাধারণত আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়, তাতে ভান করা হয় যে, যে কেউ একটা রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারে এবং নির্বাচনী পরিসরে ঢুকে পড়ার জন্য যে কোনও ইস্যুই তুলতে পারে। এটাও বোঝানো হয় যে, নির্বাচনী ক্ষেত্রটি এমনই একটা পরিসর যেখানে সবাই নিজের নিজের ইস্যুতে লড়াই করার সমান সুযোগ পাবে। এবং এই কারণেই যেগুলি মানুষের সত্যিকারের উদ্বেগের বিষয় সেগুলিই নির্বাচনের ফলাফলে অনিবার্যভাবেই প্রতিফলিত হয়। বস্তুত নির্বাচনী পরিসরে ঢুকে পড়ার পথের সামনে একটা দেয়াল আছে, যাকে অর্থনীতিবিদেরা বলেন ‘প্রবেশের পথে বাধা’। এই বাধা হল নির্বাচন লড়ার জন্য যথেষ্ট অর্থের অভাব। এই বৈষম্যই বুঝিয়ে দেয় যে, নির্বাচনী পরিসর কাজে লাগানোর সুযোগ আসলে সবার জন্য সমান নয়, এটা সবার পক্ষে সমানভাবে সক্রিয় হওয়ার পরিসরও নয়। সুতরাং এটা খুবই সম্ভব যে, আপাতদৃষ্টিতে সুষ্ঠুভাবে চলতে থাকা একটা নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্র, আসলে যে সব সত্যিকারের ইস্যুগুলি মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে, সেগুলি সমাধানের কোনও চেষ্টাই করছে না। পশ্চিমী গণতন্ত্রগুলির ক্ষেত্রে বর্তমানে ঠিক এমনটাই ঘটছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা আপাতদৃষ্টিতে মসৃণভাবে কাজ করলেও, শান্তির জন্য বিপুল সংখ্যক জনগণের মনে যে আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, নির্বাচনী ফলাফলে তা বিন্দুমাত্রও প্রতিফলিত হয় না। এটাই পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলির গণতন্ত্রেরও বৈশিষ্ট্য। এসব দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা কাজ করলেও, দেশে উপস্থিত বিদেশি সেনার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা বিপুল সংখ্যক জনগণের মধ্যে রয়েছে, নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে তা কখনই সামনে আসে না। নাইজার, মালি ও বারকিনা ফাসো— এখন এই তিনটি দেশই শাসন করেন সামরিক নেতারা যারা সম্প্রতি ক্ষমতা দখল করেছেন। সম্প্রতি এই দেশগুলি ফরাসি সেনাদের দেশ ছাড়তে বলেছে। এবং ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যাপারে মালি নির্ভর করছে রাশিয়ার ওয়াগনার গ্রুপের ওপর। এই গোষ্ঠীটি এখন কমবেশি মিশে গেছে রুশ রাষ্ট্রের সঙ্গে। বারকিনা ফাসো, মালি ও নাইজার ২০২৪-এর জুলাই মাসে একসঙ্গে বসে একটি জোট তৈরি করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অ্যালায়েন্স অফ দ্য সাহেল স্টেট’। থমাস সাঙ্কারার মতোই এই তিনটি দেশও প্যান–আফ্রিকানিজম এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। এক ক্লিকে সাবস্ক্রাইব করুন মার্কসবাদী পথের ইউটিউব যত ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ হতে পারে, তার মধ্যে কোনও দেশের খনিজ সম্পদ নিষ্কাশন খাতে করা বিদেশি বিনিয়োগ সবচেয়ে জঘন্য ধরনের। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসন একথা অনেক আগেই জোর দিয়ে বলে গিয়েছিলেন। একথাটা অন্যভাবে বললে দাঁড়ায়, কোনও দেশকে যদি তাদের নিজেদের খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার উন্নত করতে হয় তাহলে বহুজাতিক কর্পোরেশনের মাধ্যমে না করে নিজেদের দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সেক্টরের মাধ্যমেই করতে হবে। এর কারণ হল খনিজ সম্পদ এমন একটা জিনিস যা ফুরিয়ে যায়। যে কোনও দেশেই এই সম্পদ স্বল্প সময়ের জন্য টিঁকে থাকে। যদি খনিজ সম্পদের বেশিরভাগ অংশের মূল্য জাতীয় কোষাগারে সঞ্চিত না হয়, যার সাহায্যে অন্তর্বর্তী পর্যায়ে সেই দেশের অর্থনীতিকে উপযুক্তভাবে এবং নানা দিকে বিকশিত করা যায়, তাহলে যখন সেই খনিজ সম্পদ ফুরিয়ে যাবে তখন সেই দেশ একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়। আমাদের আশপাশের প্রতিবেশী দেশেই এমনটা হয়েছে। মায়ানমারের কথাই ধরা যাক। যখন মায়ানমারে খনিজ তেলের ভাণ্ডার ছিল, তখন তা নিষ্কাশনের জেরে সেদেশের অর্থনীতিতে একটা অস্থায়ী তেজি ভাব এসেছিল। আর খনিজ তেল উত্তোলনকারী বহুজাতিক সংস্থাগুলি বিপুল মুনাফা কামিয়েছিল। নানা দিকে অর্থনীতির আরও বিকাশের জন্য যেহেতু এই মুনাফা বিনিয়োগ করা হয়নি, (খনিজ তেল নিষ্কাশনের ব্যাপারটা রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের হাতে থাকলে যা হতে পারত) ফলে যখন মায়ানমারের তেলের ভাণ্ডার ফুরিয়ে গেল, তখন বহুজাতিক সংস্থাগুলি তল্পিতল্পা গুটিয়ে কেটে পড়ল। আর মায়ানমার সেই পুনর্মুষিকো ভব-তে পরিণত হল। এখন রাষ্ট্রসঙ্ঘের অভিধা অনুযায়ী মায়ানমারকে ‘সবচেয়ে কম উন্নত দেশ’-এর পর্যায়ে ধরা হয়। সুতরাং একটা দেশকে অবশ্যই নিজেদের খনিজ সম্পদ এবং নিঃশেষ হয়ে যায় যেসব সম্পদ, সেগুলির ওপর সবসময়ই মালিকানা কায়েম করতে হবে। নিজেদের শক্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের মাধ্যমে সেগুলিকে উন্নত করতে হবে। এই মৌলিক নীতিকেই স্বীকৃতি দিয়েছে বারকিনা ফাসো, যা এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তবে এই লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে সাম্রাজ্যবাদ সেই পথে যে বিপুল বাধার সৃষ্টি করবে তাকে অবশ্যই খাটো করে দেখলে চলবে না। তৃতীয় বিশ্বের যে সব দেশ তাদের খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার চেষ্টা করেছে, সেসব দেশে সরকার ওলোট পালট করার ব্যাপারে সাম্রাজ্যবাদের একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এর শুরুটা হয়েছিল ইরানে মোসাদেঘ সরকারকে উচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে। অসম্ভব ধরনের চাতুরি সত্ত্বেও, তৃতীয় বিশ্বের খনিজ সম্পদের ওপর নিঃশর্ত নিয়ন্ত্রণ কায়েম করাটা যখন সাম্রাজ্যবাদের কাছে অধরাই রয়ে গেল, তখন তারা নয়া-উদারবাদী ব্যবস্থার ফাঁদে আটকে ফেলল তৃতীয় বিশ্বকে। এর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল এই সব দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সেক্টরকে স্রেফ তুলে দেওয়া এবং দেশের খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফের পশ্চিমী বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলির করতলগত করা। সুতরাং, পশ্চিম আফ্রিকা নয়া উদারবাদী এই ব্যবস্থার ছলনা পুরোপুরি বুঝে ফেলল এবং একই সঙ্গে দেশের খনিজ সম্পদের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ জারি করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল— গোটা এই বিষয়টা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার সফল লড়াইয়ের পর, ভারত শুরু করেছিল ‘অর্থনৈতিক বি-উপনিবেশীকরণ’-এর একটা লড়াই। রাজনৈতিক বি-উপনিবেশীকরণের চেয়ে এটা ছিল সম্ভবত আরও কঠিন লড়াই। এই লড়াইয়েও ভারত সফল হয়েছিল কারণ তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা পাওয়া গিয়েছিল। সেই পর্বের পর আবার আমরা আমাদের অর্জনগুলিকে হাতছাড়া করছি। এবং তা করছি নয়া-উদারবাদকে বরণ করে নিয়ে। পশ্চিম আফ্রিকায় যে প্রয়াস চলছে সেটা দেখে আমাদের সরকারের উচিত সাম্প্রতিক পর্বে আমরা যে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রকে তুলে দেওয়ার পথে হাঁটছি, সেই নীতি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে চিন্তা করা। এমনকি প্রাকৃতিক সম্পদের প্রশ্নেও রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র থেকে সরে আসার নীতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবা উচিত। এই ক্ষেত্রটিতে দেশজ বেসরকারি উদ্যোগ মোটেই বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলির চেয়ে ভাল কিছু নয়। দেশজ বেসরকারি উদ্যোগগুলি সেই একই ত্রুটিতে ভোগে। প্রাকৃতিক সম্পদকে বিকশিত করে তোলার প্রশ্নেও রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের কোনও বিকল্প নেই। নিশ্চিতভাবেই যদি টাকা পয়সার অপব্যবহার হয় কিংবা পরিচালনায় অদক্ষতা থাকে, তাহলে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের মধ্যেও আলাদা করে প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রকে বিকশিত করে তোলার প্রয়াস জাতীয় উন্নয়নে খুব বেশি অবদান নাও রাখতে পারে। এতদসত্ত্বেও রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের অধীনেই প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রকে বিকশিত করে তোলাটা জাতীয় উন্নয়নের একটা আবশ্যিক শর্ত। তাছাড়া, যদি কোনও শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে, তাহলে নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়ার ক্ষমতাও তাদের থাকবে। সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি প্রকাশের তারিখ: ৩০-সেপ্টেম্বর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |