|
পরিযায়ীরা যেখানে অতিথি শ্রমিকশমীক মণ্ডল |
কেরালা সরকারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘রোশনি’। এই প্রকল্পে পরিযায়ী শ্রমিকদের শিশুরা পায় ভাষা শিক্ষার বাড়তি ক্লাস। সকালে ক্লাস শুরু হওয়ার ৯০ মিনিট আগে শুরু হয় এই অতিরিক্ত ক্লাস। বাংলা, ওড়িয়া ও হিন্দি ভাষী শ্রমিক পরিবারের শিশুদের দেওয়া হয় মালয়ালি, ইংরাজি ও হিন্দি ভাষা শিক্ষার বিশেষ পাঠ। স্থানীয় ভাষার অবৈতনিক শিক্ষার আওতায় এসে ভবিষ্যতে উচ্চ শিক্ষার পথে এগিয়ে চলেছে পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের শিশুরা। |
পরিযায়ী শ্রমিক নয়, এখানে সবাই অতিথি শ্রমিক। পরিযায়ী শ্রমিকদের এভাবেই দেখে কেরালা। প্রায় ৩৫ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করছেন কেরালাতে। নিজের রাজ্যের বাইরে কাজ করতে যেতে বাধ্য হলে কেরালাই তাদের প্রথম পছন্দ। একদিকে উচ্চ মজুরির হার, নিয়মিত কাজের চাহিদা ও সুরক্ষিত কাজের পরিবেশ এবং অন্যদিকে বাকি রাজ্যগুলিতে বেড়ে ওঠা বেকারত্ব, কম মজুরি, পরিকাঠামোগত ঘাটতি ইত্যাদি নানান কারণে গত কয়েক দশক ধরেই কেরালা এবং দেশের অন্যান্য রাজ্যগুলির মধ্যে একটি মাইগ্রেশন করিডোর গড়ে উঠেছে। কেরালামুখী এই শ্রমিক প্রবাহের উৎস এখন আর অতীতের মতো কেবল কেরালার প্রতিবেশি রাজ্যগুলি নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, আসাম ও বিহার থেকেই এখানে বেশির ভাগ মানুষ আসছেন পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজ খুঁজতে। এদের বেশিরভাগই অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের সাথে যুক্ত। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎমুখী নানা প্রকল্প, ট্রেড ইউনিয়নগুলির সক্রিয়তা ইত্যাদি নানা কারণে বাকি রাজ্যগুলির তুলনায় একটি আদর্শ কাজের জায়গা হিসাবে কেরালা তাদের বেশি আকৃষ্ট করে। পরিযায়ী শ্রমিকদের সার্বিক অগ্রগতির প্রশ্নে কেরালা একটি মডেল রাজ্য হিসাবে উঠে এসেছে যা বাকি রাজ্যগুলোর কাছে শিক্ষণীয়। কেরালার বাম-গণতান্ত্রিক সরকার নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সীমিত সম্পদের ভিত্তিতেই বিভিন্ন ওয়েলফেয়ার বোর্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলিকে ছড়িয়ে দিতে সফল হয়েছে বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া অংশের মধ্যে। অতিথি শ্রমিকরাই শুধু না, তাদের পরিবারকেও এই সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির আওতায় আনা, সরকারের প্রাধান্যের তালিকায় রয়েছে প্রথম সারিতে। কেরালায় অতিথি শ্রমিকদের সাম্প্রতিক প্রবণতা দেখলে লক্ষ করা যায়, সেখানে ভিন রাজ্যের শ্রমিকরা তুলনায় বেশি আসেন সীমিত সময়ের জন্য। রাজ্যে থেকে কাজ করেন এবং ফিরে যান নিজের রাজ্যে। আবার কখনও ফিরে আসেন কেরালায়। স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের পরিযান প্রবাহের সঠিক হিসাব ধরে রাখা কঠিন। ২০২১ সালে কেরালা স্টেট প্ল্যানিং বোর্ডের সহায়তায় পরিচালিত একটি গবেষণার তথ্য বলছে, এখানে সবচেয়ে বেশি পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করেন নির্মাণ শিল্পে। সংখ্যাটা প্রায় ১৭.৫ লক্ষ। এর পরেই ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প। প্রায় ৬.৩ লক্ষ। কেরালায় এই দুই শিল্পক্ষেত্র ছাড়াও ভিন রাজ্যের শ্রমিকরা আসেন মূলত সামুদ্রিক মৎস্য-শিল্প এবং কৃষিক্ষেত্রের নানান কাজের উদ্দেশ্যে (কেরালা ইকোনমিক রিভিউ ২০২৪)। সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করেন এর্নাকুলামে। এছাড়া তিরুবনন্তপুরম, কালিকট, আলাপ্পুরার মতো জেলাগুলিতেও বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করেন। অন্য রাজ্যগুলিতে সাধারণত যা দেখা যায় অর্থাৎ, শুধুমাত্র শহরগুলিই এই পরিযায়ীদের ঠিকানা— তা কিন্তু কেরালার বাস্তবতা নয়। কেরালার গ্রামীণ অঞ্চলগুলির মধ্যেও নগরায়নের বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকায় এইসব অঞ্চলেও কাজ করতে শ্রমিকরা স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। সর্বাধিক মজুরি, দীর্ঘস্থায়ী কাজ সেন্ট্রাল মেরিন ফিসারিজ রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, সামুদ্রিক মৎস্য শিল্পের সাথে যুক্ত শ্রমিকদের ৫৮ শতাংশই পরিযায়ী। যান্ত্রিক উপায়ে মাছ ধরার কাজে যুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৭৮% পরিযায়ী কাজ করেন এর্নাকুলামের মুনাম্বাম বন্দরে। তাঁরা আসেন মূলত তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যা থেকে। মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ ক্ষেত্রে ৫০% এবং বিপণন ক্ষেত্রে প্রায় ৪০% শ্রমিক পরিযায়ী। মৎস্য-শিল্পের সাথে যুক্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের মজুরি তাদের নিজের রাজ্যের তুলনায় এখানে অনেক বেশি। কাজের স্থায়িত্বও এখানে বেশি। কেরালায় মৎস্য-শিল্পের সাথে যুক্ত অতিথি শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা। যেখানে একই কাজের জন্য উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গে দৈনিক মজুরি ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে এই শিল্পের সাথে যুক্ত পরিযায়ী শ্রমিকরা তাদের বেতনের ৭৫% অর্থ নিজের বাড়িতে পাঠান কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এইসব শ্রমিকদের জন্য থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে কর্মক্ষেত্রে। এছাড়াও বহু শ্রমিক মজুরি পান শেয়ারের ভিত্তিতে। উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় মজুরি। যেখানে অন্যান্য রাজ্যগুলিতে পূর্ব নির্ধারিত মজুরি থাকে সেখানে কেরালায় মাছ ধরার মরশুমে অনেক বেশি আয় করতে সক্ষম হন শ্রমিকরা। আয়ের বেশিরভাগ অংশই সঞ্চয় করতে পারেন কেরালার অতিথি শ্রমিকরা। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার হ্যান্ডবুক অব স্ট্যাটিস্টিকস বলছে, কেরালা ধারাবাহিকভাবে গ্রামীণ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মজুরি প্রদান করে আসছে অন্যান্য যে কোনও রাজ্যের তুলনায়। খেত-মজুরদের দৈনিক মজুরি কেরালায় ৭৬৪.৩ টাকা, যেখানে জাতীয় গড় দৈনিক মজুরি ৩৪৫.৭ টাকা। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম মজুরি প্রদান করে যে-দুটি রাজ্য সে-দুটি হল মধ্য প্রদেশ এবং গুজরাট— যথাক্রমে দিনপ্রতি ২২৯.২ টাকা ও ২৪১.৯ টাকা। পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরা পায় ২৮৮.৬০ টাকা। কৃষির সঙ্গে যুক্ত নয় এমন গ্রামীণ শ্রমিক কেরালায় মজুরি পান দিন প্রতি ৬৯৬.৬ টাকা, যেখানে জাতীয় গড় মজুরি ৩৪৮ টাকা। মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাট সর্বনিম্ন মজুরি প্রদান করে যথাক্রমে, ২৪৬.৩ টাকা ও ২৭৩.১ টাকা। নির্মাণ শ্রমিকদের মজুরি কেরালায় দিন প্রতি ৮৫২.৫ টাকা, যেখানে জাতীয় গড় মজুরি দিন প্রতি ৩৯৩.৩ টাকা। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম মজুরি পায় মধ্যপ্রদেশের শ্রমিকরা ২৭৮.৭ টাকা এবং ত্রিপুরার শ্রমিকরা ২৮৬.১ টাকা। চলতি বছরের মে মাসে কেরালা সরকার সে রাজ্যে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের শিশুদের সুশিক্ষার জন্য চালু করেছে ‘জ্যোতি’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের লক্ষ্য কেরালার অবৈতনিক ও সার্বজনীন শিক্ষার উদ্যোগকে তাদের অতিথি শ্রমিকদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রায় ৩৫ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের রাজ্য কেরালা। তাঁরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজ্যটির অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছেন। এই শ্রমিকদের বড়ো অংশই এখানে থাকেন তাঁদের পরিবারকে নিয়ে। পরিবারের শিশুদের বেশিরভাগই বিভিন্ন সরকারি স্কুলে ভর্তি হলেও একাংশের পরিযায়ী শ্রমিকদের শিশুরা এই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন এতদিন। কেরালা সরকারের ‘জ্যোতি’ প্রকল্প এইসব বাচ্চাদের জন্যই। এইসব বাচ্চাদের রাস্তা থেকে তুলে এনে স্কুলে শিক্ষার আঙিনা নিয়ে এসে শিক্ষার অধিকারকে নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকার যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে দেখছে। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের কথায়, ‘যদি এই শিশুরা রাস্তায় থাকে, ওদের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাবে। ওদের জন্য যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব এবং তা গুরুত্বের সাথে পালন করা উচিত।’ ‘জ্যোতি’ প্রকল্পের লক্ষ্য ৩-৬ বছর বয়সী শিশুদের অঙ্গনওয়াড়ি ও তার বেশি বয়সী শিশুদের সরকারি স্কুলে নথিভুক্ত করা। কেরালা সরকারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘রোশনি’। এই প্রকল্পে পরিযায়ী শ্রমিকদের শিশুরা পায় ভাষা শিক্ষার বাড়তি ক্লাস। সকালে ক্লাস শুরু হওয়ার ৯০ মিনিট আগে শুরু হয় এই অতিরিক্ত ক্লাস। বাংলা, ওড়িয়া ও হিন্দি ভাষী শ্রমিক পরিবারের শিশুদের দেওয়া হয় মালয়ালি, ইংরাজি ও হিন্দি ভাষা শিক্ষার বিশেষ পাঠ। স্থানীয় ভাষার অবৈতনিক শিক্ষার আওতায় এসে ভবিষ্যতে উচ্চ শিক্ষার পথে এগিয়ে চলেছে পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের শিশুরা। সারা কেরালা জুড়েই শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের প্রথম সারিতে থাকে রাজ্যের অতিথি শ্রমিকদের পরিবারের শিশুরাই। এছাড়া অতিথি শ্রমিকদের জন্য আছে মালায়ালম ভাষা শিক্ষার বিশেষ কর্মসূচি 'চাঙ্গাথি'। আওয়াজ থেকে বন্ধু পরিযায়ী শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে মডেল কেরালা। তাদের অতিথি শ্রমিকদের জন্য কেরালা সরকার চালু করেছে স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প ‘আওয়াজ’। এই প্রকল্পে নথিভুক্ত শ্রমিকরা পান ৪টি বিশেষ সুবিধা— দুর্ঘটনা/চিকিৎসা সংক্রান্ত সুবিধা, মৃত্যু পরবর্তী ভাতা, শিশুদের শিক্ষা সংক্রান্ত ভাতা এবং অবসরকালীন সুবিধা। ২৫০০০ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সংক্রান্ত বীমা এবং ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দুর্ঘটনায় মৃত্যু সংক্রান্ত বীমা পান শ্রমিকরা। কেরালা ইকোনমিক রিভিউ ২০২৪ অনুযায়ী, ৫ লক্ষের অধিক অতিথি শ্রমিক ‘আওয়াজ’ প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করেছে।‘আইএসএমডব্লুডব্লুএস’-এর অধীনে একটি পৃথক তহবিল গড়ে তোলা হয়েছে যে অর্থ মূলত কেরালা বিল্ডিং অ্যান্ড আদার কন্সট্রাকশন ওয়ার্কার্স বোর্ডের মাধ্যমে পরিযায়ী শ্রমিকদের সামাজিক কল্যাণ খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পরিযায়ী শ্রমিকরা কেরালায় এসে একমাস কাজ করলেই এই প্রকল্পে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে পারে। সমস্ত সরকারি পরিসেবাগুলি দ্রুততার সাথে নির্বিঘ্নে পেতে সরকার চালু করেছে বিশেষ পোর্টাল, চালু হয়েছে মোবাইল অ্যাপ। ‘অধিতি’ অ্যাপের মাধ্যমে পরিযায়ী শ্রমিকরা বিভিন্ন প্রকল্পে নথিভুক্ত হতে পারেন খুব সহজে। কম্প্রিহেন্সিভ হেলথ ইনস্যুরেন্স এজেন্সি অব কেরালার উদ্যোগে তৈরি হওয়া এই অ্যাপে নিজেদের সরকারি নথির মাধ্যমে যুক্ত হলে মেলে প্রত্যেক শ্রমিকদের জন্য নিজস্ব ইউনিক আইডি। কেরালা বিল্ডিং অ্যান্ড আদার কন্সট্রাকশন ওয়ার্কার্স বোর্ডের তৈরি আরও একটি অ্যাপ যার নাম ‘গেস্ট অ্যাপ’ চালু হয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্যে। শুধুমাত্র মালায়ালি বা ইংরাজি নয়, এই অ্যাপগুলিতে প্রাধান্য পাচ্ছে বাংলা, ওড়িয়া, তেলেগু ও হিন্দি ভাষা। খুব সহজেই ভিন রাজ্যের শ্রমিকদের কাছে কেরালা সরকারের নানা প্রকল্প পৌঁছে যাচ্ছে এই অ্যাপগুলির মাধ্যমে। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মূল্যের গুণগত স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানের লক্ষ্যে কেরালার এর্নাকুলামে চলছে স্বাস্থ্য ক্লিনিক ‘বন্ধু’। অভিবাসী ও পরিযায়ী শ্রমিকদের অভিজ্ঞতার নিরিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(ডব্লুএইচও)-এর বিশেষ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে এই বন্ধু ক্লিনিক। এই জেলায় দুটি ভ্রাম্যমাণ এই ক্লিনিক রমরমিয়ে চলছে যার দ্বারা উপকৃত হচ্ছেন প্রায় ৪০ হাজার পরিযায়ী শ্রমিক। ইতিমধ্যে ১৫ হাজারের বেশি পরিষেবা প্রদান করে ফেলেছে ন্যায্য মূল্যের এই ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য পরিসেবা। সময়, ভাষা ও অঞ্চলগত প্রতিকূলতা পেরিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকরা ও তাদের পরিবারের মানুষজন স্বাস্থ্য বিষয়ক সহায়তা পাচ্ছেন এই ‘বন্ধু’ ক্লিনিকের মধ্য দিয়ে। কোভিড মহামারির সময় থেকেই কেরালার স্বাস্থ্য পরিষেবা সারা বিশ্বের কাছে উদাহরণ হিসাবে উঠে এসেছিল। মিলেছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আপনা ঘর ‘আপনা ঘর’ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাদের অতিথি শ্রমিকদের জন্য বাসস্থানের বন্দোবস্ত করতে সক্ষম হয়েছে কেরালা সরকার। ‘আপনা ঘর’ প্রকল্পের অধীনে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ডরমের্টরি নির্মাণের কাজ করছে কেরালা (এই একই প্রকল্পের উল্লেখ পাওয়া যায় কেন্দ্রীয় বাজেটে, অর্থবর্ষ ২০২৪-২৫)। একসাথে অনেকের জন্য থাকার ঘর, একাধিক রান্নাঘর, বাথরুম, টয়লেট, বিনোদনের জন্য বিশেষ সুবিধার বন্দোবস্ত আছে এই উদ্যোগে। শুধু তাই নয়, সেখানে রয়েছে নিরাপত্তার স্বার্থে সিসিটিভি নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বৃষ্টির জল সংগ্রহের ব্যবস্থা, ডিজেল জেনারেটর ব্যাক-আপ। ‘আপনা ঘর’ প্রকল্পে প্রথম পর্যায়ে ২০২৩ সালেই তৈরি হয়ে গেছে পালাক্কাড জেলায় ৬০০ শয্যা নিয়ে ডরমেটরি এবং কোঝিকোড জেলার কিলানুরে ১০০ শয্যার ডরমেটরি। ভিন রাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের স্বার্থে কেরালার বাম গণতান্ত্রিক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির প্রাথমিক আভাসটুকু মেলে তাদের ‘অতিথি’ সম্বোধনের মধ্য দিয়েই। অতিথি শ্রমিকদের জন্য গড়ে তোলা এইসব জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি পরিযায়ী শ্রমিকদের আরও কেরালামুখী করে তুলেছে। আমাদের রাজ্য থেকে প্রতি বছর বৃহদাংশের শ্রমজীবী মানুষ কেরালায় কাজ করত যান। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকেও উঠে আসে নানান ইতিবাচক দিক। গত সাড়ে তিন বছর ধরে আমাদের রাজ্যে নেই ১০০ দিনের কাজ। অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করেছে কেন্দ্রের সরকার। মেলেনি বকেয়া মজুরি। রাজ্যের শাসক দল ও সরকারের অপদার্থতায় গ্রামীণ অর্থনীতি দূর্নীতির এক জটিল ঘেরাটোপে আটকে গেছে। রাজ্যে নতুন কর্মসংস্থান নেই। দৈনিক মজুরি কমেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বেড়েছে খরচ। অভাবের তাড়নায় নিজের এলাকা ছেড়ে রাজ্যের অন্যত্র নয়, বরং বাধ্য হচ্ছেন একেবারে ভিন রাজ্যে চলে যেতে। এই পরিযায়ী স্রোতে বাদ পড়ে না স্কুল পড়ুয়ারাও। কেরালা এই মুহূর্তে প্রায় ৩৫ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র। ঐতিহ্যগতভাবে যদি দেখা যায়, কেরলে মধ্যপ্রাচ্যে বহির্গমনের একটা চল আছে। যার ফলে নানা ক্ষেত্রে রাজ্যটিকে নির্ভর করতে হয় পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপরেই। পরিযায়ী শ্রমিকরা কেরালার অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে। স্টেট প্ল্যানিং বোর্ডের রিপোর্ট (২০২১) অনুযায়ী, কেরালায় পরিযায়ী শ্রমিকরা স্থানীয় বাজারে প্রতি বছর প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় করেন এবং তাঁরা একইসাথে রাজ্যের বাইরে পাঠান প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। স্থানীয় শ্রমিকরা যখন তুলনায় কম মজুরি বা চড়া সুদের ঋণের জটিলতার মধ্যে পড়ছেন, তখন পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যা ভিন্নতর। তাঁরা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা পরিচিতিগত বৈষম্যের সম্মুখীন হচ্ছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের ধারাবাহিক অসহযোগিতা ও বঞ্চনার ফলে কেরালার সামগ্রিক অগ্রগতির পথ কিছুটা মন্থর হলেও, থেমে যায়নি। বরং মডেল রাজ্য হিসাবেই উঠে এসেছে সামনের সারিতে। অসংগঠিত শ্রমের একটি বিস্তৃত, দেশব্যাপী সমীক্ষা পরিচালনা করার জন্য কেরালা সরকারের উদ্যোগ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্কিম তৈরিতে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের সূচনা করতে পারে। শ্রমিকদের সঠিক ও নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ ছাড়া তাদের এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিতে সামিল করা কঠিন। গত মাসেই কেরালা সরকার ঘোষণা করেছে তারা ‘পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে’ এবং ‘অ্যানুয়াল সার্ভে অব আনইনকর্পোরেটেড সেক্টর এন্টারপ্রাইজেজ ২০২৫’— এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। যার ফলে, ডিডিপি সহ জেলা ভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য, শ্রম ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের নানান গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান ও মানবসম্পদের বিভিন্ন সূচকগুলির বাস্তবচিত্র উঠে আসবে। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এই সমীক্ষাগুলির উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন, ‘গত শতাব্দীতে যেমন তেল, তেমনি একবিংশ শতাব্দীতে তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সঠিক পরিসংখ্যান সরকারি কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।’ তাঁর কথায়, ‘এই সমীক্ষাগুলি যুবক যুবতী ও চাকরিপ্রার্থীদের সুবিধার জন্য সরকারকে নতুন প্রকল্প পরিকল্পনা করতে সাহায্য করবে৷’ তথ্য সূত্র: প্রকাশের তারিখ: ১৭-সেপ্টেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |