ভোটের পর ভোটের ফলাফলে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমেরিকার জনগণ জানেন, এখনকার যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তা দাঁড়িয়ে রয়েছে কারচুপির ওপর।
প্রচুর টাকা খরচ করা সত্ত্বেও প্রাথমিক পর্বে প্রতিষ্ঠানপন্থী ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোটে হারিয়ে কীভাবে জিতে আসছেন প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা, তার ব্যাখ্যায় নিবন্ধের পর নিবন্ধ লিখে চলেছেন মিডিয়ার পণ্ডিতেরা। তারা প্রাণপণে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছেন। তবে উত্তরটা মোটেই জটিল নয়।
দুর্নীতির মাধ্যমে প্রচারের টাকা জোগাড়, আয় ও সম্পদের নজিরবিহীন অসাম্য, তছনছ হয়ে যাওয়া ও ব্যয়বহুল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, এ আই চালু হলে চাকরি চলে যাওয়ার আতঙ্ক, অনৈতিক, ধ্বংসাত্মক বিদেশ নীতি— শ্রমজীবী পরিবারগুলির সামনে এগুলোই আসল ইস্যু। প্রগতিশীলেরা তাঁদের ভোটের প্রচারে এ সব ইস্যুই তুলে আনছেন। একই সঙ্গে তাঁরা হাজির করছেন সত্যিকারের সমাধান। অথচ, এই কাজগুলোর কোনওটাই করেন না প্রতিষ্ঠানপন্থী ডেমোক্র্যাটরা।
ভোটের পর ফলাফলে একই বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে। আমেরিকার জনগণ জানেন যে বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কারচুপি রয়েছে। এখানে ধনীরাই আরও ধনী হচ্ছে, আর শ্রমজীবী পরিবারগুলিকে লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে। আজকের দিনে ৬০ শতাংশ মার্কিনী বেঁচে রয়েছেন স্রেফ বেতনের চেকের ওপর নির্ভর করে। বেতনের চেক না পেলে তাঁদের জীবন একেবারে অচল। অথচ বিলিওনেয়ারদের জীবনে আজকের মতো এত সুদিন আর আসেনি।
আমেরিকার ইতিহাসে আয় ও সম্পদের এত বেশি অসাম্য এর আগে কখনও দেখা যায়নি। এখন এদেশে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের হাতে রয়েছে নীচুতলার মোট ৯৩ শতাংশের সমান সম্পদ। আর ইলন মাস্কের একার হাতেই যে সম্পদ রয়েছে তা নীচুতলার ৫০ শতাংশ মার্কিনীর সম্পদের সমান।
অতএব, মোটেই অবাক করার মতো বিষয় নয় যে, স্থিতাবস্থার রাজনীতিতে ক্লান্ত শ্রমজীবী পরিবারগুলি। সেই একই চর্বিতচর্বন প্রাতিষ্ঠানিক নীতি, যা বছরের পর বছর ধরে ব্যর্থ হয়েছে, সেটাও তাদের ক্লান্ত করে তুলেছে। তাই তাঁরা চাইছেন পরিবর্তন, সত্যিকারের পরিবর্তন— এবং সেজন্যই প্রগতিশীল প্রার্থীদের সমর্থন করছেন— যাঁরা পরিবর্তনের জন্য লড়াই করছেন।
বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ধনী দেশ আমেরিকা। সেখানকার লোকেরা তাদের ধারের টাকা মেটানোর জন্য প্রতিদিন লড়াই করতে মোটেই পছন্দ করেন না। শ্রমিকশ্রেণির জীবনে রয়েছে স্রেফ টিকে থাকার জন্য অন্তহীন চাপ। এই চাপ তাঁদের জীবনীশক্তি খুইয়ে ফেলে। তবে তাঁরা মোটেই আয়ুক্ষয় করে আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে চান না। অতীতের প্রজন্মের মতোই, তাঁরা চান না তাঁদের ছেলেমেয়েদের জীবনযাত্রার মান তাঁদের চেয়েও নীচু হোক।
প্রতিষ্ঠানপন্থী রাজনীতিক এবং প্রতিষ্ঠানপন্থী মিডিয়া বলতে চাইছে, প্রগতিশীল প্রার্থীরা জিতছেন কারণ তাঁদের অ্যাজেন্ডা ‘রাডিক্যাল’, ‘ফার লেফট’, ‘এক্সট্রিমিস্ট’, বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায় ‘কমিউনিস্ট’। এসব আসলে বস্তাপচা মন্তব্য। প্রগতিশীলদের অ্যাজেন্ডায় রয়েছে একটার পর একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সেগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে আমেরিকার জনগণের একটা বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের প্রয়োজন কী, তাঁরা আসলে কী চান।
এই সুযোগে আমি এখানে উল্লেখ করব মূল মূল প্রস্তাবগুলি, যা বেশির ভাগ প্রগতিশীল মানুষেরা সমর্থন করেন। সবটা শুনে আপনারা বলুন, সেগুলি কতটা ‘উগ্র’।
প্রচারের জন্য অর্থ জোগান ব্যবস্থার সংস্কার দরকার
প্রগতিশীলেরা মনে করেন যে এখন নির্বাচনী প্রচারের জন্য যে আর্থিক খরচের ব্যবস্থা চালু রয়েছে সেটা দুর্নীতিগ্রস্ত এবং গণতন্ত্রের পক্ষে হানিকর। এটা অর্থহীন যে একটা মাত্র লোক ইলন মাস্ক, একাই ২৯ কোটি ডলার খরচ করতে পারবেন ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদে জেতানোর জন্য। এবং দুই দলের বিলিওনেয়ারেরা তাদের সুপার প্যাকসের মাধ্যমে যত খুশি ডলার খরচ করতে পারবেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, সিটিজেন্স ইউনাইটেড সম্পর্কে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তের অবশ্যই অবসান ঘটাতে হবে। সুপার প্যাকস নিষিদ্ধ করতে হবে। এবং নির্বাচনী প্রচারের জন্য সরকারকে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি যে, গণতন্ত্র মানে এক ব্যক্তির এক ভোট। বিলিওনিয়াররা কখনই নির্বাচনের ফল কিনে নিতে পারবেন না।
স্বাস্থ্য পরিষেবা
প্রগতিশীলেরা বিশ্বাস করে যে, আমাদের এখনকার স্বাস্থ্য পরিষেবা ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে। এই ব্যবস্থা একেবারেই অচল হয়ে পড়েছে। এবং চিকিৎসার খরচও অত্যধিক। আমরা বিশ্বাস করি যে, যখন ৮৫ শতাংশ মার্কিনির কোনও বিমা নেই কিংবা যথেষ্ট পরিমাণ টাকার বিমা নেই, তখন অন্য উন্নত দেশের তুলনায় স্বাস্থ্য পরিষেবায় মাথাপিছু প্রায় দ্বিগুণ খরচ করতে আমাদের বাধ্য করাটা অনৈতিক তো বটেই, একইসঙ্গে তা আর্থিক দিক থেকে স্রেফ দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
একইসঙ্গে প্রেসক্রিপশনের ওষুধের জন্য আমাদের দিতে হয় অনেক, অনেক বেশি দাম। বলা যায়, দিতে হয় সর্বোচ্চ দাম। প্রগতিশীলেরা বিশ্বাস করে যে, স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়াটা মানবাধিকার। এবং বিশ্বে অন্য সব দেশ যা করে আমাদেরও তাই করতে হবে। এর মানে হল সবার জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবার গ্যারান্টি দিতে হবে। ৬৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক চান সবার জন্য সব ধরনের ওষুধ দিতে হবে সরকার পোষিত সংস্থার মাধ্যমে (সিঙ্গল পেয়ার সিস্টেম)। আমরা এই দাবির সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।
আমেরিকার শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে হবে
প্রগতিশীলেরা বিশ্বাস করেন যে, সব মার্কিন নাগরিকই একটা সম্মানজনক, গুণমান সম্পন্ন জীবন পাওয়ার অধিকারী। ২০২৬ সালে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক যে মজুরি পাচ্ছেন তাতে উপোস করে থাকা ছাড়া কোনও গতি নেই। এটা ভয়ানক আপত্তিকর একটি বিষয়। এখন ফেডারাল সরকারের ন্যূনতম মজুরির হার ঘণ্টা পিছু ৭.২৫ ডলার। এটা চরম অসম্মানজনক। আমরা বিশ্বাস করি যে, ফেডারাল সরকারের ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে করা উচিত ঘণ্টা পিছু ন্যূনতম কমপক্ষে ২০ ডলার। এটাই সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার মতো একটা মজুরি।
আমরা একথাও বিশ্বাস করি যে, ইউনিয়নে যোগ দেওয়া শ্রমিকদের সাংবিধানিক অধিকার। বেআইনি পদক্ষেপ করে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। প্রো অ্যাক্ট চালু হওয়াকে সমর্থন করে প্রগতিশীলেরা। এতে শ্রমিকদের ইউনিয়নে যোগ দেওয়া আরও সহজ হবে এবং তাঁরা চুক্তি নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে পারবেন। এভাবে তাঁরা আদায় করতে পারবেন ন্যায্য মজুরি, নানান সুবিধা এবং পাবেন ভাল কাজের পরিবেশ।
বিত্তবানদের থেকে কর আদায়
প্রগতিশীলেরা বিশ্বাস করে যে, যখন আয় ও সম্পদে অভূতপূর্ব বৈষম্য দেখা দিয়েছে, তখন এদেশের বিত্তবানদের ন্যায্য পরিমাণ কর দেওয়া শুরু করতে হবে। বিশ্বের যে কোনও উন্নত দেশের তুলনায় আমেরিকায় শৈশবের দারিদ্রের হার সবচেয়ে বেশি। আমাদের প্রবীণ নাগরিকদের এক তৃতীয়াংশ আর্থিক সঙ্কটে ভুগছেন। এমন একটা সময়ে ট্রাকচালক কিংবা নার্সদের চেয়ে কম হারে কর দিচ্ছেন বিলিওনেয়াররা, এটা অযৌক্তিক। এ দেশের ধনীরা এবং বৃহৎ লাভজনক কর্পোরেশনগুলিকে ন্যায্য পরিমাণে কর দিতে হবে যাতে সেই টাকায় শ্রমিক পরিবারগুলির চাহিদা, শিশু ও বয়স্কদের প্রয়োজন ঠিকমতো মেটানোর ব্যবস্থা করা যায়।
এ আই সম্পর্কে নিয়মবিধি চালু করতে হবে
প্রগতিশীলেরা বিশ্বাস করে যে, এআই ও রোবোটিকস, যা তৈরি করে এই বিশ্বে কাজে লাগাচ্ছে বিত্তবানেরা, সেটা মানবতার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রূপান্তরমূলক প্রযুক্তি। এর প্রভাব পড়বে আমাদের দেশের প্রতিটি পুরুষ, নারী ও শিশুর ওপর।
এখন এ আই লক্ষ লক্ষ লোককে কর্মচ্যুত করার মতো ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আমাদের গোপনীয়তার দফারফা করে দিয়েছে। পরিবেশের ক্ষতি করছে। গণতন্ত্রকে খর্ব করছে। এবং আমাদের শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা বিশ্বাস করি যে, এই বিপ্লবী প্রযুক্তিগুলি যাতে আপামর মার্কিনিদের স্বার্থে ব্যবহৃত হয় সে জন্য সরকারকে অবশ্যই নির্ধারক ভূমিকা নিতে হবে। সরকার শুধু মাত্র বৃহৎ প্রযুক্তির মালিক অলিগার্কদের আরও বিত্তশালী হওয়ার পথ সুগম করতে পারে না।
জলবায়ু পরিবর্তন
প্রগতিশীলেরা বিশ্বাস করে যে, ট্রাম্প যে বলছেন জলবায়ু পরিবর্তন স্রেফ একটা ‘ধোঁকা’, সেটা শুধুমাত্র একটা অস্বাভাবিক মাত্রার নির্বোধের মন্তব্য। জলবায়ু পরিবর্তন এই বিশ্বের পক্ষে সত্যিকারের বিপদ। রেকর্ডে দেখা গেছে গত ১১টি বছর ছিল ঊষ্ণতম ১১টি বছর। এর মধ্যে গত তিনটি বছর ছিল ঊষ্ণতম ৩-বছর।
এই যে বছরটা কাটছে সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং গোটা বিশ্ব দেখেছে তীব্র উষ্ণায়ন, হঠাৎ বন্যা, অনেক বেশি খরা এবং অরণ্যে ভয়ঙ্কর দাবানল। বিজ্ঞানীরা বলছেন আরও খারাপ দিন আমাদের সামনে আসছে।
প্রগতিশীলেরা বিশ্বাস করে যে, জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের যে লোভ, আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে তার প্রতিরোধ করতে হবে। সত্যিটা হল, আমরা লক্ষ লক্ষ ভাল মাইনের সরকারি চাকরি সৃষ্টি করতে পারি আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থাকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরিয়ে এনে, জ্বালানি দক্ষতা ও সুস্থায়ী জ্বালানি তৈরি করে। আমাদের সন্তানদের জন্য, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য, এবং এই বিশ্বকে বাসযোগ্য করার জন্য আমাদের এই কাজগুলোই করতে হবে।
বিদেশ নীতি
প্রগতিশীলেরা বিশ্বাস করে যে, আমাদের বিদেশ নীতি ও সামরিক নীতির মৌলিক পরিবর্তন দরকার। ভিয়েতনামের যুদ্ধ দাঁড়িয়েছিল মিথ্যে দাবির ওপর। ইরাক যুদ্ধও করা হয়েছিল মিথ্যে দাবির ওপর দাঁড়িয়ে। আবার এখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করা হচ্ছে মিথ্যে দাবির ওপর দাঁড়িয়ে। অন্তহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য এবং বিশ্বজুড়ে একনায়কতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়ার জন্য পেন্টাগনের পিছনে আমাদের বছরে ১.৫ লক্ষ কোটি ডলার খরচের কোনও প্রয়োজন নেই।
ইজরায়েলে উগ্রপন্থী নেতানিয়াহু সরকারের সমর্থনে আমাদের শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের কোনও প্রয়োজন নেই। নেতানিয়াহু সরকার প্যালেস্তাইনে ৭৩ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে এবং আহত হয়েছেন ১ লক্ষ ৭৩ হাজারের বেশি। এঁদের বেশির অংশই মহিলা, শিশু ও বয়স্কেরা।
মিডিয়া আপনাকে যা কিছুই বিশ্বাস করতে বলুক না কেন, তাদের ভাষ্যকে খারিজ করে সারা দেশে প্রগতিশীলেরা জয়ী হচ্ছেন একটা সহজ কারণে: তাঁরা মানুষের কাছে যে ভাবনাগুলি নিয়ে যাচ্ছেন সেগুলি অত্যন্ত জনপ্রিয়। কোনটা বিশ্বাস করতে হবে, সেকথা এখন আমেরিকার জনগণকে বলা বন্ধ করতে হবে রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে। যে কথা আসলে তাঁরা শুনতে চান সেকথাই তাঁদের শোনানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
বার্নি স্যান্ডার্স মার্কিন সেনেটর। তিনি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শ্রম ও পেনসন কমিটির সদস্য। তিনি ভারমন্ট রাজ্যের প্রতিনিধি এবং কংগ্রেসের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দিন নির্দল প্রতিনিধিত্বকারী।
ঋণ: দ্য গার্ডিয়ান, ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
প্রকাশের তারিখ: ২৯-আগস্ট-২০২৬ |