|
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কেন পড়ব?মালিনী ভট্টাচার্য |
|
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মতারিখ ১৯০৮ সালের ১৯ মে, মৃত্যু আটচল্লিশ বছর বয়সে ২ ডিসেম্বর ১৯৫৬ সালে। তাঁর জন্মের পর ১১৮ বছর কেটে গেছে, এমনকী তাঁর জীবনাবসানের পরেও চলে গেছে প্রায় সত্তর বছর। এমন লেখক যে-কোনো ভাষাতেই সংখ্যায় কম, এতদিন কেটে যাবার পরেও আমাদের সমকালীন জীবনে যাঁদের কথা বারবার স্মরণ করতে হয়। তাই উপরের প্রশ্নটি খুবই সঙ্গত। আধুনিক কালে অতিকথা ও কহানির জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে বাস্তববাদী কথাসাহিত্যের পত্তন হয়েছিল; আমরা জানি তার পিছনে ছিল সাহিত্যকৃতির মধ্যেও বাস্তব জীবনের প্রত্যক্ষ চিত্রণ থাকা সম্ভব বলে মনে করে এমনই এক দৃষ্টিভঙ্গি। তা হয়তো সেই জীবনের হুবহু প্রতিফলন (reflection) নয়, কিন্তু একধরনের শৈল্পিক প্রতিস্থাপন (representation) তো বটেই। এই মূল বিশ্বাসে ভর করে বাস্তববাদী আঙ্গিকের সবচেয়ে সৃজনশীল ব্যবহার বিশ্বসাহিত্যে যাঁরা করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম তাঁদের মধ্যে অবশ্যই থাকবে। মানিক-প্রতিভার গতিপথটির আন্দাজ করতে তাই তাঁর সময়কে কিছুটা বুঝতে হবে। বিশেষত ১৯২০র দশক থেকে শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারাবিশ্ব জুড়েই সময় ছিল উত্তাল ও দ্রুত পরিবর্তনশীল। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সেসময়ে নানাস্তরের অসংখ্য মানুষকে জড়িয়ে এক বিপুল গণ-আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী থাকতে হয়েছে মানুষকে। সোভিয়েত রাশিয়ার উত্থান সেই প্রজন্মকে চমকিত করেছে। সেইসঙ্গে এদেশে মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী কয়েকটি বছরের প্রবল মন্থন থেকে উঠেছে বিষ এবং অমৃত দুইই। সমাজের সমস্ত বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনধারা ও ভাবনাচিন্তাকে যা পালটে দিতে পারে। বাংলাভাষার সাহিত্যিকদের মধ্যে বাস্তববাদী শৈলী নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা প্রাসঙ্গিকতা পেয়ে যায় এই পর্বে। একজন সৃজনশীল লেখক হিসাবে মানিকের আত্মবিকাশও এই সময়েই। মুশকিল হয় এই কারণেই যে বাংলাসাহিত্যের গতানুগতিক সমালোচনার ধারায় এমন একটি প্রতিষ্ঠিত মত রয়ে গেছে যে মানিকের ক্ষেত্রে এই বিবর্তনরেখা সরাসরি টানা যেতে পারে ‘ফ্রয়েড থেকে মার্কস’-এ। সমালোচক রক্ষণশীল বা প্রগতিশীল যাই হোন, লেখকের নিন্দা-প্রশংসা যেটাই তাঁর উদ্দেশ্য হোক, অনেক সময়েই মানিকের সাহিত্যিক মূল্যায়ন এই সরলরেখাটিকে মেনেই ঘটে। কেউ বলেন মানুষের মানসিক বিকার ও অবচেতনের জটিলতার চিত্রণেই তাঁর সেরা অবদান, কিন্তু পরে মার্কসবাদের ধাঁচা মেনে বা ‘পার্টি লাইন অনুযায়ী’ লিখতে গিয়ে তাঁর সৃজনীপ্রতিভার বৈকল্য ঘটে। আবার কেউ ধরে নেন, এক বিশেষ পর্বে ব্যক্তিমনের অন্ধকারাচ্ছন্ন গোলকধাঁধা থেকে মার্কসবাদের আলোকিত বৃত্তে প্রবেশ করেই মানিক নিজেকে খুঁজে পান। এই মূল্যায়ন প্রভাবিত করে পাঠকসমাজকেও। এই প্রজন্মের পাঠকের এমন মনে হতেই পারে যে এই বিতর্কের দুদিকই তো আজ সাহিত্যে তামাদি। অবশ্যপাঠ্যের তালিকায় তাঁর লেখা তাই না থাকলেও চলে। মানিক ফ্রয়েডপন্থী ছিলেন না নিজেই বলেছেন। ফ্রয়েড ও অন্যান্য মনোবিকলনবিদের লেখা তিনি পড়েছেন তাঁরই ভাষায় ছোটোবেলা থেকে যে ‘কেন’-রোগে তিনি ভুগতেন (কলেজে বিজ্ঞানের ছাত্র-হিসাবে যেজন্য তাঁর ভর্তি-হওয়া) তারই পীড়নে। কিন্তু তাঁর এই পরিষ্কার বোধ ছিল যে, নানাধরনের যেসব মানসিক বিকারে মানুষ ভোগে এবং যার দ্বারা তার সমাজ-সম্পর্কগুলি প্রভাবিত হয় তার সূত্র খুঁজতে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের অবদমিত আদি প্রবৃত্তির কথাটুকুই যথেষ্ট নয়, অনুধাবন করতে হয় ব্যক্তিমানুষের ওপর অহরহ পরিবর্তনশীল সমাজ-পরিপার্শ্বের চাপের বাস্তবকেও, সামাজিক মানুষেরই তৈরি হলেও যার অনেকটাই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাঁর ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসের নায়ক এই ‘কেন’-রোগের প্রকোপেই সমাজ যে নিষেধকে ‘স্বাভাবিক’ বলে দেখায় তার ঘেরাটোপ ছিঁড়েখুঁড়ে খোঁজে নিষিদ্ধতার অস্বাভাবিক উৎস। বস্তুত এটা তার ‘অবসেশন’ হয়ে ওঠে। লক্ষণীয় যে একসময়ে ধারণা ছিল, ‘চতুষ্কোণ’ ১৯৪৮ সালে লেখা অর্থাৎ তাঁর তথাকথিত ‘মার্ক্স-পর্বে’। এনিয়ে সমালোচকদের অস্বস্তির কথাও জানিয়েছেন যুগান্তর চক্রবর্তী। পরে অবশ্য জানা যায় তার গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশ ১৯৪২ সালে। এই প্রসঙ্গে যুগান্তর চক্রবর্তী আরো যা বলেছেন তা প্রণিধানযোগ্যঃ এতকাল পরে একথা জেনে আশ্বস্ত হতে গিয়েও , তাঁর কম্যুনিস্ট-পর্বের এমন-কিছু লেখা বা কোনও কোনও লেখার এমনকিছু প্রসঙ্গ মনে পড়তে পারেই, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক মূর্তির সঙ্গে কোনো একরোখা ব্যাখ্যার দ্বারা যা মেলানো কঠিন। (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ঃদ্বন্দ্বের দুই মুখ/ এবং মুশায়েরা, ২০০৮, পৃ ১২৫) তাছাড়া মানিকের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের তখনও আরো বছরদুয়েক বাকি থাকলেও এসময়েই সমাজবিপ্লবের তত্ত্বের অধ্যয়ন তাঁর শুরু হয়ে গেছে তার প্রমাণ রয়েছে। ‘চতুষ্কোণ’ প্রমাণ করে এই নতুন আগ্রহের চর্চা করতে গিয়ে তিনি যে মানবমনের জটিলতার প্রসঙ্গকে ভুলেই গেছেন এমনটা নয়। বরং এই নতুন আগ্রহের মূলেও সেই একই ‘কেন’-রোগের প্রভাব কিন্তু রয়েছে। মানবমনের বিকার তথা অযুক্তিপ্রবণতা আমরা যে বৃহত্তর সামাজিক অযুক্তির দুনিয়ায় বাস করি তার সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। মাতৃগর্ভের অন্ধকার থেকে আতংক ও আকর্ষণে ভরা বিশাল রহস্যময় অজানা আধো-অন্ধকার এই দুনিয়ার বৃত্তে আমাদের চলাচল মানিককে গভীরভাবে টানে। শুধু মানুষ তার মধ্যে আলোকের সন্ধানও করে যায়, সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা ছাড়তে পারে না। যখন থেকে মানিক মার্কসবাদী চিন্তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, তার উপকরণগুলিকে এই আলোকসন্ধানের সূত্র হিসাবেই দেখেছেন, কোনো চূড়ান্ত সমাধান হিসাবে নয়। যুক্তি আর অযুক্তির মধ্যে অহরহ দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও আদানপ্রদান তাঁর লেখায় আছে প্রথম থেকেই। দুনিয়ার আদি রহস্যময়তা মানুষের তৈরি নয়, আবার তার তৈরি সামাজিক সম্পর্কগুলির আবর্তনেও এই রহস্যের জটিলতা বেড়েই যায়; এর ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ খুব সীমিত হলেও কিন্তু সে-ই পারে বাস্তব পরিস্থিতিকে মেনে নিয়েও যুক্তির সাহায্যে তাকে বশ মানাতে, তার ওপর নিজের জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করতে। মানুষ ও তার প্রাকৃতিক-সামাজিক পরিপার্শ্বের মধ্যেকার এই নাছোড় সংলাপকে বোঝার এক হাতিয়ার মার্কসবাদ। মার্কসবাদের সঙ্গে তেমন পরিচয় যখন তাঁর হয়নি তখনই কি মানিক সৃজন করেননি শশীর মতো চরিত্র? শশী পরাজিত রোমান্টিক নায়ক নয়, উপন্যাসের শেষে সে কি পরিণত হয়না নিজ বাস্তবের সঙ্গে গভীরভাবে সংলগ্ন একজন মানুষে? মানিকের লেখায় মানবজীবনের এই দ্বৈততা আগাগোড়াই বর্তমান। সৃজনশীল এই দ্বৈততার স্বাক্ষর রয়েছে তাঁর রচনায় বিবরণের তির্যক পরিমিতি, কথ্য ভাষার ছন্দ ও সংগীতের অসাধারণ ব্যবহার (যা অব্যাহত থাকে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ থেকে চাষীর মুখ দিয়ে বলা পঞ্চাশের মন্বন্তরের গল্প ‘ছিনিয়ে খায়নি কেন?’ পর্যন্ত) এবং একই সঙ্গে কথোপকথনের আঙ্গিকে বিতর্ক, প্রশ্ন, জীবনদর্শনের অভিব্যক্তি—এই সবকিছুর মধ্যেই। শেষদিকে লেখা ‘স্বাধীনতার স্বাদ’(১৯৫১), ‘ইতিকথার পরের কথা’ (১৯৫২) বা ‘আরোগ্য’(১৯৫৩)-এর মতো নতুন সামূহিক রাজনীতির বার্তা দেয় যেসব উপন্যাস—সেখানেও মানবসম্পর্কের জটিলতা এবং তার সঙ্গে ব্যক্তির অহরহ মোকাবিলার কথা তাই আড়ালে চলে যায় না। ১৯৩১ সালে মানিক লিখেছিলেন ‘বৃহত্তর ও মহত্তর’ নামের গল্পটি, ন’বছর বাদে তাকে ঢেলে লেখেন ‘মমতাদি’। কথকের মুখ থেকেই শুনি তাদের বাড়িতে তার কৈশোরে রান্নার কাজ করতে আসা মমতাদির কথা। আদি গল্পে অত্যাচারী মাতাল স্বামী ও বখে–যাওয়া সন্তানকে প্রতিপালন করার দায়িত্ব থেকে রেহাই নিয়ে সে গ্রামে চলে যায় কোনো নারীসমিতিতে যোগ দিতে, কাজ করতে গিয়ে জেলও খাটে। সংসারের নরকের বাইরে কোনো ‘বৃহত্তর মহত্তর’ জীবন সে পেল কিনা সেই প্রশ্ন কথক রেখেই যান। দ্বিতীয় গল্পে কিন্তু তাকে দেখি নরক থেকে বেরোনোর কথা বারবার ভেবেও তারই মধ্যে থেকে যেতে। আত্মরক্ষার্থে আত্মসমর্পণ করতে। তার মানে কি এই যে লেখক আগেকার বয়ানটির ‘সমাধান’কে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিচ্ছেন? বোধহয় না। দুরকম গতিই চরিত্রটির হতে পারে—লভ্য বিকল্পের এই সীমাবদ্ধতা বরং সূচিত করে লেখকের দৃষ্টির দ্বান্দ্বিকতাকে। যুক্তি ও অযুক্তির দ্বান্দ্বিকতা মানিকের সৃষ্টিতে কতোটা বৈচিত্র্য আনে তা বোঝা যায় একই বছরে লেখা (১৯৪৪) ‘রোমান্স’ এবং ‘সাড়ে সাত সের চাল’ গল্পদুটির বয়ানকে পাশাপাশি রাখলে। ওপর ওপর দেখলে প্রথম গল্পটিকে তাঁর তথাকথিত প্রথম পর্যায়ের সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হতে পারে; সেখানে তিনি দেখান অবদমিত যৌনবুভুক্ষা ও তজ্জনিত বিকার এক গ্রাম্য মেয়ের জীবনে কেমন ফাঁদ রচনা করে। কিন্তু সে অস্বাভাবিকতা তো নিহিত রয়েছে গ্রামের দম-চাপা পরিপার্শ্বেরই অস্বাভাবিকতায়, যেখানে একদিকে নারী ‘রোমান্সে’র ভ্রম বানায়, অন্যদিকে স্বামী ও প্রেমিক উভয়ে মিলেই তৈরি করে নারীশরীরের দখলদারি ব্যবহারের বৃত্ত। অথচ এই ‘রোমান্স’-এর স্বপ্ন কি আবার দুঃসহনীয় জীবনের সঙ্গে এক মরীয়া সংলাপ তৈরি করে মেয়েটির বেঁচে থাকার চেষ্টাও নয়? এর বিপ্রতীপে ‘সাড়ে সাতসের চাল’ মানিকের পরবর্তী রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মন্বন্তরের কঠোর বাস্তব কাহিনি। কিন্তু বাস্তবের ওপর মানসিক অস্বাভাবিকতার ছায়া বিছিয়ে মানিকের বিবরণ পরিত্যক্ত গ্রামের রূঢ় সত্যকে পরিণত করে সন্ন্যাসী নামের মানুষটির দুঃস্বপ্নে। শহর থেকে সাড়ে সাত সের চাল নিজে না খেয়ে যাদের জন্য সে আনল তাদের অনুপস্থিতি ক্ষুধা ও একাকিত্বের অস্বাভাবিক পরিবেশে মৃত্যুর আগে সন্ন্যাসীর চোখে রচনা করে সেইসব মানুষগুলির প্রেত-উপস্থিতির মায়া। আবার ‘রাঘব মালাকর’(১৯৪৬) অবশ্যই রাজনৈতিক প্রতিবাদের গল্প; খাদ্যের পাশাপাশি কাপড়ের অস্বাভাবিক আকালের কাহিনি। বাড়ির মেয়েদের জন্য পরণের কাপড়ের স্বাভাবিক দাবির মোকাবিলা করার প্রচেষ্টাতেও কিন্তু অযুক্তি হানা দেয়। মানুষের ক্ষোভকে সংগঠিত করতে রাঘবের প্রয়াস গ্রামবাসীদের নিজেদের মধ্যে মারামারিতে শেষ হয়। পুলিশ এসে সবাইকে ডাকাতির দায়ে গ্রেফতার করে। তাই বলে কি প্রতিবাদ করতে যাওয়াটাই এখানে অস্বাভাবিক ছিল? কথকের স্বর কিন্তু উল্টোটাই বলে। প্রতিবাদী রাঘব মালাকরকে সম্বোধন করে তাকে দ্রৌপদীর লজ্জাহারী কৃষ্ণের সঙ্গে তুলনা করে গল্পটি। মানুষের ন্যায্য দাবির বিপরীতে রাষ্ট্রের সশস্ত্র অযুক্তি নিয়ে শেষদিকের আরেকটি গল্প ‘রক্ত নোনতা’(১৯৫৩)। ডাক্তার পুলিশের গুলিতে মৃত সন্তানকে ফেলে রেখে নিঃশব্দে জীবিত রোগীর চিকিৎসা করে চলে। মানুষ ক্ষেপে গিয়ে পথে নেমেছে; রাষ্ট্র ক্ষেপে গিয়ে তাদের গুলি চালিয়ে মারছে। পরিপার্শ্বের এই সামগ্রিক অযুক্তির বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ-বহির্ভূত পরিস্থিতিতেও যা যুক্তিসঙ্গত তাই করতে সে বদ্ধপরিকর। যে মারা গেছে তাকে বাঁচানো যাবে না; জীবিতকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা যেন মানবিক ও ডাক্তারি যুক্তির সপক্ষে তার দাঁতে-দাঁতচাপা জেহাদ। এই কয়েকটি ইতস্তত উদাহরণ দিয়ে মানিকের রচনার জটিল নির্মাণের আভাস এখানে দেবার চেষ্টা করলাম। মানিকের জীবন যখন শেষ হয় তখন সারাবিশ্বে এবং স্বাধীন সার্বভৌম ভারতে আগের পর্বের প্রবল মন্থনের পর কিছুটা স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির স্বাধীনতা লাভের ফলে সাম্রাজ্যবাদের একচ্ছত্র দাপটের জায়গায় যখন কিয়ৎপরিমাণ ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে, তখন দেশের ভিতরেও কিছুটা সুস্থিতি এসেছিল জনমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি এবং তার অনুকূলে কিছু অগ্রগতির মধ্য দিয়ে। প্রায় দুই দশক ধরে চলা স্থিতিশীলতা আবার ভাঙ্গতে শুরু করে বিগত ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে। গণতন্ত্র, সমানাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি সাংবিধানিক প্রবচনের গ্রহণযোগ্যতাও তখন থেকে ফিকে হতে শুরু করে। এসময়ে মানুষকে ভাবিয়েছে, অযুক্তির দুনিয়ায় নতুন যুক্তিনির্মাণের প্রয়োজনকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে ইমার্জেন্সি, আধা-ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাস, চরমপন্থী রাজনীতি, একটি অঙ্গরাজ্যে এক জনপ্রিয় বামপন্থী সরকারের দীর্ঘ ইনিংস, সোভিয়েত ব্যবস্থার পতনের সঙ্গেই নয়া উদারবাদের হাতিয়ারে সজ্জিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদের ক্রমবর্ধমান অস্বভাবী বিজয়লালসার স্বাভাবিকত্ব, যার তালে তাল দিয়েছে এদেশে উগ্র সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থান। আজকের প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাসের পুনঃপাঠের মধ্য দিয়ে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে দায়বদ্ধ। মানিক আমৃত্যু মানবজীবনের অন্ধকার অযুক্তির মধ্যে যে মানবিক যুক্তির অন্বেষণে রত ছিলেন, তার সূত্রটি আমাদের কাছে আজ তাই জরুরি। প্রকাশের তারিখ: ১৯-মে-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |