কেন আমাদের 'ম্যঁ ওয়াপাস আউঙ্গা’ দেখা প্রয়োজন?

সীমা চিস্তি
এই সিনেমা শুধুমাত্র তার বিশাল উচ্চাকাঙ্খা এবং সাহস নয় বরং ২০২৬ সালে সামগ্রিক ভাবে এক সাম্প্রদায়িক ঘৃণার সময়ে দাঁড়িয়ে, দেশভাগের মতো যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিকে কোমলতার সাথে দেখানোর এক বলিষ্ঠ প্রচেষ্টার কারনে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে। 

হিন্দি সিনেমার ইন্ডাস্ট্রি গত বেশ কিছু বছরে উল্লেখযোগ্য বা মনে রেখে দেওয়ার মতো কোনো কাজ করে উঠতে পারেনি। যারা সিনেমার ব্যাবসায়িক দিক নিয়ে চর্চা করেন তাদের অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে টিকিট খুবই কম বিক্রি হচ্ছে এবং প্রযোজক রা অনেক সময় নিজেরাই টিকিট কিনে বিয়োজিত পয়সা উসুল করছে। যদিও অন্যান্য প্রদেশে এবং অন্যান্য ভাষায় বেশ ভালো কিছু কাজ হয়েছে। দর্শকদের হিন্দি সিনেমা থেকে নতুন কিছু পাবার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। হিন্দি সিনেমা এখনো বিভিন্ন নতুন জ্যঁর এর আঙ্গিক গুলি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা না করে, সর্বদা একঘেঁয়ে ধরণের কাজ করে চলেছে। বিগত বেশ কিছু অনেকটা বাসি খাবারের মতোই হিন্দি সিনেমাও নতুন কিছুর আস্বাদ মানুষকে দিতে পারেনি।

ঠিক এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে 'ম্যঁ ওয়াপাস আউঙ্গা' সিনেমা হিসাবে নিজেকে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এই সিনেমা শুধুমাত্র তার বিশাল উচ্চাকাঙ্খা এবং সাহস নয় বরং ২০২৬ সালে সামগ্রিক ভাবে এক সাম্প্রদায়িক ঘৃণার সময়ে দাঁড়িয়ে, দেশভাগের মতো যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিকে কোমলতার সাথে দেখানোর এক বলিষ্ঠ প্রচেষ্টার কারনে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে। 

নাসিরুদ্দিন শাহ নি:সন্দেহে এক বিশাল সিনেম্যাটিক ব্যক্তিত্ব; তবে তার সহ অভিনেতারাও সিনেমাটিকে সাফল্যমন্ডিত করার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন। আরতি বাজাজের সম্পাদনা যেন এক কাব্যিক ছন্দে গাঁথা। সিনেমাটির গানগুলির কথা এবং সুর সিনেমাটিকে এক অনন্যক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। কবীরের 'হামান হ্যায় ইশক মাস্তানা' র আদলে এই সিনেমায় ব্যবহৃত গান ' ইশক মাস্তানা' র দৃশ্যায়নে গিদ্দা, লোকসংগীত ও জাইভ নাচের যে সসংমিশ্রণ ঘটেছে তা অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং আনন্দদায়ক। সিনেমাটি একটি প্রেমের গল্প। কোনো একতরফা প্রেমের গল্প নয়, বরং এক অসমাপ্ত প্রেম: যার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এমন সব ঘটনা যার ওপর শিখ যুবক কিনু ( নাসিরুদ্দিন শাহ এবং ভেদাং রায়না দ্বারা অভিনীত) এবং মুসলিম যুবতী আফসানার ( শর্ভরী দ্বারা অভিনীত) কোন নিয়ন্ত্রন নেই। চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলী ও কারিগরি দিক নিয়ে ‘দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া’, ‘দ্য ওয়্যার’, ‘মিন্ট’ এবং আরও অনেক গণমাধ্যমে অত্যন্ত দক্ষতাপূর্ণ পর্যালোচনা হয়েছে। তবে মূল বিষয়টি হলো, ২০২৬ সালের ভারতকে বোঝার ক্ষেত্রে এই চলচ্চিত্রটি কী অবদান রাখছে? 


ভারতবর্ষে সবসময়ই নানা ধরনের কুসংস্কার ও পক্ষপাত বিদ্যমান ছিল, যদিও ১৯৪৭-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে বিভাজন দূর করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে যখন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিভাজন তৈরি ও মানুষকে বিভক্ত করার চেষ্টা চলছে, তখন এই সিনেমা যেন স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটছে। মনে রাখতে হবে আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন ভারতবর্ষের দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে প্রেম তাদের জেলে পাঠাতে পারে, জরিমানার মুখে ফেলতে পারে, এমনকি প্রাণহানির কারণও হতে পারে; যেখানে “অন্য ধর্মের কোনো ব্যক্তির” কাছে বাড়ি বিক্রি করতে হলে সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয় এবং নির্দিষ্ট কোনো খাবার সঙ্গে রাখার কারণেও প্রাণহানি হতে পারে।

এমতাবস্থায় সিনেমায় এমন  এক প্রেক্ষাপট তৈরি করা—যেখানে বিভাজন, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি সংখ্যাগুরুদের সন্দেহ এবং ঘৃণা—এসবকে নেতিবাচক ভাবে তুলে ধরা হয়েছে; তা সত্যিই এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। ‘প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (PWA)-এর মতো সাহসী ও প্রগতিশীল আন্দোলন—যা সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে অবস্থান করেছিল—তাদের এখানে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে প্রিন্টিং প্রেসের সাথে জড়িত মানুষেরা। সিনেমায় দেখায় যে  কিনু ও জিয়ার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে পিডব্লিউএ (PWA)-এর একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে। এই ধরণের রাজনৈতিকভাবে তাতপর্যপূর্ন দৃশ্যের সাথে সাথে এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভারতে রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে বর্তমানে যে বিভাজনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, তাকে একটি অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা।

সিনেমার সংলাপগুলো কাব্যিক ও ভাবনা উদ্রেককারী, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও কঠোর। একটি দৃশ্যে দেখানো হচ্ছে যে ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার সেই সময়টি নিয়ে বারবার প্রশ্ন করা হলে কিনুর ছোট ভাই (বিনোদ নাগপাল অভিনীত) সাফ জানিয়ে দেয় যে, সে সেই ঘটনাপ্রবাহের কথা প্রকাশ করবে না। তার মতে, বর্তমান প্রজন্ম (দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত চরিত্রটির মাধ্যমে যা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে) সেই ইতিহাসকে কেবল ‘ঘৃণার দৃষ্টিতে’ দেখবে এবং সেই ঘৃণাই জিইয়ে রাখবে; তারা এর পেছনের ভালোবাসাটুকু কখনোই বুঝতে পারবে না। এই সিনেমার মূল উপজীব্য হলো অতীতের মুখোমুখি হওয়া—যাতে বোঝা যায়, একটি মিশ্র জাতিসত্তা হিসেবে মিলেমিশে থাকতে চাওয়া বৈচিত্র্যময় মানুষকে কোনো পুরনো ক্ষতের অজুহাতে বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে, বরং ‘এমন ঘটনা যেন আর কখনোই না ঘটে’—এই শিক্ষাটিকেই যেন একমাত্র পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে এগিয়ে চলা।

সিনেমাটির শেষ অংশে গাজা, সুদান, বসনিয়া, ইউক্রেন এবং জার্মান ইহুদী  সহ সমগ্র বিশ্বের শরনার্থীদের বিচ্ছিন্নতার করুন উপাখ্যান একটি সুমধুর গানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। ধ্বংসস্তুপের মধ্যে বিধ্বস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা দিলজিত দোসাঞ্জ এর দৃশ্যটি, যেখানে তার হাতে উদ্ধার করা সামান্যকিছু জিনিসপত্র ছাড়া আর কিছুই নেই, দেশভাগের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের আঘাতের মাত্রা কে কোনভাবে সুক্ষতার চাদরে না মুড়ে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে এই দু:খ এই আঘাত তাদের একার নয়, বরং দেশভাগের এই চিত্র সার্বজনীন, এই বেদনা সার্বজনীন।

চলচ্চিত্রটিতে আঁচল মালহোত্রা এবং কিশ্বর আহলুওয়ালিয়ার দেশভাগ নিয়ে করা কাজের কথা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু চলচ্চিত্রটি আরও অনেক কিছুর প্রতি নীরব শ্রদ্ধা নিবেদন করে। সমালোচক রাহুল দেশাই যেমনটা উল্লেখ করেছেন, এই বছরের শুরুতে মুক্তি পাওয়া ‘ইক্কিস’ চলচ্চিত্রটি, যা ১৯৭১ সালের যুদ্ধে নিহত ছেলের হত্যার অবসান ঘটাতে পাকিস্তানে যাওয়া এক সেনাসদস্যের গল্প,  'ম্যঁ ওয়াপাস আউঙ্গা' র গল্পকেই মনে করিয়ে দেয়। দুটি দেশ তৈরির জন্য তাড়াহুড়ো করে আঁকা রেখা যে বৃত্তের সূচনা করেছিল, দুটি চলচ্চিত্রই তা সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করে। 

গীতাঞ্জলি শ্রী-র ‘রেত সমাধি’ উপন্যাসের সবচেয়ে বলিষ্ঠ কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মা’—যিনি নিজের শর্তে নিজের গল্পের ইতি টানতে ও নিজের প্রেমিককে খুঁজে পেতে পাকিস্তানে ফিরে যান—নাসিরুদ্দিন শাহের অভিনয়ে তার যথেষ্ট প্রভাব দেখা যায়। সারগোঁধায় ফিরে যাওয়ার জন্য নিরন্তর চেষ্টায় রত, স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্ত অথচ মাঝে মাঝে সম্পূর্ণ সচেতন—নাসিরুদ্দিন শাহের এই ৯৫ বছর বয়সী চরিত্রের অভিনয় দেখার সময় মান্টোর কিছু চরিত্রের কথা—বিশেষ করে ‘টোবা টেক সিং’-এর সেই সব চরিত্রের কথা—সরাসরি মনে পড়ে যায়, যারা নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত ‘পাগল’ হিসেবেই গণ্য হয়েছিলেন।

গল্পের শুরু ও শেষ- দুই পর্যায়েই আফসানার কানের একটি হারিয়ে যাওয়া চাঁদবালি দুল গল্পের একটি মূল সূত্র হিসাবে কাজ করে। আফসানা ও কিনুর সাক্ষাৎ এর অনুষংগ হয়ে ওঠা এই হারিয়ে যাওয়া দুলটির প্রণয়ঘটিত গুরুত্ব বাদ দিয়েও এক গভীরতর অর্থ আছে।  এটি আমাদের স্বত্তার এমন এক অংশের প্রতীক যা ঘৃণা ও বিদ্বেষপ্রসূত ঘটনায় হারিয়ে যায়; ঠিক যেমনটা ঘটেছিলো গ্রেওয়াল পরিবারের ক্ষেত্রে যখন তারা তাদের সব হারিয়ে  'হিন্দুস্তানে' পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং এক গভীর অপূর্ণতা নেমে এসেছিলো তাদের জীবনে। 

সিনেমাটির সমালোচনা করলে বলতে হয়, অনেক দর্শক অভি্যোগ করেছেন এই বলে যে সিনেমাটর কোন সুনির্দিষ্ট পরিসমাপ্তি বা  'ক্লোজার' দিতে ব্যার্থ্য হয়েছে। কিন্তু সিনেমাটি যেহেতু এখনকার সময়ের প্রতি সৎ থেকেছে ফলে পরিসমাপ্তির প্রশ্ন ওঠেনা কারন সমকালীন কোনকিছুর সম্পর্কেই সুনির্দিষ্ট সমাপ্তিমূলক কিছু বলা যায়না। 

সিনেমাটিতে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বিভাজন মূলক রাজনীতির মাধ্যমে অতীতে যে বিভীষিকা সৃষ্টি করা হয়েছিলো, তার প্রেক্ষাপটটি সুষ্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই গল্পের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি লেখা এখনো বাকি। হয়তো ভবিষ্যতে  অপেক্ষাকৃত ভালো কোন সময়ে 'ম্যঁ ওয়াপাস আউঙ্গা’ আরেকবার বানানো হবে – যা অপেক্ষাকৃত ভালো সময়ের গল্প বলবে? 

এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় The India Cable' এ, যা The Wire এর একটি প্রকাশিত Newsletter।

ভাষান্তর: সাবিত্রী রাভা


প্রকাশের তারিখ: ২১-জুলাই-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org