সংসদেও তুলে ধরব জনতার স্বর

অমরা রাম
’১৪, ’১৯-এর ভোট ছিল মুখ নিয়ে। বিজেপি আর তার মিডিয়া বলত মোদীর বিরুদ্ধে আর কোন্‌ ‘মুখ’ আছে? কিন্তু এই পুরো সংঘর্ষ এবং আন্দোলন পর্বে মোদীর বিরুদ্ধে ‘জনতার মুখ’ উঠে এসেছে। তাদের নিজস্ব বঞ্চনা দাবি-দাওয়া উঠে এসেছে। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, অগ্নিবীর, ভারতীয় জনতার পার্টির লাগাতার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে ভোট হয়েছে।

রাজস্থানে যখন আগে বিধায়ক ছিলাম বা ছিলাম না, সবসময়ই কৃষক শ্রমিকের দাবির কথা তুলে ধরেছি। গোটা দেশের কৃষক-মজুর, যুব-মহিলা, দলিত-আদিবাসী প্রতিটি মানুষ প্রতিনিয়ত শোষিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত হচ্ছেন। জনবিরোধী নীতি লাগু হচ্ছে, আইন প্রণয়নও হচ্ছে। আশার কথা, এই সব শোষণের  বিরুদ্ধে রাস্তায় আন্দোলন আরও বাড়ছে। মানুষ বামপন্থাকে যখন জয়ী করেছেন, নির্বাচিত করেছেন, তখন সংসদেও এই স্বর জোরালো হবে। এই আশাতেই মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছেন। আর আমি লাল ঝান্ডার প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের এই লড়াকু মানসিকতাকে সম্মান দিয়ে রাস্তা থেকে সংসদ পর্যন্ত জনতার স্বরকে তুলে ধরব। লাল ঝান্ডা শুধু রাজস্থানে নয়, গোটা দেশের লড়াকু মানুষকে এই বার্তাই দিতে চাই, মানুষের পাশে আমরা থাকব। মানুষের মাঝে থেকে এবং একইসঙ্গে সংসদে এই জনবিরোধী সরকারকে পরাস্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাব। বলেছেন রাজস্থানের সিকর থেকে নির্বাচিত সিপিআই(এম) সাংসদ অমরা রাম। মার্কসবাদী পথের হয়ে তাঁর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় মুকুন্দ ঝা। 

মুকুন্দ: প্রথম প্রশ্ন, যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের নির্বাচন হল এবং আমরা তার ফলাফল পেলাম, এর সঙ্গে মিলিয়ে আপনি আপনার জয়কে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

রাম: আসলে বিগত দশ বছরে ভারতীয় জনতা পার্টির কুশাসনে সাম্প্রদায়িক এবং কর্পোরেটদের সুবিধে করে যেসব নীতি চালু হয়েছে তাতে দেশের কৃষক, শ্রমিক, যুব, ক্ষুদ্র-ব্যাবসায়ী, মহিলা, দলিত, আদিবাসী মানুষ সকলেই সন্ত্রস্ত ছিলেন। এই কয়েক বছরে বড় কোম্পানি আরও লাভজনক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে কৃষকদের শোষণের ফলে তাঁরা মজুরে পরিণত হয়েছেন এবং মজুরদের দু’বেলার রুটি জোগাড়ে প্রাণপাত করতে বাধ্য করা হয়েছে। আর সমস্ত কালা কানুন হয়েছে– কৃষকদের বিরুদ্ধে, মজুরদের বিরুদ্ধে, যুবদের কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে, যেমন– অগ্নিবীর ইত্যাদি। এই সমস্ত শোষণের বিরুদ্ধে নিজেদের জন্য, কৃষক, মজদুর, যুব, মহিলা প্রত্যেকে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন এই নির্বাচনে। গোটা সময়পর্বে তাঁরা একজোট হয়ে ঐতিহাসিক সব আন্দোলন সংগঠিত করেছেন, তাতে অংশগ্রহণ করেছেন। এই আন্দোলন, সংঘর্ষই নরেন্দ্র মোদীকে প্রথমবার মাথা নত করতে বাধ্য করেছে। 

দেশের সমস্ত কৃষকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে কালা কানুনগুলি বাতিল করতে হবে, এই ছিল আমাদের দাবি। কিন্তু ৯ ডিসেম্বর ২০২১-এ এমএসপি (ন্যূনতম সহায়ক মূল্য) এবং অন্যান্য বিষয়ে যে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তাতে এক পা এগোনোর বদলে মোদী বিপরীত কাজ করেছেন। আমাদের পালোয়ান মেয়েরা, যারা গোটা বিশ্বে সোনার পদক পেয়ে খ্যাত, সম্মানিত, তাঁদের সঙ্গে চূড়ান্ত অপমানজনক ব্যবহার করা হয়েছে। কৃষকদের অপমান করা হয়েছে, যে কোনও বিরোধী-স্বরকে আর্বান-নকশাল, আতঙ্কবাদী, ভাড়াটে বলে দেগে দেওয়া হয়েছে! লাখিমপুর খেরিতে অজয় মিশ্রের ছেলে ৩০ জানুয়ারি কৃষক-সাংবাদিকদের গাড়ি চাপা দিয়ে পিষে ফেলেছে। এগুলো মানুষ মনে রেখেছেন।

এর ফলেই যেখানে রাজস্থানে পঁচিশে ২৫, হরিয়ানায় দশে ১০, ইউপি-তে ৬২ ছিল বিজেপি, সেখানে এবার সমাজবাদী পার্টি ৩৭ হয়েছে, রাজস্থানে ১১, হরিয়ানায় পাঁচটি আসনে বিরোধীরা জিতেছে। পাঞ্জাবে ভালো ফল হয়েছে। মোদী-বিরোধী আন্দোলনে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ভোটের ফলেও তার রাজনৈতিক প্রতিফলন পাচ্ছি।

আগামী দিনে এমএসপি, অগ্নিবীরের বিরুদ্ধে, বিভিন্ন জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধ আন্দোলন রাস্তায় এবং সংসদে, দু’জায়গাতেই আরও জোরদার হবে।

রাজস্থানে পঁচিশটি আসনের মধ্যে ইন্ডিয়া মঞ্চ পেয়েছে ১১টি আসন। সিপিআই(এম) একটি, আরএলটিপি একটি এবং একটি আসন পেয়েছে ভারত আদিবাসী পার্টি। কংগ্রেস শূন্য থেকে বেড়ে হয়েছে ৮। ইন্ডিয়া মঞ্চে কংগ্রেসও ভালোরকম সংযোজন করেছেন। প্রান্তিক নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল তার ফলেই বিজেপি বিভিন্ন জায়গায় লাখ লাখ ভোটে হেরেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জয়ের যে দাম্ভিকতা তাদের মধ্যে ঠিকরে বেরোচ্ছিল তার বিরুদ্ধে মানুষ ভোট দিয়েছে। সিকরেও তাই হয়েছে। ৭৩০০০ ভোটে বিজেপি হেরেছে। মজবুত সমর্থন পেয়েছি মানুষের। মানুষের সমর্থন আমাদের লড়াইয়ের মানসিকতাকে আরও পাকা করেছে। আমরা সংসদে এবং রাস্তায় তাদের লড়াকু মানসিকতা এবং মতের প্রতিনিধিত্ব করবো।

মুকুন্দ: আপনি বলছেন, ওই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সংগঠিত আন্দোলন ছিল এবং সেই আন্দোলনের ফল আমরা রেজাল্টে দেখছি। জানতে চাইব, ভোটের সময় প্রধানত কোন কোন বিষয়গুলি আপনারা মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন, এবং তাদের সমর্থন পেয়েছেন? 

আর পরের প্রশ্নটি এর সঙ্গেই যুক্ত– আপনি আগেও নির্বাচনে লড়েছেন, দাঁতা রামগড় আসন থেকে সেখানে পরাজিত হয়েছিলেন, তারপর কংগ্রেস এবং ইন্ডিয়া মঞ্চের সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়া হয়। তাহলে এবারের জয়ে– আন্দোলনের ভূমিকা নাকি ইন্ডিয়া মঞ্চের ভূমিকা, কোনটা বেশি প্রভাব ফেলেছে?

রাম: আসলে বেশি প্রভাব আন্দোলনেরই রয়েছে। আন্দোলনের প্রভাবের কথা সবার আগে বলব। রাজস্থানে অন্য আন্দোলনের পাশাপাশি রাওলা-ঘরসনার পানীয় জলের জন্য ঐতিহাসিক আন্দোলন হয়েছে, কৃষকরা শহীদ হয়েছেন। ২২ এপ্রিল ছাত্রাবাসে অকারণে গুলি চালানো হয়ে, সিকরে গুলি চালানো হয়, কৃষক আন্দোলনকে, বামপন্থীদের খতম করে দেওয়ার জন্য। আমরা সেখানে ছিলাম। আমাদের সঙ্গীদের এক বছরের বেশি সময় ধরে জেলে বন্দি করে রাখা হয়। লাখ লাখ মানুষকে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। নখ উপড়ে দেওয়া হয়। বিবিধ নিগ্রহে কমিউনিস্ট পার্টিকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টার কোনও ত্রুটি ছিল না। ১৪ বছরের সদ্য ক্লাস নাইনে ওঠা বাচ্চা গুলিতে শহীদ হয়। বর্ধিত হারে বিদ্যুতের বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন, করমুক্তি, ঋণমুকুব, কালা কানুনের বিরুদ্ধ লড়াইগুলি ধারাবাহিকভাবে চলেছে। 

প্রতি পাঁচ বছরে সরকার এখানে বদলায়, পাঁচ বছর কংগ্রেস, পাঁচ বছর বিজেপি, তা সত্ত্বেও মানুষের জন্য বামপন্থীরা লাগাতার আন্দোলন করেছে। মানুষ ভোটের আগে এই আন্দোলনের শরিক হয়েছেন, অংশগ্রহণ করেছেন, দেখেছেন আমাদের লড়তে। জনতার দাবি দাওয়া নিয়ে যদি কেউ লড়ে, নিশ্চিতভাবেই তারা হল লাল ঝান্ডা পার্টি। তাতে আমার মনে হয় কংগ্রেসেরও শুভবুদ্ধি হয়েছে। হিমাচল এবং অন্যান্যতে জিতলে আর ভাবতে হবেনা– এই ভাবনাতেও আঘাত পড়েছে। তেলেঙ্গানাতে জিতলেও হিন্দি বলয়ের তিনটি বড় রাজ্যে তারা পিছিয়ে। এবার আশা করি এই অঞ্চলের গুরুত্ব তারা বুঝেছে। তবে বিজেপির কুশাসনের বিরুদ্ধে সবাইকে একজোট হয়েই লড়তে হবে। তবেই পরাজিত করা সম্ভব হবে। কৃষক আন্দোলনের ভূমিকা তাতে গুরুত্বপূর্ণ। ইন্ডিয়া মঞ্চেও বলা হয়েছে যে একজোট হয়ে নিম্নস্তর অব্দি লড়াই চালিয়ে যেতে হবে তবেই সর্বৈব জয় সম্ভবপর। কর্পোরেটদের সরকার সবরকম বিভেদের চেষ্টা ভোট জিততে করেছে– সাম্প্রদায়িকতা, জাতি সংরক্ষণ সবরকম বিদ্বেষের সাহায্য নিয়েছে। যে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি জাতির ওপর বিন্যস্ত বলে মনে করা হয়, সেখানেই বিজেপির বড় পরাজয় হয়েছে। সমাজবাদী পার্টি ৫ থেকে ৩৭ এ পৌঁছেছে। আরও একজোট হওয়ার দরকার ছিল। এই ভোট থেকে আমি মনে করি, আমাদের লড়াইয়ের সঙ্গী এবং রাজনৈতিক সঙ্গী সকলেই শিক্ষা নেবে। আর তাদের রাজনীতি, জনতার স্বার্থে তাদের দাবি-দাওয়া প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করেই এগোবে। তারফলেই রাজনৈতিক জনমত তৈরি হবে। বিভেদের রাজনীতিকে পরাজিত করা যাবে।

মুকুন্দ: আপনি বললেন– বিজেপি সাম্প্রদায়িক জাতপাতের দোহাই দিয়েছে, আপনারা যখন প্রচার করছিলেন বিজেপির প্রচারের মোকাবিলা আপনারা কীভাবে করেছেন? কারণ এই সাম্প্রদায়িকতা দিয়েই ওরা ’১৪ এবং ’১৯-এর নির্বাচন জিতেছে। আর এই ভোটেও ক্রমাগত বিদ্বেষ ঘৃণা সাম্প্রদায়কিতা ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। আপনারা কীভাবে জনতার সমর্থন নিয়ে   প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন?

রাম: করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জনতা সেই ভাষ্য (ন্যারেটিভ)-কে স্বীকার করেনি। জনতা বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, অগ্নিবীর, কৃষকদের এমএসপি, পানীয় জলের সমস্যা সব কিছু যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা তার ভিত্তিতে ভোট দিয়েছে। এই ভোটে অয্যোধ্যার রামমন্দির দিয়ে তারা ভোট পেতে চেয়েছে। স্লোগান তুলেছিল: ‘রামকে যারা এনেছে আমরা তাদের আনব’, সেই অযোধ্যাতেই তারা হেরেছে। এই ভোটে যেসব হাবিজাবি ভিত্তিহীন ভাষার প্রয়োগ, হিংসার রাজনীতি প্রধানমন্ত্রী প্রচার করেছে, আমার মনে হয়না আগে আমাদের দেশের আর কোনও প্রধানমন্ত্রী এমনটা করেছে! কীসব বলেছে– আপনাদের গরু খুলে নিয়ে যাবে, মঙ্গলসূত্র খুলে নেবে, সংরক্ষণ মুসলিমদের দিয়ে দেবে ইত্যাদি ইত্যাদি মানে সেই ঘুরে ফিরে বিদ্বেষের সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি! কিন্তু এই ভোটে মানুষ দশ বছরে প্রথমবার তাকে গ্রহণ করেনি। আমি ’১৪, ’১৯-এ লড়েছি, ’২৪-এও লড়লাম নির্বাচনে। ’১৪, ’১৯-এর ভোট ছিল মুখ নিয়ে। বিজেপি আর তার মিডিয়া বলত মোদীর বিরুদ্ধে আর কোন্‌ ‘মুখ’ আছে? কিন্তু এই পুরো সংঘর্ষ এবং আন্দোলন পর্বে মোদীর বিরুদ্ধে ‘জনতার মুখ’ উঠে এসেছে। তাদের নিজস্ব বঞ্চনা দাবি-দাওয়া উঠে এসেছে। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, অগ্নিবীর, ভারতীয় জনতার পার্টির লাগাতার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে ভোট হয়েছে।

ভারতীয় জনতা পার্টি একলা ৪০০ পার করার কথা বলত। তারপর নেমে এলো ৩৭০-এ! সেসব ছাড়ুন, আমরা দেখলাম ২৭০-ও পার করতে পারলো না! হ্যাঁ এটা ঠিক, ওরা মসনদে টিকে গেছে। কিন্তু মসনদে আছে যে দুটি ‘ঠেকনা’ দিয়ে তারা কবে ল্যাং মারবে কেউ জানে না! চন্দ্রবাবু নাইডু এবং নীতিশ কুমার যে ধরণের রাজনীতি করে এসেছেন, তাতেই আমরা ধরতে পারছি সমস্যাটা। নিশ্চিতভাবেই ২০২৪ এর নির্বাচনে জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুধু দেশে নয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। সেই আন্তর্জাতিক মানের লড়াই তাদের নব-নির্বাচিত সাংসদ প্রতিনিধিরা জারি রাখবে, লড়াই চালিয়ে যাবে। এই সরকারকে কাঠগড়ায় তুলবে, বাধ্য করবে তাদের জনবিরোধী নীতিগুলিসুদ্ধ পিছু হঠতে।

মুকুন্দ: উত্তর ভারতে বহুদিন বাদে সিপিআই(এম)-এর সাংসদ নির্বাচিত হল। বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে নি:সন্দেহে এটি আশার আলো। আপনি কৃষি আন্দোলনের প্রধান মুখ হিসেবে দীর্ঘদিন লড়ছেন, শিখাওয়াটি, ঘরসনার আন্দোলন, ছাত্রাবাসে গুলি চালানো ইত্যাদি হামলার কথা বলছিলেন যার উদ্দেশ্য ছিল সিপিআই(এম)-কে ধ্বংস করা। এমন আন্দোলন কিছু আছে যা বাইরে খুব বেশি প্রচারিত হয়নি?

বিহার থেকে দু’জন এবং আপনি তিনজন বামপন্থী উত্তর ভারতের হিন্দিভাষী বলয় রাজ্যগুলি থেকে সাংসদ হয়েছেন। একে বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসের নিরিখে কীভাবে উল্লেখযোগ্য বলে মনে করছেন?

রাম: বিগত দশক গুলিতে হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলিতে মানুষের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে যত আন্দোলন হয়েছে তা করেছে বামপন্থীরা। বাকি রাজনৈতিক দল চিরকাল ভোটব্যাংক সুরক্ষিত রাখতে সাম্প্রদায়িকতা জাতপাতের বিরুদ্ধ প্রকাশ্য আন্দোলনে নামতে দ্বিধা করেছে। আমি বলব আমাদের পক্ষে এই রেজাল্ট বেশ আশাপ্রদ। হতে পারে বামপন্থীরা রাজ্য এবং কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারছে না। কিন্তু মানুষের সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে যে সততার সঙ্গে বামপন্থী দল, সংগঠন তার নেতারা লড়ে, ততখানি সততা পুঁজিবাদী পার্টিগুলির আর কারও মধ্যে নেই। মানুষ সেগুলো দেখেছেন। ইলেক্টোরাল বন্ড প্রসঙ্গ দেখুন। এই নেতারা জনবিরোধী নীতিগুলির সুবিধাও নিয়েছে। অথচ কতজন লড়াইয়ের মাঠে নেমেছে? প্রত্যক্ষ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে?

কিন্তু বিকল্প তারাই। ইন্ডিয়া মঞ্চেও তারাও আছে। একথা আমাদের বলতেই হবে। এই মঞ্চে সুবিধে তো হয়েছে, মানুষ বিরোধী পক্ষ পেয়েছে। মোদী-বিরোধী নেতাদের পেয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রত্যক্ষ আন্দোলনই একমাত্র হাতিয়ার। যেখানে সবসময় বামপন্থীরা ছিল-আছে-থাকবে। আর এই হাতিয়ারই একমাত্র পথ আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে বামপন্থী ভাবনা চিন্তাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পাঞ্জাব যেগুলি বামপন্থার গড় ছিল সেখানে সাম্প্রদায়িক, জাতপাতের বিভেদকামী রাজনীতি সেগুলিকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। সেগুলি ফিরতে শুরু করেছে জনতার দাবি-দাওয়ার রাজনীতির হাত ধরেই। এই রাজনীতি ছোট-মধ্যবিত্ত-বড় সমস্ত কৃষকদের একজোট করেছে। এই মোদী-বিরোধী আন্দোলন জনমত তৈরি করেছে- কৃষির বিভিন্ন শোষণের প্রশ্নে, বেকারত্বের প্রশ্নে, মূল্যবৃদ্ধির প্রশ্নে, জনতার বিবিধ শোষণের প্রশ্নে। বড় কোম্পানিকে লাভজনক করতে তাদের কর-ঋণ মুকুব হয়ে যাবে অথচ দরিদ্র মধ্যবিত্তের শোষণ বন্ধ হবে না। কর্পোরেট মিডিয়ার প্রাণপণ অপচেষ্টার পরেও জনতার মিডিয়া যেভাবে জনতার দাবি জনতার কাছ পৌঁছে দিয়েছে তারই প্রভাব রেজাল্টে দেখছি।

মুকুন্দ: প্রত্যক্ষ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা কেমন তা জানতে চাইব। কারণ আপনার ওপর একাধিক প্রাণঘাতী হামলাও হয়েছে আমরা জানি। ওই অঞ্চলের আন্দোলনের স্বরূপকে যদি আপনার অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করেন।

রাম: আন্দোলনে থাকার, তাকে গড়ে তোলার সবরকম চেষ্টা করেছি। ’৮৫ তে নির্বাচন লড়েছি, তার আগে ’৭৮-’৭৯-তে লড়েছি। আমার আগের জনপ্রতিনিধিদের ওপরেও প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে, সেই হামলা করিয়েছিল সেই সময়ের পুঁজিবাদী পার্টিগুলিই। তারপরের ছাত্রাবাসে গুলি চালানো হয়। ক্লাস নাইনের বাচ্চা শহীদ হয়েছে। ওখান থেকে আমি ২০ কিলোমিটার দূরে ছিলাম। তারপরেও আমার নামে ৩০৭-এর মোকদ্দমা হয়, গুলি চালানো হয়, অপরাধী বানানোর চেষ্টা করা হয়। জীবিত বা মৃত ধরে আনার ফরমান জারি করে পুলিশ বাহিনী পাঠানো হয় সবরকম চেষ্টা করা হয় আমাদের স্বরকে রুদ্ধ করার। কিন্তু জনতার বিশ্বাস আমাদের সঙ্গে ছিল আছে। সমস্ত হামলার জবাব দিয়েছে একজোট জনতা। বলবো, হিংসার বিরুদ্ধ একতা জয়ী হয়েছে। রাজস্থানের ধুরন্ধর নেতাও পরাজিত হয়েছে এই ঐক্যবদ্ধ জনমতে।

প্রতিটি আন্দোলন থেকেই প্রকৃত শিক্ষা পাওয়া যায়। কর্মকর্তা এবং নেতার জন্ম দেয়, এই ধরণের আন্দোলন। আর এগুলোই আমাদের পাথেয়। এই আন্দোলনের জয় আমাদের পার্টির আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। আমরা আত্মপ্রত্যয়ী হয়েছি। আন্দোলনগুলিতে আমাদের পার্টি মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছে। মানুষ প্রাণ-মন-ধন দিয়ে লড়েছে। জনতার ধনে আমরা সমগ্র আসনগুলিতে আন্দোলনে লড়েছি। আপনারা জানেন ভোটে কেমনভাবে পয়সা ওড়ানোর খেলা চলে, আমাদের তত অর্থবল নেই। আমাদের জনতার মিলিত ধনরাশির ৮ থেকে ১০ গুণ বেশি অর্থ পুঁজিবাদী পার্টি, বিজেপি পার্টি এক একটা বিধানসভা আসন পিছু বিনিয়োগ করে। তারও প্রভাব পড়ে বই কি। কিন্তু এত কিছুর পরেও জেতা এটা নি:সন্দেহে একটা বড় ধাপ পেরনো। আম জনতারও উপলব্ধি হল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনবিরোধী নীতি প্রণয়নকারী ক্ষমতালোভী পার্টিদের পরাজিত করা সম্ভব। 

মুকুন্দ: শেষ প্রশ্ন করব, অমরা রামকে গোটা দেশ জানে যে, আপনি আন্দোলন শুরু করেন, যতক্ষণ না জয় আসছে ততদিন প্রত্যয়ের সঙ্গে আন্দোলনের মাটি আঁকড়ে থাকেন। খোলা ময়দানে, রাস্তায় আপনি লড়েছেন– কৃষক আন্দোলনে, জয়পুরের একাধিকবার দীর্ঘদিন ধরে জনতার পদযাত্রায় শামিল হয়েছেন। আপনাকে নির্বাচিত করে মানুষ সংসদে পাঠাচ্ছে, তারা কী আশা করবে আপনার কাছে? 

রাম: রাজস্থানে যখন আগে বিধায়ক ছিলাম বা ছিলাম না, সবসময়ই কৃষক শ্রমিকের দাবির কথা তুলে ধরেছি। গোটা দেশের কৃষক-মজুর, যুব-মহিলা, দলিত-আদিবাসী প্রতিটি মানুষ প্রতিনিয়ত শোষিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত হচ্ছেন। জনবিরোধী নীতি লাগু হচ্ছে, আইন প্রণয়ন হচ্ছে। আশার কথা, এই সব শোষণের  বিরুদ্ধে রাস্তায় আন্দোলন আরও বাড়ছে। মানুষ বামপন্থাকে যখন জয়ী করেছেন, নির্বাচিত করেছেন, তখন সংসদেও এই স্বর জোরালো হবে। এই আশাতেই মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছেন। আর আমি লাল ঝান্ডার প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের এই লড়াকু মানসিকতাকে সম্মান দিয়ে রাস্তা থেকে সংসদ পর্যন্ত জনতার স্বরকে তুলে ধরব। লাল ঝান্ডা শুধু রাজস্থানে নয়, গোটা দেশের লড়াকু মানুষকে এই বার্তাই দিতে চাই, মানুষের পাশে আমরা থাকব। মানুষের মাঝে থেকে এবং একই সঙ্গে সংসদে এই জনবিরোধী সরকারকে পরাস্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাব।

দু’জনের কথোপকথনের পরিমার্জিত রূপ

অনুলিখন ও ভাষান্তর: বীথিকা সাহানা


প্রকাশের তারিখ: ১৩-জুন-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org