|
বলশেভিক বিপ্লবের মেয়েরাআলেকজান্দ্রা কোলোনতাই |
এক ঝলক অতীতের দিকে ফিরে তাকালেই দেখা যায় এই লড়াকু মহিলাদের প্রতিদিনের জীবন সংগ্রাম। নিঃস্ব হয়ে যাওয়া গ্রাম ও শহরগুলিতে তখন যুদ্ধের ভগ্নাবশেষ হিসেবে ছড়িয়ে আছে দারিদ্র , ক্ষুধার আগুন। তারই মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা, মাথায় লাল স্কার্ফ জড়ানো। বয়সের সীমা অতিক্রম করে, নিজেদের ব্যক্তিগত পরিচয় কে সরিয়ে সকলে একজোট হয়েছেন। প্রায় সকলেরই পরনে থাকত জীর্ণ স্কার্ট আর ওপরে ছেঁড়াখোঁড়া শীতকালীন জ্যাকেট। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বৃদ্ধা ও তরুণী, নারী শ্রমিক ও কৃষক, সৈনিকদের স্ত্রী, শহরের গরিব গৃহবধূরা এবং অল্প সংখ্যক পেশাজীবী, অফিসে চাকুরিরতা শিক্ষিত মেয়েরা। |
মহান অক্টোবর বিপ্লবে মেয়েদের ভূমিকা কেমন ছিল? কারা ছিলেন সেই অদম্য সাহসের প্রতীক? তাঁরা কি কয়েকজন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি? মোটেই না। বরং হাজার হাজার মেয়েরা শ্রমিক ও কৃষকদের পাশাপাশি একসঙ্গে লাল ঝান্ডা কাঁধে নিয়ে, পা মিলিয়ে হেঁটেছিলেন নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথে। লক্ষ্য একটাই - জারতন্ত্রের শাসন ভেঙ্গে বেরোতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে সাম্যবাদ। সোভিয়েতের আকাশে ছড়িয়ে দিতে হবে মুক্তির গান।
এক ঝলক অতীতের দিকে ফিরে তাকালেই দেখা যায় এই লড়াকু মহিলাদের প্রতিদিনের জীবন সংগ্রাম। নিঃস্ব হয়ে যাওয়া গ্রাম ও শহরগুলিতে তখন যুদ্ধের ভগ্নাবশেষ হিসেবে ছড়িয়ে আছে দারিদ্র , ক্ষুধার আগুন। তারই মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা, মাথায় লাল স্কার্ফ জড়ানো। বয়সের সীমা অতিক্রম করে, নিজেদের ব্যক্তিগত পরিচয় কে সরিয়ে সকলে একজোট হয়েছেন। প্রায় সকলেরই পরনে থাকত জীর্ণ স্কার্ট আর ওপরে ছেঁড়াখোঁড়া শীতকালীন জ্যাকেট। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বৃদ্ধা ও তরুণী, নারী শ্রমিক ও কৃষক, সৈনিকদের স্ত্রী, শহরের গরিব গৃহবধূ এবং অল্প সংখ্যক পেশাজীবী, অফিসে চাকুরিরতা শিক্ষিত মেয়েরা। তখনকার দিনের চাকুরীজীবী মহিলারা, এমনকি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা মহিলারা, শিক্ষিকা, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা, মহিলা চিকিৎসকরা গর্বের সাথে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন লাল পতাকা। দিকে দিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন অক্টোবর বিপ্লবের নিশান। যেখানেই তাঁদের পাঠানো হয়েছে তাঁরা হাসিমুখে ছুটে গেছেন নিঃস্বার্থভাবে। ফ্রন্টে পাঠানো হলে মাথায় সেনাবাহিনীর টুপি পরে লাল ফৌজের হয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। আবার হাতে লাল ব্যান্ড পরে কেরেন্সকির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত লাল ফৌজের ফার্স্ট এইড কেন্দ্রগুলিতে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায়। তাঁদের হৃদয় ছিল আনন্দ ও উৎসাহে পূর্ণ এবং তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে তাঁরা প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট, ঐক্যবদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী কর্মকান্ডের ছোট ছোট অংশ।
গ্রামাঞ্চলের যে পুরুষদের যুদ্ধের প্রথম সারিতে লড়তে পাঠানো হয়েছিলো, তাঁদের স্ত্রীরা, অর্থাৎ সেখানকার মহিলা কৃষকরা তাঁদের মালিকের সাথে যুদ্ধে নামেন। কেড়ে নেন তাদের জমি। বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা অভিজাততন্ত্রকে উৎখাত করেন।
অক্টোবর বিপ্লবের দিনগুলি স্মরণ করলে কখনই চোখের সামনে কেবল একটা- দুটো জরুরি মুখ ভেসে ওঠে না, বরং ভেসে ওঠে জনসাধারণের ছবি। সংখ্যাবিহীন মানবতার তরঙ্গ। কিন্তু আপনি যেখানেই তাকান, মিটিং কিংবা, সভা-সমাবেশ বা বিক্ষোভ, সেখানেই দেখতে পাবেন এই মহিলাদের। অগুন্তি মহিলারা প্রতিনিয়ত সামিল হয়েছেন এই লড়াইয়ে।
হয়তো তাঁরা সবাই পুরোপুরি ভাবে জানেন না তারা কী চান, কীসের জন্য তাঁরা লড়ছেন। কিন্তু একটা বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত: জারের শাসনে চলা যুদ্ধ, আর বিত্তশালী ধনিদের আধিপত্য, কোনোটাই তাঁরা আর বরদাস্ত করবেন না। ১৯১৭ সালে যে মানবতার মহাসমুদ্রটি দোলা দেয়, তার একটি বড় অংশ এই মহিলাদের দ্বারা গঠিত।
হয়ত একদিন ইতিহাসবিদরা লিখবেন এই নাম-না-জানা সাহসী বীরাঙ্গনাদের কীর্তি যাঁরা অসীম সাহস নিয়ে লড়ে গেছেন যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম সারিতে। বিপ্লব পরবর্তী প্রথম বছরগুলিতে চরম বঞ্চনা সহ্য করেছেন, গুলিবিদ্ধ হয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু কোনো চ্যালেঞ্জই তাঁদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁরা সোভিয়েতের লাল ব্যানার উঁচিয়ে ধরে বেঁচে থেকেছেন আর তিলে তিলে নির্মাণ করেছেন সাম্যবাদের স্বপ্ন।
এই লেখা সেই নাম-না-জানা মেয়েদের উদ্দেশ্যে যাঁরা অক্টোবর বিপ্লবে নিজেদের জীবন দিয়েছেন শ্রমজীবী মানুষ ও তাদের ন্যায্য দাবির উদ্দেশ্যে। ফলে আজকের তরুণেরা এই বীর যোদ্ধাদের লড়াইকে সম্মান জানাতে মাথা নত করেছে। সমাজতন্ত্রের ভিত তৈরী করার কারিগর হিসেবে তারাও নেমেছে লড়তে। তাদের চোখে মুখে বিপ্লবের উদ্দীপনা।
অবশ্য অজস্র লাল টুপি আর স্কার্ফ পরিহিত মাথার সমুদ্রের মধ্য থেকে অনিবার্যভাবে নির্দিষ্ট কয়েকজন উঠে এলেন যাঁদের প্রতি ইতিহাসবিদরা একটু বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়েছেন যখন তাঁরা ঐতিহাসিক অক্টোবর বিপ্লব ও তার প্রধান সৈনিক কমরেড লেনিন সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
লেনিনের কথা উঠলে সবার প্রথম যাঁর কথা মনে আসে তিনি হলেন লেনিনের সবচাইতে বিশ্বস্ত সঙ্গী, নাদেহা কনস্ট্যান্টিনোভা ক্রুপস্কায়া। তাঁর পরনে সর্বদা সাদামাটা ধূসর পোশাক। ভাবভঙ্গিতে তিনি যেন সমানে চেষ্টা চালাচ্ছেন পেছনের সারিতে থাকার। তিনি প্রায় সব মিটিংয়ে সামিল হতেন, সকলের আড়ালে থেকে। থামের পিছনে দাঁড়িয়ে ক্রুপস্কায়া সব শুনতেন ও দেখতেন। ফিরে এসে লেনিনকে দিতেন মিটিংয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ যার সাথে যুক্ত থাকত তাঁর নিজস্ব মতামত ও সমস্যা সমাধানের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উপযুক্ত উপায়।
তখনকার দিনে মাঝেমধ্যেই তর্ক-বিতর্ক হত মিটিংয়ে। জোর তর্ক চলত একটাই প্রশ্নে – সোভিয়েত কি পারবে ক্ষমতা দখল করতে? সেইসব মিটিংয়ে ঝড় উঠলেও ক্রুপস্কায়া সচরাচর খুব একটা মন্তব্য করতেন না। একটানা লেনিনের ডান হাত হিসেবে তিনি অক্লান্ত খেটে যেতেন। মাঝে মধ্যে অবশ্য দলীয় বৈঠকে সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করতেন। বিপদের মুহুর্তে ও আশঙ্কার দিনগুলোয় যখন সবচাইতে দৃঢ় কমরেডরাও হার মানছেন, সংশয় বোধ করছেন, প্রশ্ন করছেন নিজেদের বিকল্প চিন্তাকে, কমরেড ক্রুপস্কায়া হার মানেননি। তিনি নিজের বিশ্বাসে অটুট থেকেছেন। শেষ অব্দি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত ছিলেন বিজয়লাভে। ক্রুপস্কায়ার কাজেকর্মে বিচ্ছুরিত হয়েছে তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় । যাঁরা অক্টোবর বিপ্লবের মহান অধিনায়কের এই সঙ্গীর সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁরা সকলেই টের পেয়েছেন তাঁর উৎফুল্ল মেজাজ।
লেনিনের আরেকজন বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন তাঁর প্রিয় কমরেড, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক ইলিনা দিমিত্রিয়েভনা স্তাসোভা। আত্মগোপনে থাকাকালীন লেনিনের কঠিন সময়ে তার সাথে স্তাসোভা ছিলেন একটানা। তাঁর সুঠাম গড়ন, তাঁর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা ও অক্লান্ত পরিশ্রম করার শক্তি- এই তিন গুণে তিনি একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর আরেক বিশেষ গুণ হলো এই যে তিনি লোক চিনতে ভুল করতেন না। ফলে তাঁকে দূর থেকেই দেখা যেত সোভিয়েতের তাব্রিচেস্কি প্যালেসে, স্কেচিন্সকায়ার বাড়িতে ও স্মোলিনিতে। নোটবুক হাতে সিনা টান করে দাঁড়িয়ে আছেন আর সাংবাদিক থেকে জনতা সকলেই অপেক্ষা করছে তাঁর স্পষ্ট কথার, দ্রুত নির্দেশের।
স্তাসোভার কাঁধে ছিল সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব কিন্তু কোনো কমরেড বিপদে আপদে তার কাছে আসলে হতাশ করতেন না। সংকট যত জটিলই হোক, তিনি মতামত বা প্রতিক্রিয়া জানাতেন সংক্ষিপ্ত ভাবে। কখনো তাঁর উত্তরগুলো আপাতদৃষ্টিতে রূঢ় শোনাতো, কিন্তু কাজে কর্মে তার উল্টো প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি তাঁর কাজেই আবিষ্ট থাকতেন এবং অক্লান্ত ভাবে সামনের সারিতে থেকে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। কিন্তু আড়াল থেকে আলোয় আসতে তাঁর কোন ব্যাকুলতা ছিল না। তিনি কখনই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে চাননি। নিজেকে নিয়ে নয়, লক্ষ্য নিয়েই তিনি ভাবনা চিন্তা করতেন।
স্তাসোভা দিনের পর দিন জার শাসকদের বন্দী হয়ে জেল খেটেছেন, নির্বাসনেও দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু কোনোকিছুই তাঁকে লক্ষ্য থেকে টলাতে পারেনি। তাঁর বিশ্বাস একটাই - ভবিষ্যৎ সাম্যবাদ। দিনের পর দিন জেলে থাকতে থাকতে তাঁর স্বাস্থ্যের প্রবল ক্ষতি হয়। তবুও নিজের দর্শনের প্রতি তিনি ছিলেন ইস্পাতসম দৃঢ়। শারিরীক অসুস্থতা বাড়তে থাকলেও কমরেডদের প্রতি তিনি ছিলেন সর্বদা সংবেদনশীল। এমনকি কমরেডদের যে কোনো প্রয়োজনে তাঁকে এক ডাকে পাওয়া যেত। তাঁর এই গুণই ছিল তাঁর সংবেদনশীলতার বড় প্রমাণ। ক্লাদভিয়া নিকালোয়েভা ছিলেন আরেকজন কর্মঠ ও শান্ত স্বভাবের কমরেড। ১৯০৮ এর গোড়ার দিকে তিনি বলশেভিকদের সাথে যুক্ত হন। নির্বাসন ও কারাদন্ড তাঁকেও সইতে হয়। ১৯১৭ সালে তিনি লেনিনগ্রাদে ফিরে আসেন এবং ‘কমিউনিস্তকা’ পত্রিকার প্রাণ হয়ে ওঠেন। ‘কমিউনিস্তকা’ হল সে-সময়ে কর্মজীবী মহিলাদের জন্য প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা। তখন ক্লাদভিয়ার যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়। একের পর এক ঝড় তুলে চলছেন। সমস্ত শক্তি দিয়ে লাল ঝান্ডা কে আঁকড়ে ধরে লাল পার্টিতে আহবান জানাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণির মহিলাদের। একটানা ডাক পাঠাচ্ছেন, “মহিলা শ্রমিক এক হও, মহিলা কৃষক এক হও”। মিটিং-এ ক্লদভিয়া কথা বলতে বলতে মাঝেসাঝে থতমত খেতেন কিন্তু লোকজনকে আকৃষ্ট করার অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁর ছিল। বিপ্লবের প্রধান অংশ হিসেবে মহিলাদের নিয়ে আসার কঠিন দায়িত্ব তিনি অবলীলায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ফলে ক্লদভিয়া একসাথে দুই ফ্রন্টেই কাজ চালিয়ে গেছেন – সাম্যবাদী সোভিয়েতের গঠন আর দুনিয়াজুড়ে নারীমুক্তির লড়াই। নারীমুক্তি প্রসঙ্গে আরো একজনের নাম বলতেই হয়, তিনি হলেন কনকরদিয়া সামোইলোভা। লেনিনগ্রাদ এবং অন্যান্য প্রান্তে শ্রমজীবী নারীদের আন্দোলনের সবচাইতে দুরূহ মুহুর্তগুলোয় যাঁদের নিরন্তর লড়াই ইতিহাসের সাক্ষী, তাঁরা হলেন কমরেড ক্লদভিয়া এবং কনকরদিয়া। শুরু থেকে শেষ অব্দি তিনি নিষ্ঠার সাথে পার্টির যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বক্তৃতা ছিল অত্যন্ত কার্যকরী । সহজেই মন জিতে নিতেন শ্রমজীবী মহিলাদের। তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁকে চিরকাল মনে রাখবেন তাঁর সহজ ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বর জন্য। ১৯২১ সালে কলেরা আক্রান্ত হয়ে মারা যান কনকরদিয়া। ইনেসা আরমান্দো ছিলেন মৃদু স্বভাবের এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর কাঁধে ছিল অক্টোবর বিপ্লবের প্রস্তুতি পর্বের নানা গুরুদায়িত্ব। ইনিসার সৃজনশীল চিন্তাধারা মহিলাদের নিয়ে পার্টির কাজে বিপুল অবদান রেখেছিল। কমরেডরা কখনো তাঁর মতামত নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলে তিনি যুক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করতেন তবে মৃদু ভঙ্গিতেই। নিজের বিশ্বাস ও যুক্তিতে অটুট থাকতেন সর্বদা। বিপ্লবের পরবর্তীকালে ইনিসা নিজেকে নিযুক্ত করেন শ্রমজীবী মহিলা সংগঠনগুলির বিস্তারের কাজে,প্রতিনিধি সম্মেলন তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল। মস্কোয় অক্টোবর বিপ্লব চলাকালীন কঠিন ও সিদ্ধান্তমূলক কাজে ব্যাপকভাবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন ভারভারা নিকোলায়েভনা ইয়াকোভলেভা। যুদ্ধের ময়দানে ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি পার্টির সদর দপ্তরের এক যোগ্য নেতার মতন নিজের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেদিনের সেই অদম্য সাহস ও পূর্ণতার সাথে লড়ে যাওয়া দেখে অনেক কমরেড তাদের আস্থা ও ভরসা পুনরায় ফিরে পান। ‘জেতার লক্ষ্যে এগিয়ে চলো’- এই ছিল কমরেড ভারভারার দেওয়া ডাক। অক্টোবর বিপ্লবে নারীদের অবদানের কথা যতই স্মরণ করি ততই আরো নাম, আরো মুখ ম্যাজিকের মত ভেসে ওঠে আমাদের স্মৃতিতে। ভেরা স্লাটস্কায়া নিঃস্বার্থভাবে খেটেছেন বিপ্লবের প্রস্তুতিকার্যে এবং অবশেষে লড়াইয়ের ময়দান, পেট্রোগ্রাদের রেড ফ্রন্টে গুলিবিদ্ধ হন কোজাকদের আক্রমণে। ভেরা স্লাটস্কায়ার মত যোদ্ধাদের সম্মান জানাতে কখনও যেন আমরা ব্যর্থ না হই। আমরা কি কখনো ভুলতে পারব ইয়েভজেনিয়া বোশ কে? তাঁর উষ্ণ, লড়াকু মেজাজ তাঁকে কখনো লড়াই বিমুখ হতে দেয়নি। বিপ্লবের স্বার্থে আমৃত্যু তিনি রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আরও দুজন আছেন যারা লেনিনের ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। তারা হলেন আনা ইলিচনা ইলিজারোভা ও মেরি ইলিচনা উলিয়ানোভা - লেনিনের দুই বোন এবং কমরেড। লেনিনের আরেকজন কমরেড আছেন - কমরেড ভার্যয়া। প্রাণবন্ত ও সর্বদা ছুটতে থাকা এই ভার্যয়া হলেন মস্কো রেলওয়ে ওয়ার্কশপের কর্মী। আরেকজন আছেন যাঁর কথাও বলা আবশ্যক - কমরেড ফিওদরোভা। তিনি আবার লেনিনগ্রাদের টেক্সটাইল কারখানার কর্মী। মুখে উজ্জ্বল ও মনোরম হাসি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ফিওদরোভা ব্যারিকেডের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়াতে কখনোই পিছপা হননি। এই ছোট্ট লেখাটিতে হয়তো সকলের নাম আমি উল্লেখ করতে পারলাম না। তবে সত্যি কথাটা হল, অক্টোবর বিপ্লব সংগঠিত ও সফল হয়েছিল এই সমস্ত মহিলাদের নিয়ে, যাদের নাম ইতিহাসের পাতায় কোনোদিনই উঠবে না। তাঁদের লড়াইয়ে যে নিঃস্বার্থতা ছিল, তা দিয়েই মহান অক্টোবর বিপ্লবের বিজয় নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। তাঁদের কৃতিত্ব ও মহৎ কীর্তির সুফল আজ উপভোগ করতে পারছে বর্তমান সোভিয়েত ইউনিয়নের মেয়েরা। বস্তুত একটা কথা স্পষ্ট ও অবিসংবাদিতভাবে সত্য যে নারীদের ভূমিকা ছাড়া অক্টোবর বিপ্লবে লাল পতাকার জয় সম্ভব ছিল না। অক্টোবর বিপ্লবের এই সমস্ত যোদ্ধাদের কুর্নিশ! অক্টোবর বিপ্লব, এই নারীমুক্তির আন্দোলনকে কুর্নিশ! নভেম্বর, ১৯২৭ ভাষান্তর: অঙ্কিতা পাল প্রকাশের তারিখ: ১৩-নভেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |