সংলাপে মেয়েরা (পর্ব ৩)

উর্বা চৌধুরী

বাড়ির বাইরের পরিসর নিয়ে যে সংলাপ চলেছে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির সমীক্ষায়, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল – নারীর বিরুদ্ধে ঘরে-বাইরে, পথে-কর্মস্থলে হিংসার ঘটনা ঘটলে, নারী যাবে কোথায়, কার কাছে বিচার চাইবে? কর্মস্থলে নারীর প্রতি হিংসার অভিযোগ দায়ের করার কর্তৃপক্ষ হিসাবে ২৭২ জনের মধ্যে একজনও ইন্টারনাল কমপ্লেইন্টস কমিটি (আই সি সি) সম্পর্কে জানেন না। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, উত্তরদাতাদের মধ্যে সিংহভাগ অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক বা গৃহবধূ। ফলে ব্যক্তগত জীবনে আইসিসি-র অস্তিত্ব, উপযোগিতা এঁদের কাছে নাই। 

দ্বিতীয় পর্বের পর...

“পরিবারের সবাইকে না… তবে স্ত্রী কিছু অন্যায় করলে, স্বামী তো শাসন করবেই!” মতামত জানালেন স্বরূপনগর ব্লকের এক গ্রামের ২৬ বছর বয়সী ববি খাতুন। ববি বিবাহিত। নিজের ঘরের কাজ করেন। 

বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির এ রাজ্যের চারটি জেলার আট গ্রামের পাইলট সমীক্ষায় নারীদের সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকার মতো মানোবন্নয়নের বুনিয়াদি সূচকের ভিত্তিতে চলা সংলাপে আরও কিছু বিষয় অনিবার্যভাবে উঠে আসে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল নারীর বিরুদ্ধে হিংসা। ববি খাতুনকে জিজ্ঞেস করা হয় – পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের বকে, ধমকে, গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে, গায়ে হাত তুলে শাসন করা চলে? সেই উত্তর দিতে গিয়েই ববির উক্ত মতামত। 

সমীক্ষায় ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী নারীদের সঙ্গে চলা কথপোকথনে উঠে আসে গুরুতর কিছু মতামত। মোট ২৭২ জনের মধ্যে ৭৮ জন উত্তরদাতা নারী মনে করছেন, বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্দেশ অমান্য করলে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের উঁচু গলায় ধমকে শাসন করা বা তাঁদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। এবং এঁদের প্রায় কেউই এই শাসনের লক্ষ্যে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের রাখেননি, রেখেছেন নারী সদস্যদের। দু’একজন বলেছেন ছেলে বড় হলেও, ভুল করলে শাসন করা দরকার, তবে সে শাসন সন্তানের প্রতি অভিভাবকের শাসন। যাঁরা মনে করেছেন “মেয়েদের চোখে চোখে রাখতে হয়” তাঁদের কেউই অবশ্য মারধোর করাকে সমর্থন করেন না। গৃহহিংসার অন্তর্ভুক্ত আচরণ যে কেবল প্রহার নয়, ধমকে রাখা, নিয়ন্ত্রণে রাখা, মানসিক অত্যাচার, গঞ্জনা, মৌখিক লাঞ্ছনার মতো আরও অনেক কিছু, সে ধারণা এই ৭৮ জনের কারও মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এঁদের মধ্যে বয়সের কোনও নির্দিষ্ট ধারা পাওয়া যায়নি – বিভিন্ন বয়সের নারীরা সমর্থন করেছেন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ধমকে চমকে রাখার অভ্যাসকে। ন্যাশানাল ফ্যামিলি হেল্‌থ সার্ভে-৫ (২০১৯- ২০২১)-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কোন‌ওদিন ইস্কুলে না যাওয়া ২২.৫ শতাংশ নারীদের, আবার বারো বছরের বেশি সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া ১৫.২ শতাংশ নারীদের ‘স্বামীরা’ তাঁদের নারী-বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জন্যও একা বাড়ির বাইরে যেতে দেয় না। 

রাষ্ট্রসংঘের সংজ্ঞায় যেকোনও লিঙ্গভিত্তিক হিংসা, যার পরিণতিতে সামাজিক পরিসরে বা ব্যক্তিগত পরিসরে নারীর শারীরিক, যৌন বা মানসিক ক্ষতি বা বিপর্যয় ঘটে তাকেই বলা হয় নারীর বিরুদ্ধে হিংসা। হুমকি, বলপ্রয়োগ, স্বাধীনতা খর্ব করাও এ জাতীয় হিংসার অন্তর্গত। এ প্রসঙ্গে একটি খেয়ালে রাখার মতো তথ্য উল্লেখ করা জরুরি- ন্যাশানাল ফ্যামিলি হেল্‌থ সার্ভে-৫ (২০১৯- ২০২১)-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, মোট যতজন গার্হস্থ্য হিংসার শিকার নারীর সঙ্গে সমীক্ষকেরা কথা বলেছেন তার মধ্যে কখনও ইস্কুলে যাননি ৩৯.৩ শতাংশ, আবার বারো বছরের বেশি সময়ের জন্য ইস্কুলে গেছেন ১৭.৩ শতাংশ নারী। শিক্ষা ও হিংসার শিকার হওয়ার মধ্যে কার্যকারণের সম্পর্ক স্থাপন করে একশো শতাংশ নিশ্চিত দাবি করা যায় না ঠিকই, তবে নিরক্ষরতা থেকে শুরু করে বারো বছরের বেশি সময়ের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকার ব্যাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে ২২ শতাংশ বিন্দুর তফাৎ হয়ে গেলে, শিক্ষাকে গৃহহিংসার একটি সম্ভাব্য রোধক হিসাবে বিচার করা যায় কি না তা ভেবে দেখা দরকার। বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি সাক্ষরতা-শিক্ষা, সচেতনতা ও সক্ষমতার কথা উচ্চারণ করাকালীন, সক্ষম, সচেতন জীবনযাপনে, শিক্ষার একটি গুরুতর প্রভাবক হয়ে উঠতে পারার দিকটির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। 

বাড়ির বাইরের পরিসর নিয়ে যে সংলাপ চলেছে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির সমীক্ষায়, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল – নারীর বিরুদ্ধে ঘরে-বাইরে, পথে-কর্মস্থলে হিংসার ঘটনা ঘটলে, নারী যাবে কোথায়, কার কাছে বিচার চাইবে? কর্মস্থলে নারীর প্রতি হিংসার অভিযোগ দায়ের করার কর্তৃপক্ষ হিসাবে ২৭২ জনের মধ্যে একজনও ইন্টারনাল কমপ্লেইন্টস কমিটি (আই সি সি) সম্পর্কে জানেন না। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, উত্তরদাতাদের মধ্যে সিংহভাগ অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক বা গৃহবধূ। ফলে ব্যক্তগত জীবনে আইসিসি-র অস্তিত্ব, উপযোগিতা এঁদের কাছে নাই। নিজের কাণ্ডজ্ঞানের ভিত্তিতে এঁরা জানালেন যে, অফিসকাছারির মতো কর্মস্থলে অপরাধ ঘটলেও মূলত থানাকেই এঁরা একমাত্র অভিযোগস্থল হিসাবে বুঝছেন। কেউ কেউ এ প্রশ্নে অভিযোগস্থল হিসাবে চিনছেন আঞ্চলিক রাজনৈতিক মহিলা সমিতিকে। তবে  যখন দেখা যাচ্ছে যে, সংগঠিত ক্ষেত্রে, কর্পোরেট সংস্থায় চাকরিরত উত্তরদাতা বা মধ্যবিত্ত উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত উত্তরদাতারাও আইসিসি সম্পর্কে জানেন না, তখন তা কেবল তথ্যের অভাব নয়, সচেতনতার অভাব হিসাবে পরিগণিত হয়। আবার “এসব কথা লজ্জায় কোথাও বলা মুশকিল” এমন কথাও শোনা গেছে বহু উত্তরদাতা নারীর মুখে। “রিপোর্টেড কেস” হল এমন এক শব্দবন্ধ যা এ রাজ্যে, এ দেশে এ জাতীয় হিংসার মাত্রা, সংখ্যা, দাপটকে, বাস্তবের চেয়ে বহুগুণে কমিয়ে দেখায়। নারীরা অপরাধের শিকার হন, কিন্তু জানাতে পারেন না। 

“রিপোর্টেড কেস” প্রসঙ্গে আলোচনায় এক উদ্বেগজনক তথ্যের দিকে নজর দেওয়া দরকার। এই তথ্য ইঙ্গিত করতে পারবে, কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে সে তথ্য না থাকার সঙ্গে সঙ্গে, অভিযোগ জানালে সামাজিক সংকট তৈরি হবে – এই পিছুটান নারীকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এনেফএইচেস-৫ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিবাহ সম্পর্কে বলপূর্বক যৌন সম্পর্কস্থাপনের মতো শিকার হয়েছেন যত নারী তার মধ্যে কোনওদিন ইস্কুলে না যাওয়া ৭৮.২ শতাংশ নারী এবং বারো বছরের বেশি সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া ৭৮.৪ শতাংশ নারীও কোনওদিন কাউকে তাঁদের সঙ্গে ঘটা যৌন নির্যাতনের কথা বলেনইনি, বলতে পারেননি, কারণ এসব ক্ষেত্রে নির্যাতক তাঁদের বিবাহ-সম্পর্কে আবদ্ধ ঘনিষ্ট সঙ্গী অর্থাৎ তাঁদের “স্বামী”। দেখা যাচ্ছে, হিংসার বিরুদ্ধে নালিশ জানানোর ক্ষেত্রে নারীর সচেতনতা বা সক্ষমতার বিকাশে সহায়ক হয়ে উঠতে পারছে না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। ওয়ার্ল্ড হেল্‌থ অরগানাইজেশন মার্চ ২০২৪-এর একটি নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে প্রতি তিনজনের মধ্যে এক জন নারী অপরিচিত, পরিচিত বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে থাকা সঙ্গীর (ইন্টিমেট পার্টনার) দ্বারা সংঘটিত শারীরিক বা যৌন হিংসার শিকার। একই নিবন্ধ জানাচ্ছে যে, গোটা বিশ্বের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ২৭ শতাংশ নারী জীবনের কোনও না কোনও সময়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে থাকা সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। 

নারীর বিরুদ্ধে হিংসা নিয়ে যে কথোপকথন হয় পাইলট সমীক্ষায়, তার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল, এমন এক প্রশ্ন যা নিয়ে বহু সমাজ-রাজনৈতিক ও নারীবাদী তত্ত্বচর্চা হয়েছে, প্রশ্নটি হল – দোষী কে? নারীর বিরুদ্ধে হেনস্থা, নির্যাতনের ক্ষেত্রে কাকে দোষী বলে মনে হয় – যে নির্যাতক তাকে, না কি যিনি নির্যাতিত কখনও কখনও তিনিও? প্রায় আশি শতাংশ নারী বললেন, নির্যাতক তো দোষী বটেই, “তবে এক হাতে তো তালি বাজে না”! পোশাক, চালচলন, জীবনযাত্রা – নারীর নিজের ইচ্ছামতো বেঁচে থাকাটাই যেন তাঁর নির্যাতনের অন্যতম কারণ, এ কথা বলার ক্ষেত্রে এক প্রকার নৈতিক প্রত্যয়ের সুর শোনা যায় সংলাপে। তবে বেশ কিছু নারী বলেছেন – “মেয়েরা যেমন জামাকাপড়ই পরুক, ওরা তো ছেলেদের অসভ্যতা করতে বলছে না। যে ছেলেরা অসভ্যতা করছে, দোষী তো তারাই, মেয়েরা কেন হবে?” এই বিবিধ বক্তব্যেরও কোনও নির্দিষ্ট বয়স, শিক্ষা, বাসস্থানের প্রভাব লক্ষ করা যায়নি। অর্থাৎ গ্রাম-শহরের, বিবিধ বয়সের, নানারকম শিক্ষাগত যোগ্যতার নারীরাই দুই প্রকারের উত্তর দিয়েছেন। 

গ্রামীণ অঞ্চলে ২০২৪ সালেও ডাইনি সন্দেহে নারীদের উপর অত্যাচারের প্রতিবেদন পাওয়া যায় সংবাদপত্র ঘাঁটলে। ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো-র ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল অবধি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে নারীদের উপর ২০১৭ সালে ২৪৪ টি, ২০১৮ সালে ২২৮ টি, ২০১৯ সালে ২৪০ টি, ২০২০ সালে ১৮২ টি ও ২০২১ সালে ১৭৬ টি অ্যাসিড আক্রমণ নথীভুক্ত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড হেল্‌থ অরগানাইজেশান-এর মার্চ ২০২৪-এর নিবন্ধটির তথ্য জানাচ্ছে ৪২ শতাংশ নারী ঘনিষ্ট সম্পর্কে থাকা সঙ্গীর দ্বারা নানা প্রকারে, মাত্রায় আহত হওয়ার ঘটনার রিপোর্ট করেছেন।

সাক্ষরতা প্রসারের কাজ করতে গিয়ে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির অন্যতম অভিজ্ঞতা হল, অক্ষরজ্ঞানবঞ্চনার সঙ্গে লিঙ্গ-বৈষম্যের গুরুতর যোগ রয়েছে। ‘সংলাপে মেয়েরা’ শিরোনামের তিন পর্বের রচনা একটি সমীক্ষারই অংশ – প্রসঙ্গত এ কথা উল্লেখ করা জরুরি যে, সাক্ষরতা-শিক্ষার বুনিয়াদি কাজের সঙ্গে সঙ্গে, স্বাস্থ্য, নারীর অধিকার, নারীর বিরুদ্ধে অন্যায়-অপরাধ সম্বন্ধে সচেতনতার বিকাশে সহায়কের কাজ করার জন্যই মুখ্যত সমিতি এই পাইলট সমীক্ষার কাজটি করে। 

 


প্রকাশের তারিখ: ৩০-মে-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org