নারীশ্রম ও শ্রমিক রাজনীতির সম্ভাবনা- ১

কুমার রাণা
অধিকারের প্রশ্নকে শুধু স্বীকৃতির ঘোষণায় শেষ করলেও চলবে না। কাজের লিখিত শর্ত, সময়মতো পারিশ্রমিক, মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তার সংশোধন, অসুস্থতা ও মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং অবসরের ব্যবস্থা দরকার। কাজ বাড়ালে সময় ও পারিশ্রমিকের হিসাবও বদলাতে হবে। কোনও কর্মী অভিযোগ করলে তাঁর কাজ চলে যাবে কি না, সেই ভয় দূর করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ সবই শ্রমিকের নিজের জীবন সম্পর্কে কিছুটা নিশ্চয়তা পাওয়ার শর্ত। 

এক

শ্রমিক শব্দটা প্রধানত একজন পুরুষের ছবিকেই তুলে ধরে। মেয়েদের ভূমিকা শ্রমিকের স্ত্রী-র, তাঁরা পরিবারের দেখাশোনা করেন, প্রয়োজনে স্বামীর আন্দোলনে যোগ দেন। আধুনিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে নারীদের বড়জোর শ্রমিকশ্রেণির উপাঙ্গ হিসেবেই দেখা হয়। যাঁদের শ্রম ছাড়া সমাজের দৈনন্দিন জীবন চলবে না, তাঁদের শ্রমিক হিসেবে মানতে এত অসুবিধা কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শ্রমের হিসাব এবং শ্রমিক রাজনীতির প্রচলিত ধারণা, দুটোকেই পরীক্ষা করতে হয়।

সমস্যার শুরু কাজের সামাজিক বিভাজন  থেকে। রান্না, ঘর পরিষ্কার, সন্তান মানুষ করা, অসুস্থ ও বৃদ্ধের পরিচর্যা মেয়েদের কর্তব্য বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। সেখানে সময় লাগে, দেহের ক্ষয় হয়, দক্ষতা দরকার হয়; কিন্তু মজুরি নেই বলে কাজটির আর্থনীতিক গুরুত্বও আড়ালে থাকে। সংসারের এই শ্রমই মানুষকে পরের দিনের কাজে যাওয়ার উপযুক্ত করে, পরবর্তী প্রজন্মকে বড় করে। অর্থাৎ উৎপাদন চালু রাখার জন্য যা অপরিহার্য, অর্থনীতির প্রচলিত বিবরণে তার অনেকটাই বাদ পড়া। মেয়েদের শ্রমকে বাদ দিয়ে পরিবারের আয় কিংবা দেশের উন্নতি বোঝার চেষ্টা তাই গোড়া থেকেই অসম্পূর্ণ।

এর পরিমাণ সামান্য নয়। ভারতের ২০২৪ সালের সময়-ব্যবহার সমীক্ষায় ছয় বছর ও তার বেশি বয়সিদের মধ্যে যাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে গৃহস্থালির কাজ করেছেন, তাঁদের দৈনিক গড় সময় মহিলাদের ক্ষেত্রে ২৮৯ মিনিট, পুরুষদের ৮৮ মিনিট। এটি ওই কাজে যুক্ত মানুষদের গড়; সমস্ত নারী-পুরুষের গড় নয়। শিশুসহ পরিবারের সদস্যদের পরিচর্যার হিসাব আবার আলাদা।১ ফলে মেয়েদের রোজগারের কাজে যোগ দেওয়া মানেই তাঁর আগের কাজ থেকে মুক্তি নয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি কাজের উপর আর একটি কাজ চাপে। তাহলে, ঘরের দায় অপরিবর্তিত রেখে বাইরের কাজে সমান সুযোগের কথা বলা কতটা বাস্তবসম্মত? 

খেটে খাওয়া মেয়েরা অবশ্য আগেও কাজ করতেন। খেতমজুরি, গৃহপরিচারিকার কাজ, ইটভাটা, বিড়ি বাঁধা, বনজ সম্পদ সংগ্রহ প্রভৃতি বহু পরিবারের রুজির অংশ ছিল। অঞ্চলভেদে কাজের বৈচিত্র্যও ছিল; কিন্তু কাজ বেছে নেওয়া, নিশ্চিত আয় পাওয়া এবং দর-কষাকষির সুযোগ ছিল সীমিত। এর সঙ্গে ক্রমে যুক্ত হয়েছে মিড-ডে মিলের রান্না, অঙ্গনওয়াড়ি, আশার কাজ এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রকল্প। পুরনো কাজগুলি উঠে যায়নি; মেয়েদের সামনে কাজের আরও কিছু ক্ষেত্র খুলেছে। পরিবর্তনটি শুধু কাজের সংখ্যা বৃদ্ধিতেই নয়; নূতন সহকর্মী, ঘরের বাইরে পরিচিতি এবং সরকারি ব্যবস্থার কাছে দাবি জানানোর সুযোগও এর সঙ্গে এসেছে। 

কাজের ক্ষেত্রের এই প্রসারের সঙ্গে পরে যুক্ত হয়েছে মহিলাদের জন্য নগদ হস্তান্তর প্রকল্প। কাজের আয় ও সরকারি সহায়তা এক জিনিস নয়, কিন্তু দুটিই কিছু মেয়েদের হাতে অর্থ ব্যবহারের সুযোগ বাড়িয়েছে। এক দিকে কর্মক্ষেত্রে অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা, অভিন্ন সমস্যা চেনা ও দাবি তোলার অভিজ্ঞতা; অন্য দিকে সামান্য হলেও নিজের হাতে অর্থ থাকার ভরসা। এই দুই দিকের যোগ তাঁদের সক্ষমতা কিছুটা বাড়ানোর অনুকূল অবস্থা তৈরি করেছে। এই লেখাতে আমরা দেখবার চেষ্টা করব কীভাবে মেয়েদের শ্রমিকশ্রেণি হিসেবে সংগঠিত হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বিস্তৃত হয়েছে।

দুই

শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসও কেবল পুরুষের ইতিহাস নয়। ১৮৮৯ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডনের পূর্বপ্রান্তে সিলভারটাউনের রবারের জিনিস ও সমুদ্রতলের টেলিগ্রাফ-কেবল তৈরির কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক ধর্মঘট শুরু করেন। কার্ল মার্কসের কনিষ্ঠ কন্যা এলিনর মার্কস প্রতিদিন সকালে সেখানে গিয়ে কারখানার মেয়েদের সংগঠিত করতেন। তাঁর উদ্যোগে নবগঠিত গ্যাসকর্মী ও সাধারণ শ্রমিকদের জাতীয় ইউনিয়ন মেয়েদের সদস্যপদ দেয়, এবং সেই বছরের অক্টোবরে সিলভারটাউনেই প্রতিষ্ঠিত হয় এই ইউনিয়নের প্রথম নারী শাখা। বারো সপ্তাহ পরে ধর্মঘট পরাজয়ে শেষ হয়। তবু যে মেয়েদের "অদক্ষ" বলে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের বাইরে রাখা হত, তাঁরা সেই আন্দোলনের ভেতরে নিজেদের জায়গা করে নিলেন।২ এর কুড়ি বছর পরে, ১৯০৯ সালের নিউ ইয়র্কে পোশাকশ্রমিক ক্লারা লেমলিখ সাধারণ ধর্মঘটের প্রস্তাব তুলেছিলেন। তাঁর আহ্বানের পর যে আন্দোলন ছড়ায়, তাতে পাঁচশো কারখানার কুড়ি হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ বন্ধ করেন। প্রধানত তরুণী অভিবাসী শ্রমিকদের এই লড়াই মজুরি, কাজের সময় এবং ইউনিয়নের অধিকারকে সামনে এনেছিল।৩ অনেক প্রতিষ্ঠানে সাফল্য এলেও সব দাবি আদায় হয়নি। দুটি ঘটনাই একান্তভাবে বিজয়ের কাহিনি না হলেও, যাঁদের দুর্বল, অনভিজ্ঞ বা সংগঠনের অনুপযুক্ত ভাবা হয়, তাঁরাও যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারেন, তার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উঠে এল এই দুই আন্দোলন। 

১৯১৭ সালের রাশিয়ায় রুটি ও শান্তির দাবিতে নারী শ্রমিকদের পথে নামা বিপ্লবী ঘটনাপ্রবাহের সূচনায় বড় ভূমিকা নিয়েছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জের নারীদিবসের ইতিহাসে এই ধর্মঘটের গুরুত্ব স্বীকৃত।৪ এখানে সংসারের খাদ্যাভাব, যুদ্ধ এবং কর্মক্ষেত্রের অসন্তোষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। মেয়েরা রুটির দাবি তুলেছেন বলে সেটি শ্রমিকের দাবির চেয়ে ঊন হয়ে যায়নি। বরং বেঁচে থাকার সাধারণ দাবিই বৃহত্তর শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন তুলেছিল। দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা থেকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি কী ভাবে তৈরি হতে পারে, এই ইতিহাস তা বুঝতে সাহায্য করে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় রে আলেকজান্ডার সাইমনস, এমা মাশিনিনিদের সংগঠন গড়ার কাজে মজুরি ও কর্মপরিবেশের প্রশ্ন বর্ণবিদ্বেষ এবং নারী হিসেবে অধস্তন মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। নারী শ্রমিকের উপর নিপীড়ন যে শুধু কারখানার মালিকের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাঁদের আন্দোলন তা সামনে আনে।৫ কাছের বাংলাদেশের পোশাকশিল্পও নারী শ্রমিকের সংগঠনের সম্ভাবনা ও বাধা বোঝার জরুরি ক্ষেত্র। সেখানে সংগঠন করার অধিকার নিয়ে আইএলও-র গবেষণা মনে করায়, কর্মসংস্থান থাকলেই কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না।৬ নারীপ্রধান শ্রমক্ষেত্রেও নেতৃত্ব, নিরাপত্তা ও দর-কষাকষির অধিকার আলাদা করে অর্জন করতে হয়।

ভারতে সেবা (SEWA)-র অভিজ্ঞতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালে আমদাবাদে দরিদ্র স্বনিযুক্ত মহিলাদের ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে তার জন্ম। মাথায় বোঝা বহন করা, ছোট ব্যবসা কিংবা বাড়িতে থেকেই কাজে যুক্ত নারীদের সংগঠিত করতে গিয়ে প্রথমেই প্রশ্ন উঠেছিল: স্থায়ী মালিক নেই, এঁদের আবার ইউনিয়ন কীসের? “সেবা”-র নিজের ইতিহাসে এই স্বীকৃতি আদায়ের লড়াইটির উল্লেখ আছে।৭ কাজেই কারখানার স্থায়ী কর্মচারীর বাইরে শ্রমিককে খোঁজার প্রয়োজন আজ প্রথম দেখা দেয়নি। আজকের প্রকল্পকর্মীদের আন্দোলন বোঝার জন্য এই অভিজ্ঞতা জরুরি, যদিও স্বনিযুক্ত শ্রমিক এবং সরকারি প্রকল্পে নিযুক্ত কর্মীর কর্মসম্পর্ক এক নয়। 

তিন

এই ইতিহাসের আলোয় ভারতের সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে দেখা দরকার। নব্বইয়ের দশকের উদারীকরণ, উৎপাদনে ঠিকাদারি এবং কাজ বাইরে করিয়ে নেওয়ার বিস্তার শ্রমের নিরাপত্তাকে নূতন চাপে ফেলেছে। তবে শিল্পশ্রমিক শ্রেণি বিলুপ্ত বা রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে বললে অতিরঞ্জন হবে। পুরনো সংগঠিত ক্ষেত্রের ভিতরেও অনিশ্চিত কর্মসম্পর্ক বেড়েছে। আইএলও এবং ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের India Employment Report 2024 অনুযায়ী, কর্মীদের প্রায় ৮২ শতাংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রে যুক্ত, আর প্রায় ৯০ শতাংশের কর্মসংস্থান কোনও বিধিগত নিয়ন্ত্রণের বাইরে।৮ দুটি হিসাব এক নয়: সংগঠিত প্রতিষ্ঠানেও বিধিগত নিয়ন্ত্রণের বাইরে কাজ হতে পারে।

এমন অর্থনীতিতে শ্রমিকের পরিচয় শুধু কোথায় কাজ করেন, তা দিয়ে স্থির করা যায় না। নিয়োগপত্র আছে কি না, আয়ের নিশ্চয়তা কতটা, অসুস্থ হলে কী হয়, কাজ হারালে কোথায় অভিযোগ করবেন – এসবও গুরুত্বপূর্ণ। একই পরিবারের পুরুষ নির্মাণক্ষেত্রে দৈনিক মজুরিতে কাজ করতে পারেন, মহিলা স্কুলে রান্না করতে পারেন, অন্য সদস্য ঘরে বসে বাজারের পণ্য তৈরি করতে পারেন। তাঁদের পেশা আলাদা, কিন্তু অনিশ্চয়তা পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। এক জনের কাজ বন্ধ হলে অন্যের উপর চাপ বাড়ে। শ্রমিক রাজনীতির পরিসর তাই একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানের দরজা পর্যন্ত রাখলে পরিবারের এই বাস্তবতা ধরা পড়বে না।

নারীদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের পরিসংখ্যান পরিবর্তনের একটি দিক দেখায়। পিএলএফএস-এর হিসাবে, পনেরো বছর ও তার বেশি বয়সি মেয়েদের সাধারণ অবস্থাভিত্তিক শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার ২০১৭–১৮ সালের ২৩.৩ শতাংশ থেকে ২০২৩–২৪ সালে ৪১.৭ শতাংশে উঠেছে। এখানে কর্মরত এবং কাজ খোঁজা বা কাজের জন্য তৈরি, উভয় গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত। আবার ২০২৩–২৪ সালে কর্মরত মহিলাদের ৬৭.৪ শতাংশ স্বনিযুক্ত, নিয়মিত মজুরি বা বেতনের কাজে ১৫.৯ শতাংশ।৯ নির্দিষ্ট এই সময়পর্বের তুলনা আমাদের কাজের বিস্তার ও তার ধরনকে আলাদা করে দেখতে বলে।

স্বনিযুক্ত মানেই স্বাধীন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকা নয়। এই বর্গে নিজের ব্যবসা করা মহিলার পাশাপাশি পারিবারিক উদ্যোগে বিনা পারিশ্রমিকে সাহায্য করা মেয়েরাও আছেন। আবার স্বনিযুক্ত সকলেই বিনা মজুরিতে কাজ করেন, এমন বলাও ভুল। মেয়েদের যোগদান বাড়াকে তাই সরাসরি আর্থিক স্বক্ষমতার সমার্থক করা চলে না। কতটা কাজ মিলল, কত টাকা হাতে এল, সেই টাকা ব্যবহারের ক্ষমতা কার, তা জানতে হবে। নিরাপদ কর্মসংস্থান ছাড়া কাজে যোগদান বাড়লে সংসারের অভাব কিছুটা মিটতে পারে, অথচ শ্রমিকের নিজের অবস্থার বড় পরিবর্তন নাও হতে পারে। কাজের বিস্তৃতি এবং কাজের অধিকার এক প্রশ্ন নয়।

কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রকল্পের ভূমিকা এখানে আলাদা করে দেখা দরকার। মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন গ্রামীণ পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের চাহিদার ভিত্তিতে বছরে একশো দিনের অদক্ষ দৈহিক শ্রমের কাজের ব্যবস্থা করেছিল – এটা ছিল পরিবারপিছু, মাথাপিছু নয়। অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নিযুক্তি মেয়েদের মধ্যে থেকে হবার আইনি নির্দেশ এবং নারী-পুরুষের সমান মজুরির ব্যবস্থা ছিল।১০ ফলে জমি মালিক বা ব্যক্তিগত নিয়োগকর্তার কাছে কাজ চাওয়ার পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থায় কাজ দাবি করার একটি ক্ষেত্র তৈরি হল। আইনী ব্যবস্থা থাকা এবং বাস্তবে কাজ পাওয়া অবশ্য এক নয়। তবু কাজ, মজুরি ও বকেয়ার প্রশ্নে একসঙ্গে দাবি জানানোর এই সুযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে।

রাষ্ট্রের নিজের তৈরি কর্মসংস্থানে এই বিরোধ আরও স্পষ্ট। পিএম-পোষণ, অর্থাৎ মিড-ডে মিল প্রকল্পের রাঁধুনি-সহায়কদের ধরা যাক। ২৩ জুলাই ২০২৫-এর রাজ্যসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষা মন্ত্রক জানায়, প্রকল্পে চব্বিশ লক্ষের বেশি রাঁধুনি-সহায়ক যুক্ত, তাঁদের নব্বই শতাংশের বেশি মহিলা; প্রায় এগারো কোটি শিশু প্রকল্পের আওতায়। নির্ধারিত সাম্মানিক মাসে এক হাজার টাকা, বছরে দশ মাস। কেন্দ্র ও রাজ্য নির্দিষ্ট অনুপাতে এই ব্যয় বহন করে; রাজ্যগুলি নিজস্ব অর্থ থেকে অতিরিক্ত দেয়।১১ ফলে এক হাজার টাকাকে সর্বত্র মোট প্রাপ্য কিংবা কেবল কেন্দ্রের অংশ বলা ঠিক নয়।

ওই সরকারি উত্তরেই কর্মীদের সমাজসেবায় এগিয়ে আসা সাম্মানিক কর্মী বলা হয়েছে। অথচ তাঁদের কাজের উপর নির্ভর করে প্রতিদিনের একটি নির্দিষ্ট পরিষেবা। রান্না, পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যের নিরাপত্তা, সময়মতো পরিবেশন -সবই দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কাজের মান নিয়ে সরকারি প্রত্যাশা আছে, ব্যর্থ হলে জবাবদিহির প্রশ্ন আছে। তাহলে পারিশ্রমিকের বেলায় কাজটি কেন স্বেচ্ছাসেবার এত কাছে চলে যায়? পরিবারে তো মেয়েরাই রান্না করেন, অতএব সরকারি প্রকল্পেও তাঁরাই রান্না করবেন, এবং বাড়ির কাজে যেহেতু মজুরি নেই, তাই সরকারি কাজেই বা মজুরি থাকবে কেন? কাজটা তো কাজ, তা সে যেখানেই হোক না কেন! যেখানে উল্টোটা হবার কথা, অর্থাৎ বাড়ির কাজে শ্রমের মূল্যায়ন, সেটা না হয়ে সরকারি কর্মসম্পর্কে বাড়ির প্রচলিত – এবং আশু পরিবর্তনযোগ্য – রীতি ঢুকে পড়ে। 

আশা ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের কাজের ধরন, পারিশ্রমিক এবং প্রশাসনিক কাঠামো আলাদা। তবু তাঁদের ক্ষেত্রেও পরিচর্যাকে মেয়েদের স্বাভাবিক কর্তব্য ভাবার প্রভাব আছে। ২০২২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভারতের আশা কর্মীদের জনস্বাস্থ্যে অবদানের জন্য পুরস্কৃত করেছিল, বিশেষত সাধারণ মানুষের সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংযোগ তৈরির ভূমিকার স্বীকৃতিতে।১২ এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্মান দিয়ে আয়ের নিরাপত্তা, বিশ্রাম বা সামাজিক সুরক্ষার অভাব পূরণ হয় না। পরিষেবার মূল্য স্বীকার করলে সেটা প্রদানকারীর শ্রমের মূল্যও স্বীকার করতে হবে। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা কর্মীর নিজের অধিকার ত্যাগ করার অঙ্গীকার নয়।

প্রশ্নটি সরকারি আলোচনাতেও পুরনো। ২০১৩ সালের পঁয়তাল্লিশতম ভারতীয় শ্রম সম্মেলনের সংশ্লিষ্ট কমিটি প্রকল্পকর্মীদের স্বেচ্ছাসেবী বা সাম্মানিক কর্মী না বলে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি, ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষার সুপারিশ করে। সংগঠন ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকারের কথাও ছিল। কিন্তু স্কুলশিক্ষা দপ্তর ও নারী-শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের প্রতিনিধিরা স্বীকৃতি, ন্যূনতম মজুরি এবং কয়েকটি অবসরকালীন সুবিধার সুপারিশে সহমত হননি।১৩ অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল নজর এড়ানো নয়। শ্রমের প্রয়োজন মেনে নিয়েও তার পূর্ণ দায় গ্রহণ না করার বিরোধ সরকারি নথিতেই ধরা আছে।

অধিকারের প্রশ্নকে শুধু স্বীকৃতির ঘোষণায় শেষ করলেও চলবে না। কাজের লিখিত শর্ত, সময়মতো পারিশ্রমিক, মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তার সংশোধন, অসুস্থতা ও মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং অবসরের ব্যবস্থা দরকার। কাজ বাড়ালে সময় ও পারিশ্রমিকের হিসাবও বদলাতে হবে। কোনও কর্মী অভিযোগ করলে তাঁর কাজ চলে যাবে কি না, সেই ভয় দূর করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ সবই শ্রমিকের নিজের জীবন সম্পর্কে কিছুটা নিশ্চয়তা পাওয়ার শর্ত। আজ কত টাকা মিলল, তার পাশাপাশি আগামী মাসে কাজ থাকবে কি না, সেটিও তাঁর দর-কষাকষির বিষয়। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য এই প্রশ্নগুলিকে ফেলে রাখা রাখা যায় না।

অবশ্য এই পরিস্থিতিকে শুধু শোষণের বিবরণ হিসেবে দেখলে পরিবর্তনের সম্ভাবনাটি বাদ পড়ে। স্কুলের রান্নাঘর, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বা গ্রামের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দায়িত্ব মেয়েদের জনপরিসরে একটি নির্দিষ্ট পরিচিতি দেয়। সেটি যত অল্প স্বীকৃতই হোক, তার ভিত্তিতে অন্য কর্মীর সঙ্গে অভিজ্ঞতা মেলানো যায়। কার মজুরি বাকি, কার কাজ বেড়েছে, কোথায় কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হবে – এসব নিয়ে কথা হয়। সংসারের ব্যক্তিগত দুর্দশা তখন একই কাজ করা বহু মানুষের অভিন্ন সমস্যা হিসেবে ধরা পড়তে পারে। অভিযোগের এই সামাজিক রূপান্তর সংগঠনের একটি শর্ত; যদিও এটা হলেই সংগঠন গড়ে ওঠে না – তার জন্য আরও কিছু দরকার।
(ক্রমশ)

সূত্র:

১ Ministry of Statistics and Programme Implementation. (2025). Time Use Survey, 2024: Fact sheet.

২ Yvonne Kapp (1976), Eleanor Marx, vol. 2, The Crowded Years, 1884–1898; London: Lawrence & Wishart 

৩ Annelise Orleck (1995), Common Sense and a Little Fire: Women and Working-Class Politics in the United States, 1900–1965 (Chapel Hill: University of North Carolina Press. 

৪ United Nations. (n.d.). Background: International Women’s Day.

৫ LaNasa, P. (2015). The rise of women’s trade unionism in South Africa. South African History Online.

৬ International Labour Organization. (2022). Trade union organizing in Bangladesh’s ready-made garment sector amidst COVID pandemic: Status, challenges, and scope.

৭ Self Employed Women’s Association. (n.d.). History: Birth of SEWA.

৮ International Labour Organization & Institute for Human Development. (2024). India employment report 2024: Youth employment, education and skills.

৯ Ministry of Statistics and Programme Implementation. (2024, September 23). Periodic Labour Force Survey (PLFS)- Annual report [July, 2023–June, 2024]. Press Information Bureau; Rajora, S. (2024, September 27). Share of self-employed women increased to 67% in 2023–24: PLFS data. Business Standard.

১০ Ministry of Rural Development. (2022, August 2). Women workers under Mahatma Gandhi National Rural Employment Guarantee Scheme (MGNREGS). Press Information Bureau. বর্তমানে এটি নাম ও প্রকৃতি বদলে ভিবি-জিরামজি

১১ Ministry of Education. (2025, July 23). Cook-cum-helpers and kitchen facilities under PM POSHAN. Rajya Sabha starred question no. 44, statement in reply, pp. 2–3.

১২ World Health Organization. (2022, May 22). WHO Director-General announces Global Health Leaders Awards.

১৩ Ministry of Labour and Employment. (2013). Summary record of discussions of the 45th session of Indian Labour Conference held on 17th–18th May, 2013. Annexure I, pp. 19–20.

 

 


প্রকাশের তারিখ: ১৪-অক্টোবর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org