মার্কসবাদের চোখে নারীপাচার ও দেহব্যবসা

মালিনী ভট্টাচার্য

ব্যাদের মতো মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনের লেখায় বিশ্বের সবকিছুরই নিদান দেওয়া আছে কোনো প্রকৃত মার্কসবাদী একথা মনে করবেন না, বরং মুক্তির যে সামগ্রিক কাঠামো মার্কসীয় তত্ত্বের অন্তঃসার তার সাহায্যেই তিনি সতত পরিবর্তনশীল বাস্তবের গাঁটখোলার কাজটি করার চেষ্টা করবেন। গুরুর পিতৃশ্রাদ্ধে কটি বেড়াল মণ্ডপের পাশে বাঁধা ছিল তার যান্ত্রিক অনুকরণ মার্কসবাদী চিন্তকের কাজ নয়। আবার এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে গাঁটগুলি কেবলমাত্র বাহ্যিক পরিস্থিতির জটিলতারই ফল নয়, আমাদের মনে এমনকী আমরা যারা নিজেদের মার্কসবাদী বলি, তাদের মনেও বিষয়টি নিয়ে বদ্ধমূল সংস্কারের গাঁট কঠিন হয়ে বসে থাকে। কোনো নির্মোহ আলোচনার পথে তথাকথিত ভদ্রসমাজ থেকে আহৃত অযৌক্তিক জুগুপ্সা কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়।

এই প্রবন্ধটিতে আমরা এমন একটি বিষয়ের আলোচনা করব, যা নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সচরাচর কিছু ফাঁক থেকে যায়। অথচ তা নিয়ে স্পষ্ট চিন্তা আজকের দিনে খুবই জরুরি। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের যুগে মনুষ্য পাচার, বিশেষত নারী ও শিশু পাচারের আন্তর্জাতিক ব্যবসা দুনিয়া জুড়ে এমনভাবে জাল বিস্তার করেছে যে তাকে আর প্রান্তিক কোনো অপরাধ হিসাবে দেখা যাচ্ছে না, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের হিংস্র শোষণের আবশ্যিক একটি অঙ্গ বলেই তাকে চিহ্নিত করা এবং সেইভাবেই তার মোকাবিলা করা প্রয়োজন। মনুষ্য পাচার ও দেহব্যবসা অবশ্য সমার্থক নয়। দাসশ্রম বা বেগারশ্রমের অদৃশ্য আন্তর্জাতিক বাজারও মনুষ্যপাচারের অন্যতম লক্ষ্য। রাষ্ট্রসংঘ-প্রণোদিত ২০০০ সালের পালের্মো প্রোটোকলে মনুষ্যপাচারের যে সংজ্ঞা দেওয়া আছে সেখানেও এ-কথাই বলা আছে, কিন্তু সেই দলিলে এটাও দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লিখিত যে, মনুষ্য পাচারের ব্যবসার একটি প্রধান উদ্দেশ্য পাচার হওয়া মেয়েদের দেহব্যবসায় নিয়োগ করা। সুতরাং, নারীপাচারকে বিশ্বজোড়া দেহব্যবসার রমরমা থেকে কোনোভাবেই আলাদা করা যায় না। যাঁরা নারী আন্দোলনের কর্মী এবং মার্কসবাদে বিশ্বাসী তাঁদের এই ক্ষেত্রটিতে কাজ করতে গেলে তাই অবশ্যই ভাবতে হবে এই বিপুল এবং জটিল সামাজিক সমস্যার মোকাবিলায় আমাদের প্রেক্ষিত কীরকম হবে।

যাঁরা মার্কসবাদের প্রতিষ্ঠাতা তাঁরা বা পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত রাশিয়াতে মার্কসবাদের দিশাকে সামনে রেখে যাঁরা এক নতুন সমাজ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাঁরা এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখেছিলেন তার থেকে হদিশ নিয়ে কি এরকম কোনো প্রেক্ষিত গড়ে তোলা সম্ভব, না কি সমাজতান্ত্রিক সমাজ একদিন আমাদের এইসব ব্যাধি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করবে এবং আগে থেকে এসব তুচ্ছ সমস্যা নিয়ে ভাবার দরকার নেই - এই সহজ নিয়ম দিয়েই আমরা সন্তুষ্ট থাকব? এ প্রশ্ন আজ আরও প্যাঁচালো হয়ে উঠছে এই কারণে যে, বিশ্বায়িত পুঁজিবাদের মূল যুক্তির অনুসরণেই আজ দেশে-বিদেশে এমন একটি প্রচার জোরালো হচ্ছে যে, 'পাচারে’র সংজ্ঞার আবশ্যিক শর্ত জবরদস্তি করে বা ফাঁকি দিয়ে কোনো কাজে নিয়োগ করা, কিন্তু যৌনব্যবসায় যুক্ত মেয়েরা সাধারণভাবে এরকম কোনো বলপ্রয়োগ বা ভাঁওতার শিকার নন, তাঁদের মধ্যে একটি বড়ো অংশই স্বেচ্ছায় এবং জেনেশুনে এই কাজে নিজের শ্রমশক্তিকে নিয়োজিত করেন, অন্যান্য ক্ষেত্রে শ্রমিকেরা যতোটা শোষিত হন তাঁদের বেলায় তার থেকে ভিন্ন কিছু ঘটছে এমন মনে করার কারণ নেই। 

এই যুক্তি থেকে তাঁরা সিদ্ধান্তে আসছেন যে, যৌনব্যবসায় নিযুক্ত মেয়েদের যদি শ্রমিক হিসাবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া যায় তাহলেই তাঁদের ওপর যে 'কলঙ্ক'র ভুয়ো তকমা লাগানো আছে তার মোচন হবে এবং তাঁদের নিয়ে সামাজিক সমস্যার সমাধান হবে। এই যুক্তি যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরা প্রভাবশালী সন্দেহ নেই, কারণ ইতিমধ্যেই UNDP, UNFPA UNAIDS এমনকী ILO-রও কিছু নথিতে এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদনের চিহ্ন আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমাদের দেশের সরকারের সাম্প্রতিক চিন্তাভাবনাতেও এই 'লবি'র কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। এ-দেশে এই চিন্তাধারার প্রবক্তাদের কেউ কেউ আবার পুঁজিবাদের জমানায়, শ্রমশোষণ নিয়ে মার্কসের কিছু মন্তব্যকে প্রসঙ্গবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করছেন নিজেদের সমর্থনে। বিষয়টি নিয়ে আমরা চুপ করে থাকলে তাঁদেরই আসর জমানোর সুযোগ দেওয়া হবে।

একথা ঠিক যে, 'ব্যাদে'র মতো মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনের লেখায় বিশ্বের সবকিছুরই নিদান দেওয়া আছে কোনো প্রকৃত মার্কসবাদী এ-কথা মনে করবেন না, বরং যুক্তির যে সামগ্রিক কাঠামো মার্কসীয় তত্ত্বের অন্তঃসার তার সাহায্যেই তিনি সতত পরিবর্তনশীল বাস্তবের গাঁটখোলার কাজটি করার চেষ্টা করবেন। গুরুর পিতৃশ্রাদ্ধে ক'টি বেড়াল মণ্ডপের পাশে বাঁধা ছিল তার যান্ত্রিক অনুকরণ মার্কসবাদী চিন্তকের কাজ নয়। আবার এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে গাঁটগুলি কেবলমাত্র বাহ্যিক পরিস্থিতির জটিলতারই ফল নয়, আমাদের মনে এমনকী আমরা যারা নিজেদের মার্কসবাদী বলি, তাদের মনেও বিষয়টি নিয়ে বদ্ধমূল সংস্কারের গাঁট কঠিন হয়ে বসে থাকে। কোনো নির্মোহ আলোচনার পথে তথাকথিত 'ভদ্রসমাজ' থেকে আহৃত অযৌক্তিক জুগুপ্সা কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তাতে সন্দেহ নেই। তাছাড়া যাঁরা মার্কসবাদী চিন্তার পত্তন করেছেন তাঁদের লেখায় প্রসঙ্গটি ক্বচিৎ কখনো বিক্ষিপ্তভাবে এলেও তাঁদের সামগ্রিক বিশ্লেষণের সঙ্গে তার যোগসূত্র খুঁজে বার করা অসম্ভব নয়। এই প্রবন্ধে সমকালীন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ-কাজটিই করবার চেষ্টা করা হয়েছে।

মার্কসীয় চিন্তা অনুযায়ী পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের শ্রমশক্তির শোষণের প্রধান লক্ষণ এই যে তার মাধ্যমে আহৃত উদ্বৃত্ত মূল্যের একটি অংশ সবসময়েই মুনাফার রূপ নেয় এবং উৎপন্ন দ্রব্যে শ্রমিকের লভ্যাংশ থেকে চুরি করেই মুনাফা তৈরি হয়। শোষণ ঘটে প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজেও; দাস বা ভূমিদাসের মালিক শ্রম থেকে উদ্বৃত্ত মূল্য সেখানেও অপহরণ করে প্রকাশ্য জবরদস্তির মাধ্যমে। কিন্তু মুনাফার রাজত্বে এই জবরদস্তিকে লুকিয়ে রাখা হয় মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে একটি আর্থিক চুক্তির নামাবলী দিয়ে। মজুরির বিনিময়ে শ্রমিক তাঁর শ্রমশক্তি বিক্রি করেন যদিও এই মজুরি কখনোই তাঁর শ্রমের প্রকৃত মূল্যের সমান নয়, মুনাফার অঙ্ক শূন্য না হলে তা সম্ভব নয়। অথচ মজুরি পান বলে শ্রমিক মনে করেন তিনি এক স্বাধীন ব্যক্তিহিসাবেই মালিকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন। দাস বা ভূমিদাসের সঙ্গে তুলনায় তাঁর স্বাধীনতা আছে এক মালিকের কাছ থেকে আরেক মালিকের কাছে যাওয়ার বা মজুরি নিয়ে দরকষাকষি করার। কিন্তু মুনাফাসৃষ্টির উপায়ে পরিণত হওয়াতেই তাঁর ‘দাসত্ব’। মার্কস এর ভাষায়, শ্রমশক্তি বিক্রয় করা ছাড়া যেহেতু তার বেঁচে থাকার পথ নেই, কাজে কাজেই সেই শ্রমশক্তির ক্রেতা পুঁজিপতিশ্রেণিকে পরিহার করতে হলে তাকে তার অস্তিত্বই বিসর্জন করতে হয়। আসলে ‘সে অমুক বা তমুক পুঁজিপতির সম্পত্তি নয়, সে গোটা শ্রেণিটারই সম্পত্তি' (Wage Labour and Capital, Selected Works, p.74-75)। তাই দাস বা ভূমিদাসের সঙ্গে মজুরের পরিস্থিতি তুলনীয় না হলেও তার অবস্থা মাঝে মাঝে 'মজুরি দাসত্ব' বলে বর্ণিত হয়েছে।

আজকের দিনে যাঁরা দেহব্যবসায় যুক্ত নারীকে শ্রমিকের স্বীকৃতি দিয়ে সমস্যার সমাধান করার কথা বলছেন তাঁদের মধ্যে কিছু পণ্ডিতের বক্তব্য যে, মার্কস বলেছেন, শ্রমিক যেহেতু নিজের শ্রম পয়সার বিনিময়ে বিক্রি করে তাই গণিকাবৃত্তিকে সেই সার্বিক ব্যাপারটিরই এক বিশেষ নিদর্শন বলা যায়, সেখানেও পয়সার বিনিময়ে যৌনপরিষেবা বিক্রি করা হয়। অতএব মার্কস নিজেই এই নারীকে শ্রমিক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু মালিক ও শ্রমিকের মধ্যেকার লেনদেন যেন দুই সমান স্বাধীন ব্যক্তির মধ্যে একটি বোঝাপড়া, এই ধারণাটিই কি ওপরের অনুচ্ছেদে মার্কসীয় প্রেক্ষিতে পুঁজিবাদী শ্রমশোষণের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে তার সরলীকরণ নয়? বস্তুত পুঁজিবাদই তো এই সাফাই দেয় যে, পুঁজিবাদী সম্পর্কে শ্রমিক-মালিক দুজনেই সমান স্বাধীনভাবে চুক্তিবদ্ধ। আর তার থেকেই এই সিদ্ধান্ত যে লেনদেনের স্বাধীনতা যৌনব্যবসাতেও রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকের পরিস্থিতির সঙ্গে গণিকাবৃত্তিকে তুলনা করে মার্কস ঠিক কোন প্রসঙ্গে কী বলেছিলেন, তা জানতে হলে তাঁর নিজস্ব বয়ানকেই ফিরে দেখতে হবে। 'Prostitution is only a specific expression of the general prostitution of the labourer' এই মন্তব্য তিনি করেন ‘Economic and Philosophic Manuscripts of 1844’ রচনাটির ফুটনোটে (Collected Works, Vol.III, p.295) সেখানে তাঁর প্রতিপাদ্য এটা নয় যে, শ্রমিকের অনুরূপ স্বাধীনতা গণিকারও রয়েছে, বরং তিনি গণিকার জীবনের সার্বিক অধীনতার তুলনা এনে শ্রমিকের পুঁজিবাদ-অধীনতার কথাই বলতে চেয়েছেন। স্বাধীনতার নয়, অধীনতার নিরিখেই তাঁর মতে তারা তুলনীয়।

তাছাড়া মার্কস এখানে আদপেই একথা বলছেন না যে, শ্রমিকের বৃত্তি ও গণিকাবৃত্তিতে কোনো তফাৎই নেই। ঠিক যেমন ‘মজুরি-দাসত্বে’র কথা বলা মানেই এমনটা নয় যে পুঁজিবাদী জমানার সর্বহারা শ্রমিক প্রাক-পুঁজিবাদী যুগের দাস বা ভূমিদাসেরই সমতুল্য। মনে রাখতে হবে মার্কস এবং এঙ্গেলসও সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণির বিবরণ নিচ্ছেন প্রধানত ইয়োরোপের শিল্পবিপ্লবের একটি বিশেষ পর্যায়ের প্রেক্ষাপটে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের ইয়োরোপে শিল্পায়নকে ঘিরে পুঁজিবাদের বিকাশ এবং তার বিবাদী শক্তি হিসাবে সংগঠিত কারখানা শ্রমিকের অভ্যুত্থান - এই বাস্তব পরিস্থিতির বিশ্লেষণ থেকেই জন্ম নিয়েছিল মার্কসীয় সমাজবিপ্লবের তত্ত্ব। সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণির মধ্যেই এই তত্ত্ব অনুমান করেছিল সমাজ পরিবর্তনের চালিকাশক্তির উপস্থিতি। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার মধ্যেই উদ্ভূত এবং সেই ব্যবস্থার অধীন হয়েও এই শ্রেণির অভ্যস্তরে রয়েছে তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে শ্রেণিবিহীন ও শোষণহীন সমাজের অভিমুখে যাওয়ার সম্ভাবনা, সব শোষিত মানুষের নেতৃত্ব দিতে তাকে লঙ্ঘন করে যেতে হবে নিজের অধীনতার পরিস্থিতিকেও, এই যুক্তির ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে মার্কসীয় সমাজবিপ্লবের তত্ত্ব। এইখানেই আগের যুগের দাস বা ভূমিদাসের সঙ্গে তার একটি প্রধান তফাৎ।

তাই বলে মার্কস-এঙ্গেলসের লেখায় এই শ্রেণির বাইরে থাকা অন্যান্য শোষিত মানুষের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না, একথা ভাবলে ভুল হবে। বিভিন্নধরনের শোষিত মানুষ যারা প্রাক পুঁজিবাদী সমাজের ফসল – তারা পুঁজিবাদের বিকাশের মধ্য দিয়ে হয় কারখানার শ্রমিকে পরিণত হয় নতুবা এই নতুন ব্যবস্থারই আনাচেকানাচে থেকে নানাভাবে এই ব্যবস্থার দ্বারা ব্যবহৃত হয়, যেকোনোরকমে জীবিকা উপার্জন করে, যদিও সামাজিক উৎপাদনের মূলস্রোতে প্রায়শই তাদের ঠাঁই মেলে না। শ্রমের বিপুল উদ্বৃত্ত বাহিনীর অংশ তারা, কখনো বা বিবিধ শ্রেণি-উৎস থেকে আসা যে লুম্পেন প্রলেতারিয়েতের কথা Eighteenth Brumaire of Louis Bonaparte-এ বলা হয়েছে তার মধ্যেও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতিয়ার হয়ে তাদের মিশে যেতে দেখা যায়। এঙ্গেলস তাঁর ১৮৪৫ সালের রচনা Condition of the Working Class in England-এ পুঁজিবাদের চারিপাশে ঘুরে বেড়ানো শ্রেণিবিচ্যুত শিকড়হীন এই মানুষদের কথা বারংবার বলেছেন। মার্কস-এর যে ক'টি রচনায় পুঁজিবাদের ইতিহাস বিবৃত হয়েছে সেখানেও এই মানুষেরা সারাক্ষণ উঁকিঝুঁকি মেরে গেছে। পুঁজিবাদী সমাজে দেহব্যবসায় যুক্ত নারীরা এদের দলেই পড়ে।

এঙ্গেলস পূর্বোল্লিখিত রচনাটিতে উদ্ধৃত করেন লেস্টার নিবাসী এক ব্যক্তির কথা, যার মতে ইংল্যাণ্ডের এই শহরে যে নারীরা গণিকাবৃত্তিতে নিযুক্ত, বস্ত্র-কারখানায় কাজ করতে গিয়েই তাদের বেশির ভাগের এই দশা হয়েছে (p.117)। বস্ত্র কারখানাগুলিকে এই কারণে বলা হয়েছে 'নরকের দ্বার'। কারখানা শ্রমিকের পর্যায়ে উঠেও মেয়েদের কেন গণিকাবৃত্তি নিতে হচ্ছে? তার কারণ পুরুষদের বেশি মজুরিতে নিয়োগ না করে মালিকেরা কম মজুরির শ্রমের উৎস হিসাবে ব্যবহার করে নারী ও শিশুদের। এতে এমন তীব্র শোষণের রাস্তা খুলে যায় যে পরিবারের বন্ধনও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, এবং এই বিচ্ছিন্নতা মেয়েদের টেনে নেয় দেহব্যবসার দিকে। এঙ্গেলস দেখিয়েছেন পুরুষ কর্মহীন ও নারীর শ্রমের উপর নির্ভরশীল - এই পরিস্থিতি কীভাবে নষ্ট করে দেয় পরিবারের আভ্যন্তরীণ ভারসাম্যকে। কিন্তু তিনি এখানে পরিবারের মধ্যে নারী ও পুরুষের পরস্পরাগত ভূমিকার সমর্থন করেন না, এই ভূমিকাগুলো উলটে যাচ্ছে বলে হাহাকার করেন না, বরং এ-কথাই বলেন যে তাদের অসহায়তারই চিহ্ন এই বিচ্যুতি, তার থেকে তারা যে পরস্পরের পরম্পরাগত সদগুণগুলি-কে সমাদর করছে এমনটা নয়। পরিবারে নারীর অর্থনৈতিক আধিপত্য এখানে হয়ে দাঁড়াচ্ছে পুরুষের আধিপত্যের উল্টোপিঠ মাত্র, যা পুঁজিবাদী শোষণকে আরো বেশি মুনাফা আহরণ করতেই সাহায্য করে। নারী রোজগার করছে তার মানেই এই নয় যে সে স্বাধীনতা পেয়েছে, ঠিক যেমন গণিকাকে একটিমাত্র পুরুষের কর্তৃত্বে থাকতে হচ্ছে না, তার মানেই এই নয় যে পুরুষতন্ত্রের থেকে সে রেহাই পেয়ে গেছে। কারখানায় মজুর খাটতে এসে যে মেয়েরা দেহব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে তাদের সম্বন্ধে এটাই এঙ্গেলসের সিদ্ধান্ত।

এখানে এঙ্গেলস যা বলছেন তার সঙ্গে আমরা মিলিয়ে দেখতে পারি Economic and Philosophic Manuscript-এর আরো কিছু বিবরণকে (p. 258)। যৌনব্যবসায় যুক্ত নারীদের 'শ্রমিক', আখ্যা দিলেই সব সমস্যার সমাধান হবে যাঁরা ভাবেন, তাঁরা কিন্তু এই বিবরণগুলি সম্বন্ধে নীরবই থাকেন। উল্লিখিত অংশে বাড়ি-জমির মালিকেরা যে বিপুল মুনাফা করে তার উৎসের কথা বলতে গিয়ে মার্কস আনছেন তাদের আহৃত 'ভাড়া' এবং 'সুদে'র প্রসঙ্গ। নিঃস্বদের পেষণ করেই আসে এই সম্পদ। বিশেষত সুদ যাদের কাছ থেকে আহরণ করা হয় তারা মার্কস-এর বর্ণনায় ‘ruined proletarians’ যাদের মধ্যে রয়েছে গণিকা, ম্যাপ ও বন্ধকি কারবারের অধমর্ণেরা। এই দলে আমরা জুড়ে দিতে পারি যারা নিত্য বেকার বা আধা-বেকার, খুচরো কাজ এমনকী ছোটোখাটো বে-আইনি কাজ করে যাদের দিন চলে তাদেরও। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি না থাকলেও তারা জন্মসূত্রে পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে জড়িত এবং এই ব্যবস্থার আবশ্যিক উপাদান। মার্কসের 'ruined' বা 'বিনষ্ট' কথাটি কোনো নৈতিক ফতোয়া নয়, পুঁজিবাদের বিনাশমূলক চরিত্রের ওপর একটি মন্তব্য। আমাদের মনে পড়তে পারে 'রক্তকরবী' নাটকে রবীন্দ্রনাথ-উল্লিখিত 'রাজার এঁটো’ প্রয়োগটি।

কথাটির অর্থ আরেকটু ভালোভাবে বোঝার জন্য আমরা মার্কস-এর পূর্বোল্লিখিত রচনাটির আরেকটি অংশ পড়ে দেখতে পারি (p.309)। এখানেও কারখানার শ্রমিকের কাজকে তুলনা করা হয় গণিকাবৃত্তি ও দাসত্বের সঙ্গে। কারণ এমন এক শ্রমিকেরও বাধ্যবাধকতা রয়েছে তার যথাসর্বস্বকে ব্যবহারযোগ্য (useful) তথা বিক্রয়যোগ্য (saleable) করে তোলার। এটাই পুঁজিবাদের চরিত্র। মার্কস ব্যঙ্গ করে বলছেন, এই চরিত্র অনুযায়ী যদি আমার শরীরটাকেই আমি অর্থের বিনিময়ে খদ্দেরের লালসার কাছে ভাড়া দিই বা মরক্কোর দাসব্যবসায়ীদের কাছে আমার বন্ধুকে বিক্রি করি, তাহলে 'নীতিবাগীশ দাদাভাই' বা 'ধর্মিষ্ঠা দিদিমণি' অন্যরকম মনে করতে পারেন, কিন্তু প্রাণটা আগে না বাঁচলে ধর্ম ও নীতি-অনুযায়ী জীবনযাপন আমি করব কেমন করে? বস্তুত এখানে মার্কস বলছেন কীভাবে আস্তে আস্তে যা বিক্রেয় ছিল না পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তাও বিক্রি করে দেবার চাপ আসে, যার ফলে শ্রমিক ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তার ব্যক্তিজীবন ও তার মানবিক মর্যাদার থেকে।

এই বিচ্ছিন্নতার উদাহরণ দিতে গিয়ে মার্কস বলেন ফ্রান্সের সেই কারখানা শ্রমিকদের কথা যারা স্ত্রী-কন্যা-কে মালিকের হাতে তুলে দেবার নির্দিষ্ট সময়টির উল্লেখ করে 'nth working hourt বলে, কারণ এটা তাদের স্বাভাবিক কাজের সময়ের হিসাব থেকে বাইরে অন্য একরকমের শোষণকে সূচিত করে। নারী বা পুরুষ শ্রমিকের পক্ষে নিজের ব্যক্তিক অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছেদের এটা চূড়ান্ত নিদর্শন। তাকে তার সমস্ত মানবিক অনুভূতি এবং চর্যাকে ডুবিয়ে দিতে হবে অর্থলিপ্সার (avarice) গহ্বরে। 'শ্রমিক ঠিক ততোটুকুই পেতে পারবে যা তাকে জিইয়ে রাখবে, এবং তার বাঁচার উদ্দেশ্যই হবে সেইটুকু জোগাড় করা' (The worker may only have enough for him to want to live and may only want to live in order to have that)। তার স্বাধীনতার অভাব, যা প্রথমে গোপন ছিল, তা তার মানবতার অপহরণের মধ্য দিয়েই ক্রমে প্রকট হবে।

প্রোলেতারিয়ানের বিনাশ বলতে মার্কস সেই অনুমিত মুহূর্তটিকে বুঝিয়েছেন যখন পুঁজিবাদী শোষণ তার মানবতাকে এবং তার প্রতিরোধক্ষমতাকে সম্পূর্ণ বিচূর্ণ করতে পেরেছে। যখন শ্রমের উদ্বৃত্ত বাহিনী বেড়ে যেতে থাকে, তখন সেখানে প্রতিযোগিতাও আরো তীব্র হয় এবং মজুরি হ্রাস করে শ্রমিককে বাধ্য করা হয় বাঁচার তাগিদে সবচেয়ে সস্তা সবচেয়ে অসুরক্ষিত সবচেয়ে ব্যক্তিকতাবিহীন (impersonalized) শ্রমের ক্ষেত্রে ঢুকে পড়তে। মালিক ক্রমশ শ্রমের আরো বেশি বিভাজন ঘটায়, নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি করে মুনাফা আরো বাড়ানোর স্বার্থে এবং শ্রমিকের শ্রমশক্তিকে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিণত করে নিছক বৈচিত্র্যহীন একঘেয়ে উৎপাদনের উপায়ে যার মধ্য থেকে নিবিড় শারীরিক মানসিক অভিনিবেশের ক্ষমতাই অপহৃত হয়েছে। 'শ্রম যতোই শ্রমিকের পক্ষে আরো অরুচিকর, আরো ন্যক্কারজনক হয়ে দাঁড়ায়, ততোই তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ে, মজুরিও হ্রাস পায়' (পৃ:৯১)।

এটা লক্ষণীয় যে মার্কসের মতে প্রতিযোগিতা বাড়া শ্রমিকের শ্রমপ্রক্রিয়ার প্রতি আকর্ষণ বাড়ার লক্ষণ নয়, বরং নিছক বেঁচে থাকার জন্য অর্থলিপ্সা যতোই তার স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তিগুলির জায়গা নিয়ে নেয়, সে যতো 'অমানবিক' হয়, তার পক্ষে যা অপ্রীতিকর সেই শোষণব্যবস্থারই সে ততো অঙ্গীভূত হয়ে যায়। দেহব্যবসাকে মার্কস যে শ্রমশোষণের সবচাইতে চূড়ান্ত পর্যায়ে রেখেছেন, তার সম্ভবত এটাই কারণ (যদিও এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা তিনি করেননি) যে এই নারী যে ‘পরিষেবা' জোগায় তার জন্য তাকে তার জীবনের সবচাইতে ব্যক্তিগত একটি প্রক্রিয়াকেও ব্যক্তিকতাবিহীন কাজে পরিণত করতে হয়, এবং কাজ যত অরুচিকর ও ন্যক্কারজনক হয় প্রতিযোগিতা তত বাড়ে।

অবশ্যই 'বিনাশে'র মুহূর্তটি একটি অনুমিত মুহূর্ত। বাস্তবে কখনো এমনটা হতে পারে না যে, মানুষ এটাকে প্রতিরোধ করতে বা এর থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। মার্কস তা বলছেনও না, তিনি সামগ্রিক প্রক্রিয়াটির কথাই বলছেন। কিন্তু যাঁরা মনে করেন ‘শ্রমিকে’র তকমা দিলেই দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণি যে অধিকারগুলি অর্জন করেছে এই মেয়েদেরও সেগুলি অধিগত হবে, তাঁরা এই বৃত্তিকে পুঁজিবাদী শোষণের আভ্যন্তরীণ এক বিশেষ ধরনের মুনাফা উৎপাদনের প্রক্রিয়া হিসাবে দেখতেই নারাজ। কার্যত এই মুনাফার কোনো অংশ এই মেয়েরা পায় না। যে ব্যক্তিরা তা ছিনিয়ে নেয়, তারা তার উপযুক্ত বিনিয়োগ করে এই ব্যবসায়েই, কিন্তু পুঁজিবাদের মূল উৎপাদনপ্রক্রিয়ার মধ্যে তা দৃশ্যমান হয় না। দৃশ্যমান হলেই তা আর শোষণ থাকবে না এ-কথা কী করে বলা যায়? বরং দেখা দরকার যদি পূর্বোক্তদের মতানুযায়ী সত্যিই এই বৃত্তির মাধ্যমে মেয়েরা একধরনের 'কারকত্ব' বা agency লাভ করে, যদি 'বিনোদন' বা 'সেবা'র কাজের মতো এই কাজেরও একটা স্বাভাবিক সামাজিক মূল্য থাকে, তাহলে পুঁজিবাদ এর থেকে লভ্য মুনাফাকে লুকিয়ে রাখতে চায় কেন? কেন এত জোরের সঙ্গে প্রমাণ করতে চায় যে, এই মেয়েরা নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছাতেই এই লেনদেনে যুক্ত হচ্ছে?

এর ব্যাখ্যাও প্রাথমিকভাবে পাওয়া যেতে পারে এঙ্গেলস-এরই Origin of Family Private Property and the State রচনায়, যেখানে পরিবার ও সমাজে লিঙ্গ-অসাম্যের ইতিহাসের আদল তৈরি করতে গিয়ে লেখক দেহব্যবসায়ের বিবর্তনের দিকেও কিছুটা ইঙ্গিত করেন। এই বৃত্তির জন্মকাহিনি অনেক প্রাচীন, কিন্তু পুঁজিবাদের জমানায় তার যে পুনর্নির্মাণ হয়, সে এ বিষয়েও এঙ্গেলস-এর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। পরবর্তী সময়ে মানববিজ্ঞানের (anthropology) যে অগ্রগতি ঘটেছে, এবং নতুন যেসব তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এঙ্গেলসের এই রচনাটিতে ব্যবহৃত অনেক উদাহরণ বাতিল হয়ে গিয়ে থাকলেও তাঁর মূল প্রতিপাদ্যের গ্রহণযোগ্যতা এখনো চলে যায়নি এটা অনস্বীকার্য। এখানে তিনি এই কথাটিকেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, উনিশ শতকের ইয়োরোপে বুর্জোয়া পরিবারের ধাঁচাটি ধ্রুব এবং অক্ষয় নয়, সমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তন থেকেই তার উদ্ভব, সমাজবিবর্তনের সঙ্গে তার অদলবদলও ঘটতে পারে। অল্পবিস্তর তফাৎ থাকলেও এবং সব সমাজে ঠিক একইভাবে এ বিবর্তন না ঘটে থাকলেও সাধারণভাবে বলা যায়, এই ধাঁচা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ পুরুষেরই থাকবে সংসারে প্রধান ভূমিকা, নারীর একজনই পতি থাকবে এবং তার পরিচয়েই হবে সন্তানের পরিচয়। পারিবারিক সম্পত্তির অধিকারীও হবে পুরুষ সন্তানই।

এঙ্গেলস-এর মতে এ আদলটির উদ্ভব ঘটেছে মানবসভ্যতার বিকাশের কারণে সমাজে উদ্বৃত্ত সম্পদের আবির্ভাব এবং তার ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। বিস্তারিত বিবরণে না গিয়ে এইটুকু বললেই এখানে যথেষ্ট যে তাঁর যুক্তি অনুসারে শ্রেণি-অসাম্যের জন্মের এই মুহূর্ত (মুহূর্ত কথাটি এখানে আলংকারিক, এই বিবর্তন বহু যুগ ধরেও ঘটে থাকতে পারে) একই সঙ্গে লিঙ্গ অসাম্যের জন্মেরও মুহূর্ত বটে, এঙ্গেলসের পরিভাষায় যা, 'world-historic defeat of the female sex (p. 488 )। আদিম সমাজে উৎপাদনের প্রাথমিক হাতিয়ারগুলির ব্যবহারে মেয়েদের যে অগ্র-ভূমিকা ছিল এবং সন্তানের পরিচয়ে যে মাতৃ-অধিকার স্বীকৃতি পেত বলে অনুমান করা হয়, এই প্রক্রিয়া তার অবসান সূচনা করে। 'মেয়েদের কাজ' ও 'পুরুষদের কাজের মধ্যে বিভাজন যতোই আরো প্রকট হয়, ততোই 'মেয়েদের কাজ বলে চিহ্নিত পালনপোষণ-সংক্রান্ত গৃহস্থালির কাজের সামাজিক মূল্য স্বীকৃতি হারায়। তাকে মনে করা হয় পরিবারের মধ্যেকারই একান্ত ব্যাপার এবং এক মেয়েলি দায়িত্ব। পুত্রসন্তানের প্রজনন পারিবারিক সম্পত্তির বংশগত সংরক্ষণের কারণেই গুরুত্ব পায় এবং মেয়েদের এক পতির প্রতি আনুগত্যও মতাদর্শ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায় এই প্রক্রিয়ারই মধ্য দিয়ে।

এঙ্গেলস জানান, মেয়েদের পক্ষে একগামী হবার এই বাধ্যবাধকতা তাদের যে অবমূল্যায়নের সূচনা করে তারই অপরপিঠ গণিকাবৃত্তি, কারণ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বাইরে পুরুষের বহুচারিতার অধিকার থেকে যায় প্রাচীন যুগের শ্রেণিসমাজেও, এর উদাহরণস্বরূপ এঙ্গেলস একাধিক পত্নী এবং ক্রীতদাসীদের ওপর যৌন-আধিপত্যের কথাই শুধু বলেননি, মর্গানের অনুসরণে উল্লেখ করেছেন 'hetaera' দেরও, যাদের সঙ্গে দেবদাসীদের তুলনা করা যায়, যারা ধর্মপ্রতিষ্ঠানে উৎসর্গীকৃত এবং অর্থের বিনিময়ে যাদের পরিষেবা পাওয়া যেতে পারত। এঙ্গেলস অনুমান করেছেন, আরো আগের যুগে যে গোষ্ঠী-বিবাহের প্রচলন ছিল, তারই অবশেষ আমরা পাই এই প্রথায়, যা সমাজের কিছু মেয়েকে সীমিত যৌন-স্বাধীনতা দিয়েও প্রকৃতপক্ষে নতুন একগামী পরিবারের ভিত্তিকেই দৃঢ়তর করে। সমাজে এই মেয়েদের একটি নির্দিষ্ট পরিসরও রাখা হয়।।

দেহব্যবসায়ের আদি ইতিহাস যাই হোক, সন্দেহ নেই যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আচারনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ‘hetaera'বা দেবদাসীরা অথবা তাদের ধারা থেকে উদ্ভুত বারবণিতারা একগামী পরিবারের পরিপূরক হিসাবেই সমাজে স্বীকৃতি পেয়েছিল। নিজেদের পেশার স্বার্থেই তাদের আয়ত্ব করতে হত নানা কলাবিদ্যায় পারদর্শিতা, গৃহচারী নারীর চেয়ে স্বাভাবিক কারণেই তাদের গতিবিধি ছিল কিছুটা স্বাধীন, কোথাও কোথাও সম্পত্তির অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত ছিল না। কিন্তু সীমারেখাটা কোথায় টানা ছিল তার পরিষ্কার উদাহরণ পাই প্রাচীন ভারতে বৈশালী গণরাজ্যের সেরা নায়িকা অম্বপালির কাহিনিতে; রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সে তার বৃত্তি গ্রহণ করেছিল, নিজের ইচ্ছার গতিতে নয়। তাছাড়া সেই প্রাচীন শ্রেণিসমাজেও এই বৃত্তির মধ্যে শ্রেণিবিভাজন ছিল, যারা তাদের মধ্যে হতদরিদ্র তাদের তো ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রশ্নই ছিল না, যেমন জাতকসাহিত্যে কথিত কুম্ভদাসীরা যৌনশোষণ সহ সবরকান শোষণেরই শিকার ছিল। গণিকাদের এই ভূমিকাই আমরা নানারকমভাবে মধ্যযুগে এবং পুঁজিবাদের উদ্ভব ও বিকাশের আগে পর্যন্ত দেখি। একগামী পরিবারের ধাঁচার মধ্যে পুরুষের বহুচারিতার এই পরিসরটুকু থাকলেও গৃহস্থ মেয়েদের 'সতীত্ব' থেকে স্খলনকে কখনোই ক্ষমা করা হয়নি। আঠারো-উনিশ শতকে ইংরেজ আমলেও কলকাতা এবং মফঃস্বলে গণিকাদের পাড়ায় তথাকথিত ‘ভদ্রঘর’ এমনকি 'উচ্চবর্ণ’ থেকে আসা 'পতিতা’ মেয়েদের সংখ্যা কম ছিল না। এঙ্গেলসের যুক্তি থেকেই ইতিহাসের এই সূত্রগুলির ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

পুঁজিবাদী জমানা শুরু হবার পরে দেহব্যবসার এই পরম্পরাগত রূপও পাল্টে যেতে লাগল। মানুষের সকল সম্পদের পণ্যায়নই এই জমানার উদ্দেশ্য যাতে সবকিছু থেকেই মুনাফাসৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়। রূপজীবাদের সঙ্গে সম্পর্কের বেলাতেই প্রকাশ্যে অর্থের লেনদেন চালু থাকলেও, এঙ্গেলস দেখিয়েছেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি-ভিত্তিক সমাজে গোড়া থেকেই বিবাহের ক্ষেত্রেও সম্পত্তির লেনদেনের মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ়তর করাটাই ছিল আসল কথা। সম্পন্ন শ্রেণিগুলির প্রেক্ষিতে সচরাচর পাত্রপাত্রীর পারস্পরিক পছন্দ-অপছন্দের স্বাধীনতার বিষয়টি ছিল নেহাৎ গৌণ। এদিক থেকে 'সতী' স্ত্রী ও গণিকার মধ্যে যে সাদৃশ্য দেখা যায় তার উল্লেখ Conimunist Manifesto সহ মার্কস-এঙ্গেলসের অন্য রচনাতেও বিদ্যমান।

এঙ্গেলসের মতে পুঁজিবাদী সমাজেও বিবাহের এই পদ্ধতি চালু থাকতেই পারত। তবু 'ইতিহাসের পরিহাস' এমনই যে পুঁজিবাদী বিকাশের লগ্নেই এই পদ্ধতির মধ্যে এক স্ববিরোধী প্রবণতা সৃষ্টি হল। পুঁজিবাদ পুরনো পরম্পরাগত সমাজসম্পর্ক এবং চিরাচরিত প্রথাগুলিকে বাতিল করে তার জায়গায় নিয়ে এলো বেচাকেনার বাতাবরণ যার জন্য প্রয়োজন 'স্বাধীন চুক্তি'র ধারণা। এই চুক্তি সম্পাদিত হতে পারে না যদি না উভয়পক্ষ সমান ও স্বাধীন হয়; বিবাহের ক্ষেত্রেও এই দাবি আকার নিল ‘পুরুষের অধিকারের পাশাপাশি স্ত্রীর অধিকার'কে অন্তত কিছুটা স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচলনে। এঙ্গেলসের মতে এতদসত্ত্বেও বিবাহপ্রথা সাধারণভাবে শ্রেণিভিত্তিক তথা সম্পত্তিসম্পর্ক-ভিত্তিকই রয়ে গেল যদিও বিভিন্ন সমাজে এর বিভিন্ন রূপ দেখা যায়। নিছক ব্যক্তিগত পছন্দের খাতিরে বিবাহ এখনো বিরল। তাঁর এই বক্তব্যের উদাহরণ আমাদের সমাজে পাওয়া যেতে পারে পণপ্রথার দীর্ঘ ইতিহাসে। জাতপাত এবং সম্প্রদায়-বহির্ভূত বিবাহে যে এখনো এতো বাধা তার পিছনেও অনেকসময়েই শ্রেণিগত ব্যবধানকে কাজ করতে দেখা যায়। বিবাহিত স্ত্রীর এই অধীনতারই অপরপিঠ যৌনব্যবসায় যুক্ত নারীর অধীনতা। প্রথমটির 'কলঙ্ক' দূর না হলে দ্বিতীয়টির 'কলঙ্ক'ও মোছা যাবে না।

প্রাক- পুঁজিবাদী সমাজে গণিকাবৃত্তিতে কোনো সার্বিক স্বাধীনতা ছিল না, তবু তার জন্য কখনো কখনো একটা নির্ধারিত সামাজিক পরিসরের অনুমোদন থাকত। পুঁজিবাদের যুগে যেহেতু সব সম্পর্কের এক আগ্রাসী পণ্যায়নই চূড়ান্ত লক্ষ্য, তাই এই বৃত্তি থেকেও মানবিকতা ও ব্যক্তিকতার ছিটেফোঁটাটুকু পর্যন্ত নিংড়ে নিতে পারলেই মালিকের মুনাফার লোভ চরিতার্থ হয়। বিবাহের ক্ষেত্রে 'স্বাধীন চুক্তি’র যে বয়ান বিবাহিত স্ত্রীকে তবু শ্রেণিসমাজের মধ্যেই কিঞ্চিৎ আইনি সুবিধা দেয়, গণিকাবৃত্তিতে একমাত্র তা সম্ভব হতে পারত যদি অদৃশ্য মধ্যবর্তী মুনাফাকারীদের সরিয়ে দেওয়া যেত, তাই দেহব্যবসার দুনিয়ায় 'স্বাধীন চুক্তি’ নিতান্তই কথার কথা। কারণ শ্রমিকের চুক্তি তো হয় মালিকের সঙ্গে। কিন্তু দেহব্যবসায় যুক্ত মেয়েটির আসল মালিক তার আশ্রয়দাতা এবং রক্ষাকর্তা সেজেই থাকে। মালিক-শ্রমিকের সম্পর্কে সে ঢুকতেই পারে না। অন্যান্য ‘বিনষ্ট" প্রোলেতারিয়ানের মতোই তাকে ততোটুকুই রোজগার করতে দেওয়া হয় যা তাকে জিইয়ে রাখার পক্ষে যথেষ্ট আর তার বেঁচে থাকার একমাত্র তাগিদ হয়ে দাঁড়ায় সেইটুকু রোজগার করা। সে হয়ে ওঠে ‘অর্থলিপ্সা’র জীব প্রতিমূর্তি, প্রত্যেকদিনের জন্য রোজগার করাটাই হয় তার জীবনের চরম লক্ষ্য।

পুঁজিবাদের যুগে তাই তার অবস্থা হয় স্বভাবতই অধঃপতিত। এঙ্গেলসের মতে এই ব্যবসা আরো বেশি অধঃপতিত করে ক্রেতা পুরুষকে, কারণ নারীর মানবতার এই চূড়ান্ত অবমাননা সেই পুরুষদের মাধ্যমে সমস্ত সমাজেরই অধঃপতন সূচিত করে। একগামী পরিবারে বিবাহপ্রথা নারীর 'সতীত্বের' ওপর যে দখলদারি সূচিত করে, তাকে রক্ষা করার জন্য গণিকাবৃত্তির ‘সামাজিক প্রয়োজন' যেমন থেকেই যায় তেমনি অন্যদিকে পুঁজিবাদী বাজারও তার হাড়মজ্জা শুষে নিতে থাকে। যৌন ব্যবসায়ে ব্যবহৃত নারী শ্রমিক হিসাবে তার অধিকার অনুযায়ীই তার নিজের কাজ করছে একথা বলার অর্থ শ্রমের নিত্য-উদ্বৃত্ত বাহিনীর লাগাতার অসহায়তাকে একদিকে পুঁজিবাদের মুনাফার লোভ এবং অন্যদিকে একগামী পরিবারের সম্পত্তিগত স্বার্থ কীভাবে ব্যবহার করছে তা ভুলিয়ে দেওয়া।।

এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক মার্কসবাদী চর্যার মধ্যে পরবর্তী সময়েও হয়েছে, লেনিনের কিছু বিক্ষিপ্ত মন্তব্যে তার উদাহরণ পাওয়া যায়। অক্টোবর বিপ্লব সংঘটিত হবার পরে রাশিয়াতে যে নতুন সমাজ ও নতুন মানুষ গড়ার উদ্যোগ চলেছিল তার মধ্যে অবধারিতভাবেই এই প্রসঙ্গ একটি আশু সমস্যা হিসাবে সমাধান দাবি করে। লেনিন কিন্তু ১৯২০ সালে ক্লারা জেটকিনের সঙ্গে আলোচনাপ্রসঙ্গে কিছুটা বিদ্রূপ করেন রাশিয়া ও জার্মানির সেই মহিলা কমরেডদের যাঁরা মনে করছেন গণিকাদের জন্য একটি কাগজ বার করে এবং তাদের সংগঠিত করে বিপ্লবের আশু সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। এদের মধ্যে যাদের বে-আইনি কাজের জন্য জেলে পোরা হয়েছে তাদের জন্য রোজা লুক্সেমবার্গের লড়াইয়েরও লেনিন ঐ কথোপকথনের মধ্যেই সমালোচনা করেন কারণ এটা তাঁর কাছে আশু গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয়। তিনি প্রশ্ন করেন, জার্মানিতে কি সংগঠিত করার মতো অন্য শ্রমিক-নারী নেই একটি পত্রিকা বার করে যাদের সংগ্রামের মধ্যে টেনে আনা যায়? এ-বিষয়ে তিনি একটিই সমাধানের কথা বলেছেন এই মেয়েদের উৎপাদনশীল কাজের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে, তাদের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর অঙ্গীভূত করাতে হবে।

লেনিনের এই বিক্ষিপ্ত মন্তব্যের খুঁত ধরা যেতেই পারে, কেউ কেউ তা করেওছেন। যেমন, কোনগুলি 'উৎপাদনশীল' ও কোনগুলি ‘অনুৎপাদক' কাজ তাই নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। মেয়েদের কাজ বলে চিহ্নিত যে ঘরের কাজ, লেনিন তো খুব দ্ব্যর্থহীনভাবে অন্যত্র তাকেও অনুৎপাদক কাজ বলেছেন। মার্কসবাদের এই সংজ্ঞাগুলোই অনেকে মানতে রাজি নন। সমালোচকরা এটাও বলেন যে ‘উৎপাদনশীল’ কাজের সঙ্গে ঘুড়ে দিলেই মানুষের মানবিকতা ফিরে আসে একথা একধরনের 'Instrumentalist' বা উপকরণবাদী মনোভাবের পরিচায়ক এবং তা সমাজতন্ত্রেরই এক তত্ত্বগত বিভ্রম। তাছাড়াও আমরা এ প্রশ্ন তুলতেই পারি যে, কারখানার শ্রমিক বিপ্লবের অগ্রবাহিনী হতে পারে, তাই বলে কি অন্যান্য শোষিত মানুষকে এই সংগ্রামের শরিক করে টেনে আনার কাজ কম গুরুত্বপূর্ণ? যে মেয়েরা দেহব্যবসার মাধ্যমে শোষিত হচ্ছে তাদের ওপর রাষ্ট্রের অত্যাচারের বিরোধিতা করাও কি বিপ্লবীর অন্যতম কর্তব্য নয়? কাজে কাজেই এইধরনের সমালোচনার কোনোই সারমর্ম নেই একথা আমি বলব না। বিশেষত, যখন এজাতীয় উক্তিকে বেদবাক্য বলে মনে করে কোনো কোনো কমিউনিস্টও যান্ত্রিকভাবে এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন বা আসেন যে, এই বৃত্তিতে নিযুক্ত মেয়েদের উদ্ধার করে তাদের সেলাই শেখানো বা ক্যান্টিন চালানোর মতো সামাজিক কাজে লাগিয়ে দিলেই তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, বা যখন এরকম মনে করা হয় যে কোনো সুদূর শ্রেণিহীন সমাজ তৈরি হবার আগে পর্যন্ত এই মেয়েদের নাগরিক অধিকারের সুরক্ষায় কমিউনিস্টদের কিছু করার নেই। লেনিনের বক্তব্যের এরকম পাঠও অসম্ভব নয়। তবু তাঁর এই বিচ্ছিন্ন উক্তি যে মার্কসবাদী বিশ্লেষণের পক্ষে তাৎপর্যপূর্ণ তা অস্বীকার করাও যাবে না।

প্রথমত, ঐ কথোপকথনের মধ্যেই লেনিন তীব্র আক্রমণ করেন সেই বাস্তববোধশূন্য রোমান্টিকতাকে যা সাহিত্যের প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী প্রত্যেক গণিকার মধ্যে আবিষ্কার করে সতীসাধ্বী এক মাতৃমূর্তি। এই ধারণার পিছনে মানবিক সহমর্মিতা এবং বুর্জোয়া ভণ্ডামির প্রতি ঘৃণা থাকতেই পারে, কিন্তু বাস্তববোধহীনতার ফলে তা গাঁজিয়ে যেতে বাধ্য। বাস্তব এটাই যে, বুর্জোয়া সমাজ এই মেয়েদের দুবার করে বলিদান করেছে, লেনিনের ভাষায়: একবার এসমাজের অভিশপ্ত সম্পত্তি-ব্যবস্থার কাছে আর দ্বিতীয়বার তার দু'মুখো নৈতিকতার কাছে। এটা পরিষ্কার যে এই নারীদের নয়, পুরো ব্যবসাটাকেই লেনিন বলছেন ‘ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ' (diseased excrescence)। এই কারণেই তিনি সদ্যোজাত বিপ্লবের এক ঘোর সংকটের মুহূর্তে চাইছেন, নারী কমরেডরা এই ব্যাধি-প্রভাবিত অংশটির মধ্যে বিপ্লবের উপাদান না খুঁজে স্বভাব- লড়াকু সংগঠিত নারী-শ্রমিকদের বিপ্লবের কাজে যুক্ত করতে আগে সর্বশক্তি নিয়োগ করুন। লেনিনের মন্তব্যে না-বলা অনেককিছু থেকে গেছে ঠিকই, কিন্তু তা মার্ক্সীয় বিশ্লেষণের সারাংশ থেকে সরেনি।

দ্বিতীয়ত, 'অনুৎপাদক' কাজ এই কথাটির মার্ক্সীয় পরিভাষায় একটি যোগরূঢ় অর্থ আছে, তা হলো যে কাজের থেকে কোনো বিনিময় মূল্য উৎপন্ন হয়না। কিন্তু অনেক কাজ আছে যার থেকে বিনিময় মূল্য উৎপন্ন না হলেও তার সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম, যেমন মায়ের দ্বারা সন্তানের লালনপালন। লেনিন যখন গৃহশ্রমকে ‘অনুৎপাদক' বলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই তার সামাজিক মূল্যকে অস্বীকার করেন না। বরং তাঁর প্রতিপাদ্য এটাই যে গ্রামের এই বিরাট সামাজিক শক্তিকে পরিবারের চৌহদ্দির মধ্যে আটকে রেখে তাকে পচিয়ে তোলা হয়েছে। একইভাবে গণিকাবৃত্তি ‘অনুৎপাদক' একথা বলে লেনিন অবশ্যই নরনারীর মধ্যে যৌনসম্পর্কের সামাজিক মূল্যকে হেয় করছেন না, নারীর যৌন ক্ষমতাকে বিক্রেয় 'সামগ্রী'তে পরিণত করার মধ্যেই বরং নারীর ব্যক্তিসত্তা থেকে এই ক্ষমতাকে বিচ্ছিন্ন করার অশুভ লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন তিনি। তার সামাজিক তাৎপর্যের বিনাশ ঘটেছে বলেই সে অনুৎপাদক।

তৃতীয়ত, সোভিয়েত রাশিয়াতে সমাজতন্ত্র নিয়ে যেসব পরীক্ষানিরীক্ষা চলছিল, তার উদ্দেশ্য - অন্তত লেনিন যেভাবে দেখেছিলেন - ছিল মানবসম্পর্কের সামাজিকতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। যান্ত্রিকভাবে সমস্ত মানুষকে সোভিয়েত রাষ্ট্রগঠনের উপকরণে পরিণত করা নয়। তার মধ্যে যে উপকরণবাদী ঝোঁক ছিল না এমনটা নয়। বিশেষত, স্টালিনের আমলে নানাভাবে এর বৃদ্ধি ঘটে এবং তা বুর্জোয়া বিশ্বে এই প্রচারের ইন্ধন জোগায় যে মানুষকে রাষ্ট্রের উপকরণে পরিণত করে সোভিয়েত রাশিয়া ব্যক্তিসত্তাকেই বিসর্জন দিতে চাইছে। এই বিতর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে না থাকলেও এটুকু বলা যায় যে, অন্তত বিপ্লবের প্রথম দশকগুলিতে সরকার পরিচালনা ও অর্থনৈতিক-সামাজিক স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে স্টিমরোলার চালিয়েই সামুহিক সত্তাকে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছিল একথা সত্য নয়। সমাজগঠনের কাজে সব মানুষকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া যে অনেক অভাবনীয় সৃজনশীল চিন্তা ও কার্যক্রমেরও জন্ম দিচ্ছিল তার সাক্ষ্য রবীন্দ্রনাথের 'রাশিয়ার চিঠি'তেই তো যথেষ্ট রয়েছে। আমরা যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি তার মোকাবিলাও যে নবগঠিত সোভিয়েত রাষ্ট্রে নিছক যান্ত্রিকভাবে করা হচ্ছিল না তার বিশদ প্রমাণ পাওয়া যায় আলেকজান্দ্রা কলোনতাই-এর নানা লেখায়, যেখানে লেনিনের যুক্তির সারাৎসারকে গ্রহণ করেই তিনি তার প্রয়োগ করার চেষ্টা করছেন রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে।

কলোনতাই-এর যে রচনাটি তাঁর চিন্তার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ তা হলো Prostitution and Ways of Fighting it যা তিনি পেশ করেছিলেন ১৯২১ সালে গোটা সোভিয়েত রাশিয়ার সরকারি নারীবিভাগগুলির আঞ্চলিক পরিচালকদের তৃতীয় সম্মেলনে। এখানে তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় বলছেন শ্রমিকশ্রেণির প্রজাতন্ত্রে দেহব্যবসায়ের কোনো স্থান নেই, এটা কমিউনিস্ট নৈতিকতার সম্পূর্ণ বিরোধী। কিন্তু এই শিশুরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক-সামাজিক সংকট কিছুটা অন্যরূপে হলেও এই ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত ঘটাচ্ছে এবং সরকার এ-পর্যন্ত এবিষয়ে কোনো পরিষ্কার নির্দেশ না দেবার ফলে স্থানীয়ভাবে কোথাও তা অবাধে চলছে, কোথাও বা একে ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য করে এই মেয়েদের জবরদস্তি শ্রম-শিবিরে ভর্তি করা হচ্ছে। অথচ ‘অপরাধপ্রবণ’ (pathological) মানসিকতার কারণে যে মেয়েরা এই বৃত্তি গ্রহণ করে তা আদৌ নয়, এর কারণটা সামাজিক-অর্থনৈতিক। তিনি আরো বলেন যে, কেবলমাত্র এই বৃত্তিটিকেই সমাজ প্রাক-বিপ্লব শ্রেণিসমাজ থেকে বয়ে আনেনি, বিপ্লবোত্তর সময়ে তার সম্পর্কে সেই পুরোনো দু'মুখো মানসিকতার প্রভাবও এখনো আমাদের নিজেদের মনেই রয়ে গেছে।

বিপ্লবোত্তর সমাজ একদিকে মেয়েদের মধ্যে জাগিয়েছে এই চেতনা যে, নারীপুরুষের সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মতি ও সহমত। অন্যদিকে মেয়েদের পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে এই বহু শতাব্দীর সংস্কারকে জিইয়ে রাখতে সাহায্য করছে মেয়েদের ক্ষেত্রে এখনো বিদ্যমান অর্থনৈতিক অসাম্য ও তাদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। খাদ্যের অভাব, বাসস্থানের অভাব, অসম বেতন (সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী যদিও তারা সমান মজুরির অধিকারী) তাদের ঠেলে দিচ্ছে গণিকাবৃত্তির দিকে বিশেষত যেসব ক্ষেত্রে বিবাহের মাধ্যমে পুরুষের কাছ থেকে ভরণপোষণের আশ্বাস মিলছে না। বিবাহের মতোই গণিকাবৃত্তিও নারীর আর্থিক পরনির্ভরতার প্রয়োজনের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে। কলোনতাই এবৃত্তিকে বলছেন "the inevitable shadow of the official institution of marriage'। সম্পত্তির লেনদেন এবং তার বংশানুক্রমিক সংরক্ষণ যতক্ষণ বিবাহের মূল ভিত্তিহিসাবে স্বীকৃতি পাবে, ততক্ষণ গণিকাবৃত্তিও থাকবে কারণ মেয়েদের কাজের জগতে উপস্থিতিও থাকবে প্রান্তিক; ঘরগেরস্তি এবং যৌন-পরিষেবা জোগানোই হবে তাদের মূল কাজ। গণিকার পরিষেবায় অর্থের বিনিময় হবে অবশ্যম্ভাবী কারণ গৃহবধূর মতোই বেঁচে থাকার জন্য পুরুষের রোজগারের ওপরেই তাকে নির্ভর করতে হবে। এই কারণেই তার আয়কে নানাবিধ unearned income - এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, তাকে বলা হয়েছে ' person who lives off others'।

একটি জিনিস এখানে লক্ষণীয় যে, গণিকাদের কাজে লাগিয়ে যারা তার থেকে মুনাফা আহরণ করে সেই পরজীবী শ্রেণির কথা এখানে প্রায় নেই, এখানে 'পরজীবী' বলে চিহ্নিত গণিকারাই, যুগ যুগ ধরে প্রচলিত একটি সামাজিক প্রথাকে তারা নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদে জিইয়ে রাখছে, কারণ তাদের অন্য নিরাপদ জীবিকা নেই। হয়তো কলোনতাই এটাই বলতে চাইছেন যে, বিপ্লবোত্তর যুগে গণিকাবৃত্তি থেকে মুনাফা আদায় করা লোকগুলিকে কোণঠাসা করা গেছে। লণ্ডন প্যারিসে যারা 'শ্বেত ক্রীতদাস' নিয়ে রমরমা ব্যবসা করে সোভিয়েত রাশিয়াতে তারা গর্তে ঢুকতে বাধ্য হয়েছে। এখনো এখানে গণিকাবৃত্তিতে যারা রয়েছে তাদের অনেকেই আংশিক সময়ে কোনো উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত। কিন্তু তাতে তাদের ভরণপোষণ হচ্ছে না বলেই তারা দেহবিক্রয়ে বাধ্য হচ্ছে মেয়েদের চিরাচরিত পরগাছার ভূমিকারই অনুসরণে। কলোনতাই-এর মতে এই মেয়েরা স্ব-উদ্যোগেই এই ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে এমন মনে হলেও তারা বস্তুত স্বাধীন নয়, আত্ম-অবনমনের গ্লানি এই বৃত্তির গায়ে লেগেই থাকবে কেন না দেহব্যবসার জীবন পরগাছারই জীবন। এইজন্যই সামাজিক কাজে তাদের সংযুক্তির প্রয়োজন, যাতে স্বনির্ভরতার পরিসরে তারা মুক্তি পায়। একমাত্র তাহলেই যৌনজীবনেও তারা স্ব-ইচ্ছার প্রয়োগ করতে পারবে।

আগেকার মার্কসবাদী চিন্তার সঙ্গে এই প্রেক্ষিতের যোগসূত্র কোথায়? প্রথমত কলোনতাইও স্বীকৃতি দিয়েছেন গণিকাবৃত্তির সামাজিক-অর্থনৈতিক ইতিহাসকে, শুধু তাই নয়, তার নাড়ির যোগ লক্ষ্য করেছেন ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ও নারীর জন্য একগামী পরিবারের উত্থানের সঙ্গে। দ্বিতীয়ত, শ্রেণিসমাজে  বিবাহের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক এবং দেহব্যবসার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক - এই উভয়ই যে আর্থিক লেনদেনের উপর নির্ভরশীল এই বাস্তবকে কলোনতাই তাঁর বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন; একটি যে অন্যটিরই পরিপূরক তা পরিষ্কার তাঁর বয়ানে। তৃতীয়ত, উভয়কেই তিনি ‘অনুৎপাদক' শ্রমের পর্যায়ে ফেলেছেন একটি বিশেষ অর্থে। যৌনসম্পর্কের যে সামাজিক মূল্য তা বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে যখন নিজের যৌনতৃপ্তির ক্ষমতাকে নারী নিজের ব্যক্তিসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিক্রেয় ‘সামগ্রী'তে পরিণত করছে। মধ্যস্বত্বভোগীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি না থাকলেও এই বিচ্ছিন্নতার গ্লানি দূর হওয়ার নয়। বস্তুত বিবাহসম্পর্কের মধ্যেও এই লেনদেনের খেলাই চলছে। কলোনতাই-এর ব্যবহৃত এই সবক'টি যুক্তিই মার্ক্সীয় চিন্তাভাবনার পূর্বধারাকে আরো ফলিয়ে তুলতে সাহায্য করে। শ্রেণিহীন সমাজের অভিমুখী উদবর্তনে লেনদেনভিত্তিক একগামী পরিবার এবং দেহব্যবসা এই দুইয়েরই অন্ত ঘটবে, নারীপুরুষের সম্পর্ক হবে সমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, এ বিশ্বাসও সেই চিন্তাভাবনা থেকেই উদ্ভূত। কিন্তু কলোনতাই ভোলেননি যে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রের যারা পরিচালক তাদের এ ব্যাপারে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। ভবিষ্যতের আশায় বর্তমানকে এড়িয়ে গেলে চলবে না।

কলোনতাই-এর চিন্তার গুরুত্ব এইখানে যে, দেহব্যবসার সামাজিক-ঐতিহাসিক তত্ত্ব আলোচনার পাশাপাশি এখানে আমরা প্রথম দেখি মার্কসবাদের প্রতিষ্ঠাতারা যেকথা বলেছিলেন এক নতুন সমাজে তাকে প্রয়োগ করার বাস্তব প্রচেষ্টা। বুর্জোয়াসমাজের অভ্যন্তরে সমাজসেবার আঙ্গিকে গণিকাদের বিপন্ন পরিস্থিতির উন্নয়নের চেষ্টা বা তাদের সেখান থেকে 'উদ্ধার' করার কার্যক্রম আগে থেকেই বর্তমান। কিন্তু কলোনতাই-এর প্রকল্প এর থেকে অন্যরকম। একদিকে তার উপজীব্য নতুন সমাজের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ দেহব্যবসার সম্পূর্ণ উচ্ছেদ, অন্যদিকে আবার এই মেয়েদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াইয়ের বাধ্যবাধকতার কারণগুলিকেও তিনি লেনিন কথিত রোমান্টিকতার প্রভাবে এড়িয়ে যাননি। মার্কসবাদের প্রেক্ষিত থেকে যাঁরা এই সমস্যাটির আজ মোকাবিলা করার চেষ্টা করবেন, কলোনতাই-এর কাছে তাঁদের অনেক শেখার আছে।

যেমন, গণিকাদের ‘পরজীবী’র মধ্যে ফেলেও তিনি বিরোধিতা করেছেন জোর করে তাদের শ্রমশিবিরে ভর্তি করার বা তাদের শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রের নিরিখে 'অপরাধী' বলে গণ্য করার। তাঁর যুক্তি, তাহলে কেন 'পরজীবী’ বিবাহিতা নারীর ওপরেও একই দাওয়াই প্রয়োগ করা হবে না? তাদের বিরুদ্ধেও তো সামাজিক কাজ থেকে পলায়নের (labour desertion) অভিযোগ আনা যায়। কলোনতাই-এর মতে যারা নিজেদের আয়ের ঘাটতি পূরণ করার তাগিদেই দেহব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে তাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে সহানুভূতির সঙ্গে, তাদের আয় বাড়ানোর এবং মজুরির হারে সমতা আনার ব্যবস্থা করে, তাদের বাসস্থান সুনিশ্চিত করে এবং শ্রমিক হিসাবে তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়ে। যদি শান্তিই দিতে হয় তাহলে আগে চিহ্নিত করা দরকার তাদের যারা দেহব্যবসাকেই লাভের জন্য একমাত্র বৃত্তি বলে গ্রহণ করেছে এবং দালালির মাধ্যমে অন্যদের ব্যবহার করছে। কারণ যে রাষ্ট্রে সমাজগঠনের জন্য সবাইকেই শ্রম করতে হবে এবং প্রাপ্য রুজি তার থেকেই আহরণ করতে হবে, সেখানে অন্যের রুজিকে নিজের লাভের জন্য ব্যবহার করার নিয়মিত অভ্যাসটাই অপরাধ। কলোনতাই অক্টোবর বিপ্লবের পরে সোভিয়েত সরকারের সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রথম কমিশার ছিলেন। তাঁরই উৎসাহে সোভিয়েত নারীর সম অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে কমিশন বা 'সেনোৎডেল' গঠিত হয় তার পরিচালনার ভার ছিল তাঁর ওপর এবং দেহব্যবসা নিয়ে লাগাতার প্রচার ও কাজের ধারা সক্ষম হয়েছিল রাশিয়া থেকে এই অভিশাপকে প্রায় দূরীভূত করতে, যদিও স্টালিনের আমলে 'সেনোৎডেল'-এর কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে এই যুক্তিতে তার ঝাঁপ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ওপরের আলোচনাটি থেকে একথা স্পষ্ট যে, মার্ক্সীয় চিন্তার গোড়াপত্তন থেকেই আলোচ্য বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশার কোনো জায়গা রাখা হয়নি, এবং এর নিরসনে কোনো শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে শুধু চর্চা নয় চর্চারও প্রয়োজন স্বীকৃত হয়েছে। অন্যদিকে এটা সমাজের পক্ষে ‘প্রয়োজনীয়’ একটি পরিষেবা এবং শুশ্রূষা বা বিনোদনেরই একটি বিশেষ দিক এই রোমান্টিকতায় ফেঁসে না গিয়ে মার্ক্সীয় বিশ্লেষণ সবসময়েই বোঝার চেষ্টা করেছে এই পরিষেবা কেন এবং কীভাবে শ্রমের উদ্ভূত বাহিনী - বিশেষত তার মধ্যেকার নারীদের ব্যবহার করছে এবং শ্রেণিসমাজের এই পরিষেবার প্রয়োজনকে নিজেদের ব্যক্তিক প্রয়োজন হিসাবে আত্মস্থ করতে বাধ্য করছে। একগামী পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে দেহব্যবসার ইতিহাসের অঙ্গাঙ্গী যোগ এই বিশ্লেষণের আবশ্যিক অঙ্গ। এই সূত্রগুলিকে ব্যবহার করেই আমরা পুঁজিবাদের একেবারে সাম্প্রতিক প্রেক্ষিতে পাচার ও দেহব্যবসা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্ট করতে পারি এবং পুঁজিবাদের নতুন চরিত্রের সঙ্গে এই সব প্রক্রিয়ার প্রকৃত উৎসকে লুকিয়ে রাখার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলির মিল দেখতে পাই।

মার্কস ও এঙ্গেলস যখন লিখছিলেন তখন পুঁজিবাদী শ্রমনিয়োগের এবং শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের একটি প্রধান ক্ষেত্র ছিল কারখানা, যেখানে অনেক শ্রমিক বহু বিভিন্ন কাজে একত্র নিয়োজিত ছিল। কিন্তু তখনও কারখানার বাইরে ছিল শ্রমের বিপুল উদ্বৃত্ত বাহিনী এবং তারও বাইরে ছিল দখল করা উপনিবেশগুলিতে বিস্তৃত বিনামজুরির বা স্বল্পমজুরির শ্রম-নিষ্কাশনের বিশাল জাল, পুঁজিবাদের বিকাশে যার গুরুত্ব অর্থনীতিবিদেরা ক্রমেই বেশি করে অনুধাবন করছেন। বিংশ শতাব্দী জুড়ে নানা উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে যেমন সংগঠিত শ্রমিকেরা এই ব্যবস্থার মধ্যেও অধিকারগুলির জন্য কিছু স্বীকৃত পরিসর আদায় করতে পেরেছেন তেমনই উপনিবেশগুলিতেও চলেছে স্বতন্ত্রতার লড়াই যার মধ্য দিয়ে তোরা সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মুনাফা হ্রাসের এই সংকট থেকে উদ্ধার পাবার জন্য ও মুনাফার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য বিশ্ব-পুঁজিবাদকে শোষণের নতুন উপায় আবিষ্কার করতে হয়েছে। খুব সাদামাটা ভাষায় বলতে গেলে ‘সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন’ বা নয়া-উদারবাদের এটাই হলো উৎস।

এর একদিকে রয়েছে কর্মসংস্থানহীন বৃদ্ধি, কারখানাগুলির বিনাশ এবং চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী অসংগঠিত শ্রমের ব্যবহার আর অন্যদিকে রয়েছে জমি-জল-জঙ্গল প্রভৃতি প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপক লুণ্ঠন ও আগ্রাসন, যার ফলে তার ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলি অসহায় সর্বহারাতে পরিণত হচ্ছে। এই দ্বিতীয় ঘটনা শুধু বৃহদাকার কর্পোরেট প্রকল্পের নামেই ঘটছে না, তা ঘটছে যুদ্ধ-সাম্প্রদায়িক হিংসা- প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছিদ্রপথ দিয়েও। বিশ্বের নানা জায়গায় লক্ষ লক্ষ মানুষ এর ফলে নিরাশ্রয় যাযাবরে পরিণত হচ্ছেন এবং স্থান থেকে স্থানান্তরে অন্নের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যদিও বলা হয় এঁরা পরিস্থিতির শিকার এবং এঁদের প্রকৃত অর্থে ‘পরিযায়ী শ্রমিক' বলা যায় না- 'পরিযায়ী শ্রমিক’ তাঁরাই যাঁরা স্বেচ্ছায় আরো ভালো বোঝাগারের সুযোগ নিতে অন্যত্র যান-তবু বাস্তবে সারাবিশ্বে নারীশিশু পরিযায়ী শ্রমিকের বেশুমার সংখ্যাবৃদ্ধি অন্য এক ইঙ্গিতও বহন করে; জীবনের মান-উন্নয়নের জন্য দেখায় প্রবাসী শ্রমিক এবং দুর্দশাপীড়িত উদ্বাস্তু মানুষ এই দুইয়ের মধ্যে ভেদরেখা এক জায়গায় গিয়ে আজকের পরিস্থিতিতে খুবই অস্পষ্ট হয়ে যায়।

পরিযায়ের নামে পাচারের বৃদ্ধি আজ এক বাস্তব ঘটনা এবং দেহব্যবসায় যুক্ত নারীদের ক্ষেত্রে যেমন 'স্বাধীন জীবিকা-নির্বাচনের' অধিকারের ধুয়ো তোলা হয়, ঠিক তেমনই পরিযায়ী শ্রমিকের স্বাধীনতার কথাও অনেকসময়েই তার বিপর্যস্ত অবস্থার প্রসঙ্গকে এড়িয়েই নয়া উদারবাদী সংলাপের মধ্যে অবাধে ব্যবহৃত হয়। এই দু'টি ধুয়োর মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক আছে। এর মানে নিশ্চয়ই এই নয় যে, নানাধরনের মানুষ রোজগারের সন্ধানে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বসবাস করতে পারবেন না, যেমনটা ইয়োরোপ আমেরিকার অতি-দক্ষিণপন্থীরা বলে থাকে। পরিযায়ী শ্রমিকের অধিকারের সুরক্ষার জন্য স্পষ্ট নীতি চাই বইকি। তেমনই চাই ছিন্নমূলের অসহায়তায় শ্রমজীবী মানুষের অধিকার যাতে না হারিয়ে যায় তার জন্য নিজভূমির সংগ্রাম।

মার্কস-এর মতানুযায়ী উদ্বৃত্ত শ্রমের বাহিনী যতো বাড়ে ততো তার তলার দিকে অবধারিত হয় শ্রমের অবমূল্যায়ন এবং শ্রমিকের নৃশংস ক্রীতদাসসুলভ শোষণ। নয়া উদারবাদের যুগে এর তাৎপর্য আমাদের কাছে নতুন রূপ নিয়ে আসে। শ্রমিকের জীবনের অন্তর্নিহিত অধীনতা এই পর্বে আরো প্রকট এবং ব্যাপক হয়ে ওঠে, যখন কারখানাভিত্তিক সংগঠিত শ্রম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং সমস্ত ক্ষুদ্র উৎপাদককে কর্পোরেটের ছত্রছায়ায়া আসতে বাধ্য করা হয়। বিশ্ব-বাজার ঢুকে পড়ে মানুষের ব্যক্তিক জীবনের মধ্যেও এবং সেই জীবনের যে অংশ আগে বিক্রয়যোগ্য বলে গণ্য হত না, সেসবেরও পণ্যায়ন ঘটাতে শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হয়। এই পরিস্থিতিতেই কেউ কেউ দেহব্যবসাকে সামাজিক উপযোগিতার সার্টিফিকেট দেবার চেষ্টা করেন শুশ্রূষা বা 'বিনোদন' বলে, কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত এই ধরনের ঘরোয়া কাজের মূল্যও আজ শ্রমের বাজারে কতো কম। যারা গৃহপরিচারিকা বা সেবিকার কাজ করেন তাঁরা সবচাইতে কম বেতনে সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন অবস্থান কাজ করেন; এমনকী সরকারি প্রকল্পেও ঘরোয়া কাজের পরিপূরক হিসাবে যাঁদের দেখা হয় সেই অঙ্গনওয়ারি বা আশাকর্মীরা বা মিড-ডে মিলের রাঁধুনিরা তো কর্মী হিসাবে স্বীকৃতই নন। মজুরি নয়, তাঁরা ভাতাটুকুই পান। দেহব্যবসাকেও ব্যক্তিক যৌন প্রয়োজনের পরিপূরক হিসাবে 'সমাজসেবা'র তকমা দেওয়া নিষ্ঠুর রসিকতা।

যাঁরা নয়া-উদারবাদের অর্থনীতি এবং তার মধ্যে শ্রমের উপযোগ নিয়ে কাজ করেছেন তাঁদের মতে দক্ষিণ এশিয়া, সাহারা-সংলগ্ন আফ্রিকার অংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে নারী শ্রমজীবীদের একটা বড়ো ভাগই যুক্ত রয়েছে এমন বহু কাজের সঙ্গে যাকে 'নিরাপত্তাধীন কাজ’ (vulnerable work) বলা হয়েছে। তাঁরা বলেছেন, আংশিক সময়ের কাজ, একপেশে চুক্তি ইত্যাদি স্বীকৃত নিরাপত্তাহীন কাজ ছাড়াও আরও নানাধরনের নামগোত্রহীন কাজের ক্ষেত্রে এদের ভিড় করতে দেখা যাচ্ছে যার বিবরণ কোনো অর্থনৈতিক নথিতে পাওয়া যাবে না। বলা হচ্ছে, মজুরিতে যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে তার একটি বড়ো কারণ নারীশ্রমিকের এই প্রান্তীকরণ। পরিযায়ী নারীশ্রমিকদের গতিবিধি অনুসরণ করলেও দেখা যাবে রোজগারের সংকটের একটি বড়ো দিক হলো মজুরির ক্ষেত্রে লিঙ্গ-অসাম্য। ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে শ্রমের ক্ষেত্র থেকে মেয়েদের ক্রম-অপসারণ এবং শহর অঞ্চলে তাদের শ্রমে কম অংশগ্রহণ মেয়েদের রোজগারের বিশেষ সংকটকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। এমন কী কারো কারো মতে এই সংকটের ফলে নতুন করে উত্থান হচ্ছে প্রাক-পুঁজিবাদী যুগের খোলাখুলি জবরদস্তিমূলক কিছু শোষণ প্রক্রিয়ার যা নারী শ্রমিকদের ওপর বিশেষভাবে প্রযোজ্য। দেহব্যবসা এর থেকে মুক্তির কোনো পথ দেখায় না, বরং নয়া উদারবাদের যুগে নারীশ্রমের ব্যবহারের পশ্চাৎমুখী প্রক্রিয়ার উদাহরণ হিসাবেই তার উপস্থিতি। বলা যেতে পারে আরো নানারকম ক্রীতদাসত্বমূলক প্রক্রিয়ার তুলনায় তা খারাপ নয়, কিন্তু সেগুলোর তুলনায় এই বৃত্তি কিছু ভালোও নয় কারণ শ্রম বাজারে নারীর শ্রমের মূলা কতোটুকু এই বৃত্তি তারই পরিচায়ক।

দেহব্যবসা আজ মনুষ্যপাচারের বিশ্বজোড়া ফাঁদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। হতে পারে যে তা আজ আর কিছু পাড়ায় বা এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এই ব্যবসায় বেশি দেখা যাচ্ছে তাদের যারা ভ্রাম্যমাণ। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে এই মেয়েরা কোনো স্থানীয় মালিকের এক্তিয়ারে বসবাস না করলেও তাদের আয়ে ভাগ বসায় হোটেলমালিক, এসকর্ট এজেন্সি, মদ ও নেশার দ্রব্যের কারবারি ও স্থানীয় মস্তান যারা প্রকৃতপক্ষে এই ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং দুনিয়া-জোড়া ব্যবসার জালকে এলাকায় এলাকায় ছড়াতে সাহায্য করে। আজকাল অনেকসময়ে শোনা যায় যে, কিছু মধ্যবিত্ত গৃহবধূ এবং কলেজ ছাত্রীরাও নিজেদের খরচের জন্য বেশি পয়সা আয় করার আশায় নাকি দেহব্যবসায় যোগ দিচ্ছে। প্রাণের দায়ে নয় নিজের ইচ্ছায় যারা এই বৃদ্ধিতে আসে তাদেরই উদাহরণ হিসাবে এদের তুলে ধরা হয়। কিন্তু পূর্বে বর্ণিত কিছু বলীয়ান মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া কারো পক্ষেই এই ব্যবসা চালানো সম্ভব হয় না। এই মধ্যস্বরভোগীরাই ভিন্নশ্রেণি থেকে আসা মেয়েদেরও নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের পক্ষেও স্বাধীনতা আকাশকুসুম। দরিদ্র মেয়েদের তো কথাই নেই। বস্তুত কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে কিছু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অল্পবয়সী মেয়েদের গণিকাবৃত্তিতে দীক্ষিত করার যে পরম্পরাগত প্রধা আছে বর্তমান সময়ে তাদের হাভাতে অবস্থা আরো বেড়ে যাওয়ায় এই প্রথারও পুনরুত্থান হচ্ছে আন্তঃরাজ্য পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে। দেহব্যবসার আইনিকরণ তাই যারা ব্যবসাটা চালায় তাদেরই বৈধতা দেবে, দেহব্যবসায় যুক্ত মেয়েরা বৈধতালাভের জনা দালালদের ওপরেই আরো নির্ভর করবে।

আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত পাচারবিরোধী যে আইনটি আছে। এবং তা ছাড়াও অপহরণ বা জবরদস্তি অবৈধ কাজে কাউকে লাগানোর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধিতে যে ধারাগুলি আছে, সেসবে বরাবরই বিস্তর ফাঁক রয়েছে, সাজা পাবার ঘটনাও খুব কম। আইনে মোটামুটি গণিকালয়গুলিকেই নারীপাচারের একমাত্র গন্তব্যস্থল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাচারের অন্য উদ্দেশ্যগুলিরও যে এ আইনে জায়গা থাকা দরকার তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু নতুন আইন তৈরির যে উদ্যোগ চলছে তার মধ্যে পাচারকে সম্পূর্ণই দেহব্যবসা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার এক মারাত্মক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে যার পিছনে অবশ্যই ‘আইনিকরণে'র প্রবক্তারা রয়েছেন। পুরোনো আইনেও দুই ব্যক্তির মধ্যে অর্থের বিনিময়ে স্বেচ্ছায় যৌন পরিষেবার চুক্তিকে অপরাধ গণ্য করা হয়নি। তৃতীয় ব্যক্তি কাউকে ভাড়া খাটিয়ে লাভ করলেই তা অপরাধ বলে গণ্য। দেহব্যবসার থেকে যে অন্যের শ্রম থেকে মুনাফা তোলার প্রক্রিয়াটি অবিচ্ছেদ্য নতুন আইনে তার উল্লেখই যদি না থাকে, তাহলে যারা প্রকৃতপক্ষে ব্যবসাটি চালায় তারা তো বহাল তবিয়তেই থেকে যাবে। মেয়েদের ওপর শোষণ আরো বাড়বে।

পুরোনো আইনের আরো গলদ আছে যার অবসান নতুন আইন প্রণীত হলে সুনিশ্চিত করতে হবে। ঐ আইনের মূল লক্ষ্য সমাজের 'সুস্থ' অংশে যাতে এই 'কলঙ্কিত' মেয়েরা প্রভাববিস্তার করতে না পারে সেটাই দেখা, যার ফলে আমরা অনেক সময়েই দেখি পাচারের শিকার মেয়েটিকে 'উদ্ধার' করে তাকেই অপরাধীর মতো পুলিশ হেফাজতে আটকে রাখা হচ্ছে, বা সে সংশোধনাগারে বন্দীজীবন কাটাচ্ছে। দেহব্যবসার বিচ্ছিন্ন গোপন দুনিয়াতে নানা উৎকট নেশার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যারা দীর্ঘদিন এই ব্যবসায় কাটিয়েছে, বাইরের 'সুস্থ' সমাজের সঙ্গে আবার যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া এমনিতেই তাদের পক্ষে জটিল ও কঠিন। সেকারণে এবং বিকল্পহীনতাবশত অনেকসময়েই তারা একথা বলে দিতে রাজি থাকে যে তারা স্বেচ্ছায় এ পেশায় এসেছে, পাচারের শিকার হয়ে নয়। যদিও তাদের ৯৯ শতাংশই আসলে একেবারে গোড়ায় কোনো না কোনো ব্যক্তির মাধ্যমেই এই ব্যবসার দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছিল। কিন্তু আইনের মধ্যেই তাদের অপরাধীহিসাবে আটকে রাখার ব্যবস্থাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় কলোনতাই-এর সাবধানবাণীকে। তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন এ ধরনের আইন বুর্জোয়া ভণ্ডামির প্রভাবেরই ফল। নতুন আইনে এই মানসিকতা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। অন্যদিকে পাচারকারী এবং মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের 'বৃত্তির স্বাধীনতা'র অজুহাতে ছাড় দেওয়া যাবে না। আজকের সমাজে এই মেয়েদের মানবিক অধিকারকে অন্তত কিছুটা বাঁচাতে কোনো পূর্ণাঙ্গ আইনের পরিকল্পনা যদি আমরা করি তবে মার্ক্সীয় প্রেক্ষিত তার জন্যও জরুরি। কারণ একমাত্র এই প্রেক্ষিতই আমাদের দেখায় পুঁজিবাদী সমাজের মুনাফা-লালসা এবং উদ্বৃত্ত শ্রমবাহিনীর নৃশংস শোষণ কীভাবে একসূত্রে বেঁধেছে পাচারব্যবসা এবং দেহব্যবসাকে।

নয়া উদারবাদের যুগে যখন সংগঠিত কারখানার শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমেই কমিয়ে আনা হচ্ছে, কৃষি এবং সংশ্লিষ্ট কাজের এলাকাগুলি থেকে যখন ক্ষুদ্র উৎপাদকেরা ক্রমেই উৎখাত হচ্ছে, তখন শ্রমের ক্রমবর্ধমান উদ্বৃত্ত বাহিনী - যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য অসংগঠিত শ্রমজীবী এবং তাদের নিত্যসঙ্গী মার্কস-কথিত 'বিনষ্ট প্রোলেতারিয়ান’রা আমাদের আরো অনেক বেশি মনোযোগ দাবি করছে। এদেরই একাংশ সেই পাচার হওয়া ছিন্নমূল দেহব্যবসায় যুক্ত নারীদের কথাও তাই ভুললে চলবে না। যে-সমস্ত এলাকায় কাজ করতে গিয়ে আমরা তাদের মুখোমুখি হচ্ছি সেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানারকম স্থানীয় অধিকারের লড়াই চলে যার সঙ্গে আমরা একাত্ম হবার চেষ্টা করি। সেখানে এই মেয়েদের মানবিক অধিকারের জন্য লড়াইতেও আমাদের অংশগ্রহণ কি জরুরি নয়? বলা যেতে পারে এ কাজ তো এন জি ও রাও করে। কিন্তু তাদের সঙ্গে কাজ করতে আমাদের বাধা কোথায় যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট থাকে? এন জি ও-দের সঙ্গে আমাদের তফাৎ এটাই যে এই সীমিত লড়াইয়ের সঙ্গে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সেতুবন্ধন ঘটানোর কাজ একমাত্র আমাদের মধ্যস্থতাতেই হতে পারে। কাজের জন্য লড়াই, কাজের প্রকৃত মর্যাদার জন্য। লড়াই, মুনাফার দখলদারির বিরুদ্ধে লড়াইতে যেদিন জোয়ার আসবে, এই মেয়েরাও কি তাদের প্রকৃত শত্রুকে চিনে নিয়ে সেই লড়াইতে যুক্ত হবে না?

Dasgupta, Chirasree State and Capital in Independent India. 2015

Ghosh, Jayati Never Done and poorly Paid,

women's work in globalising India. Gothoskar S and Kaiwar A. 'Who says we do not work? Looking at sex work EPW, 49 (46), pp.54-64.

Karl Marx and Frederick Engels Collected Works, Vol. 3, 1975.

Karl Marx and Frederick Engels Selected Works. 1975

Mazumdar,I. Neetha, N. Agnihotri, I. 'Migration and Gender in India' EPW,48 (10) 54-64.

Papola, T.S. Social Exclusion and discrimination in the labour market' (Working Paper) 2012.

UNDP HIV and the Law: Risks, rights and health, 2012

UNDP, UNFPA. UNAIDS Sex Work and the Law in Asia and the Pacific 2012

UNWomen Note on Sex Work, Sexual Exploitation and Trafficking. 2013.


প্রকাশের তারিখ: ০৫-নভেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org