সংস্কৃতি রক্ষায় লেখকদের প্রতি

বের্টোল্ট ব্রেখট
যদি সংস্কৃতি জনগনের কৌম উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে, যদি সংস্কৃতির ব্যাপারটা একেবারে কড়ায়গণ্ডায় বাস্তবে বুঝে নেওয়ার বিষয় হয়, তাহলে একে নিয়ে যুঝতে পারা যাবে কেমন করে? সে কী নিজেই লড়তে পারে?
চার বছর আগে আমার দেশ যখন খানকতক ধারাবাহিক তাণ্ডবলীলা ঘোষণা করেছিল, তারপর সাংস্কৃতিক পরিসর একটা মৃত্যুঘন বিপদের আবর্তে সেঁধিয়েছে। ফ্যাসিস্ট দখলদারি দুনিয়ার নানা প্রান্তে মানুষকে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ঠ্যালা দিয়েছে। এই দখলদারি, মারদাঙ্গার উত্থান মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। তবে, তারপরও এর সাধারণ তাৎপর্য বিশেষত তাদের কাছে ধোঁয়াশা ঠেকেছে, যাঁরা বিক্ষুব্ধ হিসেবে বেশ গণ্যমান্য!

স্পেনের এই ঘটনা, গ্রাম আর শহর ধ্বংস করে মানুষকে শেষ করে দেওয়া তেমন নারকীয় লাগছে না আমার দেশে, যদিওবা নাটকীয় লাগে ফ্যাসিবাদের দৌলতে। একই ধ্বংসের আগুনে এরা গ্যুয়ের্নিকা জ্বালিয়েছে, যা আমার দেশে ১৯৩৩ সালের মে মাসে জ্বালিয়েছিল জার্মান ইউনিয়নের বাড়িগুলো পোড়াতে। প্রকাশ্য রাস্তায় ঘাতক বাহিনীর হাতে খুন হতে হতে চিৎকার করা মানুষগুলো গেস্টাপোর জেলে লাঞ্ছিত মানুষগুলোর কান্নার সাথে যুক্ত হয়ে এক মালসাট তৈরি করছে। ফ্যাসিস্ট একনায়করা এখন অত্যাচারের নানাবিধ তরিকা ভিনদেশের বুভুক্ষু জনতার ওপর প্রয়োগ করার জন্য রপ্তানি করছে, যা তারা ইতিমধ্যেই নিজের দেশের সবহারা মানুষের ওপর প্রয়োগ করেছে। তারা স্পেনীয়দের ইতালিয় আর জার্মানদের মত করেই আপ্যায়ন করছে। ফ্যাসিস্ট একনায়করা যখন এভিয়েশন সেন্টার বানায় তখন দেশের মানুষের জোটে না ভাতের সাথে নুন, আর বিদেশের মানুষের জোটে ভাতের বদলে বোমা। ইউনিয়ন একদিন রুখে দাঁড়িয়েছিল ভাতের দাবীতে আর এই বোমাবাজির বিরুদ্ধে। তাদের দমিয়ে দেওয়া গেছে। এমতাবস্থায় আর কার সন্দেহ আছে- এটা একই সিস্টেম, এই মিলিটারি আদানপ্রদান আর সাধারণ মানুষের শ্রম শুষে নেওয়ার প্রক্রিয়া আসলে পুঁজির দাবী?

যখন জার্মান ইতালিয়ান মজদুরদের ওপর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক আক্রমণ কাজে দিয়েছে, ইউনিয়নের কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা নামানো গেছে, প্রেসের অধিকার খর্ব করে গণতন্ত্রকে শূলে চড়ানো গেছে, তখন সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনা তো বাঁয়ে হাত কা খেল।

আমরা তখন খুব বুঝতে চাইনি যে ইউনিয়ন ধ্বংস করা আদতে সংস্কৃতির ওপরেই আক্রমণ। সংস্কৃতির ওপর আক্রমণের উদ্দেশ্যেই ওটা করা হয়। রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক ক্ষমতা হারিয়ে জার্মান আর ইতালিয়ান জনগণ তার সংস্কৃতি নির্মাণের তরিকাগুলোই হারিয়েছে। শ্রী গোয়েবলস নিজেই তার থিয়েটারে বসে হাই তুলছেন। স্পেনের মানুষরা দেশের মাটি এবং গণতন্ত্র রক্ষার জন্য মরণপণ লড়ছে, সেই লড়াই সৃংস্কৃতি রক্ষারও। এক হেকটর জমি বাঁচলে, প্রাডোতে রাখা পেন্টিঙের এক সেন্টিমিটার বাঁচে। (প্রাডো, মাদ্রিদ শহরের আর্ট গ্যালারি)। যদি এরকমই ব্যাপারস্যাপার হয়, যদি সংস্কৃতি জনগনের কৌম উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে, যদি সংস্কৃতির ব্যাপারটা একেবারে কড়ায়গণ্ডায় বাস্তবে বুঝে নেওয়ার বিষয় হয়, তাহলে একে নিয়ে যুঝতে পারা যাবে কেমন করে? সে কী নিজেই লড়তে পারে? সে নিজেই লড়ছে, কারণ সে লড়তে পারে। নানাস্তরে এই লড়াই। যারা সংস্কৃতির কর্মী, তারা বর্বরদের বিরুদ্ধে একত্রিত এই লড়াইতে। তারা শুধু অপরাধ বলেই ক্ষান্ত হয় না, তারা অপরাধীদের নাম করে চিহ্নিত করে, আর শাস্তি দাবি করে। অত্যাচারিতের প্রতি সহমর্মিতা তাকে বুঝিয়ে দেয়, অত্যাচারী ঘাতকদের প্রতি কোনও সহমর্মিতা নয়। মারদাঙ্গা ঘাতপ্রতিঘাতের ঘৃণাই তাকে প্রত্যাঘাত করতে শেখায়, প্রতিরোধ গড়তে শেখায়।

এই যুদ্ধ চলবে। চিনের আকাশে জাপানি হানাদার বিমানবাহিনী ঘুরপাক খাচ্ছে। ইথিওপিয়ায় যা চলছে তা বিচ্ছিন্ন নয়। এই সব যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলবে। যদি আমরা সংস্কৃতিকে একটা বাস্তব ব্যাপার মনে করি, তাহলে সংস্কৃতি বাস্তবিকই একটা অস্ত্র, আর বাস্তব অস্ত্র দিয়েই একে রক্ষা করতে হবে।

১৯৩৭ সালে লেখকদের দ্বিতীয় কংগ্রেসে বক্তৃতা 

ভাষান্তরঃ জয়রাজ ভট্টাচার্য

প্রকাশের তারিখ: ১০-ফেব্রুয়ারি-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org