তবু আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি

নন্দিনী মুখার্জী
আসলে গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে আধিপত্য বিস্তারের যে পরিকল্পনা আরএসএস–বিজেপি করে চলেছে– যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ এবং ২০শে আগস্ট ২০২৬-এর বাইরে থেকে আগত গুণ্ডাদের তাণ্ডব তারই একটি অংশ। এই তাণ্ডবের পরে পুলিশের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা এখনও নেওয়া হয় নি। এটাই প্রমাণ করে যে পুরোটাই শাসকদলের মগজ দখলের চক্রান্ত। এটা প্রথম নয়। বিজেপি এর আগেও বেশ কয়েকবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণ করার চেষ্টা করেছে। সে সময়ে যদিও তারা রাজ্যের ক্ষমতায় আসে নি। অধ্যাপক এবং ছাত্ররা একত্রিত হয়ে মানব বন্ধন করে সেই আক্রমণ রুখেছিল– সেই দৃশ্য হয়তো অনেকেরই মনে আছে। 

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আবার খবরের শিরোনামে। গত প্রায় ১৩-১৪ বছর ধরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বারবার খবরের শিরোনামে আসছে এবং প্রত্যেকবারই ভুল কারণে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের  কৃতিত্ব, পঠনপাঠনের উৎকর্ষ, পঠনপাঠনের বাইরেও ছাত্রদের নানান ক্ষেত্রে সম্মান অর্জন– এই সমস্ত কিছুই অনুচ্চারিত থেকে যায়। বারবার আলোচিত হতে থাকে এমন কিছু ঘটনা যাকে টেনে এনে বিশ্ববিদ্যালয়কে কালিমা লিপ্ত করা যায়।

কিন্তু সত্যি কি ঘটে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে – কেন তা বারবার খবরের শিরোনামে? ভারতবর্ষের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অনভিপ্রেত ঘটনা নতুন কিছু নয়। ছাত্র সংঘর্ষ, র‍্যাগিং, শিক্ষক নিগ্রহ, আত্মহত্যা ইত্যাদি বিভিন্ন ঘটনা প্রায় প্রতিদিন ঘটে চলেছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তার মধ্যে দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আই আই টি, আই আই এম বা অন্যান্য কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। কারণ “আঠারো বছর বয়সেই অহরহ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি”। আঠারো থেকে বাইশ বছরের “তীব্র আর প্রখর” প্রাণ প্রশ্ন করে, উত্তর খোঁজে, ভুল করে, ভুল থেকে শেখে। তাদের সংযত করা, ভুল শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব থাকে শিক্ষকদের, কর্তৃপক্ষের। কখনো সেখানেও ভ্রান্তি ঘটে, অন্যায় হয়– তাই রোহিত ভেমুলার প্রাণ অকালে ঝরে যায়। আবার যাদপুরের স্বপ্নদীপ হোক বা আই আই টি দিল্লীর ঋষিকেশ কুমার, অথবা সুরাটের জুনিয়র ডাক্তার– প্রতিটি মৃত্যুই বেদনাদায়ক, প্রবল যন্ত্রণা নিয়ে আসে মনে। 

কিন্তু প্রত্যেকবারই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা অনেকগুলি প্রশ্ন নিয়ে আসে সামনে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চত্বরে কেমন হওয়া উচিত ছাত্রদের ব্যবহার? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন মতামত বা রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের পরিসর থাকা উচিত? কর্তৃপক্ষ কতটা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন? শিক্ষক বা অধ্যাপকরা কিরকম ভূমিকা পালন করতে পারেন? 

আরও পড়ুনযাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়— সূচনা থেকে আজকের দিন  

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তমনা চিন্তাভাবনার কোন বাধা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অনেকগুলি ছাত্র সংগঠন – তা বামপন্থী হোক বা দক্ষিণপন্থী হোক – মত প্রকাশের স্বাধীনতা নীতিগতভাবে কখনো বাধা পায় না। ভিন্ন মতামতের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষ ঘটে থাকে। কিন্তু তা সাময়িক– বেশিরভাগ সময়ে ছাত্ররা নিজেরাই মিটিয়ে নিতে পারে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ভিন্ন ভিন্ন রঙ থাকলেও কোন বিশেষ রঙ-এর রংবাজী নেই। বাইরের রাজনীতির সঙ্গে ক্যাম্পাসের রাজনীতি বেশিরভাগ সময়েই মেলে না। ৩৪ বছরের বাম আমলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কটি ফ্যাকাল্টির ছাত্র সংসদ কখনোই ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের-এর হস্তগত হয় নি। বরং বাম আমলে একটা বড় সময় ধরে এবং তৃণমুল কংগ্রেসের শাসনকালেও যাদবপুরের তিনটি ফ্যাকাল্টির ছাত্র সংসদ তিনটি আলাদা আলাদা ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বাধীন ছিল। এই তিনটি ছাত্র সংগঠন ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাবর সক্রিয় থেকেছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তৃণমূল কংগ্রেস আমলে শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের আধিপত্যই প্রধানতঃ দেখা গেছে। মাত্র ১০০ দিন আগে সরকার বদলের পরে এই সমস্ত কলেজগুলিতেও আধিপত্যের বদল ঘটেছে। যাদবপুরের মুক্ত চিন্তার পরিসরে কিন্তু রাজ্যের বা কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসীন শাসকদল আধিপত্য বিস্তার করতে পারে নি। এই যে বিভিন্ন মতাদর্শের পাশাপাশি সহাবস্থান – এটাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উৎকর্ষের পেছনে অন্তর্নিহিত শক্তি। 

অথচ এই মুক্ত মনা ক্যাম্পাস রাজনীতির দিকেই বারবার আঙ্গুল তোলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে দেশদ্রোহী শক্তি এই ক্যাম্পাসে মাথাচাড়া দিচ্ছে। কার নির্দেশে জানা নেই – সাংবাদিককুলের একাংশ ক্যাম্পাসের আনাচে কানাচে খুঁজে বেড়াচ্ছে দেশদ্রোহী দেওয়াল লিখন। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং যাদবপুরে ১৫ই আগস্ট, ২৬শে জানুয়ারী পতাকা উত্তোলন হয় না, বন্দে মাতরম গাওয়া হয় না বলে মিথ্যা ভাষণ দিচ্ছেন। অথচ প্রত্যেক বছরই এই দিনগুলি যেমন মর্যাদা সহকারে পালিত হয়, তেমনি সমাবর্তনে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় স্তোত্র – দুইই গাওয়া হয়। যে শ্লোগান বা দেওয়াল লিখনকে দেশদ্রোহী বলা হচ্ছে তা কে বলেছে বা লিখেছে তার কোন প্রমাণ নেই। কোন ছাত্র? নাকি বহিরাগত? এই উত্তরগুলো তখনই পাওয়া যাবে যখন যথাযথ তদন্ত হবে বা কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু তদন্ত না করে যাদবপুরের ছাত্রকুলকে দাগিয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা তা সঠিক নয়। বরং স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা নিয়ে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্ম, সম্পূর্ণভাবে দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতির জন্য যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিগত ১২০ বছর ধরে লড়াই করে আসছে, তাকে বার বার দেশদ্রোহী তকমা যারা দিচ্ছে, বাস্তবে তারাই দেশদ্রোহী।         

আর একটা বিষয়ে বারবার এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা চলছে যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস যেন মদ, গাঁজা ও যৌনতার মুক্তাঞ্চল। এখানেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কতটা যুক্ত, নাকি কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এবং অপদার্থতার সুযোগ নিয়ে বহিরাগতরা এই ক্যাম্পাসকে তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করছে সেটাও তদন্ত করে দেখা দরকার। বেশ কয়েক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ও আধিকারিক পদে নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য যথেষ্ট কর্মী নেই। গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক পদ, যেমন রেজিস্ট্রার, ডিন অফ স্টুডেনটস, ফিনান্স অফিসার, ফ্যাকাল্টিগুলির অ্যাকাডেমিক ডিন ইত্যাদি পদ ফাঁকা। অস্থায়ীভাবে কোন অধ্যাপক বা অন্য আধিকারিকদের দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। এমন কি দীর্ঘ সময় ধরে উপাচার্যের পদ ছিল ফাঁকা। সরকার পরিবর্তনের পরেও গত প্রায় ১১৫ দিন ধরে অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় নি। অথচ এর মধ্যে অনেকগুলি বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগার কথা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক পরিস্থিতিও খুব খারাপ। প্রায় সমস্ত পরিকাঠামো ভেঙ্গে পড়ছে। গত ১২ বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা একেবারেই বন্ধ। রাজ্য সরকারও প্রত্যেক বছরের বাজেটের অর্ধেকও দিচ্ছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সঞ্চয় প্রায় নিঃশেষ। অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যর্থতার দায়ভার তুলে দেওয়া হচ্ছে ছাত্র এবং অধ্যাপকদের কাঁধে – বাস্তবে যাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে এই “নেই” রাজ্যের উৎকর্ষ এখনো বজায় থাকছে।

আরও পড়ুন —যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও নয়া জাতীয়তাবাদীগণ

আসলে গত ১১ বছর ধরে ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধ্বংস করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে শাসকদলের মদতপুষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠী। কখনো তা বাইরের থেকে, আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্র বা অধ্যাপকদের ব্যবহার করে। কিন্তু কেন বারবার এইভাবে আঙ্গুল উঠছে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে চিহ্নিত করে? কোন উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এইভাবে দিনের পর দিন অবমাননার শিকার হতে হয় না। ইটালির একটি অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণীকক্ষের বাইরের দেওয়ালে যৌনগন্ধী লেখা দেখেছি। ২০২৪ সালে আমেরিকার একাধিক কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে “Free Palestine”, “Genocide” ইত্যাদি গ্রাফিতি দেখা গেছে। সুতরাং দেওয়ালে নিজেদের মতামত লিখে রাখার জন্য শুধুমাত্র এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দায়ী করা যায় না। তবে দেশবিরোধী লেখা যদি সত্যিই কোন ছাত্র গোষ্ঠী লিখে রাখে, কর্তৃপক্ষকে তার তদন্ত করে সেই গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে হবে। যদি ছাত্রদের মধ্যে নেশার চল বাড়তে থাকে, তার জন্যও কর্তৃপক্ষকে কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। 

কিন্তু এই সমস্ত কাজ করার জন্য যে স্বাভাবিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা দরকার– গত কয়েক বছরে শাসক দলের আনুকুল্যে সেটাই তো অনুপস্থিত। 

আসলে গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে আধিপত্য বিস্তারের যে পরিকল্পনা আরএসএস–বিজেপি করে চলেছে– যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ এবং ২০শে আগস্ট ২০২৬-এর বাইরে থেকে আগত গুণ্ডাদের তাণ্ডব তারই একটি অংশ। এই তাণ্ডবের পরে পুলিশের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা এখনও নেওয়া হয় নি। এটাই প্রমাণ করে যে পুরোটাই শাসকদলের মগজ দখলের চক্রান্ত। এটা প্রথম নয়। বিজেপি এর আগেও বেশ কয়েকবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণ করার চেষ্টা করেছে। সে সময়ে যদিও তারা রাজ্যের ক্ষমতায় আসে নি। অধ্যাপক এবং ছাত্ররা একত্রিত হয়ে মানব বন্ধন করে সেই আক্রমণ রুখেছিল– সেই দৃশ্য হয়তো অনেকেরই মনে আছে। 


কোন গণতান্ত্রিক দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এইভাবে দখল করে আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্য নিয়ে শাসক দলের মিথ্যাচার, জোর করে গেট ভেঙ্গে প্রবেশ, ক্যাম্পাসের ভিতরে ভাঙচুর এবং গত দুদিন ধরে অধ্যাপক, শিক্ষাকর্মীদের নাম করে ব্যক্তিগত অপপ্রচার– এই সমস্ত কিছুই অভূতপূর্ব। এইভাবে যদি অধিকার কায়েম করা যায় তা শুধু একদিন-দুদিনের জন্য। অচিরেই শাসকের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রত্যাঘাত করে সাধারণ মানুষ– ইতিহাস তা প্রমাণ করেছে।

আঠারো থেকে বাইশ– চব্বিশ– ছাব্বিশ বছরের তরতাজা মনগুলো প্রশ্ন করতে চায়, অধিকারের জন্য লড়াই করতে চায়, প্রতিবাদ করতে চায় অনেক বঞ্চনার, অনেক উপেক্ষার। তাদের উচ্ছলতাকে সংযত করে সঠিক পথ দেখানোর জন্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে হয়– শাসকের মত ভয় দেখিয়ে নয়। মগজ দখল নয়– উৎকর্ষের জন্য প্রয়োজন চিন্তার স্বাধীনতা। নাহলে দেশের অগ্রগতি বদ্ধ জলায় আটকে যেতে বাধ্য। 


প্রকাশের তারিখ: ২৮-আগস্ট-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org