|
গ্রাম্য শ্রেণিসম্পর্ক ও সংস্কৃতি (শেষ পর্ব)হরেকৃষ্ণ কোঙার |
সাধারণ মাঝারি চাষীর মনোভাব ঠিক এইরকম নয়। তারা বেশি দামে ধান বিক্রির সুযোগ বিশেষ পায় না. তবু তার সুযোগ সে পেতে চায়। সরকারি সাহায্যের পিছনে সে ছোটে, কিন্তু তা বিশেষ পায় না বলে ক্ষুব্ধ। সে যা কিনতে চায় তার ক্রমবর্ধমান মূল্য তাকে অসন্তুষ্ট করে তোলে। আবার তার নিজের জমি কিছু আছে বলে সে গরিবদের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে দ্বিধা করে। উচ্চবর্ণ ও অনুন্নত জাতির প্রশ্ন এদেরকে এখনও প্রভাবিত করে। এরা উপরের দিকে উঠতে চায়, তাই কায়েমী স্বার্থের প্রচারে মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হয়, আবার শোষণ, অভাব ও বঞ্চনার বাস্তব আঘাত তাকে গরিবের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সে নিজে মেহনত করে, তাই তার টান মেহনতী মানুষের দিকেই বাড়ছে। |
১২ অগাস্ট ২০২৪ তারিখে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইট-এ প্রকাশিত প্রথম পর্বের পর… শুধু জমিহীন বা গরিব চাষীর অবস্থাই শোচনীয় নয়, অভাবগ্রস্থ সাধারণ চাষীও এই মহাজনী পীড়ন হতে বাদ যাচ্ছে না। সাধারণ সুদে জমি বন্ধক রেখে এখন কর্জ পাওয়া যায় না। ঋণ করতে হলে কম দামে জমি বিক্রি কোবালা (বিক্রয়পত্র) নিয়ে দিতে হয়। টাকা পায় কম, দলিলে লিখতে হয় বেশি। অনেক ক্ষেত্রেই এই জমি ফেরত পাওয়া দুষ্কর হয়। জমিদার জোতদারেরা আগে গ্রামে ধান কেনাবেচা বা মজুতের কাজ করত না। শহরের ব্যবসাদারদের ফড়িয়া হিসাবে কিছু লোক কমিশন ভিত্তিতে ধান কিনে গঞ্জে পাঠিয়ে দিত। এখন জমিদার জোতদারদের নূতন কায়েমিচক্রই ধান ওঠার পর যখন গরিবরা বা সাধারণ চাষীরা কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়, তখন সেই ধান কিনে রাখে, মজুত করে এবং পরে দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে বিক্রী করে অর্থাৎ জোতদার হয়েছে মজুতদার। এরাই আবার দাদন দিয়ে চাষীর ফসল আগাম কম দামে কিনে ফেলে। এই জমিদার-জোতদার মহাজন ও মজুতদারি চক্র গ্রামাঞ্চলের সমগ্র জীবনকে নিজেদের কুক্ষিগত করেছে। গরিব কৃষক, ক্ষেতমজুরের জীবন নিয়ে এরা ছিনিমিনি খেলে। এরাই গ্রামাঞ্চলে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে, সরকারি সাহায্যের বেশিরভাগ এরাই আত্মসাৎ করে। আমলাতন্ত্রের ও পুলিশের সঙ্গে এদের যোগাযোগ খুবই ঘনিষ্ঠ। শোষণের এই হৃদয়হীন ব্যবস্থা এদের নৈতিক মানকেও অত্যন্ত নীচে টেনে নামিয়েছে। আগে যখন গ্রামাঞ্চলে টাকার প্রভাব এত বেশি ছিল না, যখন ফসল মজুত করে অতি-মুনাফার ব্যবস্থা ছিল না, তখন গ্রামের জমিদার ও বড়লোকদের অত্যাচার ও জুলুম থাকলেও, এমনকি এই অত্যাচারের প্রকৃতি স্থূল হলেও তাদের শোষণ এত গভীর হতে পারত না। তারা অত্যাচার করত, অনেকে ধানের গোলা বেঁধে রাখত, সেই গোলা দেখিয়ে আভিজাত্য প্রকাশ করত, সেই গোলা হতে ধান কর্জও দিত, এমনকি সামন্ততান্ত্রিক, বনেদি আভিজাত্য প্রকাশের জন্য কেউ কেউ স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, পানীয় জল প্রভৃতির কিছু ব্যবস্থা করত। এখন শোষণ হয়েছে আরও গভীর, আরও নির্মম। চক্ষুলজ্জা না রেখে ভাগচাষী ও মজুরদের লুঠ করা, এক মণ ধার দিয়ে দু মণ, তিন মণ আদায় করা, কম দামে ধান কিনে বেশি দামে আবার বিক্রেতাকেই বেচা, কম টাকার জমি বিক্রি কোবালা করে নেওয়া, আইন ফাঁকি দিয়ে জমি চুরি করা, সরকারি সুযোগ আত্মসাৎ করা, এক কথায় দুহাতে টাকা লোটার ব্যবস্থা জোতদার মজুতদারদের নৈতিক মানকে টেনে আরও নীচে নামিয়েছে। সামন্ততান্ত্রিক, বনেদি আধিপত্যের স্থান আজ নেই। সাধারণ মানুষ অভাবের তাড়নায় খাদ্যের অভাবে যখন ছটফট করে তখন এদের চোখ টাকার লোভে জ্বলজ্বল করে ওঠে। খাসজমি মেরে নিতে এদের দ্বিধা হয় না; স্কুল হাসপাতালের টাকা মারতে এদের বাধে না। নীচতা, ক্রুরতা, হিংসা, দুর্নীতি, প্রতিহিংসা, গরিবদের উপর জুলুম আর বড় অফিসারদের কাছে দাস্য- এই সবই এদের চরিত্রের প্রধান লক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু এরাই গ্রাম্য সমাজের প্রধান তাই এদের মনোজগতের এই পচন গোটা সমাজকেই প্রভাবিত করছে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের অঙ্গ হিসাবে জাতিভেদ প্রথা এই অধঃপতনকে আরও ক্রুর করে তুলেছে। যেহেতু আমাদের এখানে ক্ষেতমজুর, ভাগচাষীদের বেশিরভাগই এসেছে অনুন্নত ও উপজাতি সম্প্রদায় হতে সেই হেতু জোতদার মহাজনদের জুলুমের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদকে এই কায়েমিচক্র তথাকথিত ভদ্রলোক বনাম ছোট জাতের বিরোধ বলে চালাতে চেষ্টা করে অর্থাৎ এই শোষকগোষ্ঠী তাদের অতি মুনাফার স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ প্রভৃতিকেও বাড়িয়ে তুলতে চেষ্টা করে। আশ্চর্য্যের কথা, এরাই আবার নৈতিক মানের কথা বলে! জমিহীন বা প্রায় জমিহীন ক্ষেতমজুর ভাগচাষীদের সংখ্যা আমাদের এখানে ক্রমবর্ধমান। সামন্ততান্ত্রিক ভিতের উপর পুঁজিবাদী শোষণের চাপ যতই বাড়ছে ততই কৃষকদের মধ্যে শ্রেণিভেদ বাড়ছে। ইংরেজ আমল হতেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন তা অনেক বেড়েছে। জমিহীন বা প্রায় জমিহীনদের সংখ্যা মোট কৃষকদের অর্ধেকের কম হবে না। আর গরিব কৃষকের সংখ্যা ধরলে মোট সংখ্যা হবে শতকরা ৭৫ হতে ৮০ ভাগ। এদের শোচনীয় অবস্থা ও অসহায় অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়। জমি ও কাজের জন্য কী সাংঘাতিক আকুতি এদের! এরা যে কী করে এখনও বেঁচে আছে, তাই আশ্চর্য। শ্রমজীবী মানুষের জীবনীশক্তি কী অদ্ভুত! বাঁচার জন্য কী ছুটাছুটি না এরা করে! সমাজজীবনের সামগ্রিক দুর্নীতির প্রভাব হতে এরা মুক্ত নয়, তবু এদের মধ্যে যা প্রধান, তা হোল কাজ করার ও বাঁচার বলিষ্ঠ আগ্রহ। যেখানে এরা সংগঠিত নয় সেখানে ভূমি ও কাজের জন্য এরা জোতদারদের অসহায় শিকারে পরিণত হয়। তা করতে গিয়ে অনেক সময় নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেও ফেলে। সেই সঙ্গে অপার্থিব শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে সান্ত্বনা পাবার মনোভাবও দেখা যায়। কিন্তু এ হল একদিকের চিত্র। অন্যদিকে জীবনের তাগিদে এরা শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ক্রমশ বেশি করে সামিল হচ্ছে; এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের নূতন করে চিনতে শিখছে, নিজেদের শক্তি সম্বন্ধে আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। নিজেদের মধ্যে ঝগড়ার বদলে সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে উঠছে। এই সংগ্রাম তাদের নিজেদের মধ্যে জাতিভেদের প্রাচীর ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছে, এমনকি নারী-পুরুষের সম্পর্ককেও নূতন মর্যাদা দিচ্ছে। কায়েমি স্বার্থের নীচতার পাশাপাশি এদের এই নবজাগ্রত বলিষ্ঠ জীবনের চেতনাবোধ লক্ষণীয়। এরা সংগ্রামে নামে প্রথমে আংশিক দাবি নিয়ে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে, জমির জন্য, কাজের জন্য, রিলিফের জন্য, খাদ্যের জন্য। তা করতে গিয়ে জোতদারচক্রের আক্রমণ ও পুলিশের নির্যাতন ভোগ করে। অত্যাচার মাঝে মাঝে তাদের দমিয়ে দেয়, আবার নূতন উদ্যমে তারা জেগে ওঠে। এমনই সংগ্রামের আগুনে পুড়ে তারা রাজনৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ হচ্ছে। তারা শাসকচক্রের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর যোগাযোগ বুঝতে শিখছে, রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাও বুঝছে। তাদের সংগ্রামী ঐক্য যেমন বাড়ছে, তেমনই তাদের মধ্য হতে কর্মীও গড়ে উঠছে। শ্রমিকশ্রেণির পার্টির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। লক্ষ করবার বিষয় হল, যে যেখানে একবার পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোন ঝড়-ঝাপট বা আঘাত তাদের সে যোগাযোগ সহজে ছিন্ন করতে পারে না। কায়েমি চক্রের স্বার্থপরতার তুলনায় এ মনোভাব কত মহান! সাধারণ মাঝারি চাষীর মনোভাব ঠিক এইরকম নয়। তারা বেশি দামে ধান বিক্রির সুযোগ বিশেষ পায় না. তবু তার সুযোগ সে পেতে চায়। সরকারি সাহায্যের পিছনে সে ছোটে, কিন্তু তা বিশেষ পায় না বলে ক্ষুব্ধ। সে যা কিনতে চায় তার ক্রমবর্ধমান মূল্য তাকে অসন্তুষ্ট করে তোলে। আবার তার নিজের জমি কিছু আছে বলে সে গরিবদের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে দ্বিধা করে। উচ্চবর্ণ ও অনুন্নত জাতির প্রশ্ন এদেরকে এখনও প্রভাবিত করে। এরা উপরের দিকে উঠতে চায়, তাই কায়েমী স্বার্থের প্রচারে মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হয়, আবার শোষণ, অভাব ও বঞ্চনার বাস্তব আঘাত তাকে গরিবের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সে নিজে মেহনত করে, তাই তার টান মেহনতী মানুষের দিকেই বাড়ছে। ধনী কৃষকেরা কিছু সুবিধা পাচ্ছে, কিছু ফসল বেশি দামে বিক্রী করে তারা, কিছু মজুর খাটায় বা কিছু জমি ভাগে দেয়। তাই গরীবদের দাবির ও আন্দোলনের প্রতি বিরোধী মনোভাবও আছে। সেইজন্যই এখনও পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের ঝোঁক কায়েমী স্বার্থের দিকে। কিন্তু কায়েমী স্বার্থের তুলনায় তারা সরকারি সাহায্য কম পায় বলে এবং চড়া দামে অন্যান্য জিনিস কিনতে হয় বলে তাদের কথাবার্তায় একটু অসন্তোষের সুর দেখা যায়। তারা উপরে উঠতে চায়, কিন্তু ওঠার পথে প্রতিবন্ধকতা তাদের ক্ষুব্ধ করে। পশ্চিমবঙ্গীয় গ্রামাঞ্চলে জমির সম্পর্কযুক্ত আর এক স্তরের মানুষ আছে, যাদের বলা যেতে পারে মধ্যবিত্ত বা ছোট অকৃষক জমির মালিক। এরা আর্থিক দিক দিয়ে গরিব মধ্যবিত্ত; কিন্তু তারা নিজেরা চাষ করে না, ভাগে বা মজুর খাটিয়ে জমি চাষ করায়। স্বভাবতই এরা আর্থিক কারণে শোষণ হতে বেশি আয় করতে চায়, তাই গরিবদের দাবিকে এদের পক্ষে ভাল চোখে দেখা মুশকিল। অন্যদিকে এরা গরিব বা মধ্যবিত্ত বলে এবং ক্রমবর্ধমান উচ্চমূল্য ও সংকটের চাপে এরা আঘাত খাচ্ছে বলে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের দাবির প্রতি এদের কিছু সহানুভূতির মনোভাব দেখা যায়। এদের মধ্যে যারা শিক্ষক বা চাকুরিজীবি অর্থাৎ অন্য ক্ষেত্রে যারা নিজেরা মেহনত করে তারা কর্মক্ষেত্রে সংগঠিত আন্দোলনের অংশীদার। নিজেরা চাষ করে না বলে তাদের জমির ভয়ও আছে, কায়েমী স্বার্থ এই ভয়কে কাজে লাগায়। তাই গ্রামাঞ্চলে এরা বেশ দোটানা মনোভাবের পরিচয় দেয়। কিন্তু এও লক্ষ করা যাচ্ছে যে, নিজেরা যেখানে কাজ করে সেই কর্মক্ষেত্রে যতই তারা গণসংগ্রামের মধ্যে যুক্ত হচ্ছে ততই তারা কৃষক আন্দোলনের প্রতি তাদের মনোভাব বদলাচ্ছে। এই প্রক্রিয়াই তাদের শেষ পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কায়েমীচক্রের বিরুদ্ধে কৃষক সাধারণের সংগ্রামের প্রতি সহনশীল করার সম্ভাবনা রাখে। বিভিন্ন দেশের কৃষি-বিপ্লবের ইতিহাস এই কথা শেখায় যে, কৃষকদের সংগ্রামকে কেন্দ্রীভূত করতে হবে বড় জোতদার-মহাজন-মজুতদার চক্রের বিরুদ্ধে। অকৃষক জমির মালিক শেষ পর্যন্ত থাকতে পারে না, কিন্তু তা সম্ভব দেশের মৌলিক গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর; যখন এই সব ছোট মালিকদের সংসারের জীবিকার স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। এই শিক্ষার সঠিক প্রয়োগ মেহনতি, অকৃষক, ছোট জমির মালিকদের কৃষক আন্দোলনের প্রতি সঠিক মনোভাব গ্রহণে নিশ্চয়ই সাহায্য করতে পারে! কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র প্রোগ্রামে বলা হয়েছে যে, দেশের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য যা একান্ত প্রয়োজন তা হল শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষকের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। কৃষকদের মধ্যে গরিব কৃষক ও ক্ষেত-মজুর হবে তার ভিত, মাঝারি কৃষক হবে তার ঘনিষ্ঠ মিত্র, ধনী কৃষক হবে দোদুল্যমান মিত্র। গ্রামাঞ্চলের বাস্তব অবস্থা এই গণতান্ত্রিক মোর্চা গঠনের দিকেই চলেছে। রচনাকাল: অক্টোবর ১৯৬৮ প্রকাশের তারিখ: ১৩-আগস্ট-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |