Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

গ্রাম্য শ্রেণিসম্পর্ক ও সংস্কৃতি (প্রথম পর্ব)

হরেকৃষ্ণ কোঙার
কমিউনিস্টদের কাজ শুধু সমাজকে বিশ্লেষণ করা নয়, তাকে পরিবর্তন করার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করা। সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাজ হবে এরই সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাদের সৃষ্টির কাজ পরিচালনা করা। শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের জীবন নিয়ে আলেখ্য রচনা করলেই বা তাদের বর্তমান জীবনকে বাস্তবে প্রতিফলিত করলেই বৈপ্লবিক সংস্কৃতি বা জনগণের সংস্কৃতি হয় না। বুঝতে হবে যে, বর্তমান সমাজে শোষকশ্রেণির সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার প্রাধান্য জনগণের উপর বেশ প্রভাব বিস্তার করে আছে। শ্রেণিসমাজের স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে তাদের মধ্যেও হিংসা, দ্বেষ, ক্ষুদ্রতা, গোলামির মনোভাব প্রভৃতি আছে। বাস্তবতার নাম করে এইগুলিকে তুলে ধরলে বা শোষকশ্রেণি ও কোন ব্যক্তি বিশেষের উদারতাকে ফুটিয়ে তুললে শোষকশ্রেণিরই সাহায্য করা হয়।
Rural Class Relations and Culture (Part I)

'গণনাট্যের' কর্মীরা বিশেষভাবে পাকড়েছেন একটা লেখা দেবার জন্য। সংস্কৃতি জগতের কাজের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নাই বললেই চলে, নাট্য-জীবনের সঙ্গে আরও কম। এগুলি আমি বিশেষ বুঝিও না। তাই কোনও কিছু লেখা সম্বন্ধে তেমন ভরসা পাচ্ছি না। গ্রাম্য অর্থনীতিতে কায়েমি স্বার্থের সঙ্গে কৃষক সাধারণের সম্পর্কের যে পরিবর্তন হয়েছে, এবং এই পরিবর্তন তাদের মানসিক গঠনের উপর যে প্রভাব বিস্তার করেছে, সে সম্বন্ধে কিছু লেখা স্থির করেছি, এই আশায় যে, গণনাট্যের কর্মীরা হয়ত তা হতে তাদের কাজের কিছু উপাদান পেতে পারেন।

কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সমাজের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিতের উপর গড়ে ওঠে এবং এটা হল তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ উপরতলার কাঠামো। সমাজের অর্থনীতিতে যে শ্রেণি বা শ্রেণিসমষ্টির প্রাধান্য থাকে, তারাই রাজনৈতিক কাঠামোতে প্রভুত্ব করে এবং তাদেরই স্বার্থের পরিপূরক সংস্কৃতিই প্রধান হয়ে থাকে। শোষকশ্রেণি যেমন রাষ্ট্রের সাহায্যে শোষিতদের উপর তাদের শ্রেণিশোষণ বজায় রাখে, তেমনি সাংস্কৃতিক জীবনে প্রাধান্যের দ্বারা শোষিত শ্রেণিগুলিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। তাই রাষ্ট্র যখন শ্রেণিহীন বা শ্রেণির ঊর্ধ্বে হতে পারে না, তেমনি শ্রেণিবিভক্ত সমাজে সংস্কৃতি কখনও শ্রেণিহীন বা শ্রেণির উর্দ্ধে হতে পারে না। 'সংস্কৃতির জন্যই সংস্কৃতি' বা 'সত্য, শিব ও সুন্দরের সাধনায় সংস্কৃতি' প্রভৃতি স্লোগানগুলি শুধু অবাস্তবই নয়, এগুলি সংস্কৃতির শ্রেণিচরিত্র ঢেকে রেখে শোষক শ্রেণিকে সাহায্য করার শ্রেণিস্লোগান।    

সাহিত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি প্রভৃতি সমাজের অর্থনীতি-ভিত্তিক প্রতিফলন হলেও এগুলি আয়নার প্রতিবিম্বের মত নিষ্ক্রিয় নয়। এগুলির সক্রিয় ভূমিকা আছে। মানুষের মনের উপর প্রভাব বিস্তার করে এগুলি তাদের কাজ এবং তার মারফৎ রাজনৈতিক কাঠামো এবং সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্কের উপর ক্রিয়া করে। শ্রমিকশ্রেণি সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো ও উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন আনতে পারে না, যদি না তার আগে শোষকশ্রেণির রাজনৈতিক প্রভুত্বের সে অবসান ঘটাতে পারে, এবং এ কাজ সম্ভব নয়, যদি না সে নিজেকে ও জনগণকে শোষকশ্রেণির সাংস্কৃতিক প্রভাব হতে মুক্ত করে বৈপ্লবিক পরিবর্তন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এইজন্যই সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের কর্মীদের দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিসমাজে শ্রেণিসংগ্রাম সংস্কৃতিজগতেও প্রতিফলিত হয়। শাসকগোষ্ঠী তাদের শোষণ ও রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য জনগণের মনকে সেইমতো প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। বর্তমান সমাজ-ব্যবস্থার গুণগান করা, বৈপ্লবিক পরিবর্তনের চিন্তা হতে জনগণের মনকে দূরে সরিয়ে রাখা, যৌন আবেদন ও অন্যান্য নিকৃষ্ট ভাবের দ্বারা তাদের মনকে আচ্ছন্ন করা, শোষণব্যবস্থাকে ঢেকে রাখা, জনগণের দুঃখকষ্টের কথা বললেও তার প্রকৃত কারণ চেপে রাখা, প্রেম ভালবাসা প্রভৃতিকে শ্রেণিসংগ্রামের আওতার বাইরে রাখা, অতীন্দ্রিয় জগতের মোহজাল সৃষ্টি করে পার্থিব জগতের সমস্যার পার্থিব সমাধান অস্বীকার করা- এইগুলিই হল শোষকশ্রেণির সংস্কৃতির কাজ। শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাজ হবে এরই বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জনগণকে তার প্রভাব হতে মুক্ত করা এবং তাদেরকে বৈপ্লবিক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করা।      

কমিউনিস্টদের কাজ শুধু সমাজকে বিশ্লেষণ করা নয়, তাকে পরিবর্তন করার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করা। সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাজ হবে এরই সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাদের সৃষ্টির কাজ পরিচালনা করা। শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের জীবন নিয়ে আলেখ্য রচনা করলেই বা তাদের বর্তমান জীবনকে বাস্তবে প্রতিফলিত করলেই বৈপ্লবিক সংস্কৃতি বা জনগণের সংস্কৃতি হয় না। বুঝতে হবে যে, বর্তমান সমাজে শোষকশ্রেণির সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার প্রাধান্য জনগণের উপর বেশ প্রভাব বিস্তার করে আছে। শ্রেণিসমাজের স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে তাদের মধ্যেও হিংসা, দ্বেষ, ক্ষুদ্রতা, গোলামির মনোভাব প্রভৃতি আছে। বাস্তবতার নাম করে এইগুলিকে তুলে ধরলে বা শোষকশ্রেণি ও কোন ব্যক্তি বিশেষের উদারতাকে ফুটিয়ে তুললে শোষকশ্রেণিরই সাহায্য করা হয়। এর অর্থ এই নয় যে, গণসংস্কৃতিকে অবাস্তব 'অতিমানবের' চরিত্র সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু শুধু অতি সাধারণ মানুষের চলতি মনোভাবকেই প্রতিফলিত করলে হবে না। শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের মধ্যে আছে মানুষের প্রতি ভালবাসা, সৌভ্রাতৃত্ববোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বলিষ্ঠ মনোভাব! এ মনোভাব সব সময় স্পষ্ট না থাকলেও, ধনিক প্রভাবে তা ম্লান হয়ে থাকলেও এই হবে গণসংস্কৃতির উপাদান। যত দিন যাচ্ছে তত বেশি জনসাধারণ শোষকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামছে, সংগ্রামগুলি হয়ে উঠছে আরও তীব্র-আরও ব্যাপক, তাতে যোগ দিচ্ছে অনেক বেশি নরনারী। এই সব সংগ্রামের মধ্য দিয়েও জনগণ ধনিক প্রভাব হতে মুক্ত হচ্ছে এবং বলিষ্ঠ সংগ্রামী চেতনার বাহক হয়ে উঠছে। এরই উপর দাঁড়িয়ে গণসংস্কৃতিকে এগিয়ে যেতে হবে। সমাজজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে এমন সংস্কৃতি সৃষ্টি করা প্রয়োজন যা দর্শক ও পাঠকদের মনে শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি করে, জনগণের মনে হতাশা সৃষ্টির বদলে বলিষ্ঠ বৈপ্লবিক আশা সৃষ্টি করে, এবং সমাজের পরিবর্তনের জন্য তাদের মনে সক্রিয় উদ্যোগ সৃষ্টি করে। তারাশঙ্করের 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা' কাহারদের জীবন নিয়ে লেখা হলেও তা প্রতিক্রিয়াশীল, আর গোর্কীর "মা" অতিমানব চরিত্র সৃষ্টি না করলেও তা এক মহান বৈপ্লবিক সৃষ্টি! গণনাট্যের কর্মীদের এই সব কথা মনে রেখেই কাজ করতে হবে।   

আমাদের দেশে গভীরতর সঙ্কটের পটভূমিকায় জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা করার দিকে অগ্রসর হবার কর্তব্য আরও জোরের সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের সামনে উপস্থিত হয়েছে! এই বিপ্লবে কৃষকের, বিশেষত গরীব কৃষকের, সক্রিয় সচেতন সংগ্রামী ভূমিকা একান্ত প্রয়োজন। এই বিপ্লবের সারবস্তু হল কৃষি-বিপ্লব। তাই গ্রাম্য জীবনকে শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের অন্যান্য অংশকে অবহিত করা বিপ্লবী কর্মীদের জরুরি কর্তব্য। সংস্কৃতি ফ্রন্টের কর্মীদের কাজ হবে একে সাহায্য করা। এ কাজ ঠিক মতো করতে হলে সাক্ষাৎভাবে গ্রাম্য জীবনকে জানতে হবে, কৃষকদের সঙ্গে মিশতে হবে, বিভিন্ন সংগ্রামের মধ্যে তাদের মনের গতিপ্রকৃতি বুঝতে হবে। আমার প্রবন্ধে আমি গ্রাম্য জীবনের প্রধান পরিবর্তন সম্বন্ধে সাধারণভাবে কিছু বলব।  

গ্রাম্য অর্থনীতি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে আমাদের পার্টি সঠিকভাবেই বলেছে যে, স্বাধীনতার পর শাসকশ্রেণির প্রতিনিধি হিসাবে কংগ্রেস সরকার যে নীতি নিয়ে চলেছে তা সামন্তবাদের অবসান নয়, জমিদার শ্রেণির সঙ্গে আপস করে সামন্তবাদী শোষণের ভিতের উপর পুঁজিবাদী শোষণের সৌধ গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য। সামান্তবাদী জমিদারদের কিছুটা পুঁজিবাদী জমিদারে রূপান্তরিত করে তাদেরকে ও ধনী চাষীদের একটি ক্ষুদ্র অংশকে পুঁজিবাদী চাষের জন্য উৎসাহিত করে কৃষির উৎপাদন কিছু বৃদ্ধি করাই এর উদ্দেশ্য। 

এই নীতি ও উদ্দেশ্যের বাস্তব পরিণতি কী হয়েছে? বাংলাদেশের অতীতে জমিদার, মহাজন ও দাদনের কারবারীদের যে বিভিন্ন গোষ্ঠী ছিল তার বদলে বর্তমানে জোতদার-মহাজন-মজুতদারদের এক শক্তিশালী মিলিত চক্র গড়ে উঠেছে। এদের শোষণ আরও অনেক তীব্র, অনেক গভীর ও নির্মম হয়েছে। গ্রাম্য জীবনের সর্বক্ষেত্রে এদের প্রাধান্য এক বিরাট অভিশাপের মত চেপে বসেছে।

অতীতে খাজনা আদায়ী বিধিবদ্ধ (স্ট্যাচুটারি) জমিদারবর্গ গ্রাম্য জীবনে অভিজাত প্রভু বলে গণ্য হত। দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে এদের বে-আইনি আদায় ও খাজনা বৃদ্ধি বহুলাংশে সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে এদের খাজনা আদায়ের স্বত্ব গেছে, টাকায় খাজনা আদায়ের উপর নির্ভর করে এদের যে প্রভুত্ব ছিল, তা নষ্ট হয়েছে। এদের মধ্যে যাদের খাস জমি ও নগদ টাকা কম ছিল তারা ভেঙে পড়েছে; কিন্তু যাদের খাস জমি ও নগদ অর্থ বেশি ছিল তারা চেহারা বদলে জোতদার মহাজনে রূপান্তরিত হয়েছে। জমিদারী পদ-মর্যাদার আভিজাত্যের বদলে এরা এখন জমি ও টাকার জোরে ক্রুর প্রভুত্বের বাহক হয়েছে। যারা আগে মহাজনী কারবার করত তাদের সামাজিক আভিজাত্য ছিল না, তারা ছিল সুদখোর মহাজন, তারা ধাপে ধাপে প্রভূত জমি ও টাকার মালিক হয়ে একই জোতদার, মজুতদারে পরিণত হয়েছে। ধনী চাষীরা কৃষকসমাজেরই অন্তর্ভুক্ত উদ্বৃত্ত আয়ের একটি ক্ষুদ্র স্তর। এদের মধ্যে যারা বেশি জমির মালিক তাদের কেউ কেউ মজুত ফসলের অতিরিক্ত উচ্চ মূল্যের সুযোগে বেশ টাকা জমিয়ে ধনী কৃষকের স্তর হতে মহাজন-মজুতদারের স্তরে উন্নীত হয়েছে বা হচ্ছে। এই রকম যারা উন্নীত হয়েছে তাদের সংখ্যা খুব কম। ধনী কৃষকেরা চাষে অংশ গ্রহণ করে, এরা কিন্তু আর নিজেরা চাষ করে না - চাষের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ গ্রহণ করে না। ভাগে দিয়ে বা মজুর খাটিয়ে এরা শুধু তদারকি করে।

এরা সকলে মিলে গ্রামাঞ্চলে এক মিলিত কায়েমি চক্রে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর সংখ্যক জমিহীন ও কাজের সুযোগহীন দুঃস্থ কৃষক থাকায়, তাদের নির্মমভাবে শোষণ করার সুযোগ থাকায় এবং অপরদিকে এখানে দো-ফসলী জমি কম হওয়ায় এই কায়েমি চক্র আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে বৃহদাকার উন্নত চাষের দিকে বিশেষ যায়নি। বৃহদাকার উন্নত চাষ করতে হলে যে পুঁজি নিয়োগ করা দরকার তার ঝুঁকি এরা তেমন নেয়নি। নির্মমভাবে ভাগচাষী ও মজুরদের শোষণ করে, অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত ফসল আত্মসাৎ করে, তা মজুত করা এবং অতিরিক্ত চড়া দরে তা বিক্রি করে অতি মুনাফার সুযোগ এরা পুরো কাজে লাগায়। অতিরিক্ত চড়া দরে মজুত ফসল বিক্রির সুযোগ থাকায় এদের মধ্যে মজুর খাটিয়ে চাষ করার ঝোঁক কিছুটা বেড়েছে; উন্নত সার, বীজ প্রভৃতি সরবরাহের সরকারি সুবিধার মোটা অংশ এরাই আত্মসাৎ করে। তথাপি এদের অনেকে ভাগ চাষ করায়; যেখানেই ভাগচাষীরা তেমন সংগঠিত নয়, সেখানেই তাদের অসহায় অবস্থায় সুযোগ নিয়ে এই কায়েমি জোতদার চক্র ভাগচাষীদের আইনগত ৬০/৪০ ভাগ হতে বঞ্চিত তো করেই, এমনকি আধা ভাগেরও বেশি আদায়ের চেষ্টা করে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি নির্দিষ্ট পরিমাণে ধান আদায়ের মাধ্যমে তা করে। যে সব জমিতে বিঘা প্রতি ১০ মণ ধান হয় সে সব জমিতে ৬ মণ, ৭ মণ পর্যন্ত ভাগ আদায়ের চেষ্টাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

মজুরদের উপর শোষণ চলে নিৰ্মমভাবে। ভাগচাষীরা ক্রমশ উচ্ছেদ হওয়ায় মজুরদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি চাষের উন্নতি তেমন না হওয়ায় এদের বেকারি বাড়ছে। এদের এই অসহায় অবস্থার সুযোগ নেয় জোতদারেরা। খুব অল্প সংখ্যক মজুর বাৎসরিক চুক্তিতে প্রায় গোলামের মত কাজ করে; এদের মাইনে খোরাকি ছাড়া বছরে এলাকা বিশেষে ২০০/২৫০ টাকা হতে ৪০০ টাকার মধ্যে। বেশিরভাগই দিনমজুর - বছরে ১২০ দিনের বেশি যারা সাধারণতঃ কাজ পায় না। এদের মাইনে, খোরাকি ছাড়া দিন ১২ আনা হতে ২/২।।০ টাকা পর্যন্ত হয়। কোনো কোনো স্থানে ২/১ বিঘা ভাগে দিয়ে এদের বেঁধে রাখা হয়। অভাবের সময় কিছু কর্জ নিলে এদের ন্যায্য সুদের বদলে বাজার দরের চেয়ে অনেক কম দরে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। নচেৎ ধার দেওয়া হয় না। 

এইভাবেই গ্রামের নূতন জমিদার জোতদার কায়েমিচক্র বেশি জমির মালিকানার সুযোগ নিয়ে কৃষকদের শোষণ করে। এই কায়েমিচক্রই আবার মহাজনী শোষণে লিপ্ত। এদের বেশিরভাগেরই মহাজনী লাইসেন্স নেই, তার ধারও এরা ধারে না। যেহেতু সরকার শতকরা ১০ ভাগের বেশি ঋণের প্রয়োজন মেটায় না এবং যেহেতু ভাগচাষী ও ক্ষেতমজুররা কার্যত সরকারি ঋণ কিছুই পায় না, সেই হেতু গ্রাম্য কায়েমিচক্র পুরাদমে নির্মম সুদের কারবার চালায়। আগের দিনে গরিবেরা মণে দশ সের ধান সুদের শর্তে কর্জ পেত (অভাবের সময়)। যেহেতু তখন ধান ওঠার সময়ের দরের তুলনায় পরবর্তী সময়ের ধানের দামের পার্থক্য খুব বেশি হত না, সেই হেতু মহাজনেরাও ঐ সুদে কর্জ দেওয়া অলাভজনক মনে করত না। এখন এর দরের পার্থক্য খুব বেশি হওয়ায় ঐ সুদে আর মন ভরে না। জোতদারেরা নির্লজ্জভাবে চড়া দরের হিসাবে ধান কর্জ দেয় এবং ধান ওঠার সময় যে কম দর থাকে সেই কম দরে সুদসহ ধান শোধ আদায় করে, যার ফলে এক মণ ধান ধার নিলে ৩৩৪ মাস পরে দু মণ, তিন মণ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার বেশি আদায় করা হয়। যে গরিব চাষী বা ভাগচাষী ধান ওঠার পর জোতদারকে কম দামে (২০-২২ টাকায়) নিজের ধান বিক্রি করল, তাকেই অভাবের সময় সেই জোতদারের কাছ হতে উপরোক্ত শর্তে (৪০-৪৫ টাকায়) ধান ধার করতে হয়েছে- এমন নির্মম ইতিহাস বিরল নয়।


রচনাকাল: অক্টোবর ১৯৬৮
উৎস:গণনাট্য, দ্বিমাসিক নাট্য পত্রিকা, পঁচিশ বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ১৯৮৯ 


প্রকাশের তারিখ: ১২-আগস্ট-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৭ টি নিবন্ধ
২৪-মে-২০২৬

২৩-মে-২০২৬

১৯-মে-২০২৬

১৪-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫