Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ভারতীয় নিউ সিনেমা আন্দোলনের ইস্তাহার (১৯৬৮)

মৃণাল সেন, অরুণ কাউল
সত্যজিৎ রায়ের "What is wrong with Indian Films?" নিবন্ধটি প্রকাশ পাওয়ার প্রায় ২০ বছর পর আকাশ কুসুম (১৯৬৫) এবং ভুবন সোম (১৯৬৯)-এর মতো ছবির পরিচালক মৃণাল সেন, অরুণ কাউলের সাথে 'নিউ সিনেমা আন্দোলনের ইশতেহার' প্রকাশ করেন। তাঁরা অভিনব এক সিনেমা আন্দোলনের ডাক দেন। ফ্রান্সের 'নুভেল ভাগ' কিংবা আমেরিকার 'আন্ডারগ্রাউন্ড সিনেমা' আন্দোলনের মতো শুধুমাত্র নতুন ফর্মের উদ্ভাবন করেই থামেননি, তার সাথে তাঁরা ছবি তৈরির বিভিন্ন প্রকার অভিনব উপায় এবং সেই ছবিগুলির প্রচার ও দর্শক পর্যন্ত পৌঁছে দেবার জন্য ভিন্ন প্রকার বণ্টনের উপায় ও পথের সন্ধান দিলেন। প্রাথমিকভাবে বোম্বেতে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে। তাঁরা বলেন, আমাদের কম বাজেটের ছবি তৈরি করতে হবে এবং সেই সব ছবি দ্বারা উপার্জিত অর্থ ব্যবহার করা হবে স্বল্প দৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্রে, প্রযোজনা এবং বণ্টনের জন্য।
Manifesto of the Indian New Cinema Movement

এই সময়ে ভারতীয় তথা হিন্দি ছবি একপ্রকার গভীর সংকটের মধ্যে দিয়ে চলেছে। ছবি তৈরির আকাশছোঁয়া খরচ, তারকাদের মাত্রাতিরিক্ত পারিশ্রমিক, আর্থিক সংস্থাগুলির চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে চলা সুদের মাত্রা, ছবির জগৎ জুড়ে সর্বত্র 'কালো টাকা'র লেনদেনের প্রাচুর্য ইত্যাদির সাথে চলচ্চিত্রের মতো সৃষ্টিশীল মাধ্যমে শৈল্পিক ভাবনাচিন্তা ও কল্পনার দীনতা এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয়বস্তুর আধিক্য আদতে ভারতীয় সিনেমা জগৎকে একটা দুঃখজনক সংকটের সামনে এনে দাঁড়িয়ে করিয়েছে। পরিচালক, লেখক ও ছবির সাথে যুক্ত প্রায় সকলে নতুন উদ্ভাবন সম্বন্ধে ভাবনাচিন্তা করা একরকম বন্ধ করে দিয়েছেন। কেবলমাত্র ব্যাবসায়িক সাফল্যের জন্য তাঁরা ছবিতে জনপ্রিয় তারকাদের ব্যবহার করছেন, গড়ে তুলছেন নিরর্থক জগাখিচুড়ি সেট। ছবিতে অর্থহীন ও কুরুচিকর জমকালো বাহ্যিক উপাদানে ভরপুর সিকোয়েন্স তৈরি করে মানুষকে মোহগ্রস্ত করে রাখার চেষ্টা করছেন। ছবিকে নান্দনিক ও সৃজনশীল কাজ হিসেবে কেউ বিবেচনা করছেন না। এই সাংঘাতিক নিয়ন্ত্রক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যিনি শৈল্পিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছবি তৈরি করছেন, তিনি সেই ছবি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য উপযুক্ত মাধ্যম খুঁজে পাচ্ছেন না। ফলে তা অচিরেই হারিয়ে যাচ্ছে গভীর অন্ধকারে। সুতরাং সার্বিক চিত্রটা এইরকম যে, যিনি গতানুগতিক মূলধারার ছবি থেকে বেরিয়ে এসে ভিন্ন আঙ্গিকের ছবি করবেন তাঁকে সমমনোভাবাপন্ন প্রযোজক খুঁজতে হবে, সেই ছবি বৃহৎ সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে বড়ো পরিবেশকের সাহায্য নিতে হবে এবং সবশেষে প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া করে সেখানে ছবির প্রদর্শন করতে হবে। কিন্তু এই অক্লান্ত পরিশ্রমের পরেও এটা অনিশ্চিত যে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ প্রেক্ষাগৃহে এসে ছবিটি দেখবেন। এই প্রকার অসংখ্য ভিন্ন আঙ্গিকের ছবি দর্শকহীন প্রেক্ষাগৃহে প্রতিদিন প্রদর্শিত হয় সারা দেশ জুড়ে। এইভাবে চিন্তাশীল চলচ্চিত্রকারেরা তাঁর শিল্পে স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রতি মুহূর্তে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই প্রকার ছবির দর্শক সংখ্যা খুব সীমিত। এর কারণ, আমাদের ছবির জগৎ, আর্থিক মুনাফা বৃদ্ধির কুৎসিত চক্রান্তের বাস্তবায়নের জন্য বিগত কয়েক দশক ধরে বিনোদনের নোংরা একটি ধারণার জন্ম দিয়েছে এবং সেইমতে ব্যাপক অংশের দর্শকের বিনোদন সম্পর্কে ধারণার আমূল পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। বেশি সংখ্যক ছবি প্রস্তুতকারী দেশগুলিতে অসংখ্য পরিচালক ভালো ছবি তৈরির জন্য লড়াই করছেন। বাণিজ্যিক ছবিতে স্থূল, অমার্জিত বিষয়বস্তুর সংযোজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। সিনেমাকে কেন্দ্র করে নতুন প্রকার এই আন্দোলনে ফ্রান্সে 'নিউওয়েভ', আমেরিকায় 'আন্ডারগ্রাউন্ড সিনেমা' এবং অন্যান্য বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রকার নামে পরিচিত হয়েছে। বর্তমান ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে সময় ও পরিস্থিতির দাবি এটাই যে, আমাদের দেশে এই প্রকার আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে অতি সত্বর। 

নিউ সিনেমা বলতে কী বোঝায়?

নিউ সিনেমার সংজ্ঞা এক কথায় প্রকাশ করা অসম্ভব। নিউ সিনেমা বলতে কেবলমাত্র কাজকে নতুনভাবে পরিপূর্ণ রূপ দেওয়া বোঝায় না। নিউ সিনেমা বিষয়টি ছবির প্রক্রিয়াগত ও অন্যান্য শর্তাবলির সাথে সম্পর্কিত এমন একটি অধ্যায় যা সৃজনশীলতার সাথে শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে। সচেতনভাবে ছবির নতুন ব্যাকরণ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এই মাধ্যমকে আরও বেশি শক্তিশালী ও বিস্তৃত করে নিউ সিনেমা। এই পথ একজন চলচ্চিত্রকারকে শৈল্পিক ও নান্দনিক পরিমণ্ডলে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব সহকারে অক্ষুণ্ণ রাখে এবং স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তার বাতাবরণ সৃষ্টি করে। নিউ সিনেমা কোনো একটি ছবিকে শিল্পীর ব্যক্তিগত চিন্তা ও চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করে। নিউ সিনেমার আকাঙ্ক্ষা এটাই যে, ছবির মধ্যে দিয়ে শিল্পীর নিজস্ব নান্দনিক ও শৈল্পিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। শিল্পী কখনোই স্টুডিয়োর ভাবনাচিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হবে না, এই দৃষ্টিভঙ্গিকে নিউ সিনেমা সর্বদা মান্যতা দেয়। 

ছবির নতুন আঙ্গিক ও ভাষাকে নিউ সিনেমা প্রাধান্য দেয়। এই পথ চলায় নিউ সিনেমা নিজেই শিল্পীর চোখ দিয়ে সমাজের মধ্যে কঠিন সত্যকে সন্ধান করবে। নিউ সিনেমা মনে করে, কোনো প্রশ্নের উত্তর খোঁজার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সঠিক সময়ে সঠিক প্রশ্ন সমাজের মধ্যে উত্থাপন করা। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মানুষের প্রাচীন মূল্যবোধ, মনন এবং তার চিন্তার সকল প্রতিবন্ধকতা ও শর্তগুলিকে নতুনভাবে দেখতে ও গভীরভাবে অধ্যয়নে বিশ্বাস করে নিউ সিনেমা। 

নিউ সিনেমা মানবজাতির ব্যক্তিগত সম্পর্কেরও তার একান্ত নিজস্ব জগতের মধ্যে অবস্থানকারী সকল হেঁয়ালিগুলির সংজ্ঞায়ন করতে চায়। চলচ্চিত্রকারদের কাজের মধ্যে তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন, স্বতঃস্ফূর্ততা ও তারুণ্যের উদ্যমকে সর্বদা অনুপ্রেরণা জোগায় নিউ সিনেমা। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দর্শককেও সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে আধুনিক শিল্পের নতুন দিশাকে উদ্ভাবন করতে চায় নিউ সিনেমা। 

ভারতের নিউ সিনেমা আন্দোলন 

প্রথমেই এটা নিশ্চিত করে দেওয়া উচিত যে, নিউ সিনেমার ভাবনা নিয়ে চলচ্চিত্রকাররা যে সকল ছবি তৈরি করবেন ও যে সকল ছবি মানুষের সামনে পরিবেশন করা হবে তা যেন যেকোনো প্রকার পরিস্থিতিতে মানুষকে এই প্রক্রিয়ার মূল চিন্তা ও ব্যাপ্তি সম্বন্ধে অবগত করে এবং এই আন্দোলনের বিস্তার ঘটাতে সাহায্য করে। নিউ সিনেমা আন্দোলনের দ্বারা ছবির উৎপাদন, বণ্টন ও প্রদর্শনের মধ্যে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এই আন্দোলন নিজেই ছবি তৈরি থেকে শুরু করে তার বণ্টন এবং প্রদর্শনের নতুন পথের সন্ধান করবে। এই আন্দোলন কেবলমাত্র ছবির নতুন ভাষা বা নতুন শৈল্পিক চিন্তাকে জন্ম দেবে তা নয়, তার সাথে মননশীল নতুন দর্শক তৈরি করবে তার মতো করে। নিউ সিনেমা আদতে ছবি বণ্টনকারী সংস্থাগুলির ও প্রদর্শকের আর্থিক মুনাফার জন্য ছবি তৈরির প্রক্রিয়ার সকল হস্তক্ষেপকে অগ্রাহ্য ও নস্যাৎ করে। 

নিউ সিনেমা ও নতুন দর্শক

মেধাসম্পন্ন উদ্দীপ্ত চলচ্চিত্রকার ও ছবির দর্শক- এই দু-টি হল নিউ সিনেমা আন্দোলনের মূল স্তম্ভ। সারা বিশ্ব জুড়ে গড়ে ওঠা ফিল্ম সোসাইটিগুলি এই আন্দোলন ও চিন্তাধারাকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য যে ভূমিকা নিয়েছে তা প্রশংসাতীত। তাদের অশেষ ধন্যবাদ। ভারতবর্ষে এই মুহূর্তে প্রায় এক-শোটি এই প্রকার ফিল্ম সোসাইটি অসম্ভব বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও প্রতি মুহূর্তে কাজ করে চলেছে নতুন দর্শক ও ভালো ছবি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে। এই আন্দোলন এবং নতুন চলচ্চিত্রকারদের এহেন ভিন্ন ভাবনাচিন্তাকে স্থায়ীরূপ দেবার জন্য এই সংখ্যাটি যথেষ্ট নয়। তাদের এই উদ্যম ও অক্লান্ত প্রচেষ্টাকে পরিপূর্ণ ও শক্তিশালী করার জন্য 'শিল্প প্রেক্ষাগৃহ' বা 'আর্ট থিয়েটার' গড়ে তুলতে হবে। 

এই প্রকার শিল্প প্রেক্ষাগৃহগুলি আকারে ছোটো হলেও, কিছু মননশীল দর্শক খুব সামান্য অর্থের বিনিময়ে শৈল্পিক রুচিসম্মত ছবি দেখতে পাবেন যা সাধারণত প্রদর্শিত হয় না আমাদের চারপাশে। এই প্রেক্ষাগৃহগুলি প্রযুক্তিগত ও আধুনিকতার নিরিখে বাণিজ্যিক ছবি প্রদর্শনের চাইতে উন্নত অথবা সমকক্ষ হবে। 

বোম্বের মতো জায়গায় যেখানে বিভিন্ন 'শিল্প প্রেক্ষাগৃহ'-তে দেশ ও বিদেশের নির্বাচিত বাণিজ্যিক ছবি দেখানো হয়, সেই সব প্রেক্ষাগৃহগুলিকে এই আন্দোলনে শামিল করতে হবে এবং শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে নিউ ওয়েভ আন্দোলনের সাথে যুক্ত সারা বিশ্ব জুড়ে যে সকল চলচ্চিত্রকার আছেন তাঁদের ছবিগুলি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্প প্রেক্ষাগৃহগুলি থেকে উপার্জিত অর্থ নিউ সিনেমা আঙ্গিকের ছবি তৈরির জন্য প্রয়োজন। বিনিয়োগ করা সম্পূর্ণ অর্থ ফিরে পাওয়া এর অপর একটি উদ্দেশ্য। 

বাধাহীনভাবে এই আন্দোলনকে নির্দিষ্ট ছন্দে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য বিনিয়োগ করা অর্থের পুনঃলাভ করা অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ। যেহেতু গতানুগতিক প্রথা বিরুদ্ধ এই প্রকার ছবির দর্শক খুব সীমিত, সেই কারণে বৃহৎ অঙ্কের অর্থ উপার্জন প্রায় অসম্ভব। সেহেতু নিউ ওয়েভ আন্দোলনের ছবিগুলি খুব সামান্য অর্থের বিনিময়ে তৈরি করতে হবে। ব্যয়বহুল স্টুডিয়ো থেকে বাইরে এসে প্রকাশ্যে শুটিং এবং 'পোস্ট-ডাবিং' করতে হবে। এর সাথে এই প্রচেষ্টা রাখতে হবে যাতে শুটিং-এর নিরবচ্ছিন্ন সময় তালিকা অনুসরণ করা যায়। এই প্রক্রিয়া আদতে ছবি তৈরির খরচ অনেকটাই কমিয়ে দেবে। সারা বিশ্ব তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিপ্লবী চলচ্চিত্রকাররা এই অভিনব পদ্ধতির অনুশীলনের মাধ্যমে সীমিত খরচে অসামান্য ছবি তৈরি করে চলেছেন। তাঁদের এই কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে নতুন ছবি তৈরি করতে হবে। 

ছবির প্রদর্শনীতে মাঝারি দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রগুলির সাথে স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি ও তথ্যচিত্র দেখানো হবে। এই আন্দোলন স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি ও তথ্যচিত্র প্রযোজনার জন্য কাজ করবে। স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি ও তথ্যচিত্র তৈরির জন্য আর্থিক সহযোগিতার মধ্যে দিয়ে নিউ সিনেমা আন্দোলন প্রযোজকের সকল শর্তাবলি অগ্রাহ্য করবে এবং সারা দেশ জুড়ে 'আভ গার্দ'-এর নীতি আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাবে পরীক্ষামূলকভাবে। স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবিগুলি ১০ থেকে ২০ মিনিটের এবং কাহিনিচিত্রগুলি মাঝারি দৈর্ঘ্যের হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর ফলে একটি কাহিনিচিত্রের সাথে একাধিক স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি একত্রে দর্শকের সামনে প্রদর্শন করা সহজ হবে। নিউ সিনেমা আন্দোলনকে শক্তিশালী ও সুদূরপ্রসারী করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে যারা প্রস্তাবিত ছবির চিত্রনাট্যগুলির মধ্যে এই আন্দোলনের নীতি আদর্শগত উপাদান রয়েছে কিনা সে বিষয়ে গভীর পর্যালোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ করবেন। আন্দোলনের মধ্যে অপর একটি কমিটি সেই সকল ছবিগুলিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই আদর্শে সিক্ত বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য কাজ করবে। নিউ সিনেমা আন্দোলনের ছবিগুলি সম্পূর্ণভাবে পরিচালক নির্ভর হবে। ছবির শৈল্পিক ও বৌদ্ধিক মান, ছবির গঠনগত ও নান্দনিকতার পরীক্ষা নিরীক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্তের অধিকার একমাত্র পরিচালকের থাকবে। এই সকল স্বাধীন ভাবনাচিন্তার দ্বারা পরিচালক একটি সম্পূর্ণ শিল্প সৃষ্টি করবেন যা আন্দোলনের পথকে প্রসারিত করবে। পরিচালক তাঁর পছন্দমতো বিষয় নির্বাচন করবেন এবং তাকে সম্পূর্ণ ছবির রূপ দেবেন তাঁর নিজস্ব সৃজনশীলতা দিয়ে। পরিচালকের প্রস্তাবিত ছবি বিখ্যাত গল্প বা উপন্যাস কিংবা কোনো মৌলিক লেখা ইত্যাদি যেকোনো কিছুকেই কেন্দ্র করে তৈরি হতে পারে, কিন্তু ছবিতে অবশ্যই মানুষ ও চলচ্চিত্রের ভাষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। 

বোম্বে শহরে প্রতি রবিবার সকালে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ছবি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের আত্মপ্রকাশ ঘটবে মানুষের সামনে। সারা শহর জুড়ে ছোটো, মাঝারি যে সকল প্রেক্ষাগৃহে ৩৫ মিমি ও ১৬ মিমি প্রজেকশানের সুবন্দোবস্ত আছে সেই সকল প্রেক্ষাগৃহগুলিকে আন্দোলনের শামিল করে ব্যাপক অংশের মানুষের সামনে এই আন্দোলনের নতুন ভাষাকে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি একইভাবে এই আন্দোলনকে ঢেউয়ের আকারে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে হবে। 

'শিল্প প্রেক্ষাগৃহ'গুলিতে প্রদর্শিত দেশি ও বিদেশি ছবিগুলি শৈল্পিক দিক থেকে উচ্চ মানের হওয়া বাঞ্ছনীয়। বেশি সংখ্যক মানুষকে এই আন্দোলনে শামিল করার পাশাপাশি সিনেমা শিক্ষায়তন গড়ে তুলতে হবে। সাধারণ মানুষ মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে সারা বছরের জন্য এই শিক্ষায়তনের সদস্যপদ গ্রহণ করতে পারবেন। উৎকৃষ্ট মানের ছবি দেখা ছাড়াও ছবি সংক্রান্ত যে সকল সুযোগসুবিধা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হতেন সেগুলি এই শিক্ষায়তন তাদের প্রদান করবে। 

সিনেমা শিক্ষায়তন

নিউ সিনেমা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষায়তন বোম্বে শহরের বিভিন্ন প্রান্তের বাণিজ্যিক সিনেমা কক্ষগুলিতে প্রতি রবিবার সকালে নিয়মিত ছবি দেখানো, ছবি সংক্রান্ত আলোচনাসভা ইত্যাদি কর্মসূচি গ্রহণ করবে। প্রাথমিক এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে এরপর বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আলোচনা কক্ষগুলিকে ব্যবহার করা হবে শনি ও রবিবারের সান্ধ্যকালীন প্রদর্শনীর জন্য। ধীরে ধীরে এই কক্ষগুলিকে শিল্প প্রেক্ষাগৃহের রূপ দিতে হবে সাপ্তাহিক দু-টি প্রদর্শনীর জন্য। 

ছবির বণ্টন 

ছবির বণ্টন সংক্রান্ত মূলত তিন প্রকার অভিনব পরিকল্পনা রয়েছে নিউ সিনেমা আন্দোলনের। প্রথমত, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা সিনেমা শিক্ষায়তনগুলিতে নিয়মিত প্রদর্শনের জন্য কিছু ছবি (৩৫ মিমি. এবং ১৬ মিমি.) বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগ্রহ করা হবে এবং কিছু ছবি ক্রয় অথবা ভাড়া নেওয়া হবে বিভিন্ন সংস্থা থেকে। দ্বিতীয়ত, সেই সকল ছবিগুলি দেশের বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটিগুলি ছাড়াও বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য সংগঠন দ্বারা নিয়মিত ছবি প্রদর্শন করতে ইচ্ছুক তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় অবশ্যই শিশুদের জন্য কিছু ছবি সংযুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, নিউ সিনেমা আন্দোলনের স্বার্থে, স্বাধীন চলচ্চিত্রকারদের নির্মিত ছবি এবং তার সাথে উন্নত শৈল্পিক মাত্রা সম্পন্ন ও এই আন্দোলনের অনুরূপ নীতি আদর্শ বহনকারী বিদেশি ছবিগুলি সাধারণ ব্যাবসায়িক শর্তের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মূলধারার ছবির মতো প্রতি সপ্তাহে মুক্তি পাবার ব্যবস্থা করা হবে। 

মূল সূত্র: ক্লোজ আপ (ভারত), জুলাই ১৯৬৮
উৎস: ‘মৃণালের ভুবন’, ২০১৪
ভাষান্তর: রাজদীপ মুখার্জী


প্রকাশের তারিখ: ১৪-মে-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৪ টি নিবন্ধ
১৪-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫

১১-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫