সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
৪ জানুয়ারি, ১৯৮৯: সেই অভিনয়
সুধন্ব দেশপান্ডে
ওই অভিনয়ের এবং সেই অভিনয়ে মালার ছবি সারা দেশের খবরের কাগজের প্রথম পাতায় স্থান করে নিল পরদিন। যে মাটিতে ওর নিজের কমরেড, বন্ধু ও জীবনের প্রেমের আধার নিহত হয়েছে, ওই বধ্যভূমিতে, ওই ছোট্ট একটি মুদ্রা, তাঁর সহ-অভিনেতাদের সেদিন যে পথ দেখিয়েছিল, তাতে সবাইকে ছাপিয়ে মালাই হয়ে উঠেছিল ওই আলোকদীপ্ত মুহূর্তটির প্রতীক। পরবর্তী দিনগুলিতে সারা দেশের সমস্ত ছোট বড় শহরে প্রতিবাদী সমাবেশ ছড়িয়ে পড়ল। মালাকে বম্বে, কেরল, ত্রিপুরায় যেতে হল যেখানে বিশাল বিশাল সমাবেশে বক্তব্য রাখতে হল ওকে। জানুয়ারির শেষে ও গেল কলকাতায়। আমরাও কয়েকদিন পর ওর সাথে সেখানে যোগ দিলাম ‘হল্লাবোল’-এর অভিনয়ের জন্যে।

সফদারের মৃত্যুর ৪৮ ঘন্টা পেরোনোর আগেই ঝাণ্ডাপুরের ওই জায়গাতেই জোর করে থামিয়ে দেওয়া আমাদের নাটকটি আমরা অভিনয় করি। আমার এখনও মনে হয় ভারতের পথনাটকের ইতিহাসে এটাই এ ধরনের একমাত্র ঘটনা।
৬, তালকাটোরা রোডের সিআইটিইউ-র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আমরা সবাই মিলিত হয়েছিলাম। ওখানকার উঠোনে আমরা পথনাটকের মহড়া দিতাম। বন্ধ করে দেওয়া অনুষ্ঠানের অভিনেতাদের সেদিন আবার অভিনয় করতে যাওয়ার কথা। একজনই পারল না যেতে। বিনোদের সেদিন একটা চাকরির ইন্টারভিউ ছিল। নাটকে ওর সংলাপ ও চলাফেরাগুলো আমার জানা ছিল, তাই আমি ওর জায়গায় এলাম। সেদিন ১ জানুয়ারি আমি ঘটনাচক্রে ঝাণ্ডাপুরে ছিলাম। আজ আবার ঘটনাচক্রেই, আমি অভিনয় করব।
আমরা খুব দ্রুত সংলাপের মহড়া দিয়ে ফেললাম। একেবারেই পেশাদারী দ্রুততায়। বলা হল, অভিনয়ের আগে প্রারম্ভিক কিছু কথাও আমাকে বলতে হবে
একটা ভাড়া করা বাসে চাপলাম আমরা। মাণ্ডী হাউস এসে দেখি, সেখানে আরো অসংখ্য বাস বোঝাই মানুষ অপেক্ষা করছে ঝাণ্ডাপুর যাওয়ার জন্যে। আমি গুণে দেখলাম, সংখ্যাটা ১৫। হয়ত আরো বেশিই ছিল। প্রতিটি বাসই ভিড়ে ঠাসা, দাঁড়াবার জায়গাও নেই প্রায়। শত শত শ্রমিকরা জমায়েত হয়েছিল ঝাণ্ডাপুরে। ৫,০০০ এরও বেশি মানুষ সরু গলিগুলি দিয়ে ঠাসাঠাসি করে এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন শিল্পী, লেখক, সমাজকর্মী ও পেশাজীবী। অসংখ্য চেনামুখ, সংখ্যায় তার চেয়েও অনেক বেশি সম্পূর্ণ অচেনা মানুষজন। একজনই ছিল না সেই ভিড়ে, সোহেল। কয়েক দশক পর জেনেছি, সেদিন তাকে পার্টি অফিসে থাকতে বলা হয়েছিল। সাংবাদিকদের যদি কোনো ফোন আসে, সেজন্যে। একজন দায়িত্বশীল অগ্রজ কারো থাকার প্রয়োজন ছিল সেখানে কারণ তখনও মোবাইল ফোনের দিন আসে নি। এটা একটা শোচণীয় রকমের ভুল অনুমান ছিল। সমস্ত সাংবাদিকরাই সেদিন ছিলেন ঝাণ্ডাপুরে। ফলে সোহেলকে একটি ফোনও ধরতে হয় নি সেদিন।

৪ জানুয়ারি, ১৯৮৯। ঝাণ্ডাপুরে অভিনয়রত মালা হাসমি ও জনমের সদস্যরা।
আমরা প্রথমে মৌন মিছিলে গোটা মহল্লা প্রদক্ষিণ করলাম। রাম বাহাদুরের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা ওঁকে শ্রদ্ধা জানালাম। বছর খানেক আগেই তার বিয়ে হয়েছে। মাস কয়েক আগে তাঁর এক সন্তানের জন্ম হয়েছে। পরে জেনেছি, মালা সেদিন ওর বাড়িতে গিয়ে ওর স্ত্রী ও শিশু সন্তানের সঙ্গে কিছুটা সময় থেকে ওদেরকে সমবেদনা জানিয়েছিল। সাহস দিয়েছিল।
সফদারের পুরোনো বন্ধু কাজল ঘোষের নেতৃত্বে গানের দল ‘পরচম’ দু’টি গান গেয়েছিল।
তু জিন্দা হ্যায় তো জিন্দেগী কী জিৎ মে ইয়েকিন কর
অগর কোয়ি স্বরগ হ্যায় উঠা লা জমিন পর
(জীবিত তুই, তো হোক প্রত্যয় জীবনের জয় সুনিশ্চয়
স্বর্গ কোথায়, ছিনিয়ে আন, ছড়িয়ে দে এ ধূলিময়)
এবং
লালঝাণ্ডা লে কর, কমরেড, আগে বড়তে যায়েঙ্গে
তুম নেহি রহে, ইসকা ঘম হ্যয় পর, ফিরবি লড়তে যায়েঙ্গে
(লাল পতাকা কাঁধে নিয়ে, কমরেড, সমুখপানেই চলব
আজকে তুমি নেই, এ শোক নিয়েও, সবাই মিলেই লড়ব।)
আমি জানতাম না ‘লাল ঝাণ্ডা’ গানটা বাংলা থেকে হিন্দিতে অনুবাদ করা সফদারেরই।
সফদর হাসমি
যখন ওরা গাইছিল ‘হাজার ভেস ভর কে আয়ী মওত তেরি দ্বওয়ার পর/ মগর তুঝে না ছল সাকি, চলি গয়ি ও হার কর’ (হাজার ছলে মুত্যু যখন তোর দুয়ারে হাজির হয়/ অবিচলিত তোকে দেখে, নিজেই মানে সে পরাজয়), আমার গলা বুঁজে এলো।
চারধারে শুধু মানুষ আর মানুষ। প্রতিটি কোণে, প্রতিটি খাঁজে, বাড়ির ছাদে, এমনকী জঞ্জাল ফেলার জায়গাতেও শুধু মানুষ। আমার জীবনে আমি কখনো এত দর্শক একসাথে দেখি নি। অনেকেই চটজলদি তৈরি করা প্ল্যাকার্ড বহন করছিল, তাতে লেখা ‘সফদার বেঁচে আছে’ কিংবা ‘সফদারের মৃত্যু হলেও, ব্যর্থ হবে না এই জীবনদান’। চতুর্দিকে শুধু লাল পতাকা আর লাল পতাকা।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
আমি যখন বলতে উঠলাম তখন মনটা একেবারেই শূন্য। আমি জানি না, কোথা থেকে, কীভাবে কথাগুলি এলো।
‘আমরা আমাদের থামিয়ে দেওয়া নাটকটি অভিনয় করা জন্যে আজ এসেছি। আমরা এসেছি, দর্শকদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা সম্পূর্ণ করতে। আমরা এ কথাই বলতে এসেছি আজ, আমাদের হত্যা করলেও ওরা আমাদের থামাতে পারবে না। আমরা এখানে এসেছি কমরেড রাম বাহাদুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। আমরা এখানে এসেছি কারণ কমরেড সফদার হাসমীর মৃত্যু নেই। সে এখানেই বেঁচে আছে। বেঁচে আছে আমাদের মধ্যে, দেশের দূরদূরান্তে ছড়িয়ে থাকা অগণিত তরুণ তরুণীদের মধ্যে।’

৪ জানুয়ারি, ১৯৮৯। ঝাণ্ডাপুরে হাল্লাবোল।
নাটক শুরু হল একটু আড়ষ্টভাবে। অভিনেতারা নড়ছে চড়ছে শুধু। নাটকের প্রথম কয়েকটি মিনিট ছিল ভীষণ কৌতুকময়, সাধারণত অভিনেতাদেরও প্রচুর হাসতে হয়। কিন্তু সকলেই সেদিন গম্ভীর। একটা মুহূর্ত আছে যেখানে পুলিশ চরিত্রটির নাটক থামানোর চেষ্টার উত্তরে অভিনেতারা বৃত্তাকারে হাত ধরাধরি করে দাঁড়ায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া স্থির করার জন্যে। আমরা বৃত্তাকারে দাঁড়াতেই, মালা আমার ঠিক উল্টোদিক থেকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো আমাদের দিকে ।
‘তোমাদের সমস্যাটা কী? চলো, হাসো সবাই!’
তারপর আমরা বৃত্তটা ভাঙতেই, ও একটা ঘূর্ণী দিয়ে হাসতে হাসতে পেছনের দিকে চলে গেল।
ওটাই যেন ছিল আমাদের জন্যে একটা সুতীব্র মৃতসঞ্জীবণী। নাটক মুহূর্তে প্রাণ পেয়ে গেল, দর্শকরাও ফেটে পড়ল হাসিতে ।
🔍︎ আরও পড়ুন — সফদার হাসমি: আঙ্গিকের সন্ধান
ওই অভিনয়ের এবং সেই অভিনয়ে মালার ছবি সারা দেশের খবরের কাগজের প্রথম পাতায় স্থান করে নিল পরদিন। যে মাটিতে ওর নিজের কমরেড, বন্ধু ও জীবনের প্রেমের আধার নিহত হয়েছে, ওই বধ্যভূমিতে, ওই ছোট্ট একটি মুদ্রা, তাঁর সহ-অভিনেতাদের সেদিন যে পথ দেখিয়েছিল, তাতে সবাইকে ছাপিয়ে মালাই হয়ে উঠেছিল ওই আলোকদীপ্ত মুহূর্তটির প্রতীক। পরবর্তী দিনগুলিতে সারা দেশের সমস্ত ছোট বড় শহরে প্রতিবাদী সমাবেশ ছড়িয়ে পড়ল। মালাকে বম্বে, কেরল, ত্রিপুরায় যেতে হল যেখানে বিশাল বিশাল সমাবেশে বক্তব্য রাখতে হল ওকে। জানুয়ারির শেষে ও গেল কলকাতায়। আমরাও কয়েকদিন পর ওর সাথে সেখানে যোগ দিলাম ‘হল্লাবোল’-এর অভিনয়ের জন্যে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সফদারকে মরণোত্তর সাম্মানিক ডক্টরেট দিয়েছিল। ‘হল্লাবোল’- এর প্রথম অভিনয়ে সেখানে ছাত্রদের ভিড়ে আমরা আটকা পড়ে গেলাম। জীবনে প্রথম আমাকে অটোগ্রাফের খাতায় সই করতে হল।
ওই সফর শেষ হয়েছিল সল্টলেক স্টেডিয়ামের বাস্কেটবল কোর্টের অনুষ্ঠানে যেখানে প্রায় ২৫,০০০ মানুষ সংহতি জানাতে এসেছিলেন। সফদার ও মালাকে নিয়ে লেখা কবিতা, গান ও নাটক পরিবেশিত হল। বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরা বক্তব্য রাখলেন। ওই অভিনয়ের কিছুদিন পর, ৪ জানুয়ারি সফদার হাসমী স্মৃতিরক্ষা কমিটি তৈরি হল। ওটাই ছিল সফদার হাসমী স্মারক নিধি (সহমত) গঠনের পথে প্রথম পদক্ষেপ যে নিধি পরবর্তীতে শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সাম্প্রদায়িকতা ও দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্বের শক্তির বিরুদ্ধে সংগঠিত করতে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে শাবানা আজমীর প্রতিবাদ
সত্যজিৎ রায় থেকে রবিশঙ্কর, আদুর গোপালকৃষ্ণন থেকে উৎপল দত্ত, কৃষ্ণা সবটি থেকে রাজেন্দ্র যাদব, সারা দেশের ছোট, বড়, চেনা অচেনা শিল্পীরা, আমাদের প্রতি সহমর্মিতা ব্যক্ত করে যারা জনসমক্ষে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তার তালিকা কার্যত অনিঃশেষ। এক চমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায়, ৮ জানুয়ারি, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সফদার হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে শাবানা আজমী লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছিলেন। শীতের মেঘলা কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসের সেই সন্ধ্যায় সফদারের প্রতিকৃতি হাতে প্রতিবাদে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন দিলীপ কুমার। পরদিন সারাদেশ জুড়ে একযোগে প্রতিবাদ সংগঠিত হল। পরে, ১২ এপ্রিল সফদারের জন্মদিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হল ‘জাতীয় পথনাটক দিবস’ হিসেবে। ৩০,০০০ এর বেশি নাটক অভিনীত সারা দেশে।
🔍︎ আরও পড়ুন — পথনাটকের পরম্পরা
সহমত-র প্রধান সংগঠক রাজেন্দ্র কুমার (’রাজিন’) পরে আমাকে বলেছেন, সেদিনের মালার ওই ভূমিকাটি না দেখলে সহমত-র জন্মই হত না।
এটা সত্য। মালা সেদিন ধীর, নির্ভীক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে মূর্ত হয়েছিল। আমার এখনও মনে পড়ে ওর চোখ। দৃপ্ত, যে শোক তাকে ছিন্নভিন্ন করেছে তার লেশমাত্র নেই। ওর রোগা শরীরটায় যেন ইস্পাতের মেরুদণ্ড। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ধাতব বারুদ শলাকার মত। ওর ছোট্টখাট্টো চেহারাটা মনে হচ্ছিল যেন এক অবিশ্বাস্য উচ্চতা।
আর কন্ঠ।
ওর স্পষ্ট কন্ঠ দর্শকদের শ্রবণে ধ্বণিত প্রতিধ্বণিত হয়ে হৃদয়ে অনুরণন তুলেছিল।
অনুবাদ- শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
ঋণ- হাল্লা বোল, সুধন্ব দেশপান্ডে
প্রকাশের তারিখ: ০১-জানুয়ারি-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
