সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
কালাতিপাতের শব্দ: তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের জীবনানন্দ পাঠ
সুব্রত সিন্হা
সভ্যতার ভাঙা-গড়ার প্রসঙ্গে এই পর্বের কবিতায় সূর্য আর অন্ধকারের দ্বন্দ্ব একমাত্র দ্বন্দ্ব নয়। সেই বিরোধ বহুল পরিমাণে সরলরৈখিক। … আলো-অন্ধকারের দ্বন্দ্বের সঙ্গে জীবনানন্দ মিশিয়েছেন হৃদয় বনাম মস্তিষ্কের দ্বন্দ্ব। তৃতীয় বিরোধ সুর ও নিঃশব্দতার মধ্যে। … সভ্যতার উত্থান-পতনের লড়াই যে প্রত্যক্ষ করেছে, তার নিজের মধ্যে রয়েছে আবেগ আর যুক্তির বিরোধ; ওদিকে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার (বা কালের) মধ্যেই রয়েছে শব্দ-নৈঃশব্দ্যের বিরোধ।

[তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায় (১১ মে, ১৯৪২ – ২৩ জুন, ২০২৪) ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্ট (মার্কসবাদী)-র কর্মী-সংগঠক। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে খেটে-খাওয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের একজন সহযোদ্ধা। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়েই বামপন্থী ভাবধারা ও ছাত্র সংগঠনের সাথে সংযোগ, পরবর্তীকালে যুক্ত থেকেছেন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠন ও নাগরিক আন্দোলনের সাথে। দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এনবিএ প্রকাশনা ও নন্দন পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। গত ১১ মে, ২০২৬ তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিনে উন্মোচিত হয় তাঁর অনুবাদে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একগুচ্ছ ছোটোগল্পের ইংরেজি অনুবাদের একটি সংকলন। সেই সভাতেই তাঁর পূর্বতন গ্রন্থ, উত্তরপ্রবেশের কবিতা: জীবনানন্দ ১৯৩৮-১৯৪৮ (কলকাতা: একলব্য, ২০২৪। মূল্য: ৩০০/-) বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য উপস্থাপিত করেছিলেন সুব্রত সিন্হা। লেখাটি সেই বক্তব্যের লিখিত রূপ।– মার্কসবাদী পথ]
উত্তরপ্রবেশের কবিতা: জীবনানন্দ ১৯৩৮-১৯৪৮ বইখানি প্রসঙ্গে আমার মতো কারও কথা বলতে যাওয়া বাতুলতা; তবে এরকম বাতুলতার সম্ভাবনা যে দেখা দিতে পারে সে-বিষয়ে খুব সম্ভব তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায় অবগত ছিলেন। সেইজন্য গ্রন্থনামেই প্রকট বিষয়টি নিয়ে প্রায় দেড়শ’ পাতা জুড়ে নিবিড় এবং তন্নিষ্ঠ আলোচনা করে তিনি ক্ষান্ত দেননি; সেই আলোচনার পরে দু-পাতার একটি ‘শেষের কথা’ও জুড়ে দিয়ে জানিয়েছেন, আগের চারটি অধ্যায়ে ঠিক কোন কথা তিনি বলতে চেয়েছেন। ধাতুগতভাবে শিক্ষক তীর্থঙ্কর মনে করেছিলেন এই স্পষ্টতাটুকুর প্রয়োজন ছিল; এবং সেই বাবদে আগাম সতর্কতাটুকু তিনি যে বজায় রেখেছিলেন, তাতে করে যে-একটি বিশেষ কৃত্য বাচিক পরিসর ছেড়ে গ্রন্থপরিকল্পনার অন্তর্লীন আঙ্গিকেও ওতপ্রোত হয়ে উঠেছিল, তাকে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিতেই বলতে হয় ‘শ্লেষ’। তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায়কে একটানা পঞ্চাশ বছর ধরে নিবিড় বন্ধুত্বের মধ্যে দিয়ে চিনেছেন এমন মানুষ এখনও অত্যন্ত বিরল নন, কাজেই একথা বলতে যাওয়া আমার প্রগল্ভতা, কিন্তু তীর্থঙ্করবাবুর সঙ্গে আড্ডায় বা আলোচনায় তাঁর বাক্ভঙ্গীর মধ্যে ঈষৎ শ্লেষের উপস্থিতি লক্ষ করেননি এমন মানুষ হয়তো বিরল। মালার্মে নাকি তাঁর পাইপের ধোঁয়ার পর্দা দিয়ে বাস্তবকে কিছুটা সহনীয় করে নিতেন; যথার্থই বস্তুবিশ্বের সঙ্গে সহনীয় কোনও সম্পর্কস্থাপনে, পরিগ্রহণেই হোক বা প্রত্যর্পণে, এই তীর্যগতা, শ্লেষের এই মধ্যস্থতা, হয়তো অনিবার্য হয়ে ওঠে: বিশেষত জীবনের অন্তিমপর্বে ফ্যাসিবাদী টুইডেলডাম থেকে প্রাগ্রসরতর ফ্যাসিবাদী টুইডেলডির দিকে অভিযোজনের সঙ্গে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভাবে যুঝে নিতে নিতে, যে-কাজে তীর্থঙ্করবাবু আক্ষরিক অর্থেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কোনও ফাঁকি দেননি। সেই রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন-পরিসরেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তাঁর জীবনানন্দপাঠ; এবং সেই পাঠেও সূচনায় এবং ঊনসমাপ্তিতে অন্বিষ্ট থাকে শ্লেষ। জীবনানন্দেরই অনুগমন করে (“বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ”) তীর্থঙ্কর তৃতীয় অধ্যায়ে পৌঁছে খোঁজেন ‘শ্লেষে লিখিত মহাকবিতা’-র সম্ভাবনা; আর সেই অনুসন্ধানের ভিতটি প্রথম থেকেই তৈরি হতে থাকে ১৯৩৮-১৯৪০ পর্বের জীবনানন্দের কবিতার ভাষায় এই শ্লেষের প্রয়োগ আর তার স্বরূপসন্ধানের মধ্যে দিয়ে।
রবিকরোজ্জ্বল সাহিত্যবিহারে জীবনানন্দের কাব্যভাষার এই শ্লিষ্ট চরিত্র সম্ভবত অর্জিত হয়েছিল তার অতিক্ষীণ সমকালীন পাঠকবর্গের সঙ্গে এক অনুচ্চারিত সমঝোতার অনুব্যবসায় হিসেবে। একথা আজ আর অবিদিত নয়, আধুনিকতাবাদী কাব্যধারার প্রয়োজন ছিল রবীন্দ্রনাথের এক কায়েনমনসাবাচা প্রতি-মূর্তির, কাউন্টার-ইমেজের। রবীন্দ্রোত্তর আধুনিকতাবাদের পর্বে মনসা-বাচা রবীন্দ্র-প্রতিস্পর্ধী চরিত্র খুব দুর্লভ না-হলেও দৃশ্যমানতায় বিশ্বনাগরিক, বিশ্বগুরু বাজার ধরার শতাব্দীকাল পূর্বেই যিনি যুগপৎ বিশ্বকবি এবং কবিগুরু (এবং আপনি-মোড়ল নন), যাঁর পদপ্রপাত শুধুই কাব্যকলায় নয়, ললিতকলায়-দর্শনে-রাজনীতিতে বহুধাব্যপ্ত, তাঁর বিপ্রতীপে এক ‘নির্জনতম’, ‘শুদ্ধতম’ ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কওয়া’ স্বগতোক্তিমূলক কবিমূর্তি ও কাব্যমূর্তি গড়ে পিটে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল হয়তো। লক্ষণীয়, এই পর্বের বাংলা কবিতার সার্থকতম এবং সদর্থকতম প্রতিবেদনগুলি উঠে আসছিল স্বতন্ত্র্য কোনও সমালোচকসমাজ নয়, বরং আধুনিকতাবাদী কবিসমাজের একাংশের মধ্যে থেকেই, সমকাল যাঁদের ‘প্রগতিশীল’ আখ্যা দিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে যার কথা কিছুটা শ্লেষের সঙ্গেই উল্লেখ করতেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বলা বাহুল্য, এই প্রগতিশীল কবিদের অধিকাংশই হয় অধ্যাপক, নয় সম্পাদক-প্রকাশক, নতুবা দুইই; মোটের উপর সাফল্যলাঞ্ছিত তাঁদের ব্যক্তিজীবন এবং কবিজীবনও, রবীন্দ্রজীবনেরই ভগ্নাংশ মাত্রের প্রত্যাবর্তন বলে মনে হতে পারে তাঁদের সকলকেই। এরই বিপ্রতীপে কবিস্বরের স্বাতন্ত্র্যের পাশাপাশি ব্যক্তিজৈবনিক বৈফল্যের বহুবিধ মাত্রাতেও জীবনানন্দ তুলনারহিত। সেই বৈফল্যেরই একটি মাত্রা নিশ্চয় জীবনানন্দের কদাচিৎ আত্মরক্ষা-প্রচেষ্টার অপ্রগল্ভতা আর অপ্রাতিষ্ঠানিকতাও; অতএব, গণপরিসরে জীবনানন্দীয় জীবন ও মনন সম্পর্কিত ‘শুদ্ধকবি’-র অবয়বটি যত অপ্রতিহতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ততই তীর্যক্, ততই শ্লিষ্ট হয়েছে তাঁর কবিভাষাও; তারই একটি সুচিহ্নিত দশক হিসেবে তীর্থঙ্কর বেছে নেন ১৯৩৮-১৯৪৮; উত্তরপর্ব হিসেবে নয়, বরং উত্তর-প্রবেশের পর্ব হিসেবে। আর তাই হয়তো, স্বাভাবিকভাবেই, শ্লেষ-মথিত কাব্যভাষার মহাকাব্যিক উদ্বর্তনের অনুসন্ধানের দুটি অধ্যায় তাঁর গ্রন্থপরিকল্পনায় হাইফেনেটেড হয়ে থাকে জীবনানন্দের রবীন্দ্রবীক্ষার আলোচনায়। সে-আলোচনায় জীবনানন্দের রবীন্দ্রবীক্ষা ‘ভাষার তীক্ষ্ণতা আর আক্রমণাত্মক খরতা’-র সামান্যলক্ষণকে নিয়েও হয়তো কদাচ দেখতে চায় ‘হৃদয়ের পরিজন’ ‘কবি ও নিকট লোকের মতো—বড়ো এক প্রিয়’।
আধুনিকতাবাদের প্রয়োজনে গড়ে ওঠা ‘দূরতম’, ‘নির্জনতম’, ‘শুদ্ধতম’ কবিমূর্তির সাপেক্ষে সত্যিই ততদূর ‘নির্জন’ ছিলেন কি না জীবনানন্দ, সত্যিই ‘নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির মতো নিমগ্ন’ ছিলেন কি না, এমনকি কবিজীবনের প্রারম্ভিক পর্বেও, ধূসর পাণ্ডুলিপি বা বনলতা সেন-এর চিত্ররূপময়তায় মত্তপৃথিবীর, ঔপনিবেশিকতার অভিঘাত পড়ছিল কি না জীবনানন্দীয় বাচংযমের ভিতরে, সে-প্রশ্ন উঠেছে; ভবিষ্যতেও উঠবে নিশ্চয়। তবে ‘শ্লেষ নামক অস্ত্রে সজ্জিত এবং সমাজ ও ইতিহাস সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি ভাবনায় লিপ্ত’ বলে ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৮-এর মধ্যবর্তী পর্বকেই তীর্থঙ্কর আলোচনার জন্য বেছে নেন; তাঁরই স্বীকারোক্তিতে, ‘এই সীমানানির্দেশ arbitrary এবং ন্যায়বর্জিত। কিন্তু অনুভবেরও স্পষ্ট/অস্পষ্ট হেতু থাকে’। এই স্পষ্ট/অস্পষ্ট হেতুময় অনুভব হয়তো একটি মননশীল ‘ইনট্যুইশন’ বা ‘হাঞ্চ’, এবং নিজের পাঠকসত্তার সেই স্থিতিস্থাপক অনুভূতির উপর তীর্থঙ্কর ভরসা রেখেছিলেন বলে আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে পারি। কারণ এই ইন্ট্যুইশন-প্রসূত অনুসন্ধান তাঁকে একসময় পৌঁছে দেবে জীবনানন্দের কবিজীবনের এই সংযোজকপর্বের আদিলক্ষণগুলোকে খুব স্পষ্টভাবে সনাক্ত করবার দিকে, যেখানে এইসব কবিতায় মূর্ত হয়ে থাকে ত্রিবিধ বিরোধ— কন্ট্রাডিকশন হিসেবে যতখানি, তার চেয়ে বেশি হয়তো ডায়ালেকটিকাল প্রক্রিয়ার সূত্রেই:
"সভ্যতার ভাঙা-গড়ার প্রসঙ্গে এই পর্বের কবিতায় সূর্য আর অন্ধকারের দ্বন্দ্ব একমাত্র দ্বন্দ্ব নয়। সেই বিরোধ বহুল পরিমাণে সরলরৈখিক। … আলো-অন্ধকারের দ্বন্দ্বের সঙ্গে জীবনানন্দ মিশিয়েছেন হৃদয় বনাম মস্তিষ্কের দ্বন্দ্ব। তৃতীয় বিরোধ সুর ও নিঃশব্দতার মধ্যে। … সভ্যতার উত্থান-পতনের লড়াই যে প্রত্যক্ষ করেছে, তার নিজের মধ্যে রয়েছে আবেগ আর যুক্তির বিরোধ; ওদিকে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার (বা কালের) মধ্যেই রয়েছে শব্দ-নৈঃশব্দ্যের বিরোধ।"
তীর্থঙ্করের পাঠে, ‘কালাতিপাত’ (প্রকাশ: যুগান্তর, শারদীয় ১৩৪৬) কবিতায় তিনটিরই সমাপতন ঘটেছে বলে টেনশন আর ব্যঞ্জনা এখানে আরও শক্তিশালী’—সেই কবিতাটি আমরা এইখানে উদ্ধৃত করতে চাই।
কিন্তু তারও আগে আরও একটি কথা বলবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। একটা গল্প বলি, পরিচিত এক চলচ্চিত্রকারের কাছে শোনা, বহু বছর আগে, তিনি যখন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলে তথ্যচিত্র বানানোর কাজে ঘুরছেন, তাঁর সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা। জঙ্গলমহলের কোনো এক প্রান্তিকতম জনজাতির মধ্যে তিনি দেখেছিলেন, কিছুতেই উদ্বৃত্ত সঞ্চয় না-করবার অদম্য জেদ। বনলক্ষ্মীর অনুদান থেকে সামান্য উপজাত বিক্রি করেই তাঁদের বসে যেতে হতো; উৎপাদনপ্রক্রিয়ার পরবর্তী চক্রটি শুরুই হতে পারত না ততদিন, যতদিন রাঁধা ভাত ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও পচুইয়ের হাঁড়িতে অবশিষ্ট থাকত কিছুটা তলানি। শৈশবের দাবি, বলাই বাহুল্য, কিছু অন্যরকম। পরের দফার হাটে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তাই রোরুদ্যমান শিশুর মুখে যত্ন করে পচুইয়ের জলের ফোঁটা তুলে দিয়ে মা তাকে ঝিম ধরিয়ে রাখতেন, হয়তো বা ঘুম পাড়িয়েই। গল্পটা মর্মান্তিক, এবং এইখানে তার উত্থাপন নিশ্চয়ই সংবেদনশীলতা আর সদ্বিবেচনার শোচনীয় অভাবেরই পরিচায়ক। তবু, জীবনানন্দের লেখা থেকেই দুটি অনুচ্ছেদ পড়ে দেখা যাক। ১৩৪৩-এর আশ্বিনে জীবনানন্দ লিখছেন, তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পাণ্ডুলিপি-র ভূমিকায়:
"আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৩৪ সালে। কিন্তু সেই বইখানা অনেকদিন হয় আমার নিজের চোখের আড়ালেও হারিয়ে গেছে: আমার মনে হয় সে তার প্রাপ্য মূল্যই পেয়েছে।"
"১৩৩৬ সালে আর একখানা বই বার করবার আকাঙ্ক্ষা হয়েছিল। কিন্তু নিজ মনে কবিতা লিখে এবং কয়েকটি মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত ক’রে সে ইচ্ছাকে আমি শিশুর মতো ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলাম। শিশুকে অসময়ে এবং বারবার ঘুম পাড়িয়ে রাখতে জননীর যেরকম কষ্ট হয় সেইরকম কেমন একটা উদ্বেগ—খুব স্পষ্টও নয়, খুব নিরুত্তেজও নয়—এই ক-বছর ধরে বোধ করে এসেছি আমি। …"
১৯৫৪-তে কী অস্বাভাবিকভাবে জীবনানন্দকে চলে যেতে হয়েছিল সে-কথা কারও অবিদিত নয়। ১৩৩৬-এর পরিস্থিতি না-হলেও ১৩৬১-র জীবনানন্দকেও অনেক কবিতাকেই ঘুম পাড়িয়ে রেখে যেতে হয়েছিল পত্রিকার পাতার মধ্যেই; কথাসাহিত্যকে তো প্রায় সর্বাংশেই পাণ্ডুলিপিস্তরে। পরবর্তী জীবনানন্দ-পাঠকদের একটা বড়ো কাজ নিশ্চয়ই সেইসব অনতিপরিচিত কাব্যখণ্ডের পুনরুদ্ধার, যে কাজ করেছেন ভূমেন্দ্র গুহ বা দেবেশ রায়; কবির জীবনের সঙ্গে সেই অগ্রন্থিত কবিজীবনের সমন্বয়ের কাজে অনেকদূর এগিয়ে দিয়েছেন প্রভাতকুমার দাস বা ক্লিন্টন বি সীলী। সেইসব ঘুমপাড়ানো শৈশবের পুনর্জাগরণের সেই যদি হয় প্রথম পদক্ষেপ, তাহলে নিশ্চয়ই সমালোচকের কাজ ধাতৃত্বের সঙ্গে তুলনীয়; শ্রেষ্ঠ কবিতা আর রূপসী বাংলা-র মধ্যস্থতায় বহুমান্য অবয়বের বাইরেও জীবনানন্দের কবিসত্তার পূর্ণতর পরিচয়ের জন্য, প্রাতিষ্ঠানিক কাব্যসমাজের জীবনানন্দীয় মূর্তিটির অবিনির্মাণের জন্য এইসব ধূসরতর উচ্চারণের নিবিড় ও অতিশায়ী পুনর্বিবেচনা আশু প্রয়োজন; আর সেই কাজে উত্তরপ্রবেশের কবিতা-র অবদান সংশয়াতীতভাবে মূল্যবান। তীর্থঙ্করের পাঠ আমাদের জীবনানন্দের বোধে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যায়; সেই বোধের সূত্রে কিছু দূর গিয়ে তাঁর হাত ছেড়ে স্বতন্ত্রভাবেই আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারেন হয়তো পাঠক নিজেই; যদি তাঁর মনন এবং ‘লালন’-কে শুধুই নির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করে নয়, বরং পদ্ধতিগত সংগতিতে তার আত্তীকরণ করতে পারেন তিনি।
এইবার জীবনানন্দের পূর্বোক্ত কবিতাটি উদ্ধার করা যাক: কবিতাটির বিষয়ে তীর্থঙ্করের সংবেদী পাঠের পরিচয় পাওয়া যাবে প্রথম অধ্যায়ের পঞ্চদশ পরিচ্ছেদে। ১৯৩৮-এ, ১৩৪৬-এর শারদীয়া যুগান্তর-এ প্রকাশিত কবিতাটির নাম ‘কালাতিপাত’।
সমুদ্রের প্রতিধ্বনিময় এক
আঁকাবাঁকা গুহার আঁধারে
প্রবেশ করিতে গিয়ে বোঝা গেল সুর ভাসে:
এই কুরুবর্ষ – এই কন্যাকুমারিকা
অতীতের কুয়াশার পারে।
প্রকাণ্ড ধীমান এক দেবদারু-বিবরের থেকে
প্রশান্ত বায়ুর শব্দ নড়ে;
‘হে মানুষ’ বলে সে ডাকে না কোনো জনগণদের।
আমি ক্লান্ত প্রাণ আজ প্রলাপনাণ্ডুর পৃথিবীতে;
হৃদয়ের কাছে ঢের যুক্তি ছুঁড়ে
যখন মস্তিষ্ক গেল জিতে
শরণ নিলাম আমি সূচীমুখ জ্বেলে দিয়ে — স্তব্ধতায় —
বৃশ্চিক-গ্রথিত আঁধারের।
শুনি আমি আরো শব্দ — যত দূরে চলে যাই তত;
ওরা সব আমারই মতন:
দুশ্চর সমুদ্র ঘিরে বধির বদ্বীপ — ইতস্ততঃ —
নিস্পৃহ ভূখণ্ড নিয়ে
এক-এক জন।
আজ এই পৃথবীর
স্তূপীকৃত — অন্ধ — নির্বান্ধব —
লোহার শকট ভরা আবিষ্ট মানব।
কিংবা আরো অশ্লীল তাহাদের শব:
কতখানি নেত্র আর নাসিকার তরে,
কতখানি মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের অক্ষুণ্ণ সঞ্চয়:
ভাবিছে প্রতিভূ একা শীর্ণ জাদুঘরে
অদ্ভুত অঙ্গন তার জ্যোৎস্না আর তরুদের সঞ্চারণময়।
অদ্ভুত অঙ্গন তার
জ্যোৎস্না আর রক্ত, বালুকার।
মোরা সব সন্তানের সন্ততি তাহার।
সময় গণনা আর করে নাকো তাহার মিশ্রিত মৃত্যু বুকে নিয়ে
কখন সে আপেক্ষিক তরঙ্গ হারিয়ে
হয়ে গেছে প্লিওসিন যুগের পাহাড়।
প্রকাশের তারিখ: ২৩-মে-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
